• সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
  • ||

ভূত (একটি রহস্যময় বাড়ির গল্প)

প্রকাশ:  ২২ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০
আলম সরওয়ার

(প্রথম পর্ব )

ভূতের গল্প শুনতে কার না ভালো লাগে। ছোট বড় সবাই আমরাস ভূত পেত্নির গল্প শুনতে ভালোবাসি।প্রিয় পাঠক আপনাদের সামনে এমন একটি ভূতের বাড়ির গল্প তুলে ধরার চেষ্টা করবো। যে বাড়িতে ভূতেরা বাস করে। গল্পটি হচ্ছে একজন প্রভাবশালী হিন্দু জমিদারের বাড়িকে ঘিরে।

বহু বছর আগে এক গ্রামে বাস করতেন একজন প্রভাবশালী হিন্দু জমিদার। জমিদারের অনেক নাম -ডাক ছিল। জমিদারের বাড়িটি ছিল আশ পাশের এলাকার মধ্যে সব চেয়ে বড় বাড়ি। এক কথায় বিশাল। বাড়ির এক পাশ থেকে আরেক পাশ সহজে দেখা যেত না। জমিদারের বাড়িটির একটি ইতিহাস ও ঐতিহ্য আছে।এটি বৃটিশ ভারতের সময়কার একজন প্রভাবশালী জমিদারদের বাড়ি। গ্রামের লোকজন জমিদারকে খুবই সমীহ করতেন। জমিদারের সহায় সম্পত্তি এত বিশাল ছিল। জমিদার তার নিজের ভূমির উপর দিয়ে থানা শহরে ঘোড় দৌড়ে বা গাড়ি নিয়ে যেতে পারতেন। থানা শহরে জমিদারের অনেক সম্পদ ও ব্যবসা বাণিজ্য ছিল।গ্রামের নাম ধনপুর(বড় বাড়ি)।বর্তমান সময়ে বাড়িটি সরকার বাড়ি বা বড় বাড়ি নামে আশ পাশের এলাকার মানুষের কাছে পরিচিত। সরকার বাড়ি থেকে থানা শহরের দূরত্ব হবে আনুমানিক সাত আট মাইল।কথিত আছে থানার অনেক প্রভাবশালী জমিদার নাকি জমিদারের সম্পদ এবং সামাজিক কর্মের কাছে হার মেনে ছিলেন।

বাড়ির জমিদারের নাম ছিল ভারত চন্দ্র সরকার।যেমনি তার নাম তেমনি তাঁর দামও ছিল। বাড়ির জমিদারের জমিদারি নেই কিন্তু গ্রাম এবং এলাকার মানুষজনের কাছে জমিদারের বাড়িটি আজও ভারত সরকারের (বড় বাড়ি) নামে পরিচিত।বিশ কেদার জায়গা নিয়ে বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন জমিদার ভারত। প্রাচীন বৃটিশ আমলের জমিদারের বাড়ি হিসাবে ঘরের দেওয়াল এবং ছাঁদ গুলো ছিল নানান কারুকার্যে সাদৃশ্য। বাড়ির ছাদ গুলো ছিল অসাধারণ সৌন্দর্যে রিয়েল বাঘের আকৃতিতে কয়েকটি পিতলের বাঘ দিয়ে সাজানো।বৃষ্টি হলে বাঘ গুলোর মুখ দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়তো। বাঘ গুলো ছিল দেখতে ডোরা কাটা। হঠাৎ দেখলে মনে হতো জীবিত কোন বাঘ দাঁড়িয়ে আছে। যে কোন সময় যে কারো উপর বাঘ গুলো ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে।

জমিদারের সখের একখানা পালকি ছিল। জমিদারের কাছারি ঘরে সব সময় পালকি খানা ঝুলে থাকতো।জমিদার কোথাও বের হলে মালিরা জমিদারকে পালকি দিয়ে নিয়ে যেতেন।পালকির হাতল গুলো ছিল সোনা দিয়ে মোরানো। মাঝে মধ্যে জমিদারের স্ত্রী লীলা ভারতী পালকিতে বসে সমস্ত গ্রাম ঘুরে বেড়াতেন।গ্রামের মানুষজনের খোঁজ খবর নিতেন।

জমিদার বাড়ির কাছারি ঘরের এক কোণে ছিল জমিদারের পুজো ঘর।সেখানে জমিদার প্রজাদের নিয়ে পুজো দিতেন। জমিদারের স্ত্রী লীলা ভারতী নিজ হাতে পুজো ঘর সব সময় সাজিয়ে রাখতেন।পুজো ঘরের সামনে ছিল তুলিশি গাছ।তুলশি গাছকে কেন্দ্র করে পুজো হতো। পুজো ঘর ছিল সোনা রুপা দিয়ে সাজানো। অসাধারণ সৌন্দর্যের প্রতীক ছিল পুজো ঘর। জমিদারের কাছারি ঘরে সব সময় পুজোর মেলা বসতো। ছেলে মেয়েদের নাচ গান বাজনা চলতো। জমিদার মনের আনন্দে তা উপভোগ করতেন। গ্রাম্য শালিসসহ সব ধরনের অনুষ্ঠন হতো কাছারি ঘরের মান্ডবে।

জমিদার ভারত গ্রামের সাধারণ মানুষের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বাড়ির মূল ভূখণ্ডের ভিতরে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আজও সেই স্কুল ঘরটি বাড়িতে বিদ্যমান আছে। পরিবর্তিকালে জমিদার ভারত সরকারের ছেলে বাড়িটি বিক্রি করলে বাড়ির বর্তমান মালিকগন স্কুলটিকে বাড়ির মালিকানাধীন আরেকটি জায়গায় স্থানান্তরিত করেন।

জমিদারের ছিলেন এক ছেলে ও এক মেয়ে।ছেলে সতীস চন্দ্র সরকার ও একমাত্র মেয়ে চন্দ্রিমা সরকার। জমিদারের জীবদ্দশায় চন্দ্রিমা সরকারের বিয়ে হয়। চন্দ্রিমা সরকার বিয়ের পর স্বামীর সংসারে কলকাতা চলে যান। একমাত্র ছেলে সতীস চন্দ্র সরকার বাড়িতে নিজ পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। সতীস চন্দ্র সরকার ছিলেন শিক্ষিত ভদ্র মানুষ। কোন ধরণের ঝামেলা পছন্দ করতেন না। পাক ভারতে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর বাড়ির জমিদার ভারত চন্দ্র সরকারের মৃত্যুর পর জমিদারের ছেলে সতীস চন্দ্র সরকার বাড়িটি বিক্রি করে ভারতে পাড়ি জমান।

জমিদারের ছেলে সতীস চন্দ্র সরকারের কাছ থেকে বাড়িটি কিনেছিলেন একি গ্রামের হোসেন আলীর লন্ডন প্রবাসী দাদা আমজাদ আলী সাহেব।সতীস চন্দ্র সরকারের সাথে আমজাদ আলী সাহেবের পূর্ব পরিচয় ছিল।একে অন্যের সাথে ভালো যোগাযোগ ও জানাশোনা ছিল।সতীস চন্দ্র সরকার সপরিবারে ভারতে পাড়ি জমাবেন। বাড়িটি বিক্রি করা একান্ত প্রয়োজন।লোক মারফতে সতীস চন্দ্র সরকার আমজাদ আলী সাহেবের কাছে বাড়িটি বিক্রি করার প্রস্তাব করেন।আমজাদ আলী সাহেবের বাড়িটি পূর্ব থেকেই পছন্দ ছিল।তাই তিনি প্রস্তাবটি সাদরে গ্রহণ করে স্ত্রী আয়েশা বিবিকে নিয়ে বাড়িটি দেখতে যান।স্ত্রী আয়েশা বিবির বাড়িটি পছন্দ হলে আমজাদ আলী সাহেব সতীস চন্দ্র সরকারের সাথে আলাপ আলোচনা করে বাড়িটি ক্রয় করেন।

বাড়িতে ছিল দুটো পুকুর।বাড়ির সামনের পুকুরটি ছিল ছোট্ট দিঘির মতো। পেছনের পুকুরটি ছিল সামনের পুকুরের চেয়ে একটু ছোট। কিন্তু খুবই গভীর ও ভয়ংকর। বাড়িতে ছোট বড় সব মিলে বিশ থেকে পঁচিশটি থাকার রুম ছিল। সব রুম গুলো দেখতে একি রকমের মনে হয়।

বাড়ির দালান গুলো ছিল সেই বৃটিশ আমলের রাজকীয় দালান গুলোর মতো।বড় বড় ইট পাথর ও চুন চুরকি দিয়ে নির্মিত। বাড়ির দালান গুলো আজও তাঁর সেই মূল অবয়বে দাড়িয়ে আছে। সময়ের প্রয়োজনে আমজাদ আলী সাহেবের ছেলেরা শুধু সংস্কার করেছেন মাত্র।

প্রায় দুশত বছরের পুরনো ঘর গুলোকে সংস্কারের জন্য অনেক টাকা খরচ করতে হয়েছে। ঘরের ছাঁদ গুলো যখন সংস্কারের জন্য ভাঙার প্রয়োজন দেখা দেয় তখন শ্রমিকদের অনেক কষ্ট ও দুর্ভোগ পোহাতে দেখা যায়। অনেক নির্মন শ্রমিকের অসুখ -বিসুখের খবর পাওয়া যায়।কারণ ঘরের ছাদ গুলো ছিল পাথরের শিল পাঠা (মরিচ পিসার পাটা) এবং পাথরের পোতাইল(পাটার পুতাইল) ধারা আবৃত্ত। ছাদগুলো সংস্কারের সময় নির্মন শ্রমিকরা ঘরের ছাদে প্রায় দুই,- তিন শতাধিক পাটা পুতাইলের অস্তিত্ব খোঁজে পান।বাড়ির ছাদে পাওয়া পাঁঠা- পুতাইল গুলো হোসেন আলীদের আত্মীয়- স্বজন ও গ্রামের অনেকের ঘরে আজও মরিচ ,হলুদ পিসার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। যা অনেক মজবুত ও টেকসই। সহজে নষ্ট বা ভাঙার জিনিস নয়।

দ্বিতীয় পর্ব- পুকুর খনন

আমজাদ আলী সাহেব বাড়িটি ক্রয় করার পর প্রথমে স্ত্রী সন্তান নিয়ে বাড়িতে উঠেন। কয়েক মাস যাবার পর আমজাদ আলী সাহেব বুঝতে পারেন এই বড় বাড়িতে একা বাস করা মুশকিল হবে।বাড়িতে ভূত পেত্নিদের উৎপাত খুবই বেশি। আমজাদ আলী সাহেবের পাঁচ ছেলে এক মেয়ে।আমজাদ আলী সাহেবের ছেলে মেয়েরা ছোট ছোট।আমজাদ আলী সাহেব প্রবাসী মানুষ। কিছু দিন পর প্রবাসে চলে যাবেন। আমজাদ আলী সাহেব স্ত্রী আয়েশা বিবির সাথে পরামর্শ করে আপন ছোট ভাইর পরিবারকে বসবাসের জন্য বাড়িতে নিয়ে আসেন।বাড়িটি এত বড় যে মানুষ জন না থাকলে এক ঘর থেকে আরেক ঘরের খবর বলা খুবই মুশকিল। প্রথম প্রথম আমজাদ আলী সাহেবের স্ত্রী সন্তানরা বাড়িতে বসবাস করতে খুবই ভয় পেতেন। বিশেষ করে রাতে।রাতের বেলা ভূত,পেতনীদের উপদ্রব এত বেশি ছিল যে কোন সুস্থ মানুষ ভূত,পেতনীদের খেলা দেখে ও শুনে অসুস্থ হয়ে পড়তেন।

বাড়ির পিছনের বড় পুকুর থেকে রিতিমত সন্ধ্যার পর থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত নৌকা বাইচের মত ঢোল,করতালের আওয়াজ শুনা যেত।।পুকুর পাড়ের শিমুল তলায় লাইটের আলো দেখা যেত।তেমনি ভাবে ঘরের টিনের চালে ভূত পেত্নিদের হাঁটা চলার শব্দ। ঘরের পিছনের পেয়ারা গাছ থেকে প্রায়ই কান্নার শব্দ পাওয়া যেত।

কিন্তু সবার ধারণা ছিল সব ভূত পেতনীদের বাস বাড়ির সেই পুরাতন স্কুল ঘরে এবং কাছারি ঘর(মান্ডব ঘর) যেখানে গ্রাম্য শালিশের বৈঠক বসত। মান্ডব ঘরের দক্ষিণ কোণে ছিল হিন্দু জমিদারের উপাসনালয়। পুজো ঘর। পুজো ঘরটি নানান রঙের দেবতার কারুকার্যে সাজানো গোছানো ছিল। মান্ডব ঘরে পুজা হতো। বাড়িতে শুধু ভূত পেতনীদের বাস ছিল না, তাদের সাথে বাড়ির বড় জঙ্গল গুলোতে ছোট বড় সাপ ও নানান রকমের অদ্ভুত জীব জন্তুর বাস ছিল। এখন ও সেই ভূত, পেতেনী ও বড় বড় সাপ, বিচছুদের উৎপাত মাঝে মধ্যে বাড়ির লোকেরা এখনো দেখতে পান। কিন্তু ওরা বাড়ির কার ও কোন ক্ষতি করে না, আবার সহজে চোখের সামনে ধরাও পড়ে না। গ্রামের অনেকের কাছে বাড়িটি একটি ভয়ংকর বাড়ি।

আমজাদ আলী সাহেবের ছেলেরা গ্রামের অনেকের কাছ থেকে শুনেছেন তাদের বাড়িতে ছোট বড় অনেক সাপ আছে। মাঝে মধ্যে বাড়ির লোকদের চোখেও ধরা পড়েছে। বাড়ির সামনের পুকুরটির তুলনা পিছনের পুকুরটি অনেক রহস্যে ঘেরা। পিছন পুকুরে অনেক ছোট বড় নানান প্রজাতির মাছ দেখা যেত। বিশেষ করে শনি মঙ্গলবার। কারো পক্ষে পিছন পুকুরের মাছ মারা বা খাওয়া কোন দিন সম্ভব হয়নি। অল্প পানিতে পুকুর ভর্তি মাছ ও পানি ছিল পুকুরের সব চেয়ে বড় সৌন্দর্য।

পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে মানুষজন মাছের খেলা দেখে মাছ শিকারের আপছোছ করতেন। সহজে কেউ মাছ শিকারের সাহস দেখাতেন না।বাড়ির ছোট বড় সবার এই পুকুর সম্পর্কে বিশদ ধারণা পূর্ব থেকেই আছে।বাড়ির লোকজন এই পুকুরকে খুবই ভয় পেতেন। যদি কোন ক্ষতি হয়।এই ভয় কেউ পুকুরে নামার সাহস দেখাতেন না। এমনকি পুকুরের পানি কোন দিন শুকায়নি বা শুকিয়ে যেতে কেউ দেখেনি।

একদা আমজাদ আলী সাহেবের বড় ছেলে ইমাম আলীর হচ্ছে হলো পুকুরের মাছ ধরবেন। তাই তিনি পুকুরে পানির কল বসালেন। উদ্দেশ্য পুকুর খনন করা এবং মাছ ধরা। যথারীতি পানির কলের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের জন্য একটি কল বসালেন। দু-তিন দিন পানির কল অবিরত চলে হঠাৎ একদিন বিকল হয়ে পড়ে। তাই বাজার থেকে আরেকটি নতুন পানির কল কিনে এনে আবার বসালেন। দ্বিতীয় পানির কলটিও অবিরত রাত দিন চলছে,সপ্তাহ পার হয়ে গেছে তবুও পুকুরের পানি শুকানো সম্ভব হচ্ছে না, একটু শুকিয়ে আবার পুকুর ভর্তি পানি। এদিকে পুকুরে মাছের ও কোন দেখা নেই। মাছগুলো যেন উধাও হয়ে গেছে। যেখানে পুকুর ভর্তি মাছ ছিল। সেখানে মাছের কোন নড়াচড়া নেই। ইমাম আলী সহ বাড়ির লোকজন হতাশ হয়ে পড়েন।এক রাতে ইমাম আলী স্বপ্নে দেখেন পুকুরের সমস্ত মাছ এবং বাড়ির সব সাপ বিচচু একত্রিত হয়ে উনাকে দৌড়াচ্ছে।ইমাম আলী স্বপ্ন দেখে খুবই ভয় পেয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলেন।পাশের ঘর থেকে ইমাম আলীর মা শুনতে পেয়ে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন কি হয়েছে বাবা? ইমাম আলী স্বপ্নের কথা মাকে বললেন। মা ইমাম আলীকে সান্ত্বনা দিয়ে সমস্ত রাত ইমাম আলীর পাশে বসে রইলেন। ইমাম আলীর মা একটু চিন্তায় পড়ে গেলেন।পরদিন তিনি পাশের বাড়ির এক ওজা কবিরাজের সাথে ছেলের স্বপ্নের কথা আলাপ করলেন ।ওজা কবিরাজ তাকে পরামর্শ দিলেন পুকুরের কোন মাছ না ধরার জন্য।এতে ইমাম আলীর বড় ধরণের কোন ক্ষতি হতে পারে।তাই বাধ্য হয়ে ইমাম আলী পুকুর খননের কাজ বন্ধ করে দিলেন। এর কয়েক বছর পর আমজাদ আলী সাহেব বার্ধক্য জনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেন।আমজাদ আলী সাহেবের মৃত্যুর পর পরিবার ও বিশাল সহায় সম্পত্তি দেখা শুনার দায়িত্ব পড়ে মেজো ছেলে ইফতেখার আলীর উপর। আমজাদ আলী সাহেবের বাকি ছেলেরা প্রবাসী।চার ছেলে পরিবার পরিজন নিয়ে প্রবাসে থাকেন। একমাত্র মেয়ে মিনু বেগম বিয়ের পর স্বামীর সংসারে সিলেট শহরে চলে যান। মাঝে মধ্যে মা ও ভাইকে দেখতে আসেন।আমজাদ আলী সাহেবের স্ত্রী আয়েশা বিবি ছিলেন অত্যন্ত কর্মঠ ও সাহসী মহিলা। আমজাদ আলী সাহেবের মৃত্যুর পর মেজো ছেলে ইফতেখার আলীর পরিবারকে নিয়ে বিশাল বড় বাড়িতে বসবাস করতেন। আমজাদ আলী সাহেবের বিশাল সহায় সম্পত্তি দেখাশোনা করতে মেজো ছেলে ইফতেখার আলীকে সাহায্য করতেন। ইফতেখার আলীর চার ছেলে চার মেয়ে। ছেলে মেয়েরা ছোট ছোট। তাই আয়েশা বিবি নাতী নাতনিদের নিয়ে আনন্দে দিন কাটাতেন।কোন কিছুর অভাব বোধ করতেন না। আয়েশা বিবির জীবনটা ছিল অত্যন্ত সাদামাটা। তিনি সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলতে পছন্দ করতেন।সব সময় নামাজ রোজা ও কোরআন তেলাওয়াত নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন।অত্যন্ত ধার্মিক ও পরোপকারী ছিলেন।বিশেষ করে নাতি নাতনিদের ছেড়ে তিনি কোথায়ও যেতে চাইতেন না।সব সময় বাড়ির প্রতি একটা টান অনুভব করতেন। মৃত্যর আগ পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বিশাল সহায় সম্পত্তির দেখভাল করে গেছেন।

তৃতয় পর্ব - লজি এবং কাছারি ঘর

বড় বাড়িতে সব সময় লোকাল মসজিদ,মাদ্রাসা,স্কুলের অনেক ছাএ শিক্ষক লজিং থাকতেন। বাড়িতে কাজের লোক ও সব সময় দু-চার জন থাকতেন। সবার ঘুমানোর জন্য পূর্বের ঘর বা কাছারি ঘর (মান্ডব ঘর) বরাদ্দ ছিল।ভাগ্য ভাল হলে কেউ কেউ কাছারি ঘরে অনেক দিন থাকতে পারতেন।আবার অনেককে ছয় মাসের মধ্যে লজিং অন্যত্র বদলি করতে হতো।তবে দু-তিন জন একত্রে থাকলে কোন সমস্যা নাই।একা অপবিত্র অবস্থায় থাকলে যত সমস্যা । জানুয়ারি মাস ।শীতের মৌসুম। কোন এক সোমবার বাড়িতে লজিং নিয়ে আসলেন লোকাল রুপালী ব্যাংকের ম্যানেজার বাবলা সাহেব। তিনি অত্যন্ত ভদ্র, ও বিনয়ী স্বভাবের লোক ছিলেন।ইফতেখার আলী সাহেবের মা আয়েশা বিবি উনাকে খুবই পছন্দ করতেন। বাড়ির সব চেয়ে বয়স্ক মহিলা ছিলেন ইফতেখার আলী সাহেবের মা আয়েশা বিবি।বাড়ির মুরববী হিসাবে যে কোন কাজে সবাই আয়েশা বিবিকে জিজ্ঞাস বা পরামর্শ নিতেন।এক কথায় আয়েশা বিবি যা বলতেন সবাই তা মেনে নেওয়ার চেষ্ট করতেন।আয়েশা বিবি ম্যানেজার সাহেবের পরিচয় জেনে সবাইকে বললেন উনার থাকার জায়গা কাছারি ঘরে না করে অন্য কোন ঘরে করার জন্য।কিন্তু ম্যানেজার সাহেবের পছন্দ হলো কাছারি ঘর।কারণ কাছারি ঘর অনেক বড় ও খোলা মেলা আলো বাতাসে ভরপুর ।দেখতেও অনেক চমত্কার একটি ঘর।ম্যানেজার সাহেবের আগ্রহ দেখে বাড়ির লোকজন কেউ কিছু বললেন না সবাই শুধু মিঠিমিঠি হাসলেন।মাস খানেক পর এই কাছারি ঘর সম্পর্কে ম্যানেজার সাহেবের একটা ভাল ধারনা জন্মে গেছে।

