• রোববার, ২৪ জানুয়ারি ২০২১, ১০ মাঘ ১৪২৭
  • ||

মেয়েটা বিষণ্ন বিকাল হয়ে যায়

প্রকাশ:  ২৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১৬:৩৬ | আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১৬:৪১
শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল

মেয়েটা ছেলেটার মুখের দিকে তাকাল। ছেলেটা বিশ্রী একটা শব্দ করে আকাশের দিকে চোখ মেলল। মেয়েটা তাতে বিরক্ত হল না। সে জানে ছেলেটা সব সময় পৃথিবীর একরাশ বিরক্ত নিয়ে চলাফেরা করে।

মেয়েটা আবার ছেলেটার দিকে তাকাল। ছেলেটা কি যেন ভাবল। কি যে ভাবছে আশেপাশের কেউ জানে না। শুধু মেয়েটা জানে। মেয়েটা এখন পান্থ!র ভাবনার আকাশে নিবিড় স্বপ্ন নিয়ে পাখা মেলবে (আমরা জানলাম ছেলেটার নাম পান্থ)। সে উড়বে অসীম নীল আকাশের নীল বেদনায় ভালবাসার অকৃত্রিম র্স্পশ নিয়ে। পান্থটা জানে না। পাগলটা তা জানবে কেমন করে? সেতো ভাবলেশহীন আবেগশূন্য এক কবি।

ছেলেটা কবিতা লেখে। কোন পত্রিকা তার কবিতা ছাপাতে চায় না। এক সম্পাদক তাকে বলেছিল,শোন পান্থ কবিতা ইটের ভাটায় পোড়া ইট নয়। কবিতা হল শ্যামল কিশোরীর হাসির মত নরম। তুমি এক কাজ কর, তুমি পদ্য ছেড়ে গদ্য নিয়ে ডুবে থাক। তবে কিছু একটা করতে পারবে । এভাবে কবিতা লিখলে তোমার পোড়া ইট কেউ ছাপবে না। সম্পাদকের কথা শুনে ছেলেটা খুবই রেগে গিয়েছিল । সে কথা পান্থ মেয়েটাকে জানিয়েছিল যখন তার সাথে সম্পর্ক ভাল ছিল। সর্ম্পকটা আগে গভীর ছিল। মেয়েটা ভেবে পায় না কি করে গভীর সর্ম্পকে শ্রাবণ দিনের কালো মেঘের ছায়া এসে হিংস্র পাখা মেলে। কালো মেঘের তীব্র বেদনাময় সঙ্গীতের মুর্চ্ছনায় মনে বিষাদের কাঁপন ধরে। সে কাঁপন অন্তরের ভালবাসায় ক্ষ্যাপা গ্রীষ্মের আগুন ছড়ায়। আগুন জ্বালিয়ে দেয় চির সবুজ ভালবাসার মাঠ ঘাট প্রান্তর।

পান্থ অর্থাৎ ছেলেটা জানে নীলা তাকে খুব ভালোবাসে।তাই সে তার কাছে আসতে চায় পৃথিবীর সব পাহাড় সমান বাধা উপেক্ষা করে । পান্থ এটাও জানে যারা ভালোবাসে তারা খুব কষ্ট পায়। কে যেন তাকে বলেছিলো, দুঃখ কষ্টের অতল গভীরে ভালোবাসার সোনালী রূপালী মাছেরা খেলা করে বলেই, ভালোবাসার পাত্র পাত্রীরা জগত সংসারের সকল অনিন্দ্য দুঃখকষ্ট ভোগ করে থাকে। যারা ভালোবাসার বিষ পান করে নীলকণ্ঠ হতে ভয় পায়,তাদের দরজায় ভালোবাসার অচিন স্পর্শ কখনো কড়া নাড়ে না। যার দরজায় ভালোবাসার অচিন স্পর্শ চেনা অচেনা সুরে গান গাইতে গাইতে তার নিবিড় ছোঁয়া রেখে যায়, সেইতো ভালোবাসার বেদনাময় গভীর থেকে গভীরতর উত্তাল সমুদ্রে ডুব দিতে পারে ভয়হীন চিত্তে। পান্থ মেয়েটাকে অর্থাৎ নীলাকে যতটা ভালোবাসে তার চেয়ে বেশি কাঁদাতে ভালোবাসে। বন্ধু নিলয় একদিন বলেছিলো, ভালোবাসার পাত্র পাত্রীরা যত বেশী করে চোখের জ্বলে নিজেদেরকে ভাসাতে পারবে, ততই তাদের শুদ্ধ ভালোবাসা সবুজাভ পবিত্র সুন্দরের দেখা পাবে। তাই বুঝি পান্থ ওর ভালোবাসার পাত্রী নীলাকে সারা দিনমান কাঁদিয়ে কাঁদিয়ে ভালোবাসার যোগ্য করে তোলতে চায়। নিলয় ছেলেটাকে প্রায়ই বলে, দেখ পান্থ এভাবে ভালোবাসা হয় না। ভালোবাসায় উচ্ছলতা থাকে।থাকে সুন্দরের নৈসর্গিক আহ্বান। অথচ তোর ভালোবাসার মধ্যে নেই ভালোবাসা কল্লোলিত কলরব। তোর ভালোবাসার ধরণ দেখে মনে হয় সেখানে যেন কেবলই ঘৃণা আর তিক্ততা যেন খেলা করে । পান্থ নিলয়ের এসব কথার কোন উত্তর দেয়নি কিংবা বলা যায় উত্তর দেয়া প্রয়োজনও মনে করেনি। সে জানে নিলয় আর সুবোধ বালকের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। এখনো সে একা একা বাইরের বাথরুমে যেতে ভয় পায়। ভাবে বাঁশ গাছের ভূত তাকে একা পেলে তার ঘাড় মটকে রক্ত পান করে চলে যাবে। নিলয় বেটা কি করে বুঝবে ভালোবাসার হাসি কান্নার কথা। তার এখনো মনে আছে তাদের পাশের বাসার কোন এক মেয়ে নাকি তাকে ভালোবাসার কথা বলেছিলো, নিলয় সেই মেয়েটার কথা শুনে ভয়ে আতংকে লঙ্কাকান্ড বাঁধিয়েছিলো। শেষে কয়েক দিন পর পাশের বাড়ীর সেই মেয়েটা কুরিয়ার সার্ভিসে তার ঠিকানায় একসেট আনরেডি থ্রী পিছও এক ডজন কাঁচের চুড়ী পাঠিয়েছিল।এই নিয়ে বন্ধুদের মাঝে কত না হাসাহাসি কত না কলরব।

মেয়েটা কষ্ট পায় খুব বেশি। তার হাসিখুশি মুখখানা দেখে বাইরে থেকে তা বুঝার উপায় নেই। মেয়েটা ছেলেটাকে একদিন বলেছিল তোমার বিশ্রী কথা আমার বুকে তীব্র আঘাত হানে। আমার বুক ভেঙ্গে যায়। তুমি মানুষ না আর কিছু। তোমার কি দয়া মায়া কিছু নেই।

কথা শুনে ছেলেটা হাসে। বলে,নীলা আমিতো মানুষ নই। মানুষ হলে আমি কি তোমার মতো একরসহীন মেয়ে!র জন্য পাগলের মতো ছুটে আসি। তুমি কি বুঝ কতটা বেদনা নিয়ে তোমার কাছে বিষাদের ভাণ্ডখানি মেলে ধরি (আমরা জানলাম মেয়েটার নাম নীলা)।

ছেলেটা ভাবে মেয়েটা ভালবাসা বুঝে না। ভালবাসা হলো মধুর বাটি, পরিমানে বেশী পান করলেই জ্বলে পুড়ে মরতে হয়। গাঁজার নৌকা নাকি পাহাড়েও চলে। তেমনি অনিয়ন্ত্রিত আবেগের ঠেলায় যে ভালবাসার নদীতে অবগাহন করে সেও নাকি স্বপ্নের শুকনো নদীতে নৌকা ভাসায়। তাতে অলীক আনন্দ আছে। তবে ভবিষ্যতের উচ্ছ্বাস নেই। ভালোবাসায় স্বপ্ন আছে। সেই স্বপ্নকে ভাসাতে হয় কঠিন বাস্তবের ভেলায়।

মেয়েটা ছেলেটাকে কাছে ডাকে বলে, এত ভয় কিসের তোমার। ভয় কি আমাকে নিয়ে।

ছেলেটা কিছু বলে না, কিছু শুনে না, কিছু দেখে না। কেবল অনন্ত আকাশের দিকে কষ্টকে চালান করে দিয়ে বাতাসে বসন্তে ফুলের গন্ধ শুঁকেভ। দুরের অরন্যের ডাক শুনে ছেলেটা বিভ্রান্ত হয়। ভাবে নীলা তাকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে। তার কি ক্ষমতা আছে চলমান নাগরিক ভালবাসার মূল্য দেয়ায়।

তারপর অনেক দিন চলে যায়। মেয়েটা ছেলেটাকে কোথাও খুঁজে পায় না। রাস্তায় কিংবা কলেজের করিডোরে কিংবা পাবলিক লাইব্রেরী মাঠে কিংবা বৈশাখী মেলার স্টলে, কোথাও ছেলেটা নেই। মেয়েটার বান্ধবীরাও ছেলেটার খবর জানে না। বন্ধুরা বলে সে চলে গেছে অসীমের খুঁজে। সে চলে গেছে নিবিড় গভীরের খুঁজে।

মেয়েটা ভাবে পান্থ কোথায় কোন নির্জনে অসীমের দেখা পাবে। কোথায় গভীরের ছোঁয়া পাবে। একজন মেয়েই তো পারে ঘরছাড়া কোন পুরুষকে অসীমের ঠিকানা দিতে। একজন মেয়ের গভীরে যদি কোন পুরুষ প্রবেশ না করে তাহলে কি সেই পুরুষ গভীরের ছোঁয়া পাবে।

মেয়েটা এসব ভাবে। ভাবতে ভাবতে নীল হয়ে যায়। নীল হতে হতে একদিন মেয়েটা বিষন্ন বিকেল হয়ে যায়। মেয়েটা দেখে ছেলেটা ওর সকল কর্মে সাড়া বেলা একরাশ চঞ্চলতা নিয়ে তার সাথে সাথে ঘুরে বেড়ায়।

লেখক: শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল কবি গল্পকার ও আইনজীবী


পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএম

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল,গল্প,সাহিত্য
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close