• বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
  • ||

চলন্তিকার পোড়ামাটিতে খেটে খাওয়া মানুষের আহাজারি

প্রকাশ:  ১৭ আগস্ট ২০১৯, ১৭:৩০ | আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০১৯, ১৭:৪৯
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের চলন্তিকা বস্তির এখন পোড়া-আধপোড়া ঘরগুলোর কিছু কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে।শুক্রবার রাতে এ বস্তিতে আগুন লেগে পুড়ে যায় প্রায় দু’হাজার ঘর। আগুন বাস্তুহারা করেছে অন্তত ৩০ হাজার মানুষকে। পোড়ামাটিতে মাথায় হাত দিয়ে ছাইমাখা মানুষগুলো বসে আছে, কণ্ঠে তাদের আহাজারি।

আগুনলাগার ঘটনা সন্ধ্যার পর পর ঘটায় প্রাণ নিয়ে নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। আর ঘরের বাইরে ছিল অনেকেই। তাই হতাহতের ঘটনা খুব বেশি ঘটেনি। ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিটের সাড়ে তিন ঘন্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।কিন্তু তার আগেই খেটে খাওয়া মানুষগুলোর কেড়ে নিয়েছে আগুনের লেলিহান শিখা। সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে অনেকেই রাত থেকে কাঁদছেন। রাতের সেই কান্না এখন রূপান্তরিত হয়েছে আহাজারিতে।

শুক্রবার সন্ধ্যার পর বস্তির মাঝামাঝি এলাকার একটি ঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত। মুহুর্তেই তা ছড়িয়ে পড়ে বস্তির এক ঘর থেকে অন্য ঘর। ঝিলের উপর বাঁশ আর কাঠের মাচার উপর ঘর তৈরি হওয়ায় দ্রুত তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের ৭টি, পরে ২০টি এবং সবশেষ ২৪টি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজে নিয়োজিত হয়। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় স্থানীয় মানুষ। বস্তির মধ্যে সরু গলি হওয়ায় ফায়ার সার্ভিসের পানিবাহী গাড়ি ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি। দূর থেকে পাইপের মাধ্যমে পানি নিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে ফায়ার সার্ভিস। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঈদের ছুটির সুযোগে ষড়যন্ত্র করে আগুন লাগানো হয়েছে।

আগুন লাগার সঠিক কারণ সম্পর্কে বলতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। তদন্তের মাধ্যমেই এর কারণ অনুসন্ধান করার কথা জানালেন সংস্থাটির পরিচালক।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন উত্তর সিটি মেয়র ও স্থানীয় সংসদ সদস্য। ক্ষতিগ্রস্থদের সহায়তার পাশাপাশি আহতদের সুচিকিৎসা দেয়ার ঘোষণা দেন মেয়র।

স্থানীয়রা জানায়, ঝিলপাড় চলন্তিকা বস্তির ২ হাজারেরও বেশি ঘরে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের বসবাস। ঈদের বন্ধে বাড়ী যাওয়ায় বেশিরভাগ ঘরই ছিল তালাবদ্ধ। তবে এসব পরিবারের মালামাল পুড়ে যাওয়ায় তারা নি:স্ব হয়ে গেছেন। এর আগে ২০০৯ সালেও এ বস্তিতে আগুন লেগেছিলো। তবে তার ব্যাপকতা ছিলো কম।

আগুনের ভয়াবহ তীব্রতায় ঝিলপাড় বস্তি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। পুড়ে ছাই হয়ে গেছে কাঁচা টিনের ঘরগুলো এবং ঘরের সব সরঞ্জাম। আর এই ধ্বংসস্তূপে সব হারানো মানুষগুলো খুঁজে ফিরছেন অবশিষ্ট সম্বল। পোড়া ছাইয়ের নিচ থেকে নেড়ে-চেড়ে লোহার আসবাবের ফ্রেমগুলো বের করছিলেন তারা।

আগুনে ঘর-বাড়ি সব হারিয়ে পথে বসে আহাজারি করছেন অনেকে । সোহাগ নামে এক বৃদ্ধ ভিক্ষুক থাকতেন ওই বস্তিতে। তার গ্রামের বাড়ি শেরপুর সদরে। তিনি জানান, নিজের বলতে তেমন কিছুই তার ছিল না। তারপরও যেটুকু ছিল, তার কিছুই ঘর থেকে বের করতে পারেননি।

মর্জিনা বেগম নামে এক বৃদ্ধা কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, মোবাইল ফোনসেটটি তার হাতে ছিল, শুধু সেটিই রক্ষা পেয়েছে। আর ঘরে থাকা সব কিছুই পুড়েছে। তার গ্রামের বাড়ি দিনাজপুর। সেখানে স্বজনদের কাছে মাসে মাসে কিছু টাকা পাঠাতে হয়। কিন্তু এখন তার নিজের খাওয়ারই কোনো সংস্থান রইল না।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম শনিবার দুপুরে রাজধানীর মিরপুরের চলন্তিকা বস্তির আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। মেয়র বলেন, বস্তিতে আগুন লাগা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে অস্থায়ীভাবে থাকা-খাওয়াসহ সার্বিক সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাদের জন্য পার্শ্ববর্তী পাঁচটি স্কুল অস্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। পুড়ে যাওয়া বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনে সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহায়তার আশ্বাস দেন মেয়র।

তিনি বলেন, বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনের জন্য ২০১৭ সালে বাউনিয়া বাঁধে জায়গা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে ইতোমধ্যে পুনর্বাসনের কাজ শুরু হয়ে গেছে। এখানকার ১০ হাজার বস্তি পরিবারকে পর্যায়ক্রমে সেখানে স্থানান্তর করা হবে।

পূর্বপশ্চিমবিডি-এনই

মিরপুর বস্তি
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত