• সোমবার, ১২ এপ্রিল ২০২১, ২৯ চৈত্র ১৪২৭
  • ||

লেখিকার ‘প্রতারণা’য় অনলাইনে হইচই

প্রকাশ:  ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২১:৩৪
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক
আদৃতা মেহজাবিনের বইয়ের প্রচ্ছদ

ঢাকার অন্যতম প্রকাশনা সংস্থা অন্যপ্রকাশের ফেসবুক গ্রুপে বৃহস্পতিবার একটি ঘোষণায় সদস্যরা চমকে যান। কর্তৃপক্ষ জানায়, আদৃতা মেহজাবিন নামের অ্যাডমিনকে গ্রুপ থেকে চিরতরে বহিষ্কার করা হয়েছে। তার ফেসবুক আইডি একক ব্যক্তি নয় সংঘবদ্ধ একটি চক্র পরিচালনা করে। এরপর গ্রুপ সদস্যদের মাঝে হইচই পড়ে যায়।

কে এই আদৃতা?

সম্পর্কিত খবর

    অনলাইনে বই বিক্রির প্ল্যাটফর্ম রকমারি ডটকমে পাওয়া যাচ্ছে আদৃতার বই ‘একা ও অন্যান্য’। সেখানে লেখক পরিচয়ের বলা হচ্ছে—

    “ছোটবেলা থেকেই বইয়ের ভক্ত। এমবিএ পড়ছেন ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে। ছোটবেলায় স্বপ্ন দেখতেন পুলিশ হবার। স্কুল জীবনে খেলতে গিয়ে নাকের হাড় ভেঙে সে স্বপ্নের সমাপ্তি ঘটেছে। যত দুষ্টুমিই থাকুক বইপড়া তার নিত্যসঙ্গী। এসএসসির পরেই হাতে উঠে আসে কলম। নিজের গল্পগুলো লিখতে লিখতে কখন যে অন্যের জীবন নিয়ে লেখা শুরু করেছেন! দিনক্ষণ ঠিক জানা নেই।”

    “২০১৯ বইমেলায় সেরা পাঠক পুরস্কার পেয়েছেন পাঠক সমাগম থেকে। কাজ করতে পছন্দ করেন বই নিয়ে। লেখিকার বিশ্বাস ‘পৃথিবী একদিন হবে বইয়ের রাজ্য ’।”

    সেখানে আছে গল্প, কবিতা ও বই প্রকাশের খবর। এ ছাড়া ঢাকার বাতিঘরের পেজে রয়েছে তার বই ‘একা ও অন্যান্য’র বিজ্ঞাপন। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের বাতিঘরে হয় বইটির মোড়ক উন্মোচন।

    অন্যপ্রকাশের অভিযোগ কী?

    “সম্মানিত সদস্যবৃন্দ, আপনাদের সদয় অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, অন্যপ্রকাশের মডারেটর ও সদস্য, লেখক আদৃতা মেহজাবিন নামক ফেসবুক আইডিটি সন্দেহাতীতভাবে ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। তাই গ্রুপের ভাবমূর্তি রক্ষায় আইডিটিকে মডারেটর পদ থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়া হলো। সেই সাথে তার সদস্যপদ বাতিলসহ গ্রুপ থেকে তাকে চিরতরে বহিষ্কার করা হয়েছে।”

    “আদৃতা মেহজাবিনের লেখালেখি ও অনলাইন কার্যক্রম নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হওয়ায় আমরা অনুসন্ধান শুরু করি৷ আমাদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। আদৃতা মেহজাবিন কোনো এক ব্যক্তির আইডি নয়, বরং একটি সংঘবদ্ধ চক্র। যার নেতৃত্ব দিচ্ছে নিগার সুলতানা নামক এক নারী (এখন পর্যন্ত জানা তথ্য মতে)। চক্রের অন্য আরেক সদস্য যাকে অনলাইন ও অফলাইনে সামনে আনা হত, তার নাম আয়েশা সিদ্দিকা। আয়েশা সিদ্দিকার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানা গেছে, গল্পগ্রন্থ ‘একা ও অন্যান্য’সহ যে সমস্ত লেখা আদৃতা পরিচয়ে অনলাইন ও প্রিন্ট মিডিয়ামে প্রকাশ করা হয়েছে সেগুলোর কোনোটিই তার নিজের বা একক কোনো ব্যক্তির নয়। বরং এই নামে কারো অস্তিত্বই নেই। শুধু তাই নয়, এই চক্রটি ইতিমধ্যে ছলেবলে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল অঙ্কের আর্থিক সুবিধাও হাতিয়ে নিয়েছে। চক্রটির বিষয়ে এখনো তথ্য অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।”

