Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ৪ ভাদ্র ১৪২৬
  • ||

`থানায় নিয়ে রশিতে ঝুলায়, একজন ঘুরাতে থাকে, দুজন পেটাতে থাকে’

প্রকাশ:  ০৫ আগস্ট ২০১৯, ২২:৩৭ | আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০১৯, ২৩:০৮
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক
প্রিন্ট icon
নিরাপত্তা হেফাজতে ভাইয়ের ওপর নির্যাতনের বিষয়ে কথা বলছিলেন এই নারী

বাংলাদেশে নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতন ও অমানবিক আচরণ বিষয়ে গেলো সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটির সভায় একটি পর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো। সভায় বিভিন্ন বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনের আলোকে বাংলাদেশের নির্যাতন পরিস্থিতি নিয়ে কমিটির সদস্যরা যেসব অভিযোগ তুলে ধরেছেন, তার বিপরীতে বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী দাবি করেছেন, বাংলাদেশে নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতনের তথ্য অনেকক্ষেত্রেই অসত্য। এছাড়া এ ধরণের নির্যাতন প্রতিরোধে আইনী কাঠামোর উন্নতির কথাও তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। কিন্তু বাংলাদেশে নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতনের প্রকৃত চিত্র আসলে কী রকম?

দু'হাজার ষোল সালের এক মধ্যরাত।

আব্দুল আলীমের (ছদ্মনাম) বাসায় প্রবেশ করে সাদা পোষাকে পুলিশের বেশ কিছু সদস্য।

কোন ওয়ারেন্ট ছাড়াই আব্দুল আলীমকে নিয়ে আসা হয় থানায়। তখনো আলীম জানেন না তার অপরাধ কী?

সকাল হতেই শুরু হয় তার ওপর নির্যাতন।

আলীম বলছিলেন, "থানার ভেতরে একটি রুমে ওরা আমাকে প্রথমে রশিতে ঝুলায়। এরপর আমার শরীর ঘোরাতে থাকে আর কয়েকজন পুলিশ সদস্য লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকে। ঘণ্টা দুয়েক থেমে থেমে চলে এই নির্যাতন।"

আলীম বলছিলেন, এভাবে টানা আট দিন তাকে মারধর করা হয়। প্রতিদিন অন্তত: দুই ঘণ্টা।

কিন্তু কোন মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়নি।

মারধরের আওয়াজ মোবাইল ফোনে তার বাড়ির সদস্যদের শুনিয়ে টাকা চাওয়া হয়েছিলো। বলা হয়েছিলো, টাকা দিলে ছেড়ে দেবে।

আব্দুল আলীম জানাচ্ছেন, তারা টাকা দিতে পারেননি। পরে ভাংচুরের একটি মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে চারদিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। আবারো চলে নির্যাতন।

মি. আলীম প্রায় দশ মাস কারাভোগের পর জামিন পান।

তবে তিনি পরে থানা হেফাজতে নির্যাতন বিষয়ে টুঁ শব্দটিও করেন নি। কোন মামলাও করেন নি।

"আমি বা আমার পরিবার আসলে মামলা করার কথা ভাবিই নি। ছাড়া পেয়েছি এটাই ছিলো বড় কথা। পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করে কি নিজের জীবনকেই হুমকির মধ্যে ফেলবো?" মি. আলীমের পাল্টা প্রশ্ন।

থানা হেফাজতে থাকা অবস্থায় এবং রিমান্ডে মি. আলীম তার উপর নির্যাতনের যে অভিযোগ করছেন, বাংলাদেশে এমন অভিযোগ নতুন নয়।

এমনকি নির্যাতনে মৃত্যুর ঘটনাও আছে।

এরকমই একটি মৃত্যুর ঘটনা আমাকে বলছিলেন পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী। ধরা যাক, তার নাম মানুসরা খাতুন।

মানসুরা খাতুন জানাচ্ছিলেন, ২০১২ সালে পুলিশের হাতে তার বড় ভাই আটক হওয়ার একদিন পরই তার লাশ পাওয়া যায় হাসপাতালের মর্গে।

"পুলিশের সোর্স আমার ভাইয়ের কাছে টাকা চাইছিলো। সে দেয় নাই। পরে একদিন পুলিশের এক এসআই কয়েকজন পুলিশ নিয়া আইসা আমার ভাইরে এলাকা থেকে ধরে থানায় নিয়ে যায়। রাতে আমরা দেখা করতে যাই। প্রথমে দেখা করতে পারি নাই। কিছুক্ষণ পরে থানার বাইরে থেকেই ভাইয়ের কান্না আর চিৎকার শুনতে পাইতেছিলাম। ওরা আমার ভাইরে মারতেছিলো।"

মানসুরা বলছেন, সেই রাত্রেই পরে থানায় ভাইয়ের সঙ্গে তারা দেখা করতে পেরেছিলেন।

তখন তার ভাইয়ের শরীর ছিলো রক্তাক্ত। তার ভাই তখন জানিয়েছিলেন, ৫০,০০০ টাকা না দিলে তাকে মেরে ফেলবে।

"পরদিন দুপুরে আমি থানা থিক্যা ফোন পাই। বলে আমার ভাই অসুস্থ্য। হাসপাতালে আছে। আমি আর আমার বোন দৌড়ায়া হাসপাতালে যাই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভাইরে খুইজ্যা পাই মর্গে। ভাইয়ের দুই পা নীল হয়া আছিলো। এমন মারছে যে, আমার ভাই যদি বাঁইচাও থাকতো, ওর পা দুইটা মনে হয় কাইটা ফেলতে হইতো।"

মানসুরা বলছেন, তার ভাইয়ের একমাত্র কন্যাকে এখন তারাই দেখাশোনা করছেন।

এ ঘটনায় পরে তিনি পুলিশের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে একটা মামলা করেছিলেন। সেই মামলায় পুলিশের এক এসআই জেলহাজতে আছেন।

বাংলাদেশে আইন-শৃংখলা বাহিনীর হাতে আটক অবস্থায় কিংবা রিমান্ডে নির্যাতনের এরকম ঘটনা আরো অনেক আছে।

কিন্তু এসব বিষয়ে অবশ্য ভূক্তভোগীরা প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। মামলাও করতে চান না।

এ ধরণের ঘটনার তথ্য অনেক সময় মানবাধিকার সংগঠনগুলোই জনসমক্ষে নিয়ে আসে।

মানবাধিকার সংগঠন অধিকার গত পাঁচ বছরে এরকম ১৩১টি নির্যাতনের সংখ্যা উল্লেখ করছে।

এছাড়া পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় গত পাঁচ বছরে ৩০৭ জন নির্যাতনে মৃত্যুর শিকার হয়েছে বলে তথ্য দিচ্ছে সংস্থাটি।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এর অনারারি নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন বলছেন, নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতন অহরহই ঘটছে। অথচ এটা বেআইনী।

তিনি বলছেন, "আপনি কিন্তু কোন ক্ষেত্রেই কারো বিরুদ্ধে কোন মতেই নির্যাতন করতে পারবেন না। এখানে নির্যাতনের পক্ষে কোন অজুহাতের সুযোগ নেই। এমনকি দেশে যদি যুদ্ধাবস্থাও থাকে এবং আটক ব্যক্তি যদি সন্ত্রাসীও হয়, তাহলেও তাকে নির্যাতন করা যাবে না। আমাদের সংবিধানে কিন্তু এরকমটাই বলা আছে।"

বাংলাদেশে ২০১৩ সালে নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতন বন্ধে একটি আইন পাস করা হয়। যেখানে সব ধরণের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, শাস্তি দেয়া এমনকি ভয়-ভীতি দেখানোও অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়েছে।

কিন্তু মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এই আইনে যেমন কারো শাস্তি পাওয়ার নজীর নেই তেমনি আইন প্রতিপালনেও ঘাটতি আছে।

সারা হোসেন বলছিলেন, "এখানে জবাবদিহিতার ব্যাপারটা আসলে নেই। কারণ যে সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে, তারা নিজে কিন্তু জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করছে না। যেই পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, পুলিশ বাহিনী তাদের কয় জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে? নির্যাতন বিষয়ে কী করা হয়েছে সে বিষয়ে সংসদেই বা কয়বার কথা হয়েছে?" বিবিসি বাংলা।

পূর্বপশ্চিম ডেস্ক/ এআর

apps
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত