• মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২০, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

জীবন থেকে পালানো

প্রকাশ:  ০৮ মে ২০২০, ০৩:২০ | আপডেট : ০৮ মে ২০২০, ০৫:০৮
দিলারা জামান দীয়া

দূরপাল্লার বাসে যেতে কিছু আয়োজন লাগে। শীতের কাপড় চোপড় গুলো গুছিয়ে নিয়েছি তবে অন্যমনস্ক হয়ে নিয়েছিলাম, কি নিয়েছি আর কি নেইনি বুঝতে পারছিনা। কন্ডাকটর এর মুখে অনবরত স্টপেজের নাম শুনে উঠে পড়লাম বাসে। গন্তব্য শ্রীমঙ্গল। মাত্র জনা দশেক প্যাসেঞ্জার বাসে। উত্তরা থেকে। পিছনের সিটের থেকে সামনের দিকটাই ভালো, ঝাকুনিটা কম, তাই সামনের সিটেই বসে পড়লাম।শীতের শেষদিকে লোকজনও বেড়ে গেল ঘুরাঘুরি করতে। এই যা..! তাড়াতাড়িতে রাতের খাবারের জন্য কিছুই নেয়া হয়নি। অগত্যা দাম দিয়ে বাইরের খাবার গুলিই কিনতে হল।

তোতাপাখির বুলির মত স্টপেজের নাম গুলো কন্ডাক্টর আওড়াতে থাকলো। বাস ছুটে চলল। রাতও গভীর হতে থাকলো আমার দুচোখের পাতা কোনভাবেই এক হচ্ছিল না। সেবার যাওয়ার সময় আমার গায়ে ঠাণ্ডা লাগছিলো বলে গায়ে চাদরটা জড়িয়ে দিয়েছিল। আর ভাষাহীন ভালোবাসায় আমাকে জড়িয়ে বুকের কাছে চেপে রেখেছিলো। আমি ঘুমিয়ে ছিলাম কতক্ষণ তাও মনে নেই।

মাঝ স্টপেজ থেকে অনেকগুলো প্লাস্টিকের প্যাকেট নিয়ে বাসে উঠেছে মা- মেয়ে। মনে হয় বাহিরের কোন দেশ থেকে বাংলাদেশ ঘুরতে এসেছে। তবে বাংলাদেশি। দেখেই বুঝা যাচ্ছে। উঠেই পাগলের মত বসার জায়গা খুঁজছে। ভারি আশ্চর্য, আমাদের দেশের লোকেরা ভাবে যে বাসে যেমন করেই হোক বসার জায়গা পেতেই হবে তা জায়গা থাক বা না থাক। অন্যদের পা মাড়িয়ে বা ধাক্কা মেরে। কিন্ত ওরা তা মোটেও করলো না। এদিক ওদিক তাকিয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলো। সামনের স্টপেজে একসাথে দুটো সিট খালি হলে ওরা গিয়ে বসলো।

এক বছর আগেও এই রাস্তা দিয়ে গিয়েছি এখনো যাচ্ছি। লাক্সারিয়াস বাসের টিকিট নিয়েছিলো নিলয়, আমি বলেছিলাম কেন এত দাম দিয়ে টিকিট নিতে গেলে? উত্তরে বলেছিলো তোমাকে নিয়ে তো সবসময় কোথাও যাওয়া হয়না আবার কখন আসি বা না আসি!! মনে পড়ছিলো এই কথা গুলো তখন গিয়েছিলাম একটা বন্ধুর বিয়েতে ওর বন্ধুরা আমাকে যখন ওটা এটা জিজ্ঞাস করছিলো তখন ও আমাকে কেমন জানি বাঁকা চোখে দেখছিলো। আমাকে ডেকে বলল চলো আমরা কোথাও রিক্সা করে ঘুরে আসি। ওখান থেকে বেরিয়ে আমরা সারা শহর রিক্সা দিয়ে ঘুরে বেডালাম। নিলয়কে আমি এক হাত দিয়ে ওর এক হাতে ধরে চেপে বসতাম রিক্সায় উঠলে। পুরো দিনটা খুব মজা করে ঘুরলাম। পরে ওই প্রোগ্রামে আর গেলাম না ওখানে বোডিং এ গিয়ে উঠলাম। এসব কথা মনে হচ্ছিল আর অজান্তেই চোখের কোন ভিজে উঠছিলো। চশমাটা সরিয়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের কোন মুছছিলাম। এক ফাঁকে কন্ডাক্টরকে জিজ্ঞেস করলাম ভাই শ্রীমঙ্গল পোঁছাতে আর কতক্ষণ লাগবে,, এর মাঝে সামনে তাকাতেই দেখি নীরা আমাকে বলছে এই তুই রীয়া না!!! বললাম

আরে নীরা.... না? না মানে আ..তুই রীয়া না! বাপরে কত বছর পর দেখা বল তো। তোর শরীরের একি হাল হয়েছে? নীলয় দা মানে তোর বর কেমন আছেন? হুড় মুড় করে বাসে উঠেই নীরা আমার ইন্টার্ভিউ নেওয়া শুরু করল।

