• বুধবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২১, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
  • ||

আমি নন্দিনী

প্রকাশ:  ২৭ আগস্ট ২০২১, ০০:৩৬ | আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২১, ০০:৩৭
মণিজিঞ্জির সান্যাল
মণিজিঞ্জির সান্যাল

নন্দিনী শেষ অবধি পুরী যাওয়াই মনস্থির করল। আসলে সমুদ্র ছাড়া নন্দিনী আর কিচ্ছু ভাবতে পারে না। ছোটবেলা থেকে সমুদ্র পাগল এই মেয়েটি হানিমুনে পুরী ছাড়া অন্য কোথাও যেতে রাজি নয়। সায়ন তো শুনে অবাক, “এ কিরে বাবা, গেয়ো ভূত নাকি? পৃথিবীতে এত জায়গা থাকতে শেষমেশ পুরী?”

বড়লোক বাবার ছেলে হওয়ার দৌলতে আর কর্পোরেট জগতে চাকরির সুবাদে পৃথিবীর প্রায় অনেকটা জায়গাই তার আয়ত্তে। ভেবেছিল স্বপ্নের রাজকন্যেকে নিয়ে হয় মালয়শিয়া, নয়তো থাইল্যান্ডে ঘুরে বেড়াবে।

সম্পর্কিত খবর

কিন্তু এ যে শেষমেশ এমন একটা জায়গা চয়েস করবে তা কে জানে?

“সমুদ্রই যদি তোমার ফাস্ট চয়েস হয় তাহলে চলো না সিঙ্গাপুর যাই, কিংবা কাছাকাছি গোয়াতেও তো আমরা যেতে পারি।”

“না সায়ন পুরীই চলো না প্লিজ।”

“কি যে পাও পুরীতে। বিয়ের আগেও তা শুনেছি হাজার বার পুরী গেছ। তা হানিমুনে অন্য কোথাও গেলে হয় না? একটা স্টেটাস বলেও তো কিছু আছে নাকি?”

“সায়ন স্টেটাস মেনটেন করার জন্যে তুমি…”

“‘নয় কেন?”

“অথচ তুমি...”

নন্দিনীর গলা ভারী হয়ে আসে। সায়ন আর কথা বাড়ায় না। ‘ওকে’ বলে নন্দিনীর মাথায় একটা ছোট্ট টোকা দিয়ে বেরিয়ে পরে কালো রঙের হোন্ডা সিটি নিয়ে।

পুরীর সঙ্গে যে ওর কত স্মৃতি তা সায়ন বুঝবে কেমন করে। সেই ছোট্টবেলায় তখন দেড় বছর বয়স, সবুজ রঙের ফ্রকটা একটা বড় ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, ফ্রকটার একটা অংশ কাটা ছিল, বোতাম ছিল না তাতে, সুতো দিয়ে বাঁধা, মা অদ্ভুত অদ্ভুত সব ফ্রক বানাতেন। কী ভীষণ কেঁদেছিল ছোট্ট নন্দিনী। মা তখন কোলে নিয়ে কত বুঝিয়েছিলেন।

আবার পৌনে তিন বছর বয়সে পুরী গিয়েছিল। সমুদ্রের অত বড় বড় ঢেউ দেখে একদম ভয় পায়নি ছোট্ট নন্দিনী। কি সুন্দর নেচেছিল ঢেউয়ের তালে তালে। এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান দম্পতি সেই নাচ দেখে কোলে তুলে কত ছবি তুলেছিলেন। সেবার পুরী থেকে ফিরেই মা নাচের স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। সেই থেকে নাচ শুরু।

এসব ভাবতে ভাবতেই সায়নের ফোন, “তোমার পুরী যাবার টিকিট কনফারমড। কি খুশি তো?”

কীভাবে সায়নকে বোঝাবে যে সে কতটা খুশি। ইংলিশ ব্যাচে স্যার মজা করে বলতেন পুরীর কোনারকের মন্দিরে বরের সঙ্গে ঘোরার মজাই আলাদা। কথাটার অন্তর্নিহিত অর্থ নন্দিনী তখন সেভাবে বুঝতে পারেনি। বড় হয়ে কোনারকের মন্দিরে বিভিন্ন মুর্তিগুলো বারবার দেখে লজ্জায় আটখানা। ভেবেছে, হানিমুনে বরের হাত ধরে এ জায়গাগুলোতে ঘুরবেই ঘুরবে।

সুন্দর একটা ফ্ল্যাট কিনেছে উত্তরায়ণে, শিলিগুড়ির মধ্যে থেকেও কেমন যেন একটা অন্য শিলিগুড়ি। চেনা গন্ধটা কেমন যেন অচেনা। আভিজাত্যের মোড়কে ঘেরা, কৃত্রিমতার বন্ধনে যেন আবদ্ধ এখানকার মানুষ। তবুও এখান থেকে বেরলেই সবুজ চা বাগানগুলো যেন একটা মন ভাল করা ওষুধের কাজ করে। দিল্লিতে থাকেন সায়নের বাবা, মা। শুধু কাকু, কাকিমা বাবার পৈতৃক বাড়ি শিলিগুড়িতে থাকেন। পিসিরা, জেঠুরা সবাই আছেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, কেউ বা দেশের বাইরে। পুজোর সময় বা বিশেষ কোন পারিবারিক অনুষ্ঠানে সবাই এক জায়গায়। তখন দাদুর তৈরি এই বাড়িটা জমজমাট। বিয়ে ঠিক হওয়ার পর পরই উত্তরায়ণে এই ফ্ল্যাটটা সায়ন কিনবে বলে একেবারে মনস্থির করে ফেলে ।

নন্দিনী যদিও বারণ করেছিল, বারবার বলেছিল, “কি দরকার সায়ন নতুন ফ্ল্যাট কেনার, তোমাদের এত সুন্দর একটা বাড়ি আছে, সেখানে কাকু, কাকিমাও আছেন, আমার একা থাকতে একদম ভাল লাগে না।”

শুনে হো হো করে হেসেছিল সায়ন, “পাগল নাকি? আমি আমার বউকে এই পুরনো বাড়িতে রাখব? সত্যি নন্দিনী তুমি কি বলতো? আমার বিশ্বাস হয় না তুমি কি আজকের মেয়ে?”

নন্দিনী আর কথা বাড়ায়নি।

একটা নাচের অনুষ্ঠানে পরিচয় হয়েছিল সায়নের সঙ্গে। নন্দিনী তখন নাচের জগতে বেশ রমরমা। ক্ল্যাসিকাল ডান্সে তখন ওর দারুণ পরিচিত। ওর নাচের পরেই ছিল গুলাম আলির অনুষ্ঠান। নাচ শেষ হবার পর দর্শকাসনে বসে বাবা, মায়ের সঙ্গে মন দিয়ে গুলাম আলির কণ্ঠস্বরকে উপভোগ করছিল। সায়ন ছিল ঠিক নন্দিনীর উলটো দিকের আসনে।

নন্দিনীর নাচ দেখেই ওর প্রেমে পড়ে গিয়েছিল সায়ন। গুলাম আলির গানের চেয়ে অনেক বেশি মন ছিল নন্দিনীর দিকে। কীভাবে পরিচয় করা যায় তার একটা ছক কষছিল সায়ন। সায়নের বাবা, মা ব্যাপারটা ধরে ফেলেছিলেন। তাই অনুষ্ঠানের শেষে একরকম যেচেই আলাপ করেছিলেন নন্দিনীর বাবা, মায়ের সঙ্গে। যদিও নন্দিনীর বাবা, মা অন্যান্য অনুরাগীদের মতো তার মেয়ের নাচের অনুরাগী মনে করে স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই কথা বলেছিলেন।

সায়ন বেশ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেসে বলেছিল, “অটোগ্রাফ প্লিজ।” তারপরেই খুব নিচু স্বরে বলেছিল, “উইথ ইওর সেল নাম্বার।”

একরাশ বিস্ময়ে নন্দিনী নিজের নাম এবং অজান্তেই ফোন নাম্বারটা লিখে দিয়েছিল। সায়নের ছোট্ট সুন্দর ডায়রিটার মধ্যে। বাড়ির বড়রা যখন নিজেদের আলাপচারিতায় ব্যস্ত, ঠিক তক্ষুনি নিজের সময়কে একদম নষ্ট না করে সোজাসুজি সায়ন বলল “নন্দিনী তোমার চোখ দু’টো খুব সুন্দর, তুমি খুব সুন্দর আর তোমার নাচ…”

লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছিল নন্দিনী। আশেপাশের খুদে অনুরাগীরা তখন ঘিরে ফেলেছিল তাদের প্রিয় নন্দিনীদিকে। এত অনুরাগীদের মধ্যেও বারবার চোখ চলে যাচ্ছিল সায়নের দিকে। জীবনে এমন পরিস্থিতিতে নন্দিনী কখনও পরেনি। এত তাড়াতাড়ি সবকিছু ....!!

ধীরে ধীরে দুই পরিবারের মধ্যেও অদ্ভুত এক আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠল। যার রেশ চলল বেশ কিছুদিন। তাই হ্যান্ডসাম সায়ন আর অভিজাত বনেদি পরিবারের সাড়াকে নন্দিনী এবং তার পরিবার খুব সহজেই মেনে নিল এবং তার কিছুদিনের মধ্যেই চার হাত এক হয়ে গেল।

( ২ )

নন্দিনী সুন্দরী, শিক্ষিতা, রুচিসম্মত মেয়ে। মধ্যবিত্ত পরিবারের নন্দিনী স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে। অভিমানে ভরপুর আর প্রচণ্ড সংবেদনশীল। জীবন মানে তার কাছে প্রকৃতি, বই আর নাচ। আর সুন্দর একটা মন। সুন্দর একটা হাসি তো হাসাই যায়। তাতে শরীর ও মন দুই-ই ভাল থাকে। গোমড়া মুখ করে যারা ব্যক্তিত্ব আনতে চায়, তাদের জন্যে ওর ভীষণ কষ্ট হয়, যেন জোর করে সেটার চেষ্টা, আর অজান্তেই একদিন তারা হাসতে ভুলে যায়।

নন্দিনীর আরও ভাল লাগে গান শুনতে। গুলাম আলি, জগজিৎ সিংহ তার স্বপ্নের গায়ক। ভাল লাগে মান্না দে’র গান। আরও অনেক অনেক কিছু ভাল লাগে নন্দিনীর। ভাল লাগে সন্ধেবেলায় সমুদ্রের ধারে বসে প্রিয়জনের কাধে মাথা রেখে চুপচাপ ঢেউয়ের উথাল পাতাল করা নৃত্যকে দুচোখ ভরে উপভোগ করতে। ভাল লাগে মাঝ সমুদ্রে গিয়ে জলের মধ্যে তার স্বপ্নের পুরুষের সঙ্গে আলিঙ্গনাবস্থায় থাকতে। সূর্য ওঠার সময় প্রিয় পুরুষটির সঙ্গে রক্তিম সূর্যকে দু’চোখ ভরে দেখতে। আবার সুর্যাস্তের সময় নির্জন সমুদ্র প্রান্তরে তার দু’চোখে তার প্রিয় পুরুষটির গভীর একটা ভালবাসা ভরা চুমু। আবার কোন একদিন মাঝরাতে প্রিয়জনের হাত ধরে সারারাত সমুদ্রের ধারে ছুটে বেড়াতে। কখনও বা ক্লান্ত শরীরকে বিশ্রাম দিতে ঠান্ডা বালির ওপর একটু বিশ্রাম। আর সেই সময় প্রিয়জনের দুষ্টুমিকে একটু প্রশ্রয় দিতে অভিমান ভরা সাড়া।

“কি অত ভাবা হচ্ছে সোনা? পুরী এসে শান্তি তো?”

“আজ রাত জাগবে সায়ন?”

“কি যে বলো নন্দিনী। এই এতটা পথ হেঁটে এলাম, খেলাম, এখন ফাইন করে একটা ঘুম।”

“কি তুমি বেড়াতে এসে ঘুমাবে?”

“তা কি করব পাগলের মতো জেগে থাকব?”

নন্দিনী আর কথা বাড়ায়নি। চুপচাপ শুয়ে পরে, সায়ন ওকে আদর করে কিন্তু সে আদরের মধ্যে কোনও প্রাণ পায় না নন্দিনী। কেমন যেন কৃত্রিম মনে হয়, কেমন যেন পুরুষকে দেখানোর মানসিকতা।

একটু পরে সায়ন ঘুমিয়ে পরে, নন্দিনী ওর বুকের মধ্যে হাত বুলিয়ে দেয়, আলতো করে একটা চুমু খায়, তারপর পাশ ফিরে শুয়ে পরে। সায়নের বড় বড় নিশ্বাসকে ও পরিষ্কার টের পায়, রাতটা কেমন ভাবে যেন কেটে যায় জাগা স্বপ্নের নেশায়। ভোরবেলা অনেক ডাকে সায়নকে কিন্তু ও তখন গভীর ঘুমে।

পরদিন দুপুরে স্নানের কখা বলল সায়ন বলে ওঠে, “এই রোদ্দুৱে তুমি স্নান করবে?”

“বাঃ সমুদ্রের বেড়াতে এলাম আর স্নান করব না?”

“স্কিনের বারোটা বেজে যাবে নন্দিনী, পুরো কালচে হয়ে যাবে রং।”

“তাতে কি হয়েছে? রোদে বেরনোর আগে একটু সানস্ক্রিন লোশান মেখে নিলেই হবে। বাড়ি ফিরে দেখবে সাতদিনে রং পালটে গেছে।”

“যাঃ এসব স্নান-টান বাদ দাও তো, তার চেয়ে এসো না দুজনে মিলে একটু...”

এই বলে একটা বিয়ারের বোতল দেখায় সায়ন।

“কি বলছ তুমি?”

“এই শোনো না সন্ধ্যেবেলায় স্নান করব।”

“সন্ধেবেলায়!”

“হ্যা সমুদ্রে সন্ধেবেলাতেই স্নান করতে হয়। তুমি কিচ্ছু জানো না । ”

“ঠিক আছে তাই হবে, মনে থাকে যেন।”

“ওকে। এই শোনো না, এসো না একটু খাবে?”

“তুমি কি পাগল হয়ে গেলে ! না আমি এসব খাই না।”

“একদিন খাও। আমার জন্য খাও।”

'আমার জন্যে ' কথাটা নন্দিনীকে খুব হন্ট করল। এগিয়ে গেল সায়নের দিকে। সায়ন খুব খুশি হয়ে দু’টো সুন্দর কাঁচের গ্লাসে যত্ন করে ঢেলে দিল তার শখের পানীয়। চিয়ার্স বলে কীভাবে কোন স্টাইলে গ্লাসটা ধরতে হয় তা সযত্নে শিখিয়ে দিল নন্দিনীকে। নন্দিনী চোখ মুখ বন্ধ করে এক নিশ্বাসে ঢকঢক করে শেষ করে ফেলল গ্লাসটা। মুখটা ভীষণ একটা বিকৃতি করে, তবুও হাসির রেশটা টেনে নিয়ে বিজয়ীর ভঙ্গিতে বলে উঠল, “আমি প্রথম।”

সায়ন চিৎকার করে হাসতে হাসতে বলল “প্রথম তো বটেই, তা তো তোমার খাওয়া দেখেই বুঝলাম।"

নন্দিনী দেখল সায়ন বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছে গ্লাসটা। আর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মদের গুণাগুণের বর্ণনা শুরু করেছে। সায়ন একনাগাড়ে বলে যাচ্ছে কতো কি ......শুধু তাই নয় রাশিয়ান, ফিনিশ, পশ্চিম ইউরোপের মানুষ ভদকার কতটা ভক্ত। বিয়ারের বোতলে ঝাল নুন দিয়ে এক টুকরো লেবু ঢুকিয়ে কিভাবে রসিয়ে রসিয়ে তা উপভোগ করেছিল তা পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করে যাচ্ছিল।

নন্দিনী বিস্ময়ে যখন হতবাক তখন সায়ন ওকে আশ্বস্ত করল, “চিন্তা নেই, আমি ড্রাঙ্কার নই। কিন্তু সব কিছু টেষ্ট করেছি। আমার ছোটমামা একবার হালকা বুদবুদ ওঠা পিঙ্ক ওয়াইন সারা বাড়িতে ছড়িয়ে ছিল মামির বাচ্চা হবার খবর শুনে। বাচ্চা না হতেই স্নান করিয়েছিল মামিকে পুরো শ্যাম্পেন দিয়ে, তুমি ভাবতে পারো?”

“তোমার আর কোনও কথা নেই?”

“না না চলো চলো খেয়ে আসি, খুব খিদে পেয়েছে।”

“আ... মা… র…ও”

সায়ন হঠাৎ খেয়াল করল নন্দিনীর কথাগুলো কেমন যেন জড়িয়ে যাচ্ছে আর নিজের মনেই বলে উঠল, “এই রে নেশা হয়েছে। হবে নাই বা কেন, এক চুমুকে পুরো গ্লাস সাবাড়!”

নন্দিনী ঢলে পরছে। সায়ন দেখল নন্দিনী হালকা হালকা স্টেপ ফেলছে।

নন্দিনী সায়নের গলা জড়িয়ে বলে উঠল, “সায়ন আমি নাচব তুমি দেখবে ? ”

সায়ন খুব মজা পেল নন্দিনীর এই আবেগ জড়ানো কণ্ঠস্বরে। তবুও নন্দিনীকে বলল, “তোমার নেশা হয়েছে নন্দিনী।”

“রিয়েলি!”

“রিয়েলি।”

“কিন্তু সত্যিই আমি একটা স্ট্রিং অর্কেস্ট্রা চাই, যেখানে থাকবে অনেক গুলো... যন্ত্র... কল্যারিনেট, অল্টোস্যাঙ্গ, ট্রাম্পেট, ট্ৰমবোন... ভায়োলিন... ভায়োলা...।

“নন্দিনী সব হবে, তুমি একটু বিছানায় চুপ করে শুয়ে থাকো তো।”

“শেষ হয়নি সায়ন... আরো আছে... চেলো, বাস, পিয়ানো, আর চাই ড্রাম... বিখ্যাত পিয়ানিস থিওডর রোনাল্ড ব্রেইলে’কেও চাই।”

“আর কি চাই বলতে থাকো।”

“আ... র... চাই…”

সায়ন দেখল নন্দিনী চোখ বুজে বলে যাচ্ছে, “সেই... বি... খ্যাত... অস্ট্রিয়ান... বেহালা... বাদক... ফিৎস... ক্রেইস... লরি... এর... বিভিন্ন... সুর.... ঝংকার...”

নন্দিনী ঘুমিয়ে পড়েছে। অবাক হয়ে দেখছে সায়ন। এ কোন নন্দিনী? কোনটা আসল নন্দিনী? খুব সাধারণ ছন্দে চলা নন্দিনীকে খুব অপরিচিত লাগে। তাহলে সাধারণের মধ্যে যে অসাধারণত্ব এটা কি তাহলে অ্যাটিটিউড ! ওর জীবন যাপনের একটা আলাদা স্টাইল?

