• শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১ আশ্বিন ১৪২৭
  • ||

অণুগল্পঃ স্বপ্ন পূরণ

প্রকাশ:  ১০ আগস্ট ২০২০, ১১:৫৭
মোঃ আশিকুর রহমান

অনেক দিন হলো বাড়ি যাওয়া হয়নি! মা, বাবা, ভাই, বোন, সবার কথায় খুব মনে পড়ছে। মাঝে মাঝে ছুটে যেতে মনে চাই সেই শৈশবের স্রৃতিময় গ্রামটিতে। কিন্তু আমাকে শান্ত রাখে আমার প্রাণপ্রিয় বন্ধু অক্সিজেন। অবাক হওয়ার কিছু নেই। রসায়নের সাথে তার খুব ভাব, তাই এমন নাম। যখনই মন খারাপ থাকে, তখনই ও আমাকে এসে বলে বিক্রিয়া বন্ধু বিক্রিয়া! সবই বিক্রিয়া! ঐ সব কষ্ট মনেই থাকতে দাও, বাইরে আসতে দিও না। বাইরে আসলেই শুধু ইলেক্ট্রনের লাফালাফি শুরু হয়ে যাবে!

আমার আরেক বন্ধু বর্ণ। ভাষার প্রতি তাঁর খুব টান। মাঝে মধ্যেই সে ঘুমের ভিতর মিছিল করে-জয় বাংলা, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই! গভীর রাতে হঠাৎ এমন মিছিল শুনে অক্সিজেন একটুও ভয় পায় না, শুধু মনে মনে আয়াতুল কুরসি পড়ে। আর আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে, ভাই মাফ চাই আমার বিক্রিয়া বন্ধ হওয়ার আগেই ওরে থামা! আমাদের কাছে পৃথিবী মানে আমরা তিন বন্ধু। নাওয়া, খাওয়া থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিতি দরজায় আমাদের একই সাথে পদার্পনে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। আমরা তিনজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। অক্সিজের রসায়ন বিভাগ, বর্ণ বাংলা বিভাগ, আর আমি ইংরেজি বিভাগ। বিভাগ আলাদা হলেও আমরা যেন একই সুতোই গাথা তিনটি ফুল!

সম্পর্কিত খবর

    প্রায়ই আমাদের মাঝে বাক বিতর্ক চলে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। অক্সিজেনের স্বপ্ন সে রসায়নের পি,এইচ,ডি করে অনেক বড় বিজ্ঞানী হবে। বর্ণ শুনেই অস্থির! কারন তাঁর স্বপ্ন ভাষার জন্য লড়াই করা। আমরা সবাই বাঙালি, বাংলাদেশের জন্যই আমাদের মহৎ কিছু করা দরকার। বর্ণের মতে বিজ্ঞানী হবে ইংরেজরা। ওদের দুই জনের বাংলা আর রসায়নের এই বিক্রিয়া যখন শুরু হয়ে যায়, তখন আমার ইংরেজি বিভাগের উপর এসে দায়িত্ব পরে তাদেরকে কুল ডাউন বলার! ওদের মতো আমারও একটা স্বপ্ন আছে, তা হলো ওদের দুই জনের মনের ইচ্ছাই যাতে পূরণ হয়! কারণ আমি মনে করি এ দেশে যেমন বিজ্ঞানী দরকার তেমনি মাতৃভাষার জন্য লড়াই করার মতো বীরপুরুষও প্রয়োজন।

    আমরা যেই হলে থাকতাম, সেখানে এক বড় ভাই থাকতেন। নাম তাঁর বিদ্যুৎ। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ি আমাদের রুমের নাম রাখা হয় ৫২’র সৈনিক। মাতৃভাষা বাংলাকে রক্ষার জন্য তিনি সর্বদায় বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত থাকতেন। তাঁর জীবনের একটাই স্বপ্ন বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা করে, এ দেশের বিশাল বড় নেতা হবেন। বিদ্যুৎ ভাই যেমন বলিষ্ঠ্য দেহের অধিকারী তেমনি তাঁর কন্ঠেও ছিল বিদ্যুৎ এর মতই শক্তি। তাঁর এক ভাষণে তিনি শত শত মানুষকে উৎসাহিত করতে পারতেন। আমাদের বর্ণ এসব বৈশিষ্ট্য থাকায় তাঁর খুবই ভক্ত ছিলেন। বলতে গেলে বর্ণই ছিল বিদ্যুৎ ভাইয়ের ডান হাত। বিভিন্ন মিছিল থেকে শুরু করে ব্যানার তৈরী, ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধকরন সবকিছু প্রায় বর্ণই করতো।

    আমরা প্রায়ই ভাষা নিয়া কথা বলতাম। ফেব্রুয়ারি মাস আসার পর আমাদের এই আড্ডা যেন শতগুন বেড়ে গিয়েছিল। ক্যাম্পাসসহ চারিদিকেই কেমন একটা আন্দোলনের আবহাওয়া বিরাজমান। সবাই যেন মাতৃভাষার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে আমাদের মতো রক্ত গরম ছাত্ররা। আমাদের গরম আলোচনার মাঝে হঠাৎ করেই ডাক পিয়ন প্রবেশ করলেন! বর্ণের চিঠি এসেছে গ্রাম থেকে। গাজীপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকতেন ওর মা ও বোন। বাবা মারা গেছেন অনেক আগে। চিন্তিত বর্ন আমাদের সামনেই চিঠিটা পড়তে শুরু করলোঃ বাবা অনেক দিন হয়ে গিয়েছে তুমাকে দেখি না। আশা করি আল্লাহর রহমতে ভালোই আছো। আমরাও ভালো আছি। শুনেছি ঢাকায় নাকি গন্ডগোল চলছে, বাবা তুমি কোনো ঝামেলাতে যেও না! ঠিকমতো পড়াশুনা করবে, তুমাকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন। সামনের মাসে টুনির বিয়ে ঠিক করেছি। ছেলে সরকারী অফিসের কেরানী, ভালো মাইনে পাই। তুমি এ মাসের শেষ সপ্তাহেই টুনির জন্য বেনারশি শাড়ী নিয়ে বাড়ি চলে এসো বাবা! আজ আর লিখলাম না, তুমার আসায় অপেক্ষায় রইলাম।

    এরপর কিছুদিন কেটে গেল। বর্ণ ওর বোনের জন্য একটি লাল টুকটুকে বেনারশী কিনেছে। আমি আর অক্সিজেন পড়াশোনায় ব্যাস্ত। আমাদের পরিকল্পনা ছিল ২২ অথবা ২৩ ফেব্রুয়ারিতে সব কাজ শেষ করে টুনির বিয়ে খেতে যাব। টুনিতো আমাদেরও ছোট বোনের মতই। আমি আর অক্সিজের গোপনে সুন্দর একটা গিফটও কিনে রেখেছি বর্ণকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য! ২০ এ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, সন্ধ্যা ৭ টার দিকে , আমি আর অক্সিজেন ৫২’র সৈনিকেই বসেছিলাম। হঠাৎ করে বর্ণ হাপাতে হাপাতে রোমে ঢুকল। আমরা একটু বিচলিত ওকে দেখে। কারণ জিজ্ঞেস করাতে ও বললো বিদ্যুৎ ভাই পাঠিয়েছে “ রুখে দাঁড়াও” ক্লাব ঘরে বিশেষ মিটিং ডাকা হয়েছে, তাড়াতাড়ি চল! আমরা কথা না বাড়িয়ে ওর সাথে তখনই বেড়িয়ে পরলাম। আগেই বুঝেছিলাম আজকের মিটিং একটু অন্যরকম হবে। ক্লাবে পৌছেই দেখি অনেক ছাত্রের ভীড়! বিদ্যুৎ ভাইয়ের ভাষণ শুনতে সবাই বসে আছে। মিনিট দশেক পর ভাই কথা বলা শুরু করলেন। তিনি বললেন,” আমাদের আর বসে থাকলে চলবে না! মাতৃভাষাকে বাঁচাতে হবে। প্রিয় বাংলাকে বাঁচাতে এখন রাজপথে সংগ্রাম সময়ের দাবি। সবাই সংগ্রামে নেমে পড়ুন! বুঝিয়ে দিন বাঙ্গালিরাও পারে!

