• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০, ১৩ কার্তিক ১৪২৭
  • ||

নন্দিতাকে খুঁজে পাওয়া গেছে, তবে...

প্রকাশ:  ১৭ অক্টোবর ২০২০, ১৭:৪৭
শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল

নন্দিতা সকালবেলা একবার বাসা থেকে বের হয়েছিলো। সোজা গিয়েছিলো ওর কলেজের অঙ্কের টিচার ইকবাল হাসানের কাছে। তারপর সেখান থেকে শপিং মলে ঢুকেছিলো বাসার জন্য কিছু দরকারি জিনিস কিনবে বলে। নন্দিতার এমনই কপাল যে মেয়ে হয়েও বাসার সব টুকিটাকি জিনিস তাকে একাই কেনা কাটা করে জোগার করতে হয়।

ছোট ভাইটা স্কুলের গন্ডি পাড় হয়নি। ছোট বোনটা এবার সবেমাত্র মেট্রিক পাস করে কলেজে ভর্তি হয়েছে। এখনো তার মাঝে শিশু সুলভ স্বপ্ন রাশি মনের অজান্তে খেলা করে থাকে। ওকে এখনো সকাল বেলা মুখ ব্রাশ করে দিতে হয়। ভালো করে চুলে চিরুনিও চালাতে পারে না। এসব দিকও নন্দিতাকে দেখতে হয়। বলবে ‘বড় আপা আমার চুলটা ঠিক করে বেঁধে দাও না। দেখো না যে জামাটি পড়েছি তার সাথে পরনের পায়জামাটা ম্যাচ করেছে কিনা’। আরো কত কি বলে সে।

ছোট বোনের সকল আব্দার নন্দিতা বিনা প্রতিবাদে পূরণ করে থাকে। ভাবে বোনটি তার কলেজে পা দিলেও এখনো ইলিশ মাছের কাঁটা বেছে খেতে পারে না। খুব সাবধানে তাকে সবকিছু করতে হয়। নন্দিতা অনেক সময় ছোট বোনের ওপর রেগে উঠে। বলে ‘নাসরিন তুমি বড় হয়েছ। এখন তোমাকে ছোট্ট বালিকার মতো আচরণ করলে চলবে না’।

নাসরিন বড় আপার কথার উত্তরে বলে, ‘বড় আপা তুমি আমার ওপর রাগ কর কেন। আমার কি দোষ বল। তুমিই তো আমাকে নিজে নিজে ভাত খেতে দাওনি কখনো। বলেছো ইলিশ মাছে কাঁটা আছে। বেছে না খেলে কাঁটা গিয়ে গলায় ফুঁটবে। তখন শুধু চিৎকার করবি’।

নাসরিনের কথা শুনে নন্দিতা চিন্তা করে দেখে নাসরিন মিথ্যে কথা বলছে না। সেই তো তাকে কখনো নিজ হাতে ভাত খেতে দেয়নি। ভেবেছে ছোট বোনটি যত বড়ই হোক না কেন, তার কাছে তো এখনো শিশুই রয়ে গেছে।

-বড় আপা তুমি যে কিছু বলছো না।

-আমি আর কি বলবো। তুই তো দেখছি এখন খুব কথা বলতে শিখেছিস।

-তুমি আবার রাগ করলে। তুমি রাগ করলে আমি কিন্তু মুখে আর ভাত তুলবো না।

নাসরিনের কথা শুনে নন্দিতা ভাবে বোন তার অভিমান করেছে। খুব জেদী মেয়ে সে। একবার যদি বলে ভাত খাবে না, তাহলে ভাত খাবেই না। তখন বাবা মা তাকেই দোষ দেবেন। বলবেন ঠেলা সামলাও। তুমি তো ওকে আদর দিয়ে মাথায় তুলেছো। তুমিই তার মান ভাঙাও।

ছোট ভাই কামরুল বলবে, ‘বড় আপা তোমার এত দায় কি পড়েছে যে, ছোট আপার রাগ ভাঙাতে হবে। সে তো আর আমার মত স্কুলের ছাত্রী না। এখন ছোট আপাও কলেজের ছাত্রী। পাশের বাসার নজরুল ভাই দেখছি ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। যেন কোনো দিন ছোট আপাকে সে দেখেনি। আর তুমি ওকে বাচ্চা শিশু ভাবো’।

কামরুলের কথার ধরণ দেখে নন্দিতা খুব বেশি রাগ করে। বলে ‘তুই তো দেখছি একে বারে পেঁকে গেছিস। সবই বুঝিস’। ধমক খেয়েই কামরুল নিরব হয়ে যায়।

একদিন খুব সকাল সকাল নন্দিতা বাসা থেকে বের হয়েছিলো। ভেবেছিলো দু’টি টিউশনি শেষ করে বাসায় ফিরে কামরুলকে তার ক্লাসের অঙ্ক বুঝিয়ে দিয়ে খাওয়া দাওয়া শেষ করে, আবার বিকেলের টিউশনিতে বের হবে। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে যাওয়ার পর যখন বর্ষার মেঘাচ্ছন্ন দিনের সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো, তখনো দেখা গেলো নন্দিতা বাড়ি ফিরছে না। নাসরিন কয়েকবার ওর বড় আপার নাম্বারে কল করে দেখলো নন্দিতার ফোনটা বন্ধ আছে এবং সুন্দর কণ্ঠের অধিকারীনি একটা মেয়ে বলছে ‘দুঃখিত আপনি যে নাম্বারে কল করেছেন তা এখন বন্ধ আছে। তাই সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না’।

নাসরিন যতো বারই ওর বড় আপার ফোনে কল করেছে ততো বারই দেখেছে, তার বড় আপার ফোনটা বন্ধ আছে এবং সুন্দর কণ্ঠের অধিকারীনি মেয়েটা বার বার একই কথা বলছে। কামরুল তার বড় বোনের নম্বরে কল দিয়ে দেখেছে তার বড় আপার ফোনটা বন্ধ আছে। তাদের বাবাও বার বার তার বড় মেয়ে নন্দিতা আহসানের নম্বরে কল দিয়ে দেখেছেন যে, তার বড় মেয়ের ফোনটা বন্ধ আছে এবং একটা মেয়ে, হয়তো বা তার বড় মেয়ের বয়সই হবে, বলে যাচ্ছে আপনি যে নম্বরে কল করেছেন তা এখন বন্ধ আছে। তাই সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

নন্দিতা, কামরুল ও নাসরিনের বাবা প্রথমেই ভেবেছিলেন তার বড় মেয়ে হয়তো এখনো টিউশনিতে আছে। তাই তার ফোনটা বন্ধ আছে। নাসরিন আর কামরুলও তাই ভেবেছিলো। বড় আপা হয়তো তার ছাত্র পড়ানো নিয়ে ব্যস্ত আছে। তাই ওর ফোনটা বন্ধ রেখেছে। নাসরিন জানে বড় আপার স্বভাবই হচ্ছে এমন কোন দরকারি কাজে ব্যস্ত থাকলে ফোনটা বন্ধ করে দেয়।

নন্দিতার বাবাও ভেবেছিলেন যে, নন্দিতা কোনো কাজে অর্থাৎ টিউশনিতে মগ্ন আছে। তাই ফোনটা বন্ধ রেখেছে। কিন্তু রাতের ঘড়ির কাঁটা যখন ৯টা ৩০ থেকে ১১টা ৩০’র ঘর পার হয়ে যায় এবং তখনো দেখা যায় নন্দিতার ফোনটা বন্ধ আছে এবং একটি মেয়ে সুন্দর কণ্ঠে একই কথা বলে যাচ্ছে। তখন বাড়ির সবাই বুঝল তাদের বাড়ির মেয়েটি এখন কোনো টিউশনিতে ব্যস্ত নয়। সেকোনো বিপদে পড়েছে। এখন আর এমনভাবে নিশ্চিন্তে বসে থেকে বাড়ির মেয়ের ফিরে আসার অপেক্ষা করে সময়ক্ষেপণ করা ঠিক হবে না।

নাসরিন প্রথমে বড় আপার বান্ধবীদের কাছে কল করে জানতে চাইলো তাদের বড় আপা ওদের বাসায় গেছে কি না। নাসরিনকে নন্দিতার সব বান্ধবীরাই বলল একবার কলেজের মোড়ে তাদের বোনের সাথে ওদের দেখা হয়েছিলো। তখন তাকে খুব উৎফুল্ল মনে হচ্ছিলো। প্রাণবন্ত স্বপ্নের ছোঁয়ায় মানুষ যেভাবে ভেসে বেড়ায় তেমনি নন্দিতাও যেন কোনো অজানা স্বপ্নের দোলায় ভেসে বেড়াচ্ছিলো। আসমা একবার নন্দিতাকে বলেছিলো কিরে, তোকে আজ এতো চঞ্চলা হরিনীর মতো দেখাচ্ছে কেন। নতুন জলের স্পর্শে মাছেরা যেমন অনাবিল আনন্দে জলের অগভীর তরঙ্গে ছোটে বেড়ায় তার মধ্যেও যেন এমন প্রাণস্পন্দন খেলা করছে।

আসমা আরো বলেছিলো, ‘তোর মল্লিকার বনে কি আজ প্রথম ফুল ফুঁটেছে’। আসমার কথার উত্তরে নন্দিতা মুখে কিছু বলেনি। কেবল হেসেছে। ওর হাসির মধ্যেও যেন উচ্ছলতার ঢেউয়ের দোলায় সূর্য্যরে আলোক রাশি যেমন ভাবে হেসে উঠে, ঠিক তেমনি করে প্রীতির উচ্ছাসে নন্দিতা যেন দোলে উঠছিলো।

বাসার সবাই যখন জানলো নন্দিতা তার কোনো বান্ধবীর বাসায় যায়নি, তখন তাদের বাবা ছিদ্দিক সাহেব ভাবলেন আর অপেক্ষা করা যায় না। এবার থানায় গিয়ে ডায়রি করতে হবে। পুলিশ অবশ্যই একটা ব্যবস্থা করবে। কামরুল বাবার কথা শুনে যেন নির্বাক হয়ে গেল। তার মনে হলো বড় আপা বাড়ি ফিরছে না, এই কথা বলে থানায় ডায়েরি করা মানেই হলো বড় আপাকে কেউ বিপদে ফেলেছে কিংবা বড় আপা হারিয়ে গেছে কিংবা বড় আপা তাদেরকে ফেলে চলে গেছে। কোনো দিন আর ফিরে আসবে না। আবার এমন কথাও কামরুলের মনে হলো, হতে পারে বড় আপা তার ভালোবাসার মানুষের সাথে পালিয়ে গেছে।

এছাড়া আরো অনেক কথাই কামরুলের মাথায় বিশ্রীভাবে খেলা করতে থাকলো। ছিদ্দিক সাহেবের ডাকে কামরুল সংবিত ফিরে পায়। ওর বাবা তাকে বলছেন ‘কিরে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থেকে কি ভাবছিস। এখনতো চিন্তা ভাবনা করার সময় নেই। আমাদের থানায় গিয়ে ডায়রি করতে হবে’।

কামরুল ওর বাবার মুখের দিকে কিছুটা সময় তাকিয়ে থাকলো। তারপর শেষে বললো ‘বাবা আরেকটু সময় অপক্ষো করা যায় না। এমনতো হতে পারে বড় আপা একটু পড়েই ফিরে আসবে। হয়তো রাস্তায় যানজট ছিলো, তাই তার আসতে দেরি হচ্ছে’।

কামরুলের কথা শুনে ছিদ্দিক সাহেব একটা ধমক দিয়ে ওকে বললেন, ‘বোকার মতো কথা বলো কেন। বুঝলাম রাস্তায় যানজট দেখা দিয়েছে। তাই আসতে দেরি হচ্ছে। কিন্তু তোমার বোনের ফোনটা বন্ধ থাকবে কেন’।

কামরুল বাবার কথা শুনে ভাবলো বাবাতো ঠিকই বলছেন। যানজটে পড়ে বড় আপা বাসায় ফিরতে দেরি হতে পারে। কিন্তু তার ফোন বন্ধ থাকবে কেন। আবার পরক্ষণই তার মনে হলো এমনো হতে পারে বড় আপার ফোনের চার্জ ফুরিয়ে গেছে। সেটটা হয়তো পুরোপুরিভাবে চার্জ করা ছিলো না। মনের কথাটা বাবাকে বলতে গিয়েও সে ভয়ে বলতে পারছিলো না। তারপরও কামরুল ভয়ে ভয়ে বললো, ‘বড় আপার ফোনটা বন্ধ আছে, মনে হয় সেটার চার্জ হয়তোবা ফুরিয়ে গেছে। তাই সেটটা বন্ধ হয়ে গেছে’।

কামরুলের কথা শুনে ছিদ্দিক সাহেব কি যেন ভাবলেন। তারপর বললেন ‘তোমার কথা যুক্তিগ্রাহ্য হতে পারে। কিন্তু এখনতো আমরা যুক্তি নিয়ে ঠেলা ধাক্কা করতে পারি না। চলো এবার থানায় গিয়ে একটা ডায়েরি করে আসি। তারপর না হয় দেখা যাবে কি করা যায়। তোমার বড় আপা যদি বাসায় ফিরে আসে, তখন না হয় আমরা থানায় গিয়ে বলে আসবো তোমাদের বড় আপা বাসায় ফিরে এসেছে। আমরা আমাদের সাধারন ডায়েরি তুলে নিচ্ছি। কথাটা ঠিক বলিনি’।

ছিদ্দিক সাহেব যখন উনার ছেলেকে নিয়ে শহরের সদর থানায় গেলেন তখন রাত ১২টা। পিতা পুত্র গিয়ে দেখলেন ওসি সাহেব টিভির রাতের খবর শুনছেন। ছিদ্দিক সাহেবের থানার ওসির সাথে কথা বলে মনে হলো, লোকটা খুব কাজের লোকই হবে। উনার কথা বার্তা মন দিয়েই তিনি শুনেছেন। মাঝে মধ্যে কয়েকটা প্রশ্নও করেছেন। ছিদ্দিক সাহেব সব প্রশ্নেরই গ্রহণযোগ্য উত্তর দিয়েছেন।

শুধু একটি প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘মেয়েতো আমার খুব সহজ সরল, স্পষ্টবাদী ও সত্য কথা বলে। কারো সাথে পালিয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস হয় না। যদি কারো সাথে পালিয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে এতক্ষণে খবর হয়ে যেতো’।

ছিদ্দিক সাহেবের সদর থানার ওসির সাথে কথা বলে এবং সাধারণ ডায়েরি করে বাসায় ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিলো। ওসি সাহেব আসার সময় বললেন, ‘চিন্তা করবেন না। আমরা আমাদের সাধ্যমতো সব জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে আপনার মেয়েকে খুঁজে বের করে দিবো। দেশের প্রত্যেকটা থানায় আমাদের ওয়ারলেস মেসেজ আপনার মেয়ের ছবি সহ পাঠিয়ে দিবো। যে ছবিটা দিয়েছেন সেটা নিশ্চয়ই সদ্য তোলা’।

ওসি সাহেবের কথার জবাবে ছিদ্দিক সাহেব বললেন, ‘এইতো দিন কয়েক আগের তোলা। কলেজের কাজের জন্য হয়তোবা তোলেছিলো’।

যে রাতে ছিদ্দিক সাহেব এবং তার ছেলে থানায় ডায়েরি করেছিলেন, সেই রাত ভোর না হতেই থানা থেকে ছিদ্দিক সাহেবের কাছে খবর এলো, তিনি যেন একবার থানায় যান। থানা থেকে আরো বলা হলো সঙ্গে যেন কাউকে নিয়ে আসেন। তিনি যেন একা না আসেন।

থানা থেকে খবর পাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গেই ছিদ্দিক সাহেব উনার একমাত্র ছেলে কামরুলকে নিয়ে থানায় গেলেন। দেখলেন ওসি সাহেব তখনো আসেননি। কম বয়সের এক ছেলে ওসি সাহেবের পাশের চেয়ারে বসে আছে। পুলিশেরই লোক হবে।

একজন কনস্টেবল বললো ‘আপনারা উনার সাথে কথা বলুন’। ছিদ্দিক সাহেব বুঝতে পারলেন চেয়ারে যে বসে আছে, হয়তোবা সে এসআই পদের লোক হবে। তিনি শুনেছেন আজকাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা ছেলে মেয়েরাও পুলিশের চাকরিতে যোগ দিচ্ছে। ছিদ্দিক সাহেব কনস্টেবলের দেখিয়ে দেওয়া চেয়ারে বসে থাকা ছেলেটার কাছে জানতে চাইলেন, তাদেরকে কেন থানায় তলব করা হয়েছে। ছিদ্দিক সাহেবের কথা শুনে ছেলেটি কিছু একটা ভাবলো। তারপর বললো, ‘ওসি সাহেব আসলেই সব শুনতে পাবেন’।

ছিদ্দিক সাহেব কিছুটা ইতস্তত করে বললেন, ‘আমার মেয়ের কি কোনো সংবাদ পেয়েছেন’। চেয়ারে বসে থাকা ছেলেটা যাকে তিনি লোকাল থানার এসআই মনে করছেন, সে বললো ‘আমি থানার এসআই। আমার সব কথা বলা ঠিক হবে না। সবই আইন কানুনের ব্যাপার। চাকরিতে আমি নতুন যোগ দিয়েছি। এখনো ভালো মন্দ সবকিছু বুঝি না’।

তাদের কথার মধ্যেই ওসি সাহেব এসে থানায় ঢুকলেন। পুলিশের লোকেরা উনাকে স্যালুট দিলো। ওসি সাহেব ছিদ্দিক সাহেবকে বললেন, ‘এসে গেছেন ভালোই হয়েছে। আমরা একটা মেয়ের লাশ শহরের জলপাই বাগানের জঙ্গল থেকে থানায় উদ্ধার করে এনেছি। আপনি দেখে শনাক্ত করবেন মেয়েটি আপনাদের মেয়ে কিনা’।

ওসি সাহেবের কথা শুনে ছিদ্দিক সাহেবের চোখের সামনে তামস অন্ধকার যেন দোল খেতে থাকলো। উনার মুখ থেকে কোনো কথা বের হচ্ছে না। কামরুল দেখলো বাবা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন না। সে তাড়াতাড়ি কাছে গিয়ে তার বাবাকে ধরলো।

ছিদ্দিক সাহেব মেয়ের লাশ শনাক্ত করে বাসায় ফিরে নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। উনাকে দেখলে মনে হবে, উনি যেন কোনো দিন কথা বলেননি। নন্দিতার মা মেয়ের মৃত্যুর সংবাদ শুনে উন্মাদের মতো প্রলাপ করতে শুরু করলেন। কেবল নাসরিন কিছুটা শক্ত থেকে মা বাবাকে দেখাশোনা করতে লাগলো।

কামরুল এখনো থানায় রয়ে গেছে। ওসি সাহেব বলেছেন ‘লাশ এখন মর্গে পাঠানো হবে। সেখানে ময়না তদন্তের পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার আগে একটা অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হবে’।

ওসি সাহেব আরো বলেছেন, ‘সুরতহাল রিপোর্ট দেখে মনে হচ্ছে নন্দিতা মৃত্যুর আগে গ্যাং রেপের শিকার হয়েছিলো। তার সমস্ত শরীরে জখমের চিহ্ন রয়েছে এবং সারা শরীরে কামড়ের চিহ্নও রয়ে গেছে। যারা তার সাথে খারাপ কাজ করেছে তারা হয়তো নন্দিতার চেনা ছিলো। তাই প্রমাণ না রাখার জন্য তাকে মেরে ফেলেছে’। ওসি সাহেব আরো কত কি বললেন।

কামরুল ভাবলো মানুষ এতো নিষ্টুর হতে পারে। তার কিশোর মনে কেবল একটি কথাই এখন ঘুরপাক খেতে থাকলো, আর কথাটি হলো বড় আপা নেই। বড় আপাকে খারাপ মানুষেরা খারাপ কাজ করে মেরে ফেলেছে।

ছিদ্দিক সাহেব তাদের পাড়ার একজন এডভোকেটকে দিয়ে একটি এজাহার লেখিয়ে থানায় গেলেন নন্দিতা হত্যার বিচার চেয়ে একটি মামলা দায়ের করতে। ওসি সাহেব ছিদ্দিক সাহেবকে বললেন ‘আসামি কতজনকে দিয়েছেন’।

ছিদ্দিক সাহেব ভেবে পান না কি বলবেন, থানার ওসির কথার উত্তরে। তিনি তো জানেন না তার মেয়েকে কারা নির্মমভাবে অত্যাচার করে হত্যা করেছে। তারপরও বললেন ‘আসামি কারো নাম দেইনি। আমিতো আর জানি না কে বা কারা আমার মেয়েকে হত্যা করেছে। তাই আসামিদের নাম অজ্ঞাতই রেখেছি। পুলিশই খুঁজে বের করবে আমার মেয়ের হত্যাকারী কারা’।