ভাবটা হলো"ছেড়েদে মা কেঁদে বাঁচি" সুযোগ পেয়ে ম্যানেজার সাহেব কাউকে কিছু না বলে শুধু আয়েশা বিবিকে একটু বুঝিয়ে বললেন।আয়েশা বিবিকে তিনি দাদী ডাকতেন। দাদি এই ঘরে একা থাকা সম্ভব নয়। ভয় লাগে। গভীর রাতে কে বা কারা ঘরের ভিতর বাজনা বাজায়? কিন্তু কাউকে দেখা যায় না। আয়েশা বিবি সব শুনে ম্যানেজার সাহেবকে অন্য ঘরে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন।

বাড়ির লোকজন অনেক বার ঘরের বাহির থেকে কাছারি ঘরের ভিতরে বাজনার আওয়াজ শুনেছেন। মাঝে মধ্যে ভূত পেত্নিদের ফিসফিসি ও নৃত্যের আওয়াজ আশ পাশের মানুষজন ও শুনতে পেয়েছেন। বাড়ির অন্যরাও ব্যাপারটা বুঝতে পেরে নানান কায়দায় ম্যানেজার সাহেবের সাথে মসকরা করতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত ম্যানেজার সাহেবের থাকার জন্য আরেকটি রুম ঠিকঠাক করে দেওয়া হলো। ম্যানেজার সাহেব নতুন রুম পেয়ে মহা খুশি।কর্মস্থলের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ম্যানেজার সাহেব ইফতেখার আলী সাহেবের বাড়িতে ছিলেন। মনে হয় দীর্ঘ পাঁচ বছর খানেক।পরবর্তীতে ম্যানেজার সাহেব ব্যাংকের চাকুরি ছেড়ে লন্ডনে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে চলে যান।

বড় বাড়িতে একজন কাজের লোকের প্রয়োজন।ইফতেখার আলী সাহেব অনেক খোঁজাখুঁজি করে নবীগঞ্জের বাবুল মিয়াকে বাড়িতে কাজের জন্য নিয়ে আসলেন।বাবুল মিয়া পড়ালেখা জানা ভদ্র ও শিক্ষিত মানুষ। ভালো নামী পরিবারের সন্তান।কোন এক কারণে বাড়ি থেকে রাগ করে বের হয়ে বড় বাড়িতে কাজের জন্য আসেন। বাবুল মিয়াকে দেখলে মনে হতো না তিনি বাড়ির কাজের লোক। মার্জিত ব্যবহার। বাবুল মিয়া মাঝে মধ্যে ইফতেখার আলী সাহেবের ছেলে মেয়েদের লেখা পড়ায় সাহায্য করতেন।ইফতেখার আলী সাহেবের ছেলে মেয়েরা বাবুল মিয়াকে বড় ভাই হিসাবে সম্মান করতেন।বাবুল মিয়া ইফতেখার আলীকে মামা আর ইফতেখার আলীর স্ত্রীকে মামী ডাকতেন।অল্প দিনেই বাবুল মিয়া বাড়ির সবার সাথে খুবই ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলেন।

সুঠাম দেহের অধিকারী বাবুল মিয়া থাকতেন বড় বাড়ির কাছারি ঘরে। সেখানে দুটি খাট ছিল।এক খাটে বাবুল মিয়া আর আরেক খাটে লোকাল ইস্কুলের এক হুজুর থাকতেন।কাছারি ঘরে দু-তিন জন একত্রে থাকলে কোন সমস্যা নাই।একা থাকলে যত সমস্যা।ঈদের ছুটিতে হুজুর তার নিজ বাড়িতে চলে গেছেন।সপ্তাহ খানেক পর আসবেন।বাবুল মিয়া একা ঘুমাতে লাগলেন।হঠাৎ একদিন দেখা গেল বাবুল মিয়া বেলা করে ঘুমাচ্ছেন।সকাল গড়িয়ে দুপুর চলে আসছে তবু ও ঘুমাচেছন।অনেক ডাকা-ডাকির পর ও বাবুল মিয়ার কোন সাড়া শব্দ নেই।বাড়ির সবাই চিন্তায় পড়ে গেলেন। অনেকের ধারণা বাবুল মিয়া মারা গেছেন। একেকজন একেক কথা বলতে লাগলেন।শেষ পর্যন্ত ঘরের দরজা ভেঙে ঢুকে দেখা গেল বাবুল মিয়া অচেতন হয়ে পড়ে আছেন।নাক মুখ থেকে শুধু সাদা সাদা ফেনা বের হচ্ছে।তবে জীবিত আছেন।

বাবুল মিয়াকে জীবিত দেখে সবাই একটু চিন্তা মুক্ত হলেন।কাছারি ঘর সম্পর্কে সবার ভালো ধারণা পূর্ব থেকেই ছিল।বাড়ির সবাই বলাবলি করছেন বাবুল মিয়াকে লেংড়া ভূতে ধরেছে। সবার ধারণা লেংড়া ভূত বাড়ির স্কুল ঘর ও টংঙি ঘরে যাতায়াত করে। তাই বড় হুজুর কবিরাজ ডাকা হলো। যিনি ভূত তাড়াতে খুবই উস্তাদ। বড় হুজুর এসেই বাবুল মিয়াকে গলার আওয়াজ বড় করে ডাক দিলেন। বাবুল মিয়ার কোন সাড়া নেই। হুজুর ঝাড়ফুঁক ও পানি ছিটিয়ে বাবুল মিয়ার মুখে দিতেই বাবুল মিয়া জেগে উঠলেন। উঠে খাটে বসে রইলেন। কোন কথাবার্তা নেই। হুজুর বাবুল মিয়াকে হাতের চটি দিয়ে কয়েকটি আঘাত করলেন। বাবুল মিয়া বড় বড় চোখ করে হুজুরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বাবুল মিয়াকে ভূতে ধরেছে। হুজুর ঝাড়ফুঁকু,তাবিজ কবজ দিয়ে লাঠিপেটা করে বাবুল মিয়ার ভূত তাড়ালেন। অনেকক্ষণ পর বাবুল মিয়া মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। হুজুর সবাইকে আশ্বস্ত করে বললেন। ভূত চলে গেছে। বাবুল মিয়ার জ্ঞান ফিরে এলে তাকে নিয়ে গোসল করানোর জন্য।বাবুল মিয়ার জ্ঞান ফিরে এলে সবাইকে দেখে তিনি হতবাক হয়ে পড়েন। শুধু জিজ্ঞাসা করলেন তাঁর কি হয়েছে?সবাই হাসাহাসি করতে লাগলেন। হুজুর তাবিজ কবজ করে ঘরে পানি পড়া দিয়ে চলে গেলেন। বাবুল মিয়ার গায়ে ব্যথা। সপ্তাহ খানেক লেগে গেল বাবুল মিয়া সুস্থ হয়ে উঠতে। সুস্থ হয়ে উঠার পর বাবুল থাকার রুম পরিবর্তন করে অন্য রুমে চলে গেলেন। নতুন রুমে গিয়েও বাবুল মিয়া ভয়ে সমস্ত রাত আলো জ্বালিয়ে ঘুমাতেন।

এভাবে বাবুল মিয়ার মতো আরো অনেকেই কাছারি ঘরে ভূতে ধরেছে।কিন্তু আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে বড় বাড়ির কাউকে কোন দিন ভূতে ধরেনি।ভূতেরা নাকি বাড়ির লোকদের ভালো করে চেনে। বাড়ির বাহিরের লোকদের ভূতেরা এই বাড়িতে সহ্য করতে পারে না। সময় সুযোগে ডিসটার্ব করে। বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। বাবুল মিয়া অনেক বছর বড় বাড়িতে কাজ করেছেন। পরবর্তীতে ইফতেখার আলীর পরামর্শে পাশের গ্রামের জরিনা বেগমকে বিয়ে করে সংসারী জীবন শুরু করেন। বর্তমানে দুই সন্তানের জনক বাবুল মিয়া। সংসারী জীবনে অত্যন্ত সুখি মানুষ।

চতুর্থ পর্ব - পেত্নির ডাক

বড় বাড়িতে থাকার রুমের অভাব নেই।ছোট বড় সব মিলিয়ে পনেরো/ষোলোটি হবে।মানুষের তুলনায় রুমের সংখ্যা ছিল অধিক।ঘর গুলো দুটি লাইনে বিভক্ত ছিল।পূর্ব লেইন এবং পশ্চিম লেইন।ক্লাস সিক্সে উঠার পর থেকেই ইফতেখার আলী সাহেবের মেজো ছেলে হোসেন আলী একা একটি রুমে ঘুমাতেন। একদা মাগরিবের নামাজের পর হোসেন আলী নিজ রুমে পড়ার টেবিল বসে পড়ালেখা করছেন। হঠাৎ বাহির থেকে কান্নার শব্দ কানে ভেসে আসে। হোসেন আলী প্রথমে মনে করেন কোন ছোট শিশু কাঁদছে। সেদিকে পাত্তা না দিয়ে তিনি পাড়ার টেবিলে মনোযোগ দেন।কিছুক্ষণ পর আবার একটু ভিন্ন রকমের কান্নার শব্দ হোসেন আলীর কানে ভেসে আসতে লাগল।বিকট কান্নার শব্দ,বলে কাউকে বুঝানো সম্ভব নয়। হোসেন আলী একটু ভয় পেয়ে গেলেন। ঘরের জানালা দিয়ে বাহিরে উঁকি দিতেই দেখেন বাড়ির ভিতরের উঠোন ভর্তি মানুষজন হৈ- চৈ করছেন।যে যার মতো কথাবার্তা বলছেন। এদিকে, ঐদিকে গেছে। হোসেন আলী বয়সে ছোট তাঁর এক চাচাত ভাইকে জিজ্ঞাস করলেন কী হয়েছে? সে বলল পেতনী বড় ঘরের টিনের চালের উপর অনেকক্ষণ হেঁটে হেঁটে কেঁদেছে।

উঠোনে সবাই জড়ো হওয়ায় ভূত পেতনী পিছনের পেয়ারা গাছে চলে গেছে।পেয়ারা গাছে বসে পেত্নি আপন মনে কাঁদছে। হোসেন আলী উঠোনের এক কোণ থেকে ছোট একখন্ড ইটের টুকরো নিয়ে পিছনের পেয়ারা গাছে গিয়ে মারেন এক ঢিল। ঢিল ছুঁড়ার সাথে সাথেই পেত্নি কান্নাসহ উধাও।আর এদিকে হোসেন আলীকে বাড়ির মুরববীরা বকাঝকা দিতে লাগলেন। মুরববীদের ধারণা যদি হোসেন আলীর সাথে ভূত পেত্নি লেগে যায় বা ভূত পেত্নিরা হোসেন আলীর কোন ক্ষতি করে বসে। মুরববীদের কথা শুনে হোসেন আলী ও একটু আধটু ভয় পেতে লাগলেন। হোসেন আলীর মা হোসেন আলীকে পানি পড়া এবং তেল পড়া দিয়ে একটু অভয় দিলেন আর কিছু হবে না। কিন্তু বিধি বাম। রাতে পেত্নি এসে হোসেন আলীর দরজায় ঢোকা দিয়ে হোসেন আলীর নাম ধরে ডাকতে লাগলো। হোসেন আলী, হোসেন আলী দরজা খুলো ,দরজা খুলো।গলাটা ছিল অবিকল হোসেন আলীর মায়ের মতো।হোসেন আলীর মনে হলো তাঁর মা যেন তাকে ডাকছেন।হোসেন আলীর রুমে ছিল দুটো খাট।এক খাটে হোসেন আলী এবং অন্য খাটে বড় ভাই মরম আলী থাকতেন। হোসেন আলী কিছু বুঝে উঠার আগেই বড় ভাই মরম আলী জেগে উঠেন।মরম আলী গলার আওয়াজ ছেড়ে বলে উঠেন কে ওখানে,কে ওখানে? দরজার ওপাশ থেকে কোন আওয়াজ নেই। নিস্তব্ধ রাত।কোন সাড়া শব্দ নেই ।কিছুক্ষণ পর মরম আলী দরজা খুলে বাহিরে বের হয়ে চারিদিকে একটু দেখে নিলেন।কোথায় ও কোন কিছু দেখতে না পেয়ে আবার দরজা বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে পড়েন।পরদিন সকালে ঘরের দরজার সামনে একটি কাক মরা অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। বাড়ির ছোট বড় সবাই জড়ো হয়ে কাকটি দেখছেন। এমন সময় মরম আলী তাঁর মাকে গতরাতের ঘটনা জিজ্ঞেস করেন? মা না সূচক উওর দিলে মরম আলী চিন্তিত হয়ে পড়েন। তাহলে কে হোসেন আলীকে ডাকলো? অবিকল মায়ের গলা। মা শুনে হতবাক হয়ে পড়েন। মা হোসেন আলীকে একটু বকাঝকা দিতে থাকেন। মা বুঝতে পারেন এটা পেত্নির কাজ।পেত্নি হোসেন আলীর উপর প্রতিশোধ নিতে চেয়েছে। কারণ হোসেন আলী পেত্নিকে ঢিল মেরেছে। ভূত পেত্নিরা সুযোগ পেলে মানুষের উপর প্রতিশোধ নেয়। মরার আগে সেই পেত্নিও হোসেন আলীর উপর প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল। ভাগ্য ভালো হোসেন আলীর কিছু হয়নি। হোসেন আলীর মা দোয়া কালাম পড়ে ছেলেকে ফুঁক দিয়ে মসজিদের বড় হুজুরকে ডাকলেন। বড় হুজুর এসে হোসেন আলীকে তাবিজ কবজ দিয়ে গেলেন। যাতে ভূত পেত্নি হোসেন আলীর কোন ক্ষতি করতে না পারে।

পঞ্চম পর্ব - মাছ শিকার

বর্ষা মৌসুম।চারিদিকে তৈ তৈ পানি।হোসেন আলীর ইচ্ছে হলো মাছ শিকারে যাবেন।সমবয়সী ফুফাত ভাই আব্দুল হাকিমকে নিয়ে কাজের লোকদের সাথে মাছ শিকারে বের হন।তৈ তৈ পানি আর ঘন অন্ধকার।মাছ শিকার বেশি সুবিধাজনক নয়।তাই রাতের মধ্যেভাগে ফুফাত ভাই আব্দুল হাকিমকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন।কাজের লোকদের মাছ শিকারে রেখে হোসেন আলী ফুফাত ভাই আব্দুল হাকিমকে নিয়ে বাড়ি চলে আসেন।হোসেন আলীদের বাড়িতে ঢোকার রাস্তা ছিল বাড়ির বড় পুকুরের পাড় ঘেঁষা।বাড়ির প্রবেশ মুখে পা দিতেই হোসেন আলী ও আব্দুল হাকিম শুনতে পান পুকুরে পানির শব্দ।শব্দটা আসছে পুকুরের ঘাট থেকে।আব্দুল হাকিম ও হোসেন আলীর ধারণা ছিল পুকুরের বড় মাছ গুলো মনে হয় পুকুর ঘাটে খেলা করছে।কিন্তু টর্চ লাইটের আলোতে হোসেন আলী আর আব্দুল হাকিম শুধু পানির শব্দ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলেন না।একটু পরে আস্তে আস্তে পানির শব্দ শুনতে পান।মনে হচ্ছে কেউ একজন হাত মুখ ধৈত করছেন।কিন্তু তাঁরা পুকুর ঘাটে কোন মানুষজনকে দেখতে না পেয়ে একটু ভয় পেয়ে যান।

উভয়ে ভয়ে ভয়ে পুকুর ঘাটে বাঁধানো হাতল ওয়ালা চেয়ারে বসে পড়েন। পুকুরে শুধু পানির তৈ তৈ শব্দ।মিনিট দশেক পর পুকুরের শব্দ বন্ধ হয়ে গেল। চারিদিকে সুনসান নীরবতা। অল্প কিছুক্ষণ পর হোসেন আলী ও আব্দুল হাকিম যখন পুকুরের পানিতে হাত মুখ পরিষ্কার করতে লাগলেন। তখন তাঁরা শুনতে পান পুকুর পাড় ঘেঁষা বাড়ির কাছারি ঘরের টিনের চালে ফিসফিস শব্দ ও হাঁটা চলার আওয়াজ। উভয়ে পুকুরের পানিতে কোন রকমে হাত মুখ পরিষ্কার করে যে যার রুমে গিয়ে শুয়ে পড়েন। পরদিন থেকে হোসেন আলী ও আব্দুল হাকিমের গায়ে খুব বেশি জ্বর দেখা দেয়। ভয়ে উভয়ে বাড়ির কাউকে কোন কিছু না বলে ডাক্তার দেখিয়ে ঔষধ নিলেন। সপ্তাহ খানেক লেগে গেল তাদের সুস্থ হয়ে উঠতে।সেই থেকে হোসেন আলী ও আব্দুল হাকিম ভূতের গল্প শুনলেই ভয় পান। তরতর করে তাদের গায়ে জ্বর আসে।

ষষ্ঠ পর্ব - ধান চুরি

কোন এক বর্ষা মৌসুমে হোসেন আলীদের বাড়ির কাছারি ঘর থেকে দশ পনেরো মনের মত ভেজা শুকনো ধান চুরি হয়ে গেল।অচারদিকে তৈ-তৈ পানি। ভাদ্র মাস। বোরো ধানের মৌসুম। বুরো ধান কাটা হয়েছে। ভেজা বোরো ধান শুকানোর জন্য হোসেন আলীদের কাছারি ঘরের মেঝেতে ছিটিয়ে রাখা হয়েছে।যে ঘরে ভূতেরা বাস করে।কথিত সেই ভূতের ঘর থেকে কোন এক রাতে চোরের হাত দিয়ে ঘরের দশ মন ধান চুরি হয়ে যায়।চোরের সাহসী ভূমিকা দেখে হোসেন আলীদের বাড়ির সবাই হতবাক।বাড়ির ইতিহাসে এই প্রথম বড় ধরনের চুরি হয়েছে।এর আগে কোন দিন হোসেন আলীদের বাড়ি থেকে একটি কানা-খড়িও চুরি হয়নি।ঘরের দরজায় তালা ঝোলানো আছে, কিন্তু সব ধান উধাও।পুরো ঘর খালি।বাড়িতে একজন কাজের লোক ছিলেন।নাম হান্নান মিয়া। হান্নান মিয়া হোসেন আলীদের পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে বাড়িতে কাজ করে আসছেন।বাড়ির সব কিছু দেখভালের দায়িত্ব ছিল হান্নান মিয়ার।বাড়ির সবার সন্দেহ হল কাজের লোক হান্নান মিয়ার উপর।হান্নান মিয়া কোন অবস্থাতেই স্বীকার করছেন না।তিনি নিজেকে নিষ্পাপ দাবি করছেন।তাই হোসেন আলীর বাবা ইফতেখার আলী সাহেব চোর খোঁজে বের করার সিদ্ধান্ত নিলেন।যেমন চিন্তা তেমনই কাজ।চোর ধরার জন্য তিনি মোল্লা কবিরাজ খোঁজতে লাগলেন।পেয়ে ও গেলেন একজন নামীদামি মুন্সী কবিরাজ।উনি বেতের গল্লা চালান দিয়ে চোর বের করবেন।শুক্রবার দিন মুন্সী কবিরাজ হোসেন আলীদের বাড়িতে আসলেন।হোসেন আলীর বাবা ইফতেখার আলী কাজের লোক হান্নান মিয়াকে দিয়ে গ্রামবাসীকে দাওয়াত করলেন।গ্রামবাসী হোসেন আলীদের কাছারি ঘরে সন্ধ্যার পর জড়ো হলেন। ইফতেখার আলী সাহেব গ্রামবাসীর সামনে মুন্সী হুজুরকে পরিচয় করিয়ে দিলেন।ধান চুরির ঘটনা পূর্ব থেকেই গ্রাম বাসীর জানা ছিল।তাই বিস্তারিত বলতে হলো না। শুধু মুন্সী হুজুর চোর ধরার পদ্ধতি সম্পর্কে গ্রামবাসীর সামনে একটু খোলামেলা আলোচনা করে গেলেন। উপস্থিত গ্রামবাসীকে নিয়ে পরদিন শনিবার সময় নির্ধারণ করা হলো। সকাল দশ ঘঠিকা।যথা সময়ে বাড়ি ভর্তি গ্রামের লোকজনের উপস্থিতিতে মুন্সী কবিরাজ গল্লা চালান দিলেন।জীবনে এই প্রথম গ্রামের লোকজন গল্লা চালান দেখলেন।অসাধারণ গল্লার কারুকাজ।হুজুর একজন তুলারাশির জাতক ব্যক্তির হাতে একটি মাঝারি আকারের বেতের লাঠি তুলে দিলেন। মাত্র দুই হাত লম্বা লাঠি। মুন্সী কবিরাজ কি যেন মনে মনে পড়তে লাগলেন আর সাথে সাথে তুলারাশির জাতক লোকটির হাতে লাঠিটি আস্তে ধীরে ঘুরতে লাগল। ঘুরতে ঘুরতে একসময় লাঠি হাতে লোকটি সমস্ত বাড়ি দৌড়াতে লাগলেন।মুন্সী কবিরাজ গল্লা চালান দিয়ে অনেক রকমের খেলা দেখালেন। গল্লা দেখিয়ে দিল কোন পথ দিয়ে চোর গুলো হেঁটে গেছে। চোর গুলো যে পথ দিয়ে হেঁটে গেছে গল্লা সহ তুলারাশির জাতক ব্যক্তিটি বার বার সে পথে দিয়ে দৌড়াচ্ছেন।মুন্সী কবিরাজ তিনবার গল্লার খেলা দেখিয়ে চতুর্থ গল্লা চালানে চোর ধরার ঘোষণা দিলেন। উপস্থিত বাড়ি ভর্তি গ্রামবাসীর মধ্যে কোন চোর আছে কিনা দেখা হবে। তাই যথারীতি লাঠির খেলা শুরু হল। দুই থেকে তিন শতাধিক মানুষের মধ্যে অবশেষে গল্লা চোর খোঁজে পেল।তিন থেকে চারবার গল্লা চালান দেওয়া হল। প্রতিবার গল্লা খোঁজে পেল একই ব্যক্তিকে এবং বেধড়ক লাঠিপেটা করলো।গল্লা চোর হিসাবে খোঁজে পেল হোসেন আলীদের বাড়ির কাজের লোক হান্নান মিয়াকে।

শেষ পর্যন্ত হান্নান মিয়াকে ঘরের ছাদের উপর এমন এক জায়গায় লুকিয়ে রাখা হল যাতে গল্লা খুঁজে না পায়।কিন্তু বৃথা চেষ্টা,গল্লা সেই অজানা অকল্পনীয় জায়গা থেকে হান্নান মিয়াকে খুঁজে বের করে বেধড়ক পিটিয়ে হসপিটাল উপযোগী করে দেয়। সাথে উৎসুক গ্রামবাসী হান্নান মিয়াকে একটু গন ধোলাই দিয়ে হসপিটালে পাঠিয়ে দেন। সুস্থ হওয়ার পর হান্নান মিয়া তার জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে ক্ষমা চাইলেন। সপ্তম পর্ব - মস্তই মিয়া

গ্রামে ইফতেখার আলী সাহেবের পারিবারিক মালিকাধীন ছোট বড় কয়েকটি বাড়ি আছে।ছোট বড় সব মিলে চার পাঁচটি বাড়ি হবে।বাড়ি গুলোর ও নাম আছে। একেকটি বাড়ি একেক নামে পরিচিত। যেমন বড় বাড়ি,ছোট বাড়ি,ফারুকের বাড়ি,ইমানী বাড়ি,ময়না বাড়ি।প্রতিটি বাড়ি ছোট বড় গাছ গাছালিতে ভরপুর। ইফতেখার আলী সাহেব প্রতি বছর লোক লাগিয়ে বাড়ি গুলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করান।নতুবা বাড়ি গুলো জঙ্গলে রূপ নেয়।তাই বাড়ির গাছ গাছালি পরিষ্কারের জন্য তিনি গ্রামের কিছু লোক ডাকলেন। যাঁরা গাছের ডাল পালা কর্তনে বিশেষ পটু।তাদেরকে তিনি সব কিছু বুঝিয়ে দিলেন।তাঁরা একে একে সব বাড়ির গাছের ডাল পালা পরিষ্কার করে যখন ময়নার বাড়িতে আসলেন।তখন বিরাট এক কান্ড ঘটে গেল। কথিত আছে ময়নার বাড়ি এবং বড় বাড়ি এই দুটি বাড়িতে ভূত পেত্নিদের উপদ্রব খুবই বেশী।রাতের বেলা কেউ সাধারণত ময়নার বাড়িতে একা যাওয়া আসা করেন না।সবার ভয় লাগে।ভূত পেত্নিরা এই বাড়ির পিছনের তেতুল গাছে নাকি রাতের বেলা খেলা করে।এক ডাল থেকে অন্য ডালে ভূত পেত্নিদের জাম্পিং করতে অনেকে দেখেছেন। রাতের অন্ধকারে পিছনের পুকুর পাড়ের করছ গাছ এবং তেতুল গাছ থেকে ফিশফিশ আওয়াজ শুনা যেত।কাটুরীরা যখন ময়নার বাড়ির সামন থেকে একে একে গাছ গুলোর ডাল কর্তন করে যখন পিছনের পুকুর পাড়ের তেতুল গাছের ডাল কর্তন শুরু করেন, তখনই নানা রকম সমস্যা দেখা দিতে লাগলো।দা করাত ভেঙে যেতে লাগলো।দু একটি ভেঙেও গেল।তেতুল গাছের ডাল ছাঁটতে গিয়ে প্রথমে একজনের হাত কেটে যায়।আরেকজনের মাথা ব্যথা শুরু হয়।কাটুরীরা সংখ্যায় ছিলেন তিনজন।মস্তই ,ময়না এবং রহিম।মস্তই মিয়া ছিলেন তাদের দল নেতা।মস্তই মিয়া খুবই সাহসী এবং কর্মঠ ছিলেন।ময়না এবং রহিম যখন তাদের শারীরিক দুর্বলতা প্রকাশ করলেন মস্তই মিয়া তখন তাদের উপর একটু রেগে গেলেন।তিনি দা,কুড়াল হতে নিয়ে তেতুল গাছে উঠলেন ডাল ছাঁটার জন্য।উঠেই তিনি গাছের ডাল এক এক করে কর্তন করা শুরু করলেন। একপর্যায়ে তিনি নিজেই নিজের পায়ের হাঁটুতে দা দিয়ে কুপ মেরে দিলেন।দা এর কুপে অল্পের জন্য হাঁটু দু টুকরো থেকে রক্ষা পেল। নতুবা হাঁটু দু-টুকরো হয়ে গাছের উপর থেকে নিচে পড়ে যেত। মস্তই মিয়া খুবই শক্তিশালী ও সাহসী মানুষ ছিলেন। তিনি গাছের ডালে শক্ত করে ধরে অজ্ঞান হয়ে বসে রইলেন।কোন নড়াচড়া বা কান্নাকাটি ও নেই। হঠাৎ কেউ একজন দেখলেন গাছের উপর থেকে টপটপ করে রক্ত নিচে পড়ছে।সবাই হতবাক হয়ে মস্তই মিয়াকে ডাকতে লাগলেন, কিন্তু মস্তই মিয়ার কোন সাড়া শব্দ নেই। তাড়াতাড়ি করে গাছের নীচে জাল সহ ঘরের সব ব্যলাংকেট বিছিয়ে দেওয়া হলো।দুটি লাডার জাতীয় লম্বা মই লাগিয়ে চারজন গাছে উঠে মস্তই মিয়াকে নীচে নামিয়ে নিয়ে আসলেন।তখনও মস্তই মিয়ার কোন হুস নেই।ততক্ষণে ডাক্তার এসে পড়েছেন।

মস্তই মিয়াকে ধরাধরি করে বড় বাড়ির কাছারি ঘরে নিয়ে আসা হলো।কাছারি ঘরে দুটো খাট ছিল।মস্তই মিয়াকে একটিতে শুইয়ে দেওয়া হয়।ডাক্তার মস্তই মিয়ার পায়ের কাঁটা অংশে সেলাই দিয়ে কয়েকটি ইনজেকশন পুশ করে ঔষধ দিয়ে চলে গেলেন।সেলাই দেওয়ার সময় মস্তই মিয়া জেগে উঠেলেন।উঠেই হাঁউ মাউ করে কেঁদে উঠেন।উপস্থিত সবাই মস্তই মিয়াকে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন।এদিকে মস্তই মিয়ার বউ বাচ্চারা এসে পড়েছেন।বউ বাচ্চারা এসে হাঁউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন।সাথে মস্তই মিয়াও।

পরদিন মস্তই মিয়াকে শহরের হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়।হসপিটালে ভর্তি করে তাকে কয়েক ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়।মস্তই মিয়ার শরীর থেকে অনেক রক্ত গড়িয়েছে।মস্তই মিয়াকে ১৫দিনের মতো হসপিটালে রেখে মোটামুটি সুস্থ করে বাড়িতে নিয়ে আসা হলো। ডাক্তারা পরামর্শ দিলেন অন্তত তিন মাস লাগবে মস্তই মিয়া পুরোপুরি সুস্থ হতে। মস্তই মিয়ার পারিবারিক অবস্থা তেমন ভালো ছিল না।তাই সুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত ইফতেখার আলী সাহেব মস্তই মিয়াকে নিজ বাড়ির কাছারি ঘরে রেখে দিলেন। কথিত সেই ভূতের ঘরে।মস্তই মিয়াকে বাড়ির কাছারি ঘরে থাকতে দেওয়া হলো।কাছারি ঘরে মস্তই মিয়া সহ আরেক হুজুর থাকতেন।ধীরে ধীরে হুজুরের সাথে মস্তই মিয়ার খুবই ভাব জমে উঠে। হুজুর ও মস্তই মিয়াকে দেখভাল করতে লাগলেন।মস্তই মিয়া অসুস্থ মানুষ বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেন না।যে কোন প্রয়োজনে হুজুর সব সময় মস্তই মিয়াকে আপন ভাই মনে করে দেখাশোনা করতেন।মস্তই মিয়া হুজুরের কাছে সবসময় দোয়া চাইতেন।হঠাৎ একদিন হুজুর বিশেষ প্রয়োজনে নিজ বাড়িতে বেড়াতে গেছেন। কথা ছিল দুই এক দিন থাকবেন। কিন্তু আর থাকা হলো না।একদিন পর চলে আসলেন। কারণ মস্তই মিয়ার খুবই অসুবিধা হচ্ছে । ঠিক মতো ঘুমোতে পারছেন না। রাতের বেলা ভূত পেত্নিরা মস্তই মিয়াকে ঘুমোতে দেয় না।একদিন রাতে মস্তই মিয়ার ঘুম ভেঙে গেলে তিনি খুবই চিন্তায় পড়ে যান।ঘরের দরজা জানালা সবই খোলা।দু -দু করে ঘুরে হাওয়া ডুকছে। তিনি কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখেন কে যেন আবার ঘরের দরজা লাগাচ্ছে।মস্তই মিয়া কে কে বলে চেঁচাচ্ছেন ।?কোন সাড়া শব্দ নেই। সেদিন রাতে মস্তই মিয়ার চোখে কোন ঘুম নেই।মনে মনে ভয় পেয়েছেন। সমস্ত রাত জেগে রইলেন।পরদিন মস্তই মিয়া হুজুরকে ফোন করে সব কিছু বললেন। হুজুর আর দেরি না করে তাড়াতাড়ি চলে আসলেন।হুজুর কিছু তাবিজ কবজ ও ঝাড়ফুঁক দিয়ে মস্তই মিয়াকে আসস্ত করলেন।আর কোন ভয় নেই। হুজুর এই ঘরের অবস্থা ভালো করে জানেন।একা থাকলে যত সমস্যা। তবে পাক পবিত্র হয়ে থাকলে কোন সমস্যা নেই। হুজুরকে ও একবার ভূতেরা জ্বালাতন করেছে। সকালে উঠে দেখেন হুজুরের বালিশ নেই। অন্য খাটে কে যেন বালিশে শুয়ে আছে। হুজুর সেদিন খুবই ভয় পেয়েছিলেন। হুজুরের আমল খুবই ভালো।এরপর থেকে তিনি ঘরের লাইট জ্বালিয়ে নিজ শরীরে ঝাড়ফুঁক দিয়ে ঘুমোতেন।হুজুর আসার পর মস্তই মিয়ার ভয় কিছুটা কেটে যায়।এর মাস খানেক পর মস্তই মিয়া সুস্থ হয়ে নিজ বাড়িতে চলে যান।--

-

অষ্টম পর্ব - ভন্ড হুজুরের ভূত তাড়ানো

ইফতেখার আলী সাহেবের মা অসুস্থ। বৃদ্ধ মহিলা। বয়স একশোর উপরে। বার্ধক্য জনিত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।ইফতেখার আলী সাহেবরা পাঁচ ভাই এক বোন। শুধু ইফতেখার আলী সাহেব ছাড়া বাকি চার ভাই প্রবাসে থাকেন পরিবার পরিজন নিয়ে।একমাত্র ছোট বোন মিনু শহরে থাকেন স্বামীর সংসারে।মায়ের অসুস্থতার খবর শুনে মিনু বেগম বাড়িতে আসেন। মায়ের সাথে কিছুদিন সময় কাটালেন।মাকে দেখভাল করলেন।মায়ের শরীর আগের চেয়ে আরো বেশি খারাপ হয়ে গেল।ইফতেখার আলী সাহেব বোনের সাথে পরামর্শ করে শহরে নিয়ে গেলেন।নামী দামী হসপিটালে ভর্তি করালেন।কয়েক দিন হসপিটালে রাখার পর ডাক্তারা পরামর্শ দিলেন বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য।কারণ অবস্থার কোন উন্নতি হচ্ছে না। বরং অবনতি হচ্ছে। মায়ের ও ইচ্ছা বাড়িতে চলে যাবেন। ইশারায় কথা বলছেন।সবাই বুঝলেন তিনিও বাড়ি যেতে চান।ইফতেখার আলী সাহেব প্রবাসী ভাইদের মায়ের অসুস্থতার খবর পাঠালেন।মায়ের অসুস্থতার খবর শুনে প্রবাসী ভাইয়েরা দেশে চলে আসলেন। মাকে একনজর দেখার জন্য। সপ্তাহ খানেক পর ইফতেখার আলী সাহেবের মা খোদার ডাকে সাড়া দিয়ে পর পারে চলে গেলেন।মায়ের মৃত্যর মাস খানেক পর এঁকে এঁকে সবাই প্রবাসে চলে গেলেন।শুধু ইফতেখার আলীর মেজো ভাই মজুমদার আলী রয়ে গেলেন।কারণ মায়ের মৃত্যু শোকে মজুমদার আলী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।খুব বেশি অসুস্থ। শরীরর খুবই দুর্বল। ঠিক মতো চলাফেরা করতে পারেন না।ডাক্তার ডাকা হলো। ডাক্তার ঔষধ দিলেন। ঔষধ খেয়ে কিছুটা সুস্থ স্বাভাবিক হতে লাগলেন। কিন্তু রাতে ঠিক মতো ঘুমোতে পারেন না।

মজুমদার আলীর বউয়ের ধারণা মজুমদার আলীর উপর জিন ভূতে আচর লেগেছে। তাই তিনি ভালো মোল্লা কবিরাজ ডাকলেন।মজুমদার আলীর শালা একজন জাঁদরেল কবিরাজ নিয়ে আসলেন। লম্বা লাল দাড়ি ওয়ালা।মজুমদার আলীর স্ত্রী লাল দাড়ি ওয়ালা হুজুর দেখে খুবই খুশি। হুজুরকে চা নাস্তা দেওয়া হলো।হুজুর ভালো করে চা নাস্তা খেয়ে মজুমদার আলীকে দেখতে গেলেন। হুজুর মজুমদার আলীকে ঝাড়ফুঁক ও একটু নাড়াচাড়া করে কয়েকটি তাবিজ লিখে হাতে এবং গলায় ঝুলিয়ে দিলেন।হুজুর তিনদিন সময় দিয়ে গেলেন।তিন দিনের ভিতরে মজুমদার আলী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবেন।হুজুরের ভাষ্য মতে মজুমদার আলীর সাথে জিন লেগেছে। শত্রুতা করে মজুমদার আলীকে মারার জন্য জিন দিয়ে চালান দেওয়া হয়েছে। জিন তিনদিনের ভিতরে মজুমদার আলীকে ছেড়ে যাবে।নতুবা তিনদিন পর এসে হুজুর জিন তাড়ানোর ব্যবস্থা করবেন।তিনদিন পর হুজুর আসলেন।মজুমদার আলী আগের চেয়ে অনেক সুস্থ। শরীর দুর্বল। একটু আধটু মাথা ঘুরে। ডাক্তারী ঔষধ খাচ্ছেন। একমাত্র মজুমদার আলীর স্ত্রী এবং শালা ব্যতীত পরিবারের সবার ধারণা মজুমদার আলী ঠিকমতো ডাক্তারী ঔষধ খেলে সুস্থ হয়ে উঠবেন। হুজুর মজুমদার আলীর স্ত্রীকে জিন তাড়ানোর কথা বললেন। আজ শনিবার রাতেই জিন তাড়াতে হবে। নতুবা দেরী হয়ে যাবে। তাই তড়িঘড়ি করে হুজুর জিন তাড়ানোর দু একটা খেলা দেখালেন।খেলা গুলো ছিল খুবই হাস্যকর। হুজুর সবার অগোচরে রাতের অন্ধকারে বাড়ির কয়েকটি স্থানে গুটিকয়েক তাবিজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখলেন। তাবিজ রেখে হুজুর বাড়ির উঠানে এসে মজুমদার আলীকে নিয়ে আসর বসালেন।মজুমদার আলীকে একটি চেয়ারে বসিয়ে চার থেকে ছয় হাত দূরে একটি মাচা বাঁধলেন।মাচার উপরে একটি মাটির হাড়ি বসালেন।হাঁড়ির ভিতরে কিছু কয়লা রাখলেন।উদ্দেশ্য বাড়িতে চড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা তাবিজের পুতলো গুলো হাড়িতে জ্বালাবেন।

লোকজন ভর্তি উঠোন। হুজুর ঘোষণা দিলেন বাড়িতে কিছু কিছু স্থানে তাবিজ পুঁতে রাখা হয়েছে। তাবিজ গুলো খোঁজে বের করে পাতিলের মধ্যে জ্বালিয়ে দেওয়া হলে মজুমদার আলীর উপর থেকে জিনের আচর চলে যাবে। এবং মজুমদার আলী সুস্থ হয়ে উঠবেন।তাবিজ গুলো খোঁজে বের করতে হুজুরের একজন তুলারাশির জাতক প্রয়োজন।পরিবারের লোকজন সবাই ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। কে এমন শত্রু বাড়িতে তাবিজ পুঁতে রেখেছে? পরিবারের সবাই এঁকে অন্যকে সন্দেহ করতে লাগলেন।বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে সন্দেহর প্রবণতা একটু বেশী দেখা দিল।উপস্থিত সবাই খোঁজাখুঁজি করে একজন তুলারাশির জাতক খোঁজে আনলেন।তুলারাশির জাতক ব্যক্তি একটি পিতলের গোলাকার বাটিতে দুই হাত রাখলেন। হুজুর মন্ত্র পড়ে ফুঁক দিতেই বাটিসহ তুলারাশির জাতক ব্যক্তিটি আস্তে আস্তে দৌড়তে লাগলেন। হুজুর যে যে স্থানে তাবিজ পুঁতে রেখেছিলেন সেই স্থান গুলোতে বাটিসহ তুলারাশির জাতক যেতে থাকলেন।যেখানে গিয়ে বাঁটিসহ তুলারাশির জাতক দাঁড়ায়।সেখানেই হুজুর দুই একজনকে নির্দেশ দেন তাবিজ খোঁজে বের করার।

অন্ধকার রাত। লাইটের আলোতে কোথাও কোন তাবিজ খোঁজে পাওয়া গেল না।কারণ তাবিজ গুলো এর আগেই উধাও হয়ে গেছে। হুজুর যখন তাবিজ গুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখেন তখন বাড়ির পাহারাদার হেলাল মিয়া দেখে ফেলে।প্রথম দিন থেকেই হেলাল মিয়ার সন্দেহ ছিল হুজুরকে নিয়ে। হেলাল মিয়ার কাছে হুজুরের কথা বার্তা ভালো লাগেনি। হুজুর তাবিজ গুলো রেখে যাওয়ার পর হেলাল মিয়া সব তাবিজ গুলো খোঁজে বের করে একটি বোতলে ভরে নেয়। তাবিজের খোঁজে যখন সবাই ব্যস্ত তখন হেলাল মিয়া কানে কানে গিয়ে হুজুরকে তাবিজের কথা বলে একটি ধমক দিয়ে বসে। হুজুর বিপদ টের পেয়ে কোন কথা না বলে সবার অগোচরে চুপিচুপি পালালেন।

উপস্থিত লোকজন হুজুরকে খোঁজতে লাগলেন। কিন্তু কোথায়ও হুজুরকে খোঁজে পাওয়া গেল না।

মজুমদার আলীর স্ত্রী রাগে ফেটে পড়েছেন। হুজুরকে নিয়ে বাড়ির অনেকের সাথে তিনি খারাপ আচরণ করেছেন। হুজুরের গুন গান গেয়েছেন।পরিশেষে তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরে সবার কাছে দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। মজুমদার আলী ও ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন।সুস্থ হয়ে উঠার সপ্তাহ খানেক পর তিনিও বিদেশে পাড়ি জমান।

নবম পর্ব - জিনে ধরা

একদা কোন এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে বিয়ের নিমন্ত্রণ এলো। পরিবারের সবাইকে বিয়ে বাড়িতে নিমন্ত্রণ জানানো হয়। বাড়ির মুরববী হিসাবে ইফতেখার আলী সাহেবের মা আয়েশা বিবি সেই বিয়ে বাড়িতে যাবেন। এমনিতে আয়েশা বিবি বাড়ির বাহিরে কোথায়ও বেড়াতে যান না।এই বিয়েটি আয়েশা বিবির বাপের বাড়ির কোন এক আত্মীয়ের হওয়াতে তিনি নিজ থেকে বিয়েতে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। বিয়ের আগের দিন বিকেলে গাড়ি ডাকা হয় আয়েশা বিবিকে বিয়ে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। যথা সময়ে গাড়ি এসে উপস্থিত।আয়েশা বিবি গাড়িতে উঠলেন সাথে আদরের নাতনি ইফতেখার আলী সাহেবের ছোট মেয়ে মনি।আয়েশা বিবি বয়স্ক মহিলা। নিজের দেখভালের জন্য নাতনি মনিকে সঙ্গে নিলেন। মনির বয়স তখন ১৪কিংবা ১৫হবে।কথা ছিল সপ্তাহ খানেক বিয়ে বাড়িতে থাকবেন।কিন্তু বিধি বাম।বিয়ের একদিন পর হঠাৎ নাতনি মনির খুবই শরীর খারাপ করলো। অসম্ভব জ্বর এবং মাথা ধরা। বিয়ে বাড়ির লোকজন ডাক্তার ডাকলেন। ডাক্তার এসে ঔষধ দিয়ে গেলেন। মনিকে ঔষধ খাওয়ানো হলো। প্রথম দিন ঔষধ খাওয়ার পর একটু ভালো দেখা গেল। কিন্তু পরদিন থেকে আবার জ্বর।আয়েশা বিবি মনির এমন অবস্থায় খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েন।মনস্থির করলেন বাড়ি ফিরবেন।গাড়ি ডেকে মনিকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসলেন।বাড়িতে আসার পরদিন মনিকে নিয়ে ভালো ডাক্তার দেখানো হলো। শহরের নামকরা ডাক্তার। ঔষধ খাওয়ানোর পর জ্বর কমে গেল।মনি সুস্থ স্বাভাবিক। কয়েকদিন চলে গেল।হঠাৎ মনির মা লক্ষ্য করলেন মনি একা একা কথা বলে। রাতে ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করে। কি যেন আবুল তাবুল বকে। ?জিজ্ঞেস করলে চোখ বড় বড় করে রাগ করে উঠে।মনির মাায়ের সন্দেহ হলো।মনে হয় মেয়ের উপর কোন কিছুর আচর পড়েছে।মনি প্রায়ই অসুস্থ থাকে।কোন কিছু খেতে চায় না।যা খুশি তাই করে।মনির আম্মা সরলা বেগম শাশুড়ি আয়েশা বিবির সাথে মেয়ের শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে আলোচনা করলেন।আয়েশা বিবি পাশের গ্রামের এক জিনের হুজুরকে ডাকলেন। হুজুর এসে মনিকে দেখে ঝাড়ফুঁক দিয়ে গেলেন।তিনি শুধু বলে গেলেন ওকে জিনে ধরেছে।ওর জন্য তালাবী করতে হবে।হুজুর দুদিন পর আসবেন।দুদিন পর হুজুর এসে বড় বাড়ির কাছারি ঘরে আসর বসালেন।পুরো কাছারি ঘর ভর্তি মানুষ।মনিকে হুজুরের সামনে বসানো হলো।হুজুর ঝাড়ফুঁক দেওয়া শুরু করলেন। আস্তে আস্তে মনির সাথে কথা বলার চেষ্টা করছেন।কিন্তু মনি কোন কথা বলে না। শুধু চোখ বড় বড় করে এদিক ওদিক তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ কোন কথা না বলে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। চোখে মুখে পানি দেওয়া হলো। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরে এলো। জ্ঞান ফিরে আসার পর হুজুর শক্ত করে মনির হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে ধরলেন। ধরে ফুঁক দিলেন। ফুঁক দিতেই মনি হুজুরকে দমক দিয়ে উঠলো।মনির ধমকে উপস্থিত সবাই কেঁপে উঠলেন। হুজুর ও ধমক দিয়ে এক থাপ্পড় মেরে চুলের মুঠিতে ধরলেন।ধরা মাত্রই মনি হুজুরকে বলল আর মারিস না। নতুবা তোকে মেরে ফেলবো। তোর বংশ মেরে ফেলবো।তুই চিনিস না আমি কে?বলে চিৎকার দিয়ে উঠে।

উপস্থিত লোকজন একটু ভয় পেয়ে গেলেন। হুজুর তার কৌশল পাল্টালেন। সবাইকে একটু সরে যেতে নির্দেশ দিলেন। হুজুর লাল রংয়ের কি যেন তার পাঞ্জাবির পকেট থেকে বের করলেন। বের করে এক গ্লাস পানির সাথে মিশিয়ে জোর করে মনিকে খাইয়ে দিলেন।মনির হাতে এবং চুলে দুটো তাবিজ বেঁধে দিলেন।তাবিজ বেঁধে দেওয়া মাত্রই মনি মাটিতে গড়াগড়ি শুরু করতে লাগল।তখন হুজুর এগিয়ে এসে মনিকে জিজ্ঞেস করলেন বল তুই কে? কোথায় থাকিস ।কোথায় থেকে এসেছিস এরকম নানান প্রশ্ন করতে লাগলেন। মনি কোন কথা বলে না বার বার হুজুরকে নানান ধমক দিতে থাকে।হুজুর ও নাছোড়বান্দা কোন অবস্থায় ছাড় দিচ্ছেন না।এভাবে ঘন্টা খানেক চলে গেল।হুজুর ও তাঁর ঝাড়ফুঁক দিয়ে যাচ্ছেন অনবরত।হঠাৎ মনি লাফ দিয়ে উঠে দৌড় দিতে চাইলো।হুজুর তাঁর হাতের লাঠি দিয়ে আঘাত করে ধরে ফেললেন। হুজুর হাতের লাঠির উপরিভাগে একটি তাবিজ বেঁধে আস্তে আস্তে মনিকে আঘাত করতে লাগলেন।মনি কথা বলতে শুরু করেছে। প্রথমে ৩২ দাঁত বের করে একটা অট্টহাসি দিয়ে সবাইকে ভয় পাইয়ে দেয়। এমন জোরে অট্টহাসি দেয় সমস্ত বাড়ি কেঁপে উঠে। হুজুর মাঝে মধ্যে লাঠি দিয়ে চতুর্দিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ধমক দিচ্ছেন আর আঘাত করতে থাকেন।মনি গড়গড় করে সব কথা বলতে লাগল।

হুজুর জিনকে অনুরোধ করলেন মনিকে ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য।অনেক কথাবার্তা ও লাঠির আঘাতের উপর আঘাত মনে হয় আর সহ্য করতে না পেরে মনিকে ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য জিন রাজি হয়। হুজুর চলে যাওয়ার নিদর্শন চাইলেন। হঠাৎ কাছারি ঘরের পাশের আম গাছের একটি ডাল ভেঙ্গে নীচে পড়তে দেখা গেল। এমন সময় মনিও মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। হুজুর নির্দেশ দিলেন মনিকে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেওয়ার জন্য। জিনে চলে গেছে।সবাই ধরা ধরি করে মনিকে বাড়ির ভিতরে বড় ঘরে নিয়ে শুইয়ে দিলেন।।মনি লম্বা একটি ঘুম দিচ্ছে। হুজুর কিছু তাবিজ ও ঝাড়ফুঁক দিয়ে সেদিনের মতো বিদায় নিলেন।পরদিন মনি দুপুরে ঘুম থেকে উঠে দেখে শরীরের খুবই ব্যথা।মাকে জিজ্ঞেস করে তাঁর কি হয়েছে।?শরীরের এমন ব্যথা কেন। মা কিছু না বলে শুধু মুচকি হেসে বললেন যাও গোসল করে ভাতের টেবিলে এসো।মনি আর কথা না বাড়িয়ে সোজা বাথরুমে গিয়ে গোসল সেরে নিল।মনির খুবই খিদে পেয়েছে তাই আর দেরি না করে ভাতের টেবিলে গিয়ে পেঠ ভরে ভাত খেয়ে নেয়।। মনে হয়েছে সে অনেক বছর ভাত খায়নি।

মনি বুঝতে পারে ঘরের সবাই তাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করছেন। সে কারো সাথে কোন কথা না বলে নিজের রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। এভাবে মন মরা অবস্থায় কয়েক দিন চলে যায়। মনি কারো সাথে কোন কথা বলে না। সারাদিন বিছানায় শুইয়ে থাকে।

সপ্তাহ খানেক লেগে গেল সুস্থ স্বাভাবিক হতে। সপ্তাহ খানেক পর থেকে মনি পুরোদমে সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে স্কুলে যাওয়া আশা শুরু করতে লাগলো।

মনির স্কুলে যাওয়া আশা এবং মনিকে সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে চলাফেরা করতে দেখে পরিবারের সবার ভূতের ভয় কেটে গেল।মনিও আগের মতো তাঁর স্বাভাবিক সুন্দর জীবন ফিরে পেল।

দশম পর্ব -লেংড়া ভূত ও শিরিনের মা

শিরিনের মা এই গরমে ও কাঁথা গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে। বাহিরে প্রচণ্ড গরম যা এক কথায় অসহনীয়। কাঁথার নিচে শিরিনের মা কি যেন আবুল তাবুল বকছে। বারবার শরিনকে ডাকছে কাঁথা দেওয়ার জন্য।গায়ে তিন খানেক কাঁথা আছে।তারপর ও শিরিনের মার আরো কাঁথা চাই । শিরিন এদিক ও ওদিক ছোটাছুটি করছে কাঁথার জন্য। কোথায়ও কাঁথা খোঁজে পাচ্ছে না। শিরিনের বয়স মাত্র দশ বছর। এই দশ বছর বয়সে শিরিন তার মাকে ঘরের রান্না বান্না সহ সকল কাজে সহযোগিতা করে। সাথে ছোট ভাই কবিরকে দেখভাল করার দায়িত্ব শিরিনের। শিরিন ঘরে কাঁথা খুঁজে না পেয়ে পাশের ঘরের জরিনা আন্টির কাছ থেকে মায়ের অসুখের কথা বলে একখান কাঁথা চেয়ে আনল।মাকে কাঁথা দিতেই মা বকাঝকা দিয়ে উঠলেন শিরিনের দিকে। এমন বিশ্রী ভাষায় শিরিনের মা শিরিনকে বকছে ,মায়ের বকাঝকা শুনে শিরিন ভয়ে এক দৌড়ে চলে গেল জরিনা আন্টির ঘরে। সেখানে গিয়ে শিরিন হাঁউমাউ করে কাঁদছে। জরিনা আন্টি সব শুনে শিরিনের বাবাকে ফোন দিলেন। কিছুক্ষণ পর শিরিনের বাবা চলে এলেন। শিরিনের বাবা ফরিদ মিয়া একজন রং মিস্ত্রি। ফরিদ মিয়ার আয় দিয়ে সংসার চলে।ফরিদ মিয়া শিরিন ও জরিনা আন্টিকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন।

দেখলেন শিরিনের মা ঘুমের ঘোরে কি যেন ফিশ ফিশ করে বলছে। ফরিদ মিয়া শিরিনের মার কপালে হাত দিতেই শিরিনের মা ফরিদ মিয়াকে কর্কশ ভাষায় বকাঝকা দিয়ে উঠলেন। কিছুক্ষণ পর শান্ত হয়ে শিরিনের মা শিরিনের বাবাকে আব্বা ডাকতে শুরু করলেন।শিরিনের মায়ের এমন ব্যবহারে ফরিদ মিয়া খুবই লজ্জিত হলেন।যত সময় গড়াচ্ছে ততই শিরিনের মায়ের পাগলামি আরো বাড়ছে। ফরিদ মিয়া ডাক্তার ডাকলেন। ডাক্তার এসে শিরিনের মাকে দেখে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে গেলেন। শিরিনের মা কয়েক ঘন্টা ঘুমিয়ে উঠে ভাত খেতে চাইলেন। শিরিনের মাকে ভাত দেওয়া হলো। শিরিনের মা একাই হাঁড়ির সব ভাত ,তরকারি খেয়ে ফেললেন। হাড়িতে কোন কিছুই অবশিষ্ট রহিল না।স্বামী ফরিদ মিয়া ও বাচ্চারা কি খাবে সেই দিকে শিরিনের মার কোন খেয়াল নেই। ভাত খেয়ে শিরিনের মা আবার ঘুমিয়ে পড়লেন। শিরিনের বাবা ফরিদ মিয়ার সন্দেহ হলো। শিরিনের মাকে মনে হয় ভূতে ধরেছে। শিরিনের বাবা মোল্লা কবিরাজ ডাকলেন। এক লম্বা দাড়িওয়ালা হুজুর আসলেন শিরিনের মায়ের ভূত তাড়ানোর জন্য। হুজুরকে শিরিনের মায়ের সব ঘটনা খুলে বলা হলো। হুজুরকে পাশের ঘরে বসানো হলো। চা নাস্তা দেওয়া হলো। মুখে মুখে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো শিরিনের মাকে ভূতে ধরেছে। আস পাশের লোকজন এসে জড়ো হলেন ভূত তাড়ানো দেখার জন্য ।যথাসময়ে শিরিনের মাকে হুজুরের সামনে নিয়ে আসা হলো।শিরিনের মা হুজুরকে দেখেই অকথ্য ভাষায় বিশ্রী রকমের গালাগাল শুরু করে দিলেন।হুজুর কিছু না বলে সবাইকে ইশারা করলেন ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য। ঘরের মধ্যে শিরিনের বাবা সহ কয়েকজন মুরববী বসে রইলেন। হঠাৎ কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই শিরিনের মা হুজুরের মুখে থুতু দেওয়া শুরু করলেন। ফরিদ মিয়া উঠে এসে শিরিনের মা কে ধরতে চাইলেন। তাঁর আগেই শিরিনের মা ঘরের দরজা খুলে বাইরে বের হয়ে যায়। বাহিরের লোকজন ভয়ে চারিদিকে ছোটাছুটি করতে লাগলেন। শিরিনের এক মামা শিরিনের মাকে সাহস করে ধরে ফেললেন। হুজুর ও আর শিরিনের মায়ের ভূত তাড়ানোর সাহস দেখালেন না। সবার অগোচরে তিনি ও ভয়ে চুপিচুপি পালালেন।

শিরিনের মাকে বড় ধরনের ভূতে ধরেছে। শিরিনের বাবা ফরিদ মিয়া খুবই চিন্তিত হয়ে পড়লেন। কি করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না।আবার হুজুর ডাকা হলো। এবার আসলেন নামীদামি একজন হুজুর। তিনি ভূত তাড়াতে খুবই উস্তাদ।উনার নাম ডাক আছে। হুজুর এসে কোন কথা না বলে শিরিনের মাকে এক থাপ্পড় মেরে চুলের মুঠিতে ধরলেন। ধরা মাত্রই শিরিনের মা হুজুরের সাথে দস্তি শুরু করে দিলেন। চুলের মুঠি ধরেই একটি তাবিজ শিরিনের মায়ের চুলের কোপায় বেঁধে দিলেন। তাবিজ দেওয়া মাত্রই শিরিনের মা লাফাতে শুরু করল।

হুজুর ফরিদ মিয়াকে বললেন তোমার স্ত্রীকে লেংড়া ভূতে ধরেছে। লেংড়া ভূত তাড়াতে হলে অনেক খরচ হবে। ফরিদ মিয়ার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। এমনিতে টাকা পয়সার অভাব যাচ্ছে না। অনেক দেনা আছে। অনেক ভেবে চিন্তে ফরিদ মিয়া তাঁর শখের বাই সাইকেলটি বিক্রি করে টাকার জোগাড় করে হুজুরকে খবর দিলেন। হুজুর আসলেন সাথে আরেক হুজুরকে নিয়ে। এসে মন্ত্র পড়া শুরু করে দিলেন। শিরিনের মাকে নিয়ে আসা হলো হুজুরদের সামনে। শিরিনের মাকে বসানো হলো একটি চেয়ারে। আজ আর শিরিনের মার কোন জোরজবরদস্তি নেই। কোন চিল্লা চিল্লি বা হইচই নেই। হুজুর উঠে শিরিনের মার চারিপাশে চক দিয়ে একটি গুল বৃত্ত আঁকলেন। তখনই শিরিনের মা চিল্লাচিল্লি করে কাঁদতে শুরু করে দিলেন। হুজুর শিরিনের মাকে বেত দিয়ে কয়েকটি আঘাত করতে করতে নাম জিজ্ঞেস করলেন কয়েক বার। শিরিনের মা কিছুই বলে না ।শুধু ফরিদ মিয়ার দিকে তাকিয়ে ফরিদ মিয়াকে বাবা ডাকছে। বাবা বাঁচাও,বাবা বাঁচাও বলে চেঁচাচ্ছে। আমি আর দুষ্টুমি করবো না।আমাকে বাঁচাও বলে হা হা করে হাসছে আর কাঁদছে। ফরিদ মিয়া লজ্জায় কিছু বলে না।শুধু মাথা নিচু করে বসে আছে। হুজুর দেখলেন হাল্কা মন্ত্রে কাজ হবে না।তিনি সাথের হুজুরকে কি যেন বললেন ,হুজুর উঠে গিয়ে শিরিনের মার মাথায় হাত দিলেন এবং একটি মাটির হাড়ি বসালেন। বড় হুজুর উঠে হাড়িতে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিলেন। শিরিনের মা হাঁউমাউ করে কান্নাকাটি শুরু করতে লাগলেন।শিরিনের মা হুজুরকে ইনিয়ে বিনিয়ে কাকুতি মিনতি করতে লাগলেন। হুজুর কোন কথা না শুনে আগুনের গতি আরো বাড়িয়ে দিলেন। হঠাৎ শিরিনের মা হুজুরকে বলে উঠলেন আর আগুন দিস না, চলে যাচ্ছি। চলে যাচ্ছি বলে হাঁউমাউ করছে। বড় হুজুর সবাইকে দরজার সামন থেকে সরে যেতে নির্দেশ দিলেন। হুজুরের নির্দেশ মতো দরজার সামন খালি করা হলো। হঠাৎ দরজা বিকট শব্দে খুলে গেল। শিরিনের মা ও মাটিতে লুটিয়ে পড়ে গেলন। হুজুর শিরিনের মাকে কিছু তাবিজ ও ঝাড়ফুঁক দিলেন। সবাই ধরা ধরি করে শিরিনের মাকে শুয়োর ঘরে নিয়ে বিছানায় শুয়ে দিলেন।হুজুরও সেদিনের মতো চলে গেলেন।এর সপ্তাহ খানেক পর থেকে শিরিনের মা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেন।

(সমাপ্ত)

আলম সরওয়ার যুক্তরাজ্য


পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএম

গল্প,সাহিত্য,ভূত
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close