দাঁড়া, দাঁড়া। একসাথে অনেক গুলো প্রশ্ন করার অভ্যেস টা তোর গেলনা

আগে বল তোর শরীরের এই অবস্থা কেন আমাদের ক্যাম্পাসের আইডল ছিলি রিয়া,। তোকে এমন অবস্থা দেখে আমি মানতে পারছিনা।নীরা আইডল বলে কিছু নাইরে। তোরা আমাকে সবাই ভালোবাসতি তাই এমন করে বলছিস। ছাড় ওসব। কোথায় যাচ্ছিস রীয়া ওত রাতের জার্নি। একা কেন যাচ্ছিস?ওই আর কি এখন একা চলার অভ্যেস হয়ে গিয়েছে। আচ্ছা, এতদিন পরে দেখা। বাসে বসে আড্ডা দিতে দিতে সেলিব্রেট করি। আমি চা করে এনেছি গরম গরম পরটা খাব আর চা খাব।

একদমে কথা গুলো বলে থামল নীরা,।এখন বল তোর কথা.... চা খেতে খেতে রীয়া ভাবতে লাগলো নীরা কে বলে আর কি হবে!! কষ্ট বললে আরো বাড়ে... যে "নীলয় " আমাকে চোখের সামনে না দেখলে পাগলের মত আচরণ করতো অফিস ছুটির পর ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতো কখন আমি আসবো আর একটু এক জায়গায় বসে আড্ডা দিবো। কখনো কখনো পুরো শহরটাই রিকশা করে ঘুরে বেড়াতো। ফুসকার দোকান, লেকের পারের পিঠা... আর এখন... ! ওর অনেক ব্যস্ততা সময় ই হয়না আমাকে সময় দেয়ার।

সময় কত বদলেছে,,, জীবনটাই এমন, সময় হারিয়ে যায় সময়ের কাছে । নীরবে কত যে চোখের পানি ঝরে কার এত সময় আছে ঝরা জলের কাহিনী লিখবে...। কি হল রীয়া বসে বসে অতো কি ভাবছিস?

আচমকা নীরার ডাকে চমক ভাঙলো।

এই যে, দেখ চোখের কোন টায় সবসময় ভিজে থাকে কি যে হয়েছে!!! বলে অন্যদিকে ফিরে শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছে নিল।আমাকে এমন ভেঙ্গে পড়া মানায় না,আমার আর কত পথ একা চলতে হবে!! হয়তো বা বাকী জীবন একা একাই চলতে হবে। আমার তো ভালোবাসা ছিল মন ছিলো যে মন সারাক্ষণ একটু মন সারাক্ষণ একটু ভালোবাসা পেতে অপেক্ষায় সময় কেটে যেত।এখনো অপেক্ষা আছে কিন্ত সেই ভালোবাসা নেই।

আচ্ছা রীয়া বলতো তখন থেকে দেখছি এতো কি ভাবছিস বলতো! নীরার কথায় সম্বিত ফিরে এলো.। বললাম, আচ্ছা রীয়া বলতো "কষ্টের রং সবখানেই কি একইধরনের হয় "ছোট বেলা তো ছোট কোন বিষয় নিয়ে শুধু কান্না করলেই এর কিছু একটা সমাধান হয়ে যেত এখন কেন কষ্ট গুলো বুকের মাঝে সেটে থাকে যেতেই চায়না"।

কিছুক্ষণ দু ’জনেই চুপ। এর মাঝে নীরা বলল, রীয়া, আমরা সবাই আসলে সুবিধাবাদী। এই যে তুই এত কথা বললি, আমার মাথায় কিন্তু কিছুই ঢোকেনি। তোর কথায় তাল মিলিয়ে নিজের কথাই ভেবেছি। আজ এমন করে তোর সাথে দেখা না হলে কবে তোর সাথে দেখা হত কে জানে। আমার কিন্তু সেই কলেজ জীবনে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। রীয়া আজকাল রাজনীতি নিয়ে যেরকম নোংরামি হচ্ছে তখন অন্তত সেসব হতোনা।

আচমকা নীরাকে প্রশ্ন করে বসলাম,আচ্ছা তোর মাঝে মাঝে সবকিছু ছেড়ে একদম একা হয়ে যেতে ইচ্ছে করে? মনে কর তোর সাথে মতের অমিল কিংবা তোকে কেউ খুব অবহেলা করলে মরে যেতে ইচ্ছে করে? আমার করে। আমার মনে হয় এমন স্বার্থপর মানুষদের কাছ থেকে পালিয়ে মরতে পারলেই বাঁচি।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে রীয়া বলল সব কেমন যেন উল্টো পালটা হয়ে গেল, তাইনা নীরা।বলতে বলতে নীরার নামার সময় হয়ে এলো। নীরা উঠে দাঁড়াতেই আমি ওর হাত চেপে ধরলাম বললাম নীরা...... !!! আমার চোখের কোনের পানি টলটল করছিলো দেখে ও নীরা বাস থেকে দ্রুত নেমে পড়লো।

কতকটা বিহবলের মতো ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম।

আমিও তো কয়েক দিন থাকার জন্য শ্রীমঙ্গল যাচ্ছিলাম। কিন্ত জায়গা বদল হলেই কি কষ্ট কমে.!

আস্তে আস্তে"" জীবন"এর কষ্ট গুলো লুকোত।

(ফেসবুক থেকে নেওয়া)

দিলারা জামান দীয়া,ফেসবুক স্ট্যাটাস
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close