    পরদিন সকালে বিদ্যুৎ ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা অনেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে মিছিলে বের হলাম। অক্সিজেন, বর্ণ ও আমি একসাথেই ছিলাম। বর্ণ শ্লোগানে হাক দিচ্ছে আমরা সবাই গর্জন দিচ্ছি! সময় বাড়ার সাথে সাথে ছাত্রদের সংখ্যা বেড়ে গেলো। বর্ণ সবার সামনে গিয়ে মিছিলে হাক দিচ্ছিলঃ জয় বাংলা, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই! ইতোমধ্যেই পুলিশ এসে আমাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিছুক্ষণ পর গ্যাস ছাড়তে শুরু করে। চারিদিকে অন্ধকার দেখে আমি অক্সিজেনকে বললাম এগুলো কি হচ্ছে? আমি ওকে দেখতে পেলাম না, শুধু আওয়াজ শুনলাম বিক্রিয়া সবই বিক্রিয়া! বিক্রিয়ার সাথে সাথে আমাদের মিছিল চলছে তো চলছেই………। অবস্থা খারাপ দেখে পুলিশ গুলি ছুড়তে শুরু করে। আমরা তখনও ঐসব মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করলে যে সরাসরি গুলি ছুড়বে আমাদের অনেকের তা জানায় ছিল না। তাই আমাদের ইট, পাটকেল ছুরা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকজন ছাত্র শহীদ হয়ে গেলেন! আমি আর অক্সিজেন বিদ্যুৎ ভাইয়ের ঈশারায় পিছন গেট দিয়ে বাইরে বের হতে যাচ্ছিলাম। বর্ণ তখনও ভাষার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। আমরা যখন গেটের কাছাকাছি পোছালাম তখন বিকট একটা শব্দ শুনতে পেলাম! হঠাৎ তাকাতেই দেখি বর্ণ মাটিতে পড়ে আছে! দৌরে ওর কাছে যেতেই দেখি গুলিটা ওর বক্ষ ভেদ করে চলে গিয়েছে! ও শুধু আমাদেরকে দুইটি কথা বললো- টুনির বিয়েতে লাল বেনাড়শিটা দিস! আর মাকে বলিস আমি এক মা কে বাঁচাতে, আরেক মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পারলাম না! যেই গিফট দেখিয়ে আমরা ওকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম, তাঁর থেকে অনেক গুণ বেশী সারপ্রাইজ দিয়ে আমাদের বর্ণ বাংলা বর্ণকে বাঁচাতে চলে গেল না ফেরার দেশে!

    আজ ২২ এ ফেব্রুয়ারি। যেই বাড়িটিতে আমাদের নাচ, গান আর বাদ্য নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেই বাড়িতে আজ আমরা লাশ নিয়ে এসেছি! বর্ণের মাকে শান্তনা দেওয়ার ভাষা আমাদের জানা নেই। হাউ মাউ করে তিনি কাঁদছিলেন! কাঁদবে না কেন? একমাত্র ছেলেকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল তাঁর।

    লাল বেনারশী দেখে টুনির কান্না আরও বেড়ে গেলো! বার বার লাশটাকেই জিজ্ঞেস করতে লাগলো ভাইয়া তুমার কি হয়েছে? মায়ের স্বপ্ন পূরন করবে না? ওঠো ভাইয়া! মায়ের স্বপ্ন পূরন করবে না? ওঠো ভাইয়া ওঠো! আমার আর অক্সিজেনের শুধু একটা কথায় মনে হলো, বর্ণ বেঁচে থাকলে এখনই বলে উঠত” জয় বাংলা”।


    পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএম

    অণুগল্প
    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
    cdbl
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close