বেশ কিছুক্ষণ পরে সায়ন বাথরুমে গেল। স্নান সেরে যখন বেরিয়ে এল, দেখল নন্দিনী বিছানায় বসে আছে কেমন যেন ঘোরের মধ্যে, একটু বিহ্বল। জড়তা কাটতেই একটা লাজুক হাসিতে তাকাল। সায়ন বলল “ যাও ভাল করে স্নান করে এসো, বেশ ফ্রেশ লাগবে।”

নন্দিনীও বাধ্য মেয়ের মতো অনেকক্ষণ ধরে স্নান করল। তারপর এরা লাঞ্চে গেল।

লাঞ্চ টেবিলে পরিচয় হল এক মধ্যবয়সী দম্পতির সঙ্গে। ওরাও একই হোটেলে উঠেছেন। একসঙ্গে অনেক গল্প হলো । ঠিক হলো সন্ধেবেলা একসঙ্গে সমুদ্রের ধারে আড্ডা মারবে। খাওয়াদাওয়ার পর দুপুরবেলা ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল। দূরে তখনও অনেকে স্নান করছে। সমুদ্রের ঢেউগুলো আপন মনে খেলা করছে। কেমন যেন একটা গর্জন সমুদ্রের। বেশ রাশভারি, ঠিক রাতের দিকে নিস্তব্ধ নির্জনে তাকে অনুভব করা যায়। মায়ের কাছে নন্দিনী শুনেছিল সমুদ্র কিছুই নেয় না, যা কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায় তাকে আবার ফেরত দিয়ে দেয়।

তাহলে কি সবুজ জামাটা সমুত্র ফেরত দিয়েছিল? হতেই পারে না, নন্দিনীর বিশ্বাস ওই জামাটা ও সমুদ্রকে উপহার দিয়েছে।

কয়েকজন নুলিয়া জলের তালে তালে কি সুন্দর নাচছে। এদের মতোই এক অল্পবয়সী দম্পতি সদ্য স্নান সেরে হাত ধরে সমুদ্রের পাড় থেকে ফিরছে। কেউ কেউ এখনও স্নান করছে, হয়তো তারাও নন্দিনীর মতো সমুদ্রকে পাগলের মতো ভালবাসে।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছে অনেকক্ষণ। নন্দিনী ব্যালকনি থেকে ধীরে ধীরে ঘরে এল। দেখল সায়ন পাশবালিশ জড়িয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমচ্ছে। কোনও চিন্তা নেই, ভাবনা নেই, সমুদ্রকে দু’চোখ ভরে দেখার ব্যাকুলতা নেই, বালি নিয়ে ঘর বানাবার কোনও স্বপ্ন নেই।

ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল নন্দিনী। নিজের চোখ দু’টোকে একবার দেখল। দেওয়ালের গায়ে পরস্পর বিপরীতমুখী দুটো টিকটিকি চেয়ে আছে পরস্পরের দিকে। কি সুন্দর দেখাচ্ছে ওদের। ওরা কি প্রেমালাপ করছে ? নাকি মুগ্ধ নয়নে ওরা পরস্পর পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার চেষ্টা করছে !

নন্দিনী ভাবল, আচ্ছা সায়ন এমন গভীরভাবে আমার দিকে তাকিয়েছে কখনো ? কোন একটা মুহুর্তেও কি ওর দু’হাতের মুঠোয় আমার মুখটা ধরে আমার দু’চোখের পাতায় আবেগমাখা চুমু খেয়েছে ?

“কি হল নন্দিনী সাজুগুজু হচ্ছে? দু’টো চায়ের কথা বলো না?”

সায়নের ডাকে চমকে উঠল, তারপর নিঃশব্দে চায়ের জন্য বেলটা বাজাল।

কিছুক্ষণের মধ্যে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে দুজনেই ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালো , নন্দিনী চা খেতে খেতে আবারও সমুদ্রের ঢেউকে দেখতে লাগল। সায়ন একটা সিগারেট ধরাল। নন্দিনী দেখল দুপুরবেলা যে মধ্যবয়সী দম্পতির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তারা তৈরি হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। নন্দিনীদের দেখে তারা হাত নাড়লেন। নন্দিনী হাত নাড়িয়ে বোঝাল ওরা এক্ষুনি আসছে। সায়ন বলল, “যাও তাড়াতাড়ি তৈরি হয় নাও।”

নন্দিনী সুন্দর করে সাজল। এক ঢাল চুল তার কাঁধ বেয়ে কোমরে এসে স্পর্শ করল। সিফনের মত তুলতুলে চুলগুলো সমুদ্রের ঢেউয়ের ধাক্কায় ঠিক সায়নের গালে গিয়ে স্পর্শ করবে, ভাবতেই ওর শরীরটা রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল।

সায়ন অফ হোয়াইটি জিন্সের ওপর পার্পল কালারের শার্টটা পরল।

“সায়ন তোমাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে।”

“রিয়েলি?”

“ইয়েস বস।”

নন্দিনী জড়িয়ে ধরে সায়নকে একটা চুমু খেল। তারপর বেরিয়ে পরল সমুদ্রের উদ্দেশ্যে। সেই মধ্যবয়সী দম্পতি একগাল হেসে ওদেরকে ওয়েলকাম জানালেন।

“কিছু বাজার করবে নন্দিনী?” সায়ন উৎসাহের সঙ্গে কথাটা বলল।

নন্দিনী ভাবল, সায়ন বেমালুম ভুলে গেল সন্ধেবেলায় স্নান করার কথাটা। তাহলে ওটা কথার কথা ছিল, মন ভোলানো। অভিমানে ওর দুচোখ জলে ভরে উঠল। তবুও কোনও রকমে বলল, “না না কিছু কিনব না। চলো না সায়ন সমুদ্রের ধারে একটু হাঁটি।”

“সত্যি সমুদ্রের ধারে হাঁটার মজাই আলাদা।” মধ্যবয়সী ভদ্রলোক কথাটা বলতেই তার স্ত্রী বলে উঠলেন, “আমার আবার অত হাঁটতে ভাল লাগে না। আমার হাজবেন্ডের শুধু সমুদ্র আর সমুদ্র। তোমার হাজবেন্ড বেশ সৌখিন। কখন থেকে শুধু বাজার যাবার কথা, তোমাকে শাড়ি কেনার কথা বলেই যাচ্ছেন।”

“আমার মিসেস আবার শৌখিনতা বলতে বাড়ি, গাড়ি, গয়না এসবকে খুব প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।”

খুব মজা করে মধ্যবয়সী ভদ্রলোক কথাটা বললেও তার মিসেস বেশ সুকৌশলে বলে উঠলেন, “শাড়ি, গয়না, গাড়ি, বাড়ি করে চিৎকার করেছিলাম বলেই তো সল্টলেকের মতো জায়গায় এত বড় একটা বাড়ি করতে পেরেছি। ছেলেদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে বিদেশে পাঠাতে পেরেছি।”

ভদ্রমহিলার কথাকে প্রবল সাড়া দিল সায়ন, “সত্যি উচ্চাকাঙ্ক্ষা না থাকলে জীবনে কিছু করা যায় না। দেখুন না বউকে নিয়ে ভাবলাম বাইরে কোথাও হানিমুনে যাব, কিন্তু আমার বউ পুরী ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না।”

“বাঃ, আপনার বউটি কিন্তু ভারি মিষ্টি, ওকে বোঝার চেষ্টা করুন । "

ভদ্রলোকের কথাকে ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে ভদ্রমহিলা বললেন, “সায়ন ভারি চমৎকার। সো হ্যান্ডসাম অ্যান্ড ভেরি অ্যাম্বিসাস। সত্যি নন্দিনীর ভাগ্যকে স্যালুট করতে হয়।”

নন্দিনী মাথা নিচু করে হাসল। তারপর বলল, “আপনি নন?”

নন্দিনীর কথায় ভদ্রমহিলা বেশ জোরে হেসে উঠলেন, তারপরে বললেন, " ভাগ্যকে আমি নিজে তৈরি করেছি, তারপর ভাগ্য আমার সহায় হয়েছে।”

কথা বলতে বলতে ভদ্রমহিলা আর সায়ন বিদেশের গল্পে মত্ত হয়ে উঠলেন। কুইন্সটাউনই যে নিউজিল্যান্ডের সবচেয়ে সুন্দর শহর এ ব্যাপারে তারা দুজনেই একমত। মেলবোর্নের বিমানবন্দরে একবার একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল তার বিশ্লেষণ করছে সায়ন।

এক নিশ্বাসে সায়নের কথাগুলোকে হজম করেই ভদ্রমহিলা বলতে শুরু করেছেন নিউজিল্যান্ডে তার অনেক কিছু পাওয়ার মধ্যে স্পেশাল পাওয়া ছিল সেলের শো-পিস আর তার প্রিয় গয়নাগাটি।

ভদ্রমহিলা আরও বেশি ধন্য মনে করেন নিজেকে সচক্ষে দেশে এসেছেন তার ছেলের দৌলতে। এই সিটি অফ গোল্ড ছিল তার ড্রিম ডেস্টিনেশন। চোখ ধাঁধানো লেটেস্ট ট্রেন্ডের এক্সকুসিফ গয়না তিনি দেখেছেন সেখানকার বিখ্যাত জুয়েলারি শপগুলিতে। একেবারে সনাতন থেকে আধুনিক, নিজে কিনেছেন প্রচুর।

কথা বলতে বলতে এগিয়ে গেছে ওরা দু’জন। একটু পিছিয়ে নন্দিনী আর ওই ভদ্রলোক। নন্দিনীর চোখের সামনে যেন ভেসে উঠছে ঝাঁ চকচকে একটা শহর। বড় বড় গাড়ি, দানবের মতো সব অট্টালিকা, চোখ ঝলসানো সোনালি রঙের সব অলংকার।

নন্দিনী পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে এখানকার সবকিছু সোনালি। সব কেমন যেন স্ট্যাচুর মতো, কাগজের বান্ডিল আর তার বিনিময়ে সোনালি জিনিসের আমদানি। মানুষগুলোও সব ধীরে ধীরে সোনালি হয়ে যাচ্ছে। তারপর তারা এক-একটা স্ট্যাচুতে পরিণত হয়ে যাচ্ছে, কেউ দম নিতে পারছে না। তার মাঝখানে একটা মানুষকে খুঁজে বেড়াচ্ছে নন্দিনী। তাকে সেখান থেকে টেনে নিয়ে নন্দিনী সবুজের জন্যে হাতড়ে বেড়াচ্ছে, একটু অক্সিজেন চাই।

হঠাৎ একটা হোঁচট খেল নন্দিনী। সমুদ্রের একটা ছোট্ট ঢেউ তার পায়ের পাতায় এসে ধাক্কা মারতেই সে খেয়াল করল ভদ্রলোক তাকে বলছে, “এটাই জীবন নন্দিনী, তুমি কখনও গভীর জঙ্গলে হেঁটেছ?”

নন্দিনী খুব আস্তে মাথা নেড়ে বলল " হ্যাঁ...”

--খেয়াল করেছ নিস্তব্ধ সেই জঙ্গলে একরকম পাখির ডাক ? কেমন থেমে থেমে সেই ডাকটা…।

-- শুনেছি সেই ডাক...

-- সেই পাখিটা কি বলতে চায় জানো?

-- জানি না কি বলতে চায় ! কি বলতে চায় !

নন্দিনী ভদ্রলোকের কাছ থেকে জেনেছিল পাখিটা কি বলতে চায়। সত্যিই তো এভাবে তা নন্দিনী কখনও ভাবেনি। জীবনের এত রং আছে তা তো ওর জানা ছিল না।

আচ্ছা ক্রিয়েটিভিটিই কি পারে জীবনকে নুতন করে বাঁচাতে? সবসময় খুঁজে চলে নতুন মোড়, নতুন প্রেক্ষাপট?

নন্দিনী ভাবে কত কি, ভাবে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে নান্দনিক সত্তার মধ্যে দিয়ে অনুভব করতে হবে। প্রাণ ভরে বাঁচতে হবে, তবেই তো জীবন।

নন্দিনী দেখল ভদ্রলোক আপন মনে বলে চলছেন , “অতি দূর সমুদ্রের পর/ হাল ভেঙে যে নাবিক হারিয়েছে দিশা…”

অবাক বিস্ময়ে চেয়ে আছে নন্দিনী। সূর্য অস্ত যেতে চলেছে, চারদিক লাল হয়ে আসছে, একটু পরেই আসবে গাঢ় অন্ধকার। কৃত্রিম আলোতে ছেয়ে যাবে চারদিক। জীবনের ব্যথা, যন্ত্রণা, আবর্জনা সবকিছু ধুয়ে মুছে মিশে যাবে এই কালো রংটার মধ্যে।

নন্দিনীর মনে পড়ল বহুযুগ আগে ঠিক এই সময় জাহ্নবীর নদীর তীরে কর্ণ ও কুন্তীর এক করুণ মুখচ্ছবি। অন্ধকার কি সত্যিই পারে সব লজ্জা, গ্লানি, যন্ত্রণাকে মুছে দিতে? হয়তো পারে। জীবনের রংগুলোকে আলো আঁধারের মধ্যেই হয়তো সত্যিই ভাগ করে নিতে হয়।

হঠাৎ চমক ভাঙল ভদ্রলোকের কথায়, “জানো নন্দিনী এভাবেই কাটিয়ে দিলাম জীবনের অনেকগুলো বছর...”

নন্দিনী ভাবল জীবনের কোন মূল সুরকে তিনি তুলে ধরতে চাইলেন ?

সমুদ্রের হাওয়ায় নন্দিনীর শাড়ির আঁচল নাকি ওর নরম তুলতুলে চুল কোনটা স্পর্শ করল তাকে ? যা স্পর্শ করার কথা ছিল সায়নকে .....।

এক গাদা দামি দামি খাবার নিয়ে এল সায়ন , হাত ভর্তি প্যাকেট । সমুদ্রের ধারে সবাই বসল । গান গাইল, আবৃত্তি করল, খাবার খেল। ভদ্রলোক মাঝে মাঝে ভদ্রমহিলাকে জোর করে খাইয়ে দিচ্ছিলেন। নন্দিনীর চোখটা চিকচিক করে উঠল। হঠাৎ একটা বড় ঢেউ এল। মনে হল লক্ষ লক্ষ চুমু এই সমুদ্রের ঢেউয়ের মধ্যে দিয়ে স্পর্শ করল নন্দিনীর সারা শরীরকে, এ স্পর্শ কার...?

একটা ঘোরের মধ্যে কাটল কিছুক্ষণ, হঠাৎ নন্দিনীর খেয়াল হল ভদ্রলোক গলা ছেড়ে আবৃত্তি করছেন ভদ্রমহিলার এক হাত তার মুঠোর মধ্যে নিয়ে। সায়নের কি একবারও ইচ্ছে করছে না নন্দিনীকে স্পর্শ করতে ?

