• রোববার, ১১ এপ্রিল ২০২১, ২৮ চৈত্র ১৪২৭
  • ||

বিষাদ কিংবা অন্য কিছুর গল্প

প্রকাশ:  ০৫ এপ্রিল ২০২১, ২২:১৩ | আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২১, ২২:১৬
শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল
শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল

ভাইজান কিছু বলছেন। কথাটা বলে নিয়ামত থামলো।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে উত্তর না পেয়ে আবার বলল ভাইজান মনে হয় কিছু বলছেন। এবারও কিছু সময় অপেক্ষা করে অচেনা লোকটার মুখ থেকে কিছু একটা শুনতে। না নিয়ামত কোনো উত্তর পেলোনা।

নিয়ামত যাকে এতোক্ষণ ধরে প্রশ্ন করে যাচ্ছে সেই ব্যক্তিটিকে কেউ চেনে না। এ তল্লাটে হয়তো নুতন এসেছে। আগে কেউ তাকে দেখেনি। নিয়ামতও দেখেনি। লোকটা পাগল না ভালো মানুষ বুঝার উপায় নেই। বেশভূষা দেখে মনে হয় ভদ্রঘরের পড়াশোনা জানা কোনো ছেলে হবে। শরীরে দামী শার্ট প্যান্ট। পায়ে নামকরা বড় কোম্পানীর দামী ক্যাডস পরা। কিছুতেই বুঝবার উপায় নেই লোকটা কেমন। কেনই বা এখানে পাগলের প্রলাপ বকে যাচ্ছে।

আমাদের যতীন ঠাকুর বললো দেখেতো মনে হয় ভদ্রঘরের সন্তানই হবে। সে আরো কতো কি বললো, কেউ আমলে নিলোনা। কেউ তার কথা আমলে নেয় না।

দেখতে দেখতে লোকটার চারপাশে অনেক মানুষের ভীড় জমে গেছে। সেখানে বাজারের ছোট ছোট টোকাই ছেলেমেয়েরাও যোগ দিয়েছে।

পূর্বপাড়ার হারাধনের ছেলে বিষু পোকে খাওয়া দাঁত বের করে বলছে, টাউনের মানুষ। পাগল হয়ে আমাদের এখানে এসেছে।

বিষুর কথা শুনে সমবেত জনতার মধ্যে দীর্ঘশ্বাসপূর্ণ আলোড়নের সৃষ্টি হলো। গভীর আলোড়ন। নিয়ামত বিষুর দিকে চেয়ে ভেংচি কেটে বলে কথা কম ক। তুই হইছস তোর বাবার মতো। সবকিছুতেই নাক গলানোর স্বভাব। নিয়ামতের গালি শুনে বিষু কিছু বলে না। চুপ হয়ে যায়। শান্ত বালকের মতো দাঁড়িয়ে ভীড়ের এক কোণে মিশে থাকে।

সমবেত জনতার ভীড় থেকে এবার একটা কোলাহল উঠে। সেই কোলাহলের ধ্বনি বাতাসে ভর করে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের কলরবের কারণে আসল কথা আর বুঝা যায় না। কেউ কেউ ভীড় ভেঙ্গে অন্য গন্তব্যে চলে যাচ্ছে। রাগে হোক আর ক্ষোভেই হোক, নিয়ামত লোকটাকে এবার জোরে ধাক্কা দিলো। অথচ অচেনা লোকটা তাতে কোনো ধরনের প্রতিক্রীয়া দেখালো না।

লোকটার কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখে, নিয়ামত এবার লোকটাকে পর পর কয়েকবার সজোরে ধাক্কা দিলো। তারপরও লোকটার মধ্যে কোনো প্রতিক্রীয়া নেই। দূরের অনন্ত শূন্যতার পানে তাকিয়ে আছে। কি যেন বলে দুর্বোধ্য ভাষায়। কিছুই বুঝা যায়না।

নিয়ামতকে এলাকার সবাই ভালো করে চেনে। এলাকায় কে নুতন আসে। কে কোথায় যায় এসবের খোঁজ খবর রাখার দায়িত্ব তাঁর। তাকে এসবের খোঁজ খবর রাখার দায়িত্ব গ্রামের মানুষ দেয়নি। সে নিজে থেকেই দায়িত্ব নিয়েছে। নিয়ামতকে নিয়ে সবাই হাসি ঠাট্টা করে। অথচ এলাকার ভালমন্দের খবর মানুষজন তার কাছ থেকেই নেয়। সেই নিয়ামতও ভেবে পাচ্ছে না লোকটা কি পাগল মানুষ। না অন্য কোনো জায়গা থেকে অপরাধ করে পালিয়ে এসেছে। তবে নিয়ামত সম্বন্ধে এখানে আরেকটি কথা বলে রাখা দরকার। তার কথার ধরনের কোন ঠিক-ঠিকানা নেই। কখনো ভদ্রলোকের ভাষায় কথা বলে। আবার একইসঙ্গে গ্রাম্য আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে।

নিয়ামতের ভাবনায় প্রচণ্ড ধাক্কা লাগে আগন্তুক লোকটার কথা শুনে। লোকটা আপন মনে বলছে, আমি যাবো। অবশ্যই যাবো। আমাকে কেউ আটকাতে পারবে না। আমি সময়কে স্বাক্ষী রেখে যাবো। সময়ও আমার সাথে যাবে। কথাটা শেষ করে লোকটা সহজ ভঙ্গিমায় শব্দ করে হেসে উঠলো। নিয়ামত লোকটার কথা শুনে বুঝে নিয়েছে লোকটা পাগল মানুষ। পাগল মানুষই একা একা রাস্তায় কিংবা বাজারের ভীড়ে এমন ভাবে কথা বলে। হাসে কাঁদে আরো কতো কি করে। ভীড়ের মধ্যে থেকেই কে যেন বলে উঠলো শালার এমনিতেই পুরান পাগলের যন্ত্রনায় টিকতে পারি না। তার মধ্যে আবার নতুন পাগলের উপদ্রব।

নিয়ামত আরো ঘন হয়ে লোকটার গা ঘেষে দাঁড়ায়। তারপর মুখটা কানের কাছে নিয়ে খুব আস্তে করে বলে, ভাইজান মনে হয় ছ্যাকাটা খুব শক্তই খেয়েছেন। এখন যাবেন কোন চুলায়।

লোকটা নিয়ামতের মুখের দিকে তাকায়। কি যেন ভাবে। কতক্ষণ পর শুদ্ধ বাংলায় গালি দিয়ে বলে, আমি তার কাছে যাবো।

সে কে। সে কি আপনার আপন স্বজন।

সে আমার আপন মানুষ। আমাকে ঘুরিয়ে বেড়ায় পথে পথে। তবু তার কাছেই যাবো।

ভাইজান কি প্রেমে দাগা খাইছেন।

না, আমি প্রেমে দাগা খাইনি। আমি প্রেমে ভালোবাসা খেয়েছি।

অচেনা লোকটার মুখে এসব কথা শুনে ভীড়ের অবশিষ্ট মানুষরা হাসি ঠাট্টা, হৈ চৈ, হই হুল্লোড় করতে থাকে।

নিয়ামত বিজ্ঞের মতো তার নিজের ভাষায় বলে খাইছের ভাইজানের মাথাটা একেবারেই গেছে।

নীলা ঘুম থেকে উঠে দেখে দীপঙ্কর পাশে নেই। সারারাত সে ঘুমাতে দেয়নি। খুবই যন্ত্রণা করেছে। নিজেও ঘুমায়নি। তাকেও ঘুমাতে দেয়নি। নীলা কেঁদেছে। ওর কান্নার ধ্বনি দীপঙ্করকে অনিঃশেষ বেদনার গান শুনিয়েছে।

দীপঙ্কর শুধু বলেছে, আমি চলে যাবো। এখানে থাকবো না। এখানে আমার কেউ নেই। তুমি নিবিড় আঁধারের অলীক ভালোবাসায় পূর্ণ গভীর শূন্যতা। তোমার সাথে আমার মানায় না। আমাকে মানায় অনন্ত অসীমের নীলাভ শূন্যতায় ভরা নির্জনতার পাশে।