ওসি সাহেব এদিক ওদিক তাকিয়ে ছিদ্দিক সাহেবকে বলেন ঠিকই বলেছেন, ‘পুলিশই খুঁজে বের করবে আপনার মেয়ের হত্যাকারী কারা। তাই বলছিলাম আমরাতো একটা অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছি। আপনার আর মামলা করার দরকার কি’।

কথাটা বলেই ওসি সাহেব মাথা নিচু করে টেবিলের তলায় কিছু একটা খুঁজে বের করার ভান করে নিজে যেন ছিদ্দিক সাহেবের কাছ থেকে পালাতে চাইছেন। তিনি তো জানেন এতো বড় অপরাধ কারা করেছে। এটা কোনো সাধারণ মানুষের কাজ নয়। উনার সোর্স দিয়ে তিনি জেনেছেন কে বা কারা সিদ্দিক সাহেব এর মেয়েকে গ্যাং রেপ করে হত্যা করেছে। তাদেরকে শাগ্র স্পর্শ করা তার মতো মফস্বলের এক থানার ওসির পক্ষে সম্ভব নয়।

আলোচিত নন্দিতা হত্যার সঠিক তদন্ত করতে গেলে নিজেও বিপদে পড়তে পারেন। তিনি শুনেছেন এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে তার সহপাঠিরা এবং শহরের সচেতন নাগরিকরা আন্দোলনে নেমেছে। তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করেছে। কিন্তু আন্দোলনকারীরাতো জানে না কর্তার ইচ্ছা ছাড়া কখনো কর্ম হয় না। কর্তারা চাইলেই মানুষ ন্যায় বিচার পেতে পারে।

সিদ্দিক সাহেব থানার ওসির কথা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়লেন। ভাবলেন লোকটা বলে কি। উনি কিছুটা রাগের সুরেই বললেন ‘কি বলছেন আপনি। আমার মেয়েকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আর আপনি বলছেন আমার মামলা করার কোনো প্রয়োজন নেই’।

ওসি সাহেব কিছুটা বিচলিত হয়ে বললেন, ‘আমরা আমাদের মতো করে মামলা করবো এবং মামলার তদন্ত করবো। তাই আপনার এজাহার নিতে পারছি না’।

ছিদ্দিক সাহেব ওসি সাহেবের কথার উত্তরে কি বলবেন কিংবা কি করবেন কিছুই ভেবে পাচ্ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত হাউ মাউ করে কেঁদে ফেললেন। ছিদ্দিক সাহেবকে কাঁদতে দেখে থানার ওসির মনে হলো এই কান্না কেবল একজন কন্যা হারা ছিদ্দিক সাহেবের কান্না নয়। এই কান্না হচ্ছে কন্যা হত্যার বিচার না পাওয়া সকল পিতার বুক ফাটা কান্নার ধ্বনি।

শেষে ছিদ্দিক সাহেব বললেন ‘ওসি সাহেব নন্দিতা যদি আপনার আদরের কন্যা হতো তাহলে আপনি করতেন’। ছিদ্দিক সাহেবের কথার উত্তরে এবার ওসি সাহেব বললেন, ‘নন্দিতা যদি আমার কন্যা হতো আমিও আপনার মতো থানায় যেতাম মামলা দায়ের করতে। থানার ওসি আমার মামলা না নিলে আমিও ওসি সাহেবের সামনে আপনার মতো কান্না কাটি করতাম এবং ওসি সাহেবকে প্রশ্ন করতাম আমার মৃত মেয়েটি যদি আপনার আদরের মেয়ে হতো, তাহলে আপনি কি করতেন’।

শেষে ওসি সাহেব ছিদ্দিক সাহেবকে বললেন, ‘আমি আপনি আমরা সবাই একটা দুঃসময়ের হাতের পুতুল। আমাদের কিছুই করার ক্ষমতা নেই’।

কবি, গল্পকার, আইনজীবী

পূর্বপশ্চিমবিডি/অ-ভি

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল,নন্দিতা,রাগ,ফোন,থানা,ডায়েরি
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close