• সোমবার, ২৫ মে ২০২০, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে ক্ষোভ

পাল্টা কমিটি গঠনে শলাপরামর্শ

প্রকাশ:  ১৫ মে ২০১৯, ১৭:৪৯ | আপডেট : ১৫ মে ২০১৯, ১৮:০০
নিজস্ব প্রতিবেদক

কেন্দ্রীয় সম্মেলনের একবছর পর ৩০১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করেছে ছাত্রলীগ। সোমবার (১৩ মে) সংগঠনের সভাপতি রেজোয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী স্বাক্ষরিত কমিটির তালিকা গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। কমিটি ঘোষণার পরপরই ক্ষোভে ফেটে পড়েন পদবঞ্চিতরা। এসময় নতুন কমিটির বিরুদ্ধে মিছিল করে মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করতে গেলে তাতে হামলা চালায় পদপ্রাপ্তরা। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করছে ছাত্রলীগের একাংশ নেতাকর্মী ও সাবেকদের মধ্যে। কমিটিতে পদবঞ্চিতদের বেশিরভাগ নেতাকর্মীই সংগঠনের সদ্যসাবেক সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেনের অনুসারী বলে জানা গেছে।

গতবছর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেসময় সদ্যসাবেক নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো বর্তমান কমিটির নেতাদেরকে। তবে সাবেক দুই নেতার পরামর্শকে গ্রাহ্য না করেই শোভন-রাব্বানী নতুন কমিটি ঘোষণা করেন বলে অভিযোগ পদপ্রাপ্তদের। আর একারণেই সংগঠনের দ্বন্দ প্রকাশ্যে এসে তা মারামারি পর্যন্ত গড়ায়। এঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছেন হামলার শিকার ছাত্রলীগ নেতারা। তারা নতুন করে পাল্টা কমিটি করতে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করছেন বলে জানিয়েছে একটি সূত্র।

সম্পর্কিত খবর

    তারা জানায়, বিবাহিত, অছাত্র, হত্যা ও মাদক মামলার আসামিদের জায়গা দেয়া হয়েছে নতুন কমিটিতে। ত্যাগীদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। অতীতে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগবিরোধী অবস্থান ছিল এমন অনেকে পদ পেয়েছেন। ৩০১ সদস্যের এই কমিটিতে স্থান হয়নি বিগত কমিটির প্রথম সারির অন্তত শতাধিক নেতার। সর্বশেষ সম্মেলনে আলোচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী ছিলেন এমন অনেকের ভাগ্যেও জোটেনি সঠিক মূল্যায়ন।

    ফলে বিতর্কিতদেরকে বাদ দিয়ে নতুন কমিটি করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেয়ার কথা ভাবছে আগের কমিটিতে ছিলেন কিন্তু এই কমিটিতে জায়গা পাননি এমন অনেকেই। আর এতে আওয়ামী লীগের একাংশের সায় আছে বলে জানায় দলটির একটি সূত্র। তারা নিজেদের মধ্যে পাল্টা কমিটি গঠনে শলাপরামর্শ করছেন বলা জানা গেছে।

    পদবঞ্চিত হওয়া গত কমিটির প্রচার সম্পাদক সাঈফ বাবু জানান, সোহাগ-জাকিরের প্যানেলের কেউ এই কমিটিতে পদ পায়নি। তিনি বলেন, অনেক ত্যাগী নেতাকর্মীকে ‘মাইনাস’ করা হয়েছে। আবার এমনও আছে যারা মাঠে ছিল না; এখন দেখছি কমিটিতে বড় পদ পেয়েছে।

    তিনি অভিযোগ করে বলেন, শোভন-রাব্বানী স্বজনপ্রীতি করেছেন। মাদারিপুর জেলার অনেক নেতাকর্মী ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদ পেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, ছাত্রলীগের সভাপতি শোভনের ভাইকে এ কমিটিতে পদ দেওয়া হয়েছে।

    এটা কোনও আদর্শ কমিটিতে হতে পারে না বলে মন্তব্য করে ছাত্রলীগের এই নেতা বলেন, আমরা এই কমিটি মানি না, আপার (প্রধানমন্ত্রী) কাছে আমরা অনুরোধ জানাবো এই কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হোক।

    এছাড়া ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর অনুসারীরাই হামলা চালিয়েছেন। তাদের দাবি, ঘোষিত কমিটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান আল ইমরানের নেতৃত্বেই এই হামলা হয়েছে। তবে হামলা করার কথা ইমরান অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ঘটনার সময় তিনি মধুর ক্যান্টিনে উপস্থিত থাকলেও তিনি হামলায় অংশ নেননি। তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে।

    খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পদ না পাওয়া নেতাকর্মীদের মধ্যে অধিকাংশই আগের কমিটির সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ এবং সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইনের অনুসারী। ছাত্রলীগের গত সম্মেলন হতে দেরি হওয়ায় সোহাগ-জাকিরের প্রতি কিছু নেতাকর্মী ক্ষুব্ধ ছিলেন। তারা সম্মেলন দেওয়ার দাবি করলে তাদের ওপর সোহাগ-জাকিরের অনুসারীরা তখন কয়েক দফা হামলা চালিয়েছিলেন।

    গত কমিটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সায়েম খান সেই সময় ছাত্রলীগের সাধারণ সভায় প্রশ্ন তুলেছিলেন জাকির-সোহাগের বিলাসী জীবন, টাকার ভাগাভাগি, দরপত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। এরপর এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। এ ঘটনার পরপরই গোলাম রাব্বানী ও সায়েম খানেরা সোহাগ-জাকিরের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করে সম্মেলন দেওয়ার দাবি জানান। অবশেষে ২০১৮ সালের ৩১ মার্চ ২৯তম সম্মেলন হয়। তবে সম্মেলনের প্রায় আড়াই মাস পর ছাত্রলীগ নতুন নেতৃত্ব পায়। শোভন-রাব্বানীর হাতে নেতৃত্ব তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

    এবিষয়ে জানতে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি-সাধারন সম্পাদকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা ফোন রিসিভ করেন নি।

    এদিকে সোমবার (১৩ মে) কমিটি ঘোষণার পরে মঙ্গলবার দুপুরে বিতর্কিত এই কমিটি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে না ভাঙলে গণপদত্যাগ করার হুমকি দেন পদবঞ্চিত নেতারা।

    এসময় ছাত্রলীগের শামসুন্নাহার হলের সভাপতি নিপু ইসলাম তন্বী বলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ‘বিতর্কিত’ ওই কমিটি ভেঙে না দিলে বিক্ষোভ, অনশনসহ আমরা গণপদত্যাগ করবো।

    রোকেয়া হলের সভাপতি লিপি আক্তার বলেন, তদন্ত কমিটি মানি না। যারা হামলা করেছে তাদের দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শোভন-রাব্বানীর প্রত্যক্ষ নির্দেশে আমাদের ওপর হামলা হয়েছে। আবার তারা হামলাকারীদের দিয়ে তদন্ত কমিটি করেছে। আমরা বিশ্বাস করি যদি বঙ্গবন্ধু কন্যার কাছে সঠিক তথ্য যায়, তাহলে তিনি বিতর্কিত এ কমিটি ভেঙে দেবেন।

    এদিকে সোমবার সন্ধ্যায় মধুর ক্যান্টিনে পদবঞ্চিতদের সংবাদ সম্মেলনে হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা হলেন নবগঠিত কমিটির সহ-সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়, আইন বিষয়ক সম্পাদক ফুয়াদ হোসেন শাহাদাত এবং তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক পল্লব কুমার বর্মণ।

    হামলার ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির লক্ষ্যে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়।

    কমিটির দুই সদস্য আল নাহিয়ান খান জয় ও ফুয়াদ হোসেনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পদবঞ্চিতদের ওপর হামলার ঘটনায় তারাও ক্ষুব্ধ।

    আইন সম্পাদক ফুয়াদ হাসান বলেন, কারা হামলা করছে তার খোঁজ নিচ্ছি। আহতদের সঙ্গেও কথা বলব। হামলাকারীদের বিষয়ে আমরা কঠোর। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের নাম তদন্ত প্রতিবেদন আকারে জমা দেয়া হবে।

    মঙ্গলবার দুপুরে মধুর ক্যান্টিনে আসেন শোভন-রাব্বানী। ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন সাংবাদিকদের বলেন, বৃহত্তর এই সংগঠনে পদ প্রত্যাশী রয়েছে এক থেকে দুই হাজার কর্মী। কিন্তু কমিটি দিয়েছি ৩০১ সদস্যের। ত্যাগী কর্মীদের আসলে পদ দ্বারা সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়। কমিটিতে যাদের নিয়ে বিকর্ত আসছে তাদের বিষয়ে তদন্ত কমিটি করা হবে জানিয়ে শোভন বলেন, প্রমাণ হলে তাদের পদগুলো শূন্য ঘোষণা করে যোগ্যদের মূল্যায়ন করা হবে। সোমবারে মধুর ক্যান্টিনে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার প্রশ্নে তিনি বলেন, ছাত্রলীগ সকলের প্রাণের সংগঠন। এর রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের।

    পদবঞ্চিতদের বিষয়ে তিনি বলেন, যারা পদ পায়নি, তাদের রাজনীতি থেমে গেছে এমনটি ভাবার কিছু নেই। তাদের (পদবঞ্চিতরা) প্রতি আহ্বান জানাব ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য তাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেষ্ট থাকবে। কিছুদিন পরে এই কমিটি বর্ধিত করে আরও কিছু-যারা বেশি যোগ্য, যাদের পদ দিতে পারি নাই তাদের কমিটিতে আনব। বিচার বিশ্লেষণ করে যে সকল ত্যাগী এবং যোগ্যরা বাদ পড়েছে, নেত্রীর সঙ্গে কথা বলে কিছু পদ যদি বাড়ানো যায়, সেই বিষয়ে আমরা কথা বলব।

    গোলাম রাব্বানী বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে, আমরা আজকেই তদন্ত কমিটি করে দিচ্ছি। অভিযোগকারীরা দালিলিক তথ্য কমিটির কাছে দেবে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে তারাও প্রমাণ করবে যে এই অভিযোগ মিথ্যা। সেই তদন্ত প্রতিবেদন ‘পাবলিকলি’ প্রকাশ করব।

    পদবঞ্চিতদের বিক্ষোভ ও তাদের ওপর হামলