• শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
  • ||

ডেঙ্গুর পরীক্ষা নিয়ে সংকট

প্রকাশ:  ০৫ আগস্ট ২০১৯, ১১:১১ | আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০১৯, ১১:২২
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু। এরই মধ্যে কয়েক হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন মারাও গেছেন। যতই দিন যাচ্ছে এই রোগে আক্রান্তদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে, যা চরম আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে সারাদেশে।

রোববার (০৫ আগস্ট) সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে আরও ১ হাজার ৮৭০ জন ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী যা আগের দিনের চেয়ে ২২১ জন বেশি। এর মধ্যে ডেঙ্গুর পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কিটের সংকট দেখা দিয়েছে বাজারে, দামও বেড়েছে কয়েক গুণ। ফলে ডেঙ্গু পরীক্ষা বন্ধ করে দিয়েছে কোনও কোনও বেসরকারি হাসপাতাল।

এসব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, জুনে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেওয়ার পর থেকেই এনএস১ কিটের দাম বাড়তে থাকে, ১২০ টাকার কিট এখন ৪৫০ টাকা দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ডেঙ্গু পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য এই হাসপাতালগুলোকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীদের অনেকে।

তারা বলছেন, কিটের দাম বৃদ্ধি এবং সরকার ডেঙ্গু পরীক্ষার দাম বেঁধে দেওয়ায় অনেক হাসপাতাল ইচ্ছা করে এই পরীক্ষা বন্ধ করে দিয়েছে।

রোববার মালিবাগের ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বন্ধ ছিল ডেঙ্গুর পরীক্ষা। নয়া পল্টনে ইসলামী ব্যাংক স্পেশালাইজড হাসপাতালেও ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য ভর্তি রোগীদের প্রাধান্য দেওয়া হয়।

কিট সংকটের কথা বলেছেন আরও অনেক বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। এই অবস্থায় রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে অনুরোধ করা হয়েছে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ডেঙ্গুর পরীক্ষা না করাতে।

তাদের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ঢালাওভাবে সব ধরনের রোগীর এনএস-ওয়ান পরীক্ষা করা হচ্ছে। এ কারণে পরীক্ষায় ব্যবহৃত কিটের অপচয় হচ্ছে। এ কারণে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ডেঙ্গু রোগের পরীক্ষা না করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

জ্বরের দ্বিতীয়-তৃতীয় দিনে চিকিৎসকের কাছে গেলে ডেঙ্গু হয়েছে কি না, তা বের করতে ডেঙ্গু এনএস১ পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়। এই পরীক্ষার জন্য দরকার হয় এনএস১ কিট। এরপরে গেলে আইজিজি ও আইজিএম পরীক্ষা দেওয়া হয়। কারণ এই সময়ে এনএস১ কিট দিয়ে পরীক্ষা করলে ডেঙ্গু থাকা সত্ত্বেও তা শনাক্ত হয় না।

টানা দেড় মাসের মতো ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় এ নিয়ে জনমনে আতঙ্কের কারণে ঢাকার সব হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষার হিড়িক পড়ে। এই সুযোগে অতিরিক্ত ফি নেওয়ার অভিযোগ ওঠে অনেক বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে। গত মাসে ডেঙ্গুর টেস্টের জন্য ফি বেঁধে দেয় সরকার-ডেঙ্গু এনএস১ এর জন্য ৫০০ টাকা এবং আইজিজি ও আইজিএম-দুটোর জন্যে ৫০০ টাকা। এখন কিট সংকটের কথা জানিয়ে ডেঙ্গুর পরীক্ষাই বন্ধ রাখছে অনেক হাসপাতাল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ইমপালস হাসপাতালের পরিচালক (অপারেশন) শফিকুল ইসলাম বলেন, শনিবারই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে এসএমএসের মাধ্যমে জানানো হয়েছে বাজারে পর্যাপ্ত ডেঙ্গু টেস্ট কিট রয়েছে। কিন্তু আমরা কোনো মার্কেটে গিয়েই ডেঙ্গু এনএস১ কিট পাচ্ছি না। তারা বলছে, সব কিট এয়ারপোর্টে আটকা পড়ে আছে। কিন্তু আমরা সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে পারছি না। এখন একটি কিট কিনতে ৪০০ টাকা বা তার চেয়ে বেশি গুণতে হচ্ছে। সঙ্কট থাকলে তারা বেশি দামে কীভাবে বিক্রি করছে? অথচ আগে এই কিটগুলো ১৮০ টাকায় পাওয়া যেত।

ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ সরঞ্জাম আছে কি না জানতে চাইলে ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা সুব্রত মণ্ডল বলেন, এই হাসপাতালে এখন টেস্টের কোনো কিট নেই। পাওয়া যাচ্ছে না। যেসব রোগী বাইরে থেকে টেস্ট করে ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছেন তারা এখানে আসলে ভর্তি নেওয়া হচ্ছে।

তাদের হাসপাতালে এখন ১০২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছেন। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই শিশু বলে জানান তিনি।

এই হাসপাতালে নিয়মিত ৬০ থেকে ৭০ জন রোগী ভর্তি থাকলেও ডেঙ্গুর প্রভাবের কারণে তা বেড়ে প্রতিদিন গড়ে ১৭০-১৮০ জন রোগী ভর্তি থাকছেন বলে জানান সুব্রত।

কিট না থাকায় সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা কেন্দ্রে ডেঙ্গু পরীক্ষা হবে না বলে জানিয়েছেন সেখানকার প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা (সিএমও) সারওয়ার জাহান মোস্তাফিজ।

তিনি বলেন, শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির কারণে তাদের ডেঙ্গু টেস্ট বন্ধ ছিল। মাঝখানে রোববার ১৫০ জনের টেস্ট করানো হয়েছে। তবে সোমবার কিট না থাকার কারণে টেস্ট বন্ধ থাকবে।

ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কিটের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেন নয়া পল্টনের ইসলামী ব্যাংক স্পেশালাইজড হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট ডাক্তার মোজাম্মেল হোসেন খান।

তিনি বলেন, তারা নিবন্ধিত কোম্পানির কাছ থেকে ১১৪ টাকা ও ১৮০ টাকায় এনএস১ কিট সংগ্রহ করছিল্নে। কিন্তু সম্প্রতি এর দাম পাঁচগুণ বেড়ে গেছে। গতকাল বিএমএ মার্কেটে গেলে এনএস১ এর দাম চেয়েছে ৪২৮ টাকা। আজকে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের মুগদা শাখায় এই কিট কিনেছে ৫০০ টাকা করে। এভাবেই কৃত্রিম সঙ্কট দেখিয়ে দাম বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

রোববার এক আলোচনা সভায় ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের চেয়ারম্যান ও এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক প্রীতি চক্রবর্তী বলেন, আমরা ডেঙ্গু কিট কিনতে হিমশিম খচ্ছি । ৪৫০ টাকা করে যেগুলো কিনেছি তা দিয়ে আগামীকাল পর্যন্ত চালানো যাবে। এর পর কী হবে বুঝতে পারছি না। সরকার যে কিট আনছে সেটাতো সরকারি হাসপাতালে ব্যবহার হবে। এই পরিস্থিতিতে বেসরকারি হাসপাতালের জন্যও সরকারের কিট আমদানি করা উচিত।

বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্লিনিক এসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জাহাঙ্গীর বলেন, আগে আমরা ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট কিনতাম ১২০ টাকা দিয়ে। এরপর তা ১৫০ টাকা হয়। জুনে তা বেড়ে ১৮০ টাকা হয়। আর এখন ৪৫০ টাকা দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না।

মালিবাগ মোড়ের মেডিনোভা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের জনসংযোগ কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান খান বলেন, আমাদের এখানে বিভিন্ন রোগের শুধু টেস্ট করানো হয়। কোনো রোগী ভর্তি করা হয় না। রোববার বিকাল পর্যন্ত প্রায় ১০০ জন ডেঙ্গু টেস্ট করিয়েছেন। শনিবার ৩০০ ও শুক্রবার প্রায় ৪০০ জন এই টেস্ট করিয়েছেন।

এনএস১ কিট পর্যাপ্ত পরিমাণ আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন আছে। তবে মাঝে দুই দিন কিট সঙ্কট ছিল।


পূর্বপশ্চিমবিডি/লা-মি-য়া

ডেঙ্গুর পরীক্ষা
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত