Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • সোমবার, ২৬ আগস্ট ২০১৯, ১১ ভাদ্র ১৪২৬
  • ||

গোলাভরা ধান, তবু কৃষকের বুকে কষ্টের আগুন

প্রকাশ:  ১৬ মে ২০১৯, ১৭:৫১ | আপডেট : ১৬ মে ২০১৯, ১৮:৫৬
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট icon

গত কয়েক বছরের মধ্যে এবারের মৌসুমে ধানের সবচেয়ে ভালো ফলন হয়েছে। ফলন ভালো হলেও হাসি ফুটেনি কৃষকের মুখে। কারণ ধানের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না কৃষক। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহেও বাজারে নতুন ধান স্থানভেদে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা মণে বিক্রি হয়েছে। আর এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন চিকন ধান মাত্র ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা মণে বিক্রি হচ্ছে। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে ধানের দর কমেছে ২৩ থেকে ২৫ শতাংশেরও বেশি। বেশিরভাগ হাট থেকে কৃষকরা ধান নিয়ে ফেরত যাচ্ছেন। কারণ প্রত্যাশিত দামে বিক্রি হচ্ছে না ধান। এই চিত্র সারাদেশের।

ধানের বাজারের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মুলত কৃত্রিম। ফড়িয়া আর চালকল মালিকরাই মুনাফা লুফতে এ পরিস্থতি তৈরি করেছে।সারা দেশের ধান-চালের বাজারে ফড়িয়ারা গুজব ছড়াচ্ছে, সরকার বিদেশ থেকে বেশি চাল আমদানি করায় গুদামে জায়গা নেই। তাই এবার বেশি ধান-চাল কিনতে পারবে না।চালকলের মালিকেরা ধান ওঠার সময় ধান না কেনার ভান করে দামটা কমিয়ে রেখে সস্তা দরে ধান কেনার কৌশল গ্রহণ করেন। এবার তাঁরা একজোট হয়ে একেবারেই ধান কিনছেন না বলা চলে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতি কেজি মোটা চাল পাইকারিতে ৩১ থেকে ৩৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর চলতি বছর প্রতি কেজি চালের উৎপাদন খরচই পড়েছে ৩৬ টাকা। এক মাস আগেও চালের দর ছিল ৩৮ থেকে ৪০ টাকা। কৃষককে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান পরিচালনা করে। কিন্তু গুদামের ধারণক্ষমতা কম থাকাসহ নানা জটিলতায় সরকার ২০-২৫ লাখ টনের বেশি চাল সংগ্রহ করতে পারে না। সাড়ে তিন কোটি টন চালের মধ্যে মাত্র ২০-২৫ লাখ টন ধান-চাল কিনে কৃষককে উৎসাহজনক মূল্য যে দেয়া যাবে না, এটা সংশ্লিষ্ট সবাই জানেন।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধান-চালে দাম নির্ধারণে মধ্যস্বত্বভোগীদের একচ্ছত্র আধিপত্যের ফলে দেশে ধান উৎপাদনে নিয়োজিত কৃষকরা যেমন ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন, তেমনি বেশি দামে চাল কিনে সাধারণ ভোক্তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হন। গবেষণায় বলা হয়, প্রতিবেশী দেশ ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের মধ্যস্বত্বভোগীরা মুনাফা করছেন অতিমাত্রায়। তার পরও ভারতের কৃষকরা মাঝে মধ্যেই আন্দোলন করে থাকেন, রাজধানী ঘেরাও পর্যন্ত করেন। তাদের মধ্যে আত্মহত্যার হারও বেশি। কৃষকরা দীর্ঘ সময় বিনিয়োগ করে প্রতি কেজি ধানে ১ থেকে ২ টাকার বেশি মুনাফা করতে পারেন না দাম নির্ধারণে অক্ষমতার কারণে। অনেক সময় তারা বড় ধরনের লোকসানের সম্মুখীন হন।

অন্যদিকে ধান থেকে চাল তৈরি প্রক্রিয়ায় জড়িত ব্যবসায়ী ও মিলাররা সেই ধান কেনেন কৃষকের বিক্রির দামের চেয়ে দেড় গুণ বেশি দিয়ে। এতে মিলারদের ধান সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় ধানের দামের ৫০ শতাংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রমই ত্রুটিতে পরিপূর্ণ। এ কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সংগ্রহের লক্ষ্য ব্যর্থ হয়েছে।

কৃষকরা বলছেন, গোলাভরা ধান এবার ফলেছে সত্যি, কিন্তু তাদের পকেট খালি। প্রতি মণ ধান উৎপাদন খরচের চেয়ে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা কমে বিক্রি করতে হচ্ছে কৃষকদের।প্র তি মণ ধান উৎপাদনে ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু ধান বিক্রি হয়েছে ৫০০ থেকে ৫২০ টাকায়। সরকার ভারত থেকে চাল আমদানি অব্যাহত রাখায় কৃষক ধানের দাম পাচ্ছেন না বলে মনে করছেন এই ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থা চলতে থাকলে ধান উৎপাদনে কৃষকরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন বলে মনে করছেন অনেকেই।

এদিকে সরকারিভাবে চাল কেনার ঘোষণা থাকলেও এখনো কেনার তোড়জোড় কোথাও শুরু হয়নি। এ প্রসঙ্গে সংবাদমাধ্যমকে কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, ফলন ভালো হলে দাম পড়ে যায়। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। এটা আমরা জানি। চাল রপ্তানি করে দাম বাড়ানো যায়। তবে এ নিয়ে মতবিরোধ আছে। কারণ, হঠাৎ সংকট দেখা দিলে ভয়ংকর বিপদ হবে। আমরা চিন্তা করছি কৃষকদের জন্য কিছু একটা করার। সারা দেশে বোরো ধান কাটা হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি কৃষকদের ন্যায্যমূল্য দিতে। ধানের দাম নিয়ে সরকারের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারের নীতিমালার সঠিক প্রয়োগের অভাবেই ধানের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেনে কৃষকরা। সরকারের প্রত্যক্ষ নজরদারি না থাকায় কথিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনছে ন। ফলে সংগ্রহ মূল্য বাড়ালেও উৎপাদক কৃষকরা বারবার বঞ্চিত হচ্ছেন সরকারি দাম থেকে। সরকার এবার বোরো মৌসুমে ধান কিনবে মাত্র দেড় লাখ টন। আর কৃষক ধানই বিক্রি করেন। ফলে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার সরকারি উদ্দেশ্য প্রথমেই ধাক্কা খায়। ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হলে বাজার ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।

তাদের মতে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশের বিদ্যমান বাস্তবতার সমন্বয়ে এটি সাজাতে হবে। কৃষকের অবস্থা দিন দিন রুগ্ণ হবে আর হাজার হাজার চালকল বড় মুনাফা করবে, সেটি কাম্য নয়। এটি রোধে গুরুত্বপূর্ণ পথ হতে পারে বাজার অদক্ষতা দুর করে সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানকে কার্যকর করে তোলা। পাশাপাশি আমাদের কৃষি ও কৃষককে বাঁচাতে হলে প্রক্রিয়াজাত ও বাণিজ্যিকীকরণ অপরিহার্য। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প দেশে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও রফতানির ভিত্তিতে নতুন নতুন সুযোগ ও সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে। যথাযথ বিনিয়োগের মাধ্যমে এসব থেকে পূর্ণ সুবিধা গ্রহণ এ খাতের উন্নয়ন ঘটাতে পারে। কৃষির যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমাতে হবে। কৃষকের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য তাদের সংগঠিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষকদের ঠকাতে পারবে না সহজে।

পিপিবিডি-এনই

ধানের দাম,কৃষকের হতাশা,ধানের ফলন
apps
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত