Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • রোববার, ২৬ মে ২০১৯, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬
  • ||

মেয়েদের কথা

প্রকাশ:  ১৬ মে ২০১৯, ০০:১৮ | আপডেট : ১৬ মে ২০১৯, ০০:৩৫
তসলিমা নাসরিন
প্রিন্ট icon

মেয়ে বলে, শুধু মেয়ে বলেই তুমি যখন গুরুত্বপূর্ণ কোনও কথা বলবে, কেউ তোমার চোখের দিকে বা মুখের দিকে তাকিয়ে মন দিয়ে শুনবে না তোমার কথা। বিশেষ করে পুরুষেরা। আমি আজ থেকে নয়, এই আচরণটি লক্ষ্য করছি আমার বয়স যখন পাঁচ কিংবা ছয়। পাঁচ বা ছয় যখন- আমার কোনও কথাকে গুরুত্ব দেওয়া হতো না। কারণ আমি শিশু। আমার শিশুতোষ কথা মন দিয়ে শোনার উপযুক্ত বলে কেউ মনে করেনি। আমি যদি বুদ্ধির কথা বলতাম, আমাকে কেউ ‘পাকনা বুড়ি’ বলতো, কেউ হেসে উঠতো, কেউ গাল টিপে দিত। কেউ আমার কোনও কথাকেই কানাকড়ি মূল্য দিতো না। কোনও প্রশ্ন করলেও প্রশ্নের কোনও উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনও কেউ মনে করতো না। ধরা যাক আমি জিজ্ঞেস করলাম, সাইবেরিয়া থেকে পাখিরা কী করে পথ চিনে আমাদের ঝিলের-বিলের কাছে উড়ে চলে আসে প্রতিবছর শীতকালে? আমার এই প্রশ্নটি শুনে অট্টহাসি হেসেছিল কেউ। কেউ বলেছে, দেখ দেখ কীরকম প্রশ্ন করছে? কেউ কিন্তু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেনি।

আজও তাই হচ্ছে। একইরকম অবজ্ঞার আর অবহেলার শিকার আজও আমি। আমি পাঁচ নই। পঞ্চাশ পার হয়েছি। আজও। আমি আমার তরুণ-বয়স থেকেই আগাগোড়া স্বনির্ভর মানুষ। দেশে বিদেশে সবখানেই, যেখানেই যাই, ঘুরি, বাস করি- স্বনির্ভর। আত্মবিশ্বাস আমার সঙ্গী, স্বকীয়তা আমার সংসার। ভুল হোক, নির্ভুল হোক- জীবনের সব সিদ্ধান্ত নিজেই নিয়েছি। কিন্তু যে দুর্ভোগটা আমাকে তরুণ-বয়সে পোহাতে হয়েছে- যে অবিশ্বাস যে সংশয়, যে দ্বিধা বা সংকোচ মানুষের মধ্যে দেখেছি আমাকে একজন স্বাভাবিক সুস্থ মানুষ হিসেবে গ্রহণ করার বেলায়- তা এখনও একই রকম। তখনও লোকে মুখে না বললেও মনে মনে বলেছে, ‘ও মেয়েমানুষ, ওর তো এসব বোঝার কথা নয়।’

কী কী বোঝার কথা নয় তার তালিকায় প্রায় সবই আছে, ধন-দৌলত, জায়গা-জমি, ব্যবসা-বাণিজ্য, দেশ-বিদেশ, ইতিহাস-ভূগোল, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি এবং হাজারও কিছু। শুধু রান্নাবাড়া, ঝাড়ু পোছা, কাপড়ধোয়া, শিশুপালন, ফ্যাশন ছাড়া সবই। আমার বাবা যখন তার সহায় সম্পত্তি নিয়ে কথা বলতেন, লক্ষ্য করতাম, তিনি আমার বা আমার বোনের বা আমার মায়ের দিকে তাকাতেন না, তাকাতেন আমার দুই ভাইয়ের দিকে। মেধায়, মননে, শিক্ষায়, দীক্ষায়, জ্ঞানে, বুদ্ধিতে দুই ভাইয়ের চেয়ে আমি বড়ো হলেও বাবা কখনও তার কিংবা পরিবারের কারোর, এমনকি আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমাকে ডাকতেন না, ডাকতেন দুই ভাইকে। আর, ধরা যাক, বাবা কোনও একটি বিষয় জানতে চাইলেন- একই ঘরে আমরা চার ভাই বোন- আমরা যার যার মত প্রকাশ করলাম। বাবা আমার বা আমার বোনের দিকে তাকালেন না যখন মত প্রকাশ করছি, যত দুর্বলই হোক দুই ভাইয়ের মত, দুই ভাইয়ের মতই মন দিয়ে শুনলেন। দুই ভাইয়ের মতকেই গ্রহণ করলেন- কারণ দুই ভাই পুরুষ। বাবা যে এত তার মেয়েদের শিক্ষা এবং স্বনির্ভরতার ব্যাপারে সচেতন ছিলেন তিনিও অবচেতনে নারীর ওপর আস্থা রাখতেন না। বাবাই যদি অমন হন, তাহলে সমাজের আর সব পুরুষের মানসিকতা কীÑ তা অনুমান করতে কি কোনও কষ্ট হয়?