নীলা কিছু বলেনি। শুধু কেঁদেছে। কেবল কেঁদেছে। কেঁদে কেঁদে নীল হয়ে গেছে।

দীপঙ্কর আগে এমন ছিল না। সে কবি। কবিতার আসরে তার সাথে পরিচয় হয়েছিল। তারপর ভালোবাসা। উচ্ছল প্রেম। শরীর নিয়ে টানাটানি। মন নিয়ে খেলা। একদিন নোটারী পাবলিকের অফিসে গিয়ে উকিল ধরে বিয়ে। দিনগুলি ছিলো প্রজাপতির পাখার মতো রঙ্গীন উচ্ছলতায় ভরা। কবিতা গল্প গান ছিল নিত্য সঙ্গী। এর বাইরে কিছুই মনে আসতো না। দীপঙ্কর দূরে কোথাও গেলে নীলা পরিপূর্ণ শূন্যতায় ডুবে যেতো। ভাবতো কেউ নেই এই জগত সংসারে। গভীর শূন্যতায়ও মনের গভীরে দীপঙ্কর ঘন হয়ে লেপ্টে থাকতো। সেই সহজ সরল ভালোবাসার মানুষটি আজ নেই। ঘরে নেই। বাইরেও কি নেই। শুধু তার বেদনার্ত মনের কোণে দুঃখ কষ্টের নীলাভ স্মৃতি হয়ে জেগে আছে।

নীলার ঘুম ভেঙ্গেছিল অর্ঘ্যরে ডাকাডাকিতে। অর্ঘ্য তাকে ধাক্কা দিয়ে বলে, দেখো বাবা চলে গেছে। কথাটা শুনে ওর মেজাজটা তিরিক্ষি দিয়ে উঠে। এমনিতেই রাতে তাকে ঘুমাতে দেয়নি। যা-ও শেষ রাতে ঘুমিয়ে ছিল অর্ঘ্য ঠেলে ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিলো। তবে তার ভিতরে এতো যে আলোড়ন চলছে তা অর্ঘ্যকে বুঝতে দেয়নি। নিজেকে সামলে নেয়। এছাড়া তার কি করারইবা আছে। অর্ঘ্যকে কিছু বলেনি। বাচ্চা ছেলে কতইবা বয়স হবে। সেতো আর বুঝে না বাবা তার আগের মতো প্রাণবন্ত নয়। একটু অন্যরকম হয়ে গেছে। এই অন্যরকম শব্দটা মনে আসতেই নীলা একটু থমকে যায়। নিজেকেই প্রশ্ন করে দীপঙ্কর অন্যরকম হয়ে গেছে ভাবছে কেন। ওতো বলতে গেলে পাগলের মতো হয়ে গেছে। দীপঙ্করকে পাগল ভাবতে গিয়ে নীলার বুক ভেঙ্গে যায়। বর্ষার আকাশ ভেঙ্গে যেমন বৃষ্টি আসে, তেমনি চোখে তার শ্রাবণ ধারা বইতে থাকে। বুকে কান্নার ঢেউ উঠছে সমুদ্রের মতো গর্জন করে। নীলা মনে মনে অব্যক্ত বেদনায় বলে, দীপঙ্কর তুমি এমন হলে কেন। তুমিতো এমন ছিলে না। তবে কি কবি’রা সীমাহীন শূন্যতায় ডুবে পাগল হয়ে যায়। দীপঙ্কর তোমার ভালোবাসায় আমি আমার মনপ্রাণ অন্তর সমস্ত কিছু ডুবিয়ে নিশ্চিন্তে সুখের সাগরে ভাসতে চেয়েছিলাম। কি এমন কষ্ট তোমাকে আমার পৃথিবী থেকে আলাদা করে দিলো।

অর্ঘ্য বলে, মা তুমি কাঁদছ কেন। কি হয়েছে তোমার। বাবা পাগলামী করে বলে কি তুমি কাঁদছ।

নীলা এবার বুকের ভিতরে লুকানো কান্নাকে আটকে রাখতে পারলো না। সে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলে, অর্ঘ্য তোর বাবা পাগল হয়নি। তোর বাবা কবি। কবি’রা জগত সংসারের আলাদা মানুষ। তাদের সাথে অনেকেরই অনেক কিছু মিলে না। তাদের আলাদা একটা জগত থাকে। সেই জগতের ব্যাপার স্যাপার আমরা সাধারণ মানুষের দল বুঝতে পারি না।

নীলার ভাবনায় আজে বাজে ভাবনার পোকারা কিল বিল করে। মগজে একটি কথা বার বার ঘুরে ফিরে আসে, আর তা হল অর্ঘ্যও বুঝে ফেলেছে দীপঙ্কর পাগল হয়ে গেছে। বাবা তার অন্য দশজনের মতো স্বাভাবিক মানুষ নয়।

অর্ঘ্য বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝখান থেকে বলে, মা সত্যি করে বলো না বাবা কি পাগল হয়ে গেছে।

নীলা আরো বেশী করে ভেঙ্গে পড়ে। শাড়ীর আঁচল দিয়ে চোখ মুখ মুছে বলে, না-রে বাবা, তোর বাবা পাগল হয়নি। তোর বাবা কবি মানুষ। পাঠ্য বইয়ে যে কবিতা পড়িস, সেসব কবিতা যেসব কবিরা লিখেছেন তাদের মতো কবি। একদিন দেখবে তোর বাবার কবিতাও পাঠ্য বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সেদিন কত আনন্দ হবে আমাদের। যারা কবিতা লিখে তারা খেয়ালী মানুষ হয়। পাগল হয়না। নীলা থামলো। অর্ঘ্য কি বুঝল কিংবা তার কথা বিশ্বাস করল কি’না তা আর জানতে চাইলো না। কেবল অর্ঘ্যরে কচি মুখের দিকে করুন দৃষ্টি মেলে অপরাধীর মতো চেয়ে থাকলো।

তারপর আরো অনেক দিন গেল। দীপঙ্করের কোনো খবর নেই। নীলা সম্ভাভ্য সব জায়গায় খোঁজ খবর নিয়েও দীপঙ্করের কোন পাত্তা লাগাতে পারেনি। সে ভেবে পায়না তার স্বামী এমন হল কি করে। নীলা বিশ্বাস করে নিজের মধ্যে কোনো ধরনের অপরাধবোধ নেই। দীপঙ্করের সাথে এমন কোনো ব্যবহার করেনি, যার জন্যে সে হঠাৎ করে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়তে পারে। শরীরের ভাঁজে অন্যকোনো পুরুষের পাপ স্পর্শ নেই। দীপঙ্করকে ভালবেসেছে, দীপঙ্করকেই বিয়ে করেছে। মনে প্রশ্ন আসে, তাহলে কেন এমন হবে।

অর্ঘ্য যতক্ষণ স্কুলে থাকে নীলা ততক্ষণ দীপঙ্করহীন ফ্ল্যাট বাড়িতে একেবারে একা হয়ে যায়। সুখের কোনো চিন্তাই মাথায় আসে না। কোনো কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারে না। ভালমন্দ সব একাকার হয়ে যায়। চারিদিকের জগত সংসারে শুধুই বেহিসাবী কান্নার ধ্বনি শোনা যায়। নীলা অতল ভাবনার গভীর অতলে ডুব দিয়ে কিছুই পায়না। দীপঙ্করের বন্ধু-বান্ধবেরা সবাই তাকে বলেছে, দীপঙ্কর একটু রগচটা। তাই বলে কোনোকিছুর সাতপাঁচে থাকতো না। কলেজে পড়াকালীন সময়ে কবিতা গল্প লিখতো। বামপন্থি একটা ছাত্র সংগঠনের মাঝারি সাইজের নেতা ছিল। এর বাইরে বন্ধু-বান্ধবরা আর কিছু জানে না। ওর পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ডও ভালো ছিল। কেউ বলতে পারবে না তার আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে কেউ এমন খ্যাপাটে স্বভাবের ছিল।