অনেকটা সময় সমুদ্রের ধারে বসার পর তাঁরা হাঁটতে শুরু করল। নন্দিনী ইচ্ছে করেই সায়নের গা ঘেঁষে হাঁটতে লাগল। ভাবল একবার অন্তত সায়ন ওর হাতটা ধরুক। হঠাৎ একটা ঢেউয়ের ঝাপটা এসে স্পর্শ করল ওদের । সায়ন দৌড়ে সরে গেল দামি জুতোটাকে বাঁচাতে, নন্দিনী মনে মনে হেসে উঠল।

সায়ন হাঁটতে হাঁটতে ফ্রয়েডের অনেক তত্ত্বকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করতে লাগল। নন্দিনী ভাবল এত ফ্রয়েডকে বোঝো, তুমি শুধু আমাকেই বোঝো না। এই-ই কি প্রেম? সুক্ষ অনুভূতি, সুক্ষ্ম ভাললাগা এসবের কোন মূল্য নেই ? এই মধ্যবয়সী ভদ্রলোকের মতো তাকেও তার অভিমান ভরা মন নিয়ে, হৃদয়ের ব্যাকুলতা নিয়ে সারাটা জীবন কাটাতে হবে কাছের মানুষটির সঙ্গে ?

সমুদ্রের ধারে গিয়েছিল কিছুটা অক্সিজেন নিতে। গিয়েছিল স্বপ্নের প্রিয় পুরুষটির সঙ্গে একান্তে সমুদ্রকে উপভোগ করতে। সায়নকে নিবিড় করে পেতে। একে অপরকে চিনতে জানতে বুঝতে...।

( ৩ )

ফিরে এসেছিল হনিমুনের বিখ্যাত ট্যুরকে সেরে তার নিজের শহর শিলিগুড়িতে। তার দু’হাজার স্কোয়ার ফুট ফ্ল্যাটে.....

সমুদ্র প্রিয় অভিমানী মেয়েটি নিঃশব্দে ভাবে, সমুদ্র আমার থেকে সবকিছু নিয়ে নিয়েছে। আমার অভিমান, আমার অনুভূতি, এমনকি আমার স্বপ্ন গুলোকেও । আর নিজের মনে ভাবে ' তুমি কথা রাখনি সায়ন। আমাকে নিয়ে গভীর রাতে সমুদ্রের ধারে হাঁটনি। আমার সঙ্গে সমুদ্রে তুমি স্নান করনি। সমুদ্রের উথাল পাতাল ঢেউয়ের মধ্যে আমার শারীরিক আবেদনকে তুমি একবারও প্রত্যক্ষ করনি।

আমি চেয়েছিলাম সমুদ্রের খুব কাছে তোমার উষ্ণ পরশ। হাতে হাত ধরে অনেকটা পথ চলা। সুর্যোদয় আর সূর্যাস্তের সময় আমার চোখে তোমার গভীর ভালবাসা ভরা একটা চুমু। স্নানের সময় তোমার মিষ্টি ভরা দুষ্টুমি। সমুদ্রের ঢেউয়ের ভাঙন দেখতে দেখতে আমার কোলে তোমার মাথা রেখে আদর .....আমার চাওয়াটা অনেক বড় তাই না...?'

নির্জন দুপুরে ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে নন্দিনী দেখছিল একটা চড়ুই পাখিকে। ছোট্ট পাখিটা বড় ছটফটে কিন্তু ওর কোনও সঙ্গী নেই। একা একাই এদিক ওদিক করছে। চড়ুই পাখিটা বড় নিঃসঙ্গ, একা। ছটফটে পাখিটার এই নিঃসঙ্গতাকে মেনে নিতে বড় কষ্ট হচ্ছিল নন্দিনীর। বাইরের প্রকৃতিকে দেখে সত্যিই কি তার ভিতরের সত্তাকে, ভিতরের প্রকৃতিকে বিচার করা সম্ভব? কিংবা ওই সমুদ্র, অক্লান্ত নেচে যাওয়া সমুদ্র, ও কখনও হাঁপিয়ে যায় না ? ওর কখনও এত একা লাগে না ? হয়তো লাগে, ওর একাকিত্বের কথা নিজের কাছেই রাখে , কাউকে বুঝতে দেয় না। সবাইকে বিলিয়ে দিয়েই ওর আনন্দ। সবাইকে খুশি করাই ওর একমাত্র কাজ। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ও কেবল দিয়েই যাচ্ছে, নেয় না কিছুই, নন্দিনীও কি তাই ...?

লেখক: মণিজিঞ্জির সান্যাল, কথা সাহিত্যিক

শিলিগুড়ি, দার্জিলিং

পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।

আরো পড়ুন: অন্ধকারের স্বপ্নেরা - মণিজিঞ্জির সান্যাল

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

মণিজিঞ্জির সান্যাল
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close