• শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২০, ২০ চৈত্র ১৪২৬
  • ||

কবিতা থেকে গান: আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১শে ফেব্রুয়ারি

প্রকাশ:  ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২৩:৫৮
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক

'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি।' এই কবিতাটি রচনা করেছিলেন ঢাকা কলেজের ছাত্র আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী।৷ দেশে তখন ভাষা আন্দোলন চলছে, রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রাস্তায় তখন আপামর জনতা৷ ২১শে ফেব্রুয়ারি গুলি চলে সেই আন্দোলনে৷ প্রাণ হারান রফিক, জব্বার, সালাম, বরকতরা৷ সেইদিনের সাক্ষী গাফফার চৌধুরী৷ তিনি বলেন, সেসময় বাংলাদেশ আন্দোলনমুখর ছিল৷ কেননা, ভাষা আন্দোলন তো ৫২ সালেই শুরু হয়নি, ১৯৪৮ সালে শুরু হয়, যখন মি. জিন্নাহ ঊর্দূকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন৷ তারপর এই আন্দোলন গড়াতে গড়াতে ৫২ সালে এসে রক্তাক্ত এক অধ্যায়ের সূচনা হয়৷

গাফফার চৌধুরী শহীদ রফিকের মরদেহ দেখেছিলেন৷ পুলিশের গুলিতে রফিকের মাথার খুলি উড়ে গিয়েছিল৷ ৫২'র ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ তিনি৷ কি দেখেছিলেন সেদিন? সেসময় ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী গাফফার চৌধুরী বললেন, ‘আমি আরো দু'জন বন্ধু নিয়ে গিয়েছিলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজের আউটডোর কক্ষে৷ সেখানে বারান্দায় শহীদ রফিকের লাশ ছিল৷ মাথার খুলিটা উড়ে গেছে৷ অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম তখন ছাত্র৷ তিনি তাঁর ক্যামেরায় রফিকের ছবি তোলেন৷'

সম্পর্কিত খবর

    রফিকের মরদেহ দেখে গাফফার চৌধুরীর মনে হয়েছিল, যেন তাঁর নিজের ভাইয়ের লাশ পড়ে আছে৷ তখনই তাঁর মনে গুনগুনিয়ে ওঠে একটি কবিতা, ‘‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি''৷ তিনি বলেন, এই কবিতায় প্রথমে আব্দুল লতিফ সুর দেন৷ তারপরে আলতাফ মাহমুদ সুর দেন৷ আলতাফের সুরেই এটা প্রভাত ফেরির গান রূপে গৃহীত হয়৷

    ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষার দাবিতে ছাত্রমিছিলে গুলি চালানোর প্রেক্ষাপটেই রচিত হয়েছিল কবিতাটি। ১৯৫৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকা কলেজের ছাত্ররা একটি লিফলেট প্রকাশ করে। সেখানে কবিতাটি ছাপা হয়। এরপর হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ও মোহাম্মদ সুলতান কর্তৃক প্রকাশিত একুশে ফেব্রুয়ারি সংকলনে 'একুশের গান' হিসেবে ছাপা হয় ১৯৫৩ সালের মার্চ মাসে। শহীদের রক্তে যে প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছিল সেদিন, সেই ঋণ পরিশোধের অঙ্গীকার নিয়ে আমরা চলেছি আজও, আন্দোলনের ৬০ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও। তবে এই উচ্চারিত শোকগাথা আর সুর সৃষ্টি আজ গোটা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, কারণ আমাদের বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি যে বিশ্ব সংস্থার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। মাতৃভাষা দিবসে আমাদের দূতাবাসগুলোতে অনুরণিত হচ্ছে গানটি।

    এই কবিতাটির যে সুরের সংগীত মাধুর্য বিশ্বকে আজ চমৎকৃত করছে, তার স্রষ্টা শিল্পী সংগ্রামী আলতাফ মাহমুদ। কী অনন্য-সাধারণ প্রতিভায় প্রদীপ্ত স্বাক্ষরেই না সৃষ্টি হয়েছে এই কালজয়ী সুর।

    তবে এই অপূর্ব কবিতাখানি লিখিত হওয়ার পর সেদিনের আরেক তরুণ সচেতন ছাত্র রফিকুল ইসলাম একে তুলে দিয়েছিলেন দেশের বরেণ্য এক কণ্ঠশিল্পী আবদুল লতিফের হাতে। প্রলুব্ধ অথচ শোকার্ত শিল্পীর আবেগ-মথিত সুর একদিন ঢাকা কলেজের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে ব্যথা আর বেদনার পাশাপাশি নবীন সমাবেশে ভাষার দাবিতে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল।

    ইতিমধ্যে বরিশালের সচেতন যুবকর্মী, শিল্পী-সংগঠক আলতাফ মাহমুদ এই কবিতাটি পড়ে প্রলুব্ধ হন এবং তিনিও সুরারোপ করেন। লতিফ ভাইকে সুরটি শোনাতে চাইলে তিনি শুনেছিলেন তো বটেই, সেই সঙ্গে এক শৈল্পিক মহানুভবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। আবদুল লতিফ উদারচিত্তে আলতাফ মাহমুদকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন সেদিন এবং অনুমতি দিয়ে বলেছিলেন, 'আজ থেকে তোমার সুরেই এই গানটি গাইবে সবাই। আমার দেওয়া সুর স্থগিত রইল।' এ যে কত বড় মহত্ত্বের দৃষ্টান্ত, তা বলে শেষ করা যাবে না। এর কোনো উদাহরণ আর মিলবে না। সেই থেকে আবদুল লতিফের সুরটি স্থগিত হলেও তার শিল্পীসুলভ ঔদার্য ঘটনাটিকে মহিমান্বিত করেছে। আলতাফ মাহমুদের দেওয়া সুরটিই আজ বাজে প্রতিটি পাড়ায়, মহল্লায়, গ্রামেগঞ্জে, নগরে-বন্দরে, ঘরে ঘরে।

    একুশের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রাণ বলিদানের মধ্য দিয়ে আমরা বাঙালি হিসেবে যে অধিকার অর্জন করেছিলাম, তারই প্রতীক হয়ে আবির্ভূত হলো 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো' গানটি। আমরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যখন একুশের অনুষ্ঠানে এই গানটি পরিবেশন করেছি, তখন দেখেছি আলতাফ মাহমুদকে প্রচণ্ড হৃদয়ানুভূতি দিয়ে তার সুরকে বাঙ্ময় করে তুলছেন সমবেত মানুষের মধ্যে। ছড়িয়ে দিচ্ছেন শোককে শক্তিতে পরিণত করে। একুশের চেতনা আমাদের জাতিসত্তাকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। আমরা শক্তি সঞ্চয় করেছি একুশ থেকে, এই ভাষার আন্দোলন আমাদের যে গতি দিয়েছিল, যে পথনির্দেশ করেছিল, তাকেই লক্ষ্য করে আমরা সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলাম। আমরা ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সংঘবদ্ধ হয়েছিলাম। এই লড়াইয়ের ময়দানে আমাদের কানে যেন বেজেছে এই শহীদের গান। প্রভাতফেরির জন্য বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা থেকে যে দলগুলো বের হতো, তাদের কণ্ঠে উঠে আসত 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো' গানটি। এখনো একই ধারায় একই সুর-মূর্ছনায় বাঙালি জাতি কেবল নয়, আমাদের দেশের অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষও জেগে ওঠে, আপন সত্তাকে বিকশিত করার জন্য তারাও প্রাণময় সংঘবদ্ধতায় অভিসিক্ত হয়। এই একুশের গান, এই একুশে আমাদের শিখিয়েছে, মানুষের শক্তি কী অপ্রতিরোধ্য।

    র্পূ্বপশ্চিম /এনই

    আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close