    “অন্যপ্রকাশের পক্ষ থেকে আমরা আরও জানাচ্ছি, অন্যপ্রকাশের নাম ব্যবহার করে আদৃতা মেহজাবিন প্রতারণামূলক কিছু করলে সে ব্যাপারে আমাদের দায় থাকবে না।”

    ফেসবুক ঘেটে দেখা যায় এ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে লাইভ অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেছেন আদৃতা। এ ছাড়া গ্রুপে প্রকাশ করা ছবিতে প্রতিষ্ঠানটির অন্যদের সঙ্গে তাকে দেখা যায়। অনেকেই তার প্রশংসা করে গ্রুপে পোস্ট করেছেন।

    অন্যপ্রকাশের পোস্টের মন্তব্যের ঘরে এসেছে নানান ধরনের প্রতিক্রিয়া। কয়েকজন ছবিও পোস্ট করেছেন। একটিতে আদৃতা ওরফে আয়েশা সিদ্দিকাকে (অন্যপ্রকাশের মতে) দেখা যায় লেখক হাসনাত আবদুল হাইয়ের সঙ্গে।

    কী বলছেন পাঠক

    এমন ঘটনায় স্বভাবতই মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ আদৃতার কথোপকথনের অভিজ্ঞতা জানালেন। আবার এমনও প্রশ্ন উঠেছে না জেনে অন্যপ্রকাশের মতো প্রতিনিধিত্বশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ফেইসবুক গ্রুপের অ্যাডমিনের দায়িত্ব কী করে পেলেন এক ছদ্মবেশী। এমনকি আদৃতার বাবার অসুস্থতার খবর দিয়ে সাহায্যের আবেদন করেছিলেন প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার।

    আবদুল্লাহ অপু নামের একজন লেখেন—

    “অন্যপ্রকাশের মাজহার ভাই আদৃতা মাহজাবিনকে ট্যাগ করে এতদিন পোস্ট দিতেন, আদৃতার বাবার অসুস্থতার কথা বলে মাজহার ভাই ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন, সাহায্য পাঠানোর জন্য বিকাশ, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর দিয়েছিলেন। কাউকে না জেনে এভাবে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর, বিকাশ নম্বর দিয়ে সাহায্য চাওয়া যায়? মাজহার ভাইয়ের মতো দায়িত্বশীল একজন মানুষ এটা কীভাবে করতে পারলেন?”

    মন্তব্যের সূত্রে জানা যায়, আদৃতার কাছ থেকে উপহার হিসেবে বই পেয়েছেন অনেকে। আবার কারো কারো সঙ্গে আদৃতা যোগাযোগ করলেও উপহার পাঠাননি পরে।

    আদৃতার বিরুদ্ধে অর্থ হাতানোর অভিযোগ

    মোরশাদুর রহমান আল-আমিন নামের একজন আদৃতার বিরুদ্ধে টাকা হাতানোর অভিযোগ এনেছেন।

    “দেশের শীর্ষপর্যায়ের একাধিক গ্রুপের অ্যাডমিন মডারেটরের দায়িত্বে থাকা আদৃতা মেহজাবিন প্রচুর ফ্যান-ফলোয়ারও জমিয়েছিলেন। আর ঠিক সময়টাই কাজে লাগিয়ে কথিত আদৃতা মেহজাবিন আসল কাজে নেমে পড়েন। তার বাবার চিকিৎসার কথা বলে সরলমনা পাঠক এবং গুণীজনদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেন। হাজার হাজার চোখকে ফাঁকি দিয়ে কীভাবে কী ঘটে গেল আমরা কেউ-ই বুঝতে পারলাম না।”

    মায়ের চাপে পড়ে আদৃতার প্রতারণা!

    ফৌজিয়া লিমা নামের এক গ্রুপ সদস্য অন্য ধরনের তথ্য দিলেন। মায়ের চাপে পড়ে এ পথ বেছে নিয়েছে আদৃতা। সঙ্গে প্রকাশ করেন স্ক্রিনশট।

    “কয়দিন আগে একটা আইডি থেকে নক আসে আপু আপনার সাথে কথা আছে প্লিজ নক দিন। আমি স্পামের মেসেজ দেখিনি, আজ বিকেলে মেসেঞ্জার অ্যাকটিভ করবার পরপর মেসেজ দেখে রিপ্লাই দেই। মেয়েটির প্রোফাইলে আদৃতা মেহজাবিনের ছবি ব্যবহার করার কারণেই কৌতূহলটা তৈরি হয়।

    তারপর সে আমাকে বলে সে ফোনে কথা বলতে চায় আদৃতা মেহজাবিনের বিষয়ে। আমি বললাম আদৃতা আছেন অনলাইনে, তাকে নক করুন। তৎক্ষণাৎ সে জানায় তার আমার সাথেই কথা বলা প্রয়োজন। আমি কল দিতে বলি, সে কল দেয়।”

    “জানায় সব চাঞ্চল্যকর তথ্য। সে তার মায়ের চাপে এই কাজে নেমেছে। তার মা প্রতারক, মানুষ ঠকিয়ে টাকা নিয়ে থাকেন তার মা। বাবার চিকিৎসার কথা বলেও তিনি টাকা নিয়েছেন বিভিন্ন জনের কাছ থেকে। তাকে জোরপূর্বক এসব কাজ করানো হতো। লেখিকা হিসেবে তার কোনো অবদান নেই, এসব তার মায়ের চাপে পরে করেছেন।”

    “বিশ্বাসযোগ্য নয়! স্বাভাবিক। আমার তিন বছরের সম্পর্ক আদৃতার সাথে অনলাইনে, কী করে এক কথায় অবিশ্বাস করব?! বললাম কী প্রমাণ আছে আপনাকে বিশ্বাস করব? সে বলল ভিডিও কল দিন। ভিডিও কল দিলাম, সেই পরিচিত মুখ! আদৃতা ওরফে ‘আয়েশা সিদ্দিকা’ বসে আছে তার অফিসে, কর্মস্থলে। আমার ক্যামেরা অফ রেখে তার স্ক্রিনশট নিলাম এর মধ্যে আমি মূল আইডি যেটা সকলে চিনেন সেখানে নক করি, কল করি একটু আগের কল ব্যস্ত দেখায় দুইবারই। তারপর জিজ্ঞাসা করি সে কোথায়? বলে আমি বাসায় অথচ তখনই তার সাথে আমি ভিডিও কলে ছিলাম (প্রতারক চক্রের বাইরের কেউ নয় বলেই আমারও ধারণা কারণ তার কথায় তার মা তাকে এসব জোর করে করাতেন এবং তার মা বাবার মধ্যে ১৫ বছর কোনো রকম সম্পর্ক নেই, তারা একই ঘরে আলাদা থাকতেন, বাবা কিছু করতে পারতেন না এমনভাবে বন্দী ছিলেন)।”

    “তারপর গ্রুপ চ্যাটে ওই আয়েশা সিদ্দিকা আসেন আমাদের সাথে। আমার সাথে ভিডিও কলে ফরহাদ ভাই ছাড়া বাকিরা (গ্রুপ অ্যাডমিন) ছিলেন। ‘আয়েশা সিদ্দিকা’ তার নামে চালানো আইডিটি নিয়ে জিডি করেছেন সেই কপিও প্রমাণ হিসেবে আমাকে দেন।”

    আদৃতা মেহজাবিন নামে সামহোয়ার ইন ব্লগ ও শব্দনীড় ব্লগে দুটি অ্যাকাউন্ট পাওয়া গেছে। বাংলা মেইল নিউজ নামের একটি পোর্টালে অদৃতার বাবার মৃত্যুর খবর ছাপা হয়েছে গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর। অভিযোগ ওঠার পর থেকে লেখিকার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ রয়েছে।

    পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
    cdbl
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close