নীলা নিজের মধ্যে নিজের ভুল খুঁজতে থাকে। ভাবে কোথাও কি বড় ধরনের ভুল হয়ে গেল! সে নিজে কি কোনো বড় ধরনের ভুলের ফাঁদে পা বাড়িয়েছে। নীলা তার দ্বারা সংঘটিত হয়েছে এমন কোনো অপরাধের অস্তিত্ব খুঁজে পায়না। তাদের দুজনের যাপিত জীবনে অবহেলা নেই। নেই অপরাধবোধ। তার আর দীপংকরের জীবন শ্রাবণের বৃষ্টিতে ভেজা হলুদ করবীর মতো স্নিগ্ধ ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। নীলার ভালোবাসা শরতের সুনীল আকাশের মতো উদার আর পবিত্রতায় ভরা। সেখানে মাঝে মধ্যে শিমূল তুলার মতো শুভ্র মেঘরাশি উড়াউড়ি করে। যা প্রতিটা মানুষের জীবনেই হানা দিয়ে থাকে। এ মেঘরাশি এতো কালো নয় যে, তাদের জীবনকে তছনছ করে দেবে। তারপরও নীলা খুঁজে ফেরে। যদি কিছু ভুলের কণা পেয়ে যায়। খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে যায়। কিন্তু খুঁজে পায়না। এতো খোঁজার পরও নীলা চারপাশটা ভালোভাবে তন্নতন্ন করে খুঁজে। নিজের মধ্যে খুঁজে বেড়ানোর পথে পথে দীপঙ্করের মাঝেও কিছু একটা খুঁজে। পাবার আকাঙ্খা তাকে উন্মাদ করে ফেলে। তবুও আলোর সন্ধান পায় না। সে ক্লান্ত হয়। ক্লান্ত হতে হতে অসীম শূন্যতার মাঝে নেতিয়ে পড়ে। হাত বাড়ায় কিছু একটা ধরে দৃঢ় ভাবে উঠে দাঁড়াবার জন্যে। অথচ যেখানেই নির্ভর নিয়ে ধরতে যায়, সেখানেই শুধুই শূন্যতা পায়চারী করে। কেবলই গভীর থেকে গভীরতর শূন্যতা খেলা করে। এই গভীরতর শূন্যতাকে ভেদ করে সে উঠে দাঁড়াতে পারে না। জীবনের সমস্ত সঞ্চয় এক করে অনিঃশেষ শূন্যতাকে ভরিয়ে তুলতে চেয়েছে। মনের কোণে জন্ম দাগের মতো স্পষ্ট হয়ে লেগে আছে দীপঙ্কর পাগল হয়ে বাড়ী থেকে বের হয়ে গেছে। তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

অতুল দীপঙ্করকে ঠিকই চিনেছে। সেই আগের মতোই আছে। অতুল শাখাইতি বাজারে দোকান নিয়ে বসেছে। দোকানে বেচাবিক্রি খারাপ হয়না। শহরের বাজার থেকে যে কোনো সময় মালামাল নিয়ে আসা যায়। একটা লোককে ঘিরে অনেক মানুষের ভীড় দেখে অতুলও গিয়েছিল। এর মধ্যে নিয়ামতের মাতব্বরী দেখে বুঝে নিয়েছিল সেখানে কোনো কিছু হয়েছে। দোকানের কর্মচারী ছেলেটাকে সবকিছুতে নজর রাখার কথা বলে সেও ভীড় লক্ষ্য করে রওয়ানা দিয়েছিল। অতুল সাধারণত উটকো ঝামেলায় জড়াতে চায়না। তারপরও কি জানি কি মনে করে ভীড়ের সমবেত জনতার একজন হতে গিয়েছিল। সবাই বলাবলি করছে ভদ্রঘরের পড়াশোনা জানা একটা ছেলে এখানে দাঁড়িয়ে কি সব আজেবাজে কথা বলছে। ছেলেটার কথা শুনে সবাই হাসাহাসি করছে। নিয়ামতও প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে কোনো কূল কিনারা পাচ্ছে না। মানুষের মুখে এতোসব কথা শুনে অতুলও কৌতুহলী হয়ে উঠে পাগল লোকটাকে দেখার জন্যে। যাকে অনেক মানুষ ভীড় করে দেখছে। সে যখন ভীড়ের মধ্যে ঢুকে তখন দেখে নিয়ামতের সঙ্গে অচেনা কোনো পাগল নয়, দাঁড়িয়ে আছে কলেজ জীবনের বন্ধু দীপঙ্কর। যাকে ছেলেমেয়েরা দীপুদা বলে ডাকতো। নিয়ামত দীপুকে অর্থাৎ দীপঙ্করকে একটার পর একটা প্রশ্ন করছে। দীপঙ্করও প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাচ্ছে। দীপঙ্কর প্রশ্নের উত্তরে যা বলছে তা শুধু নিয়ামত কেন, কারো পক্ষেই বুঝা সম্ভব নয়।

অতুল দীপঙ্করের সামনে দাঁড়ায়। না, দীপঙ্কর তাকে চিনতে পারেনি। কিন্তু সে ঠিকই চিনেছে।

অতুল ভেবে পায়না কলেজ জীবনের বন্ধুর এই করুণ অবস্থা হল কি করে। তারতো এমন হবার কথা ছিল না। কত সুন্দর কবিতা গল্প লিখতো দীপঙ্কর। কলেজের ম্যাগাজিনে আর দেওয়াল পত্রিকায় সেসব কবিতা গল্প বের হতো। সঙ্গের ছেলেমেয়েরা তাকে খুব ভালবাসতো। সেই দীপঙ্কর আজ পাগল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় বাজারে বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমন অস্বাভাবিক পরিণতি তার হল কি করে। অতুল কোনোকিছুরই হিসাব মেলাতে পারছে না। সে শুধু এইটুকুই বুঝে নিয়তি মানুষের জীবনকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করায় তা কেউ বলতে পারেনা। কারো পক্ষে কস্মিনকালেও বলা সম্ভব নয়।

অতুল ভীড় ঠেলে আরো ঘন হয়ে দীপঙ্করের মুখোমুখি দাঁড়ায়। দীপঙ্কর তাকে এখনো চিনতে পারেনি। ওর হাত ধরে বলে আমাকে তুই চিনতে পেরেছিস।

অতুলের মুখের দিকে অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থাকে দীপঙ্কর। তার চাউনি দেখে মনে হচ্ছে সে বলতে চাচ্ছে, না আমি তোমাকে চিনি না। তুমি কে?

ভীড়ের মধ্যে আবার কোলাহল শুরু হল। কাজ কর্মহীন মানুষগুলো চেঁচামেছি শুরু করল। কে যেন বলছে আরে লোকটাতো অপরিচিত নয়। অতুল চিনতে পেরেছে। আমাদের অত্র অঞ্চলের লোকই হবে।

আমাদের মতি মেম্বার সব লক্ষ্য করছিল। এবার ভীড়ের দিকে তাকিয়ে বলে, আরে দাঁড়াও কিছু বুঝে উঠার আগে চিৎকার শুরু করে দিয়েছো। আগে অতুলের মুখ থেকেই শোনা যাক সে পাগল লোকটাকে চিনে কি-না। এখন দিনকাল ভালো না। চোর-ডাকাতে চিরিদিক ভরে আছে। কত জন কত বেশে যে চলাফেরা করে তা-কি কেউ বলতে পারবে। কে চোর কে সাধু আজকাল বুঝার কোনো উপায় নেই।

অতুল মতি মেম্বারের কথাগুলো বুঝার চেষ্টা করে। তারপর রাগ করে বলে আপনার শুধু শুধু বয়স হয়েছে। ভালমন্দ কিছুই বুঝেন না। দেখছেন না আমি তার হাত ধরে আছি। ওকে বুঝার জন্যে কথা বলছি। তারপরও যতসব ভয় জাগানো কথা বলছেন।

মতি মেম্বার অতুলের কথার বিপরীতে প্রথমে কিছু বলে না। সে ভীড় ঠেলে উত্তর মুখো রাস্তা দিয়ে চলে যায়। যাবার সময় অতুলকে বলে যায়, আমাদের বয়স কম হয় নাই। এতো বিশ্বাস করা ভালো নয়। পরে পস্তাতে হয়। তোমার বন্ধু হলেই যে সবাই ভাল হবে, তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে। বিপ্লবতো তোমার প্রাণের বন্ধু ছিল। সে ছিনতাই করতে গিয়ে গণপিটুনেতে মারা যায় নাই। সব ভুলে গেছ।

মতি মেম্বারের কথা শুনে অতুল তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে। অগ্নিগর্ভ কণ্ঠে বলে বিপ্লব ছিনতাইকারী ছিল না। আপনার গম চুরি ধরে ফেলেছিল তাই তাকে ষড়যন্ত্র করে মেরে ফেলেছেন। গ্রামের মানুষ ঠিকই সব জানে। তখন আপনার হাতে ক্ষমতা ছিল ভয়ে কেউ কিছু বলেনি।

কথাটা শেষ করে অতুল দীপঙ্করকে বলে চল, আমার সাথে।

দীপঙ্কর অতুলের দিকে চেয়ে বলে, কোথায় যাবো। তার কাছে নিয়ে যাবে।

অতুল দীপঙ্করের করুন মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, করো কাছে নিয়ে যাবো না।

তার কাছে নিবে না তো আমি তোমার সাথে যাবো না।

ঠিক আছে চল তার কাছে নিয়ে যাবো।

কথাটা বলতেই দীপঙ্কর কিশোর বালকদের মতো আনন্দে আত্মহারা হয়ে গান গাইতে থাকে।

অতুল কিছু একটা বুঝে নিয়ে বলে, তুই কি আমাকে চিনতে পেরেছিস। দীপঙ্কর হাসে। সে সহজ-সরল শিশুর মতো হাসে। হাসতে হাসতেই বলে, তোমাকে আমি চিনি না। তুমি আমার কেউ না। আমি তাকে ছাড়া কাউকে চিনি না।

অতুল দীপঙ্করকে নীলার সামনে হাজির করে। নীলা দীপঙ্করকে দেখে নির্বাক হয়ে মাটির মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে। অনেকক্ষণ সময় কেউ কিছু বলে না। অতুলই প্রথম নীরবতা ভেঙ্গে দীপঙ্করকে বলে, নে তোর তার কাছে এনে দিলাম। এখন আর পাগলামি করিস না। ভালোভাবে থাক। তুই আমাদের সবার প্রিয় কবি। প্রিয় বন্ধু। তোর এমন অবস্থা হলে চলে না। তাতে আমাদেরও কষ্টে বুক ভেঙ্গে যায়।

অতুল নীলার দিকে তাকায়। বলে কি হয়েছে ওর। তার মধ্যেতো কখনো পাগলামি ছিল না। এমন হল কি করে।

নীলার চোখে জল। সেই জল বর্ষার শ্রাবণ ধারাকেও হার মানায়।

অতুল নীলার মুখের দিকে তাকাতে পারে না। মাথা নিচু করে বলে ওকে ডাক্তার দেখানো প্রয়োজন। অতুলের কথা শুনে দীপঙ্কর ক্ষ্যাপা চিতার মতো ক্ষেপে উঠে। বলে আমার কি হয়েছে? আমাকে যে ডাক্তার দেখাবে। আমি তার কাছে যাব। আমি পাগল নই।

অতুল দীপঙ্করের কথা শুনে কি যেন ভাবে। তারপর নীলাকে দেখিয়ে বলে এইতো তার কাছে এনে দিলাম। দীপঙ্কর অতুলের কথার উত্তরে শান্ত বালকের মতো হেসে বলে সেতো নীলা। আমার অর্ঘ্যরে জননী। রক্ত মাংসের নারী। আমি যারে খুঁজে বেড়াই সেতো নীলা নয়। আমি যারে খুঁজে বেড়াই সে অসীমের মধ্যে আসা-যাওয়া করে। অসীমের মধ্যে বসবাস। তার শরীরের গন্ধ আছে। স্পর্শ নেই। অনন্ত নীলিমায় সোনালী চিলের ডানায় ভর করে বেড়ায়। সে ধরা দিতে চায় না। অথচ আমাকে প্রতিনিয়ত আহ্বান করে। ওই আহ্বানে জীবনের সুর বাজে। সেই আহ্বানে অনন্ত মৃত্যুর পরাজয় ঘটে।

দীপঙ্করের এসব অদ্ভুত কথা শুনে অতুল বিমর্ষ হয়ে যায়। তার ভিতর থেকে বেদনাময় হাহাকার বের হয়। ভাবে নীলা কিছুই অনুভব করতে পারছে না। সে কি বুঝতে পারছে সামনের দিনগুলো কতোটা ভয়াবহতা নিয়ে তারে দিকে ধেয়ে আসছে।

কেবল অর্ঘ্য তার বাবাকে দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে প্রভাত বেলার আলোর সরলতা নিয়ে বলে বাবা এসেছে। আমার বাবা এসেছে বলে চিৎকার করতে করতে বলে আবার মার মুখে হাসি ফুটবে।

লেখক: শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল

কবি, গল্পকার ও আইনজীবী

কালী বাড়ী রোড, হবিগঞ্জ।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close