আজও যখন দোকানে যাই, আমার সঙ্গে যদি কোনও পুরুষ থাকে, সে যে পুরুষই হোক, ভাই হোক, বন্ধু হোক, আমার গাড়ির চালক হোক বা আমার বাড়ির দারোয়ান হোক, দোকানি টাকা-পয়সার ব্যাপারে আমাকে বলবেন না, বলবেন পুরুষদের। সম্ভবত তারা ধরেই নিয়েছেন পুরুষরা টাকা-পয়সার মতো কঠিন বিষয়টি সহজে বুঝবেন, আমি যেহেতু পুরুষ নই, আমি বুঝবো না। এ শুধু দোকানে নয়, অফিসে, আদালতে, রাস্তাঘাট সর্বত্র। সেদিন গাড়ি সারাতে গেলাম, কম্পিউটার কিনতে গেলাম, মোবাইল ফোন, প্রিন্টার, রেফ্রিজারেটর দেখতে গেলাম, দোকানি আমার সঙ্গে যে পুরুষ ছিল, যার ওইসব মেশিন সম্পর্কে কোনও ধারণা নেই, তার সঙ্গে কথা বলল মেশিন নিয়ে, আমার সঙ্গে নয়। আমি কিনছি, আমার টাকাÑ এটা মেনে নিলেও আমি যা কিনছি তা সম্পর্কে আমার জ্ঞান আছেÑ তা মেনে নিতে পারলো না। আমার টাকাকেও জানি না হয়তো পুরুষের টাকা বলেই ভেবেছে।

মেয়েরা জানে কম। বোঝে কম। মেয়েদের ঘটে বুদ্ধি নেই। এই বিশ্বাসটা গভীরভাবে মানুষের, বা প্রায় সব মানুষেরই মস্তিষ্কে ঢুকে গেছে। শুধু টাকা-পয়সা জমিজমা আর প্রযুক্তির ব্যাপারে নয়, যে কোনও বিষয়েই মেয়েদের মূর্খ ভাবা হয়। পুরুষেরা তাদের বালক-পুত্রদের জিজ্ঞেস করবে সাতাশ আর সাতানব্বই যোগ করলে কত হয়, কিন্তু শিক্ষিত স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করবে না কারণ তাদেরও বিশ্বাস স্ত্রী যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ ততটা জানে না। স্ত্রীকে বরং জিজ্ঞেস করবে চিতল মাছের কোপ্তা বানাতে গেলে কী কী করতে হয়। সহজ অঙ্কটি স্ত্রী জানবে না। কঠিন রান্নাটি জানবে।- এ পুরুষের বদ্ধমূল ধারণা। তারা কিন্তু সত্যি সত্যি মনে করে দুনিয়ার অন্য কোনও কাজের চেয়ে রান্না সহজ কাজ, তাই স্ত্রীরা আর কিছু না জানলেও রান্না জানে। কিন্তু রান্না কি সহজ? আমার কিন্তু মনে হয় না।

দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, ঘরে-বাইরে সবখানে, সর্বত্র মেয়ে হিসেবে, নারী হিসেবে, আমি, শুধু আমি নই, প্রায় সব মেয়েই, অপদস্ত হয়, অপমানিত হয়। কারণ তাদের সিদ্ধান্তকে, তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক কোনও সিদ্ধান্তকেই বুদ্ধিপ্রসূত বলে স্বীকার করা হয় না। ভালো বুদ্ধি দেখালে ভাবা হয় কোনও পুরুষ আড়ালে থেকে বুদ্ধিটা দিয়েছে। কোনও নারী-পরিচালক ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণ করলে ভাবা হয় নেপথ্যে কোনও পুরুষ নিশ্চয়ই সাহায্য করেছে নির্মাণ করতে।

গান হয়তো ভালো গাইতে পারে নারী কিন্তু সংগীত পরিচালক পুরুষকেই মানায়, অভিনয় হয়তো করতে পারে নারী, কিন্তু নাটকÑ থিয়েটারের পরিচালক পুরুষকেই মানায়। চাকরি হয়তো করতে পারে নারী- বস কিন্তু পুরুষকেই মানায়। মালিক মাতব্বর, কর্তা, বিচারক হিসেবে নারীকে অধিকাংশ মানুষই পছন্দ করে না। তাই নারী ধনদৌলতের মালিক হলেও শিক্ষিত-স্বনির্ভর হলেও- তাকেও শুধু নারী হওয়ার কারণে পুরুষের উপেক্ষা সহ্য করতে হয়। শিক্ষা এবং স্বনির্ভরতাই নারীবিরোধী সব সমস্যার সমাধান করে ফেলবে- এ অতি সরলীকরণ। সমস্যা আরও নিহিত আছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সম্পদ নারীবিরোধী সংস্কার আর নারীবিদ্বেষী মানসিকতায়। এসবও একই সঙ্গে দূর না করলে শিক্ষিত আর অশিক্ষিত নারীর মধ্যে, স্বনির্ভর আর পরনির্ভর নারীর মধ্যে, ধনী আর দরিদ্র নারীর মধ্যে কোনও পার্থক্য থাকবে না।

নারীরা মূর্খ, নির্বোধ তাই তাদের পুরুষের ওপর নির্ভর করে বাঁচতে হয়- মানুষের এই গভীর বিশ্বাসকে ভাঙার জন্য নারী-পুরুষ উভয়কেই কাজ করতে হতে হবে- তা না হলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজটা যেমন আছে, তেমনই থেকে যাবে অনন্তকাল। নারী ও পুরুষের বৈষম্যও যেমন আছে- প্রায় তেমনই থেকে যাবে। নারীর সমানাধিকার এখন যেমন স্বপ্ন তেমন স্বপ্নই থেকে যাবে চিরকাল।

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

তসলিমা নাসরিন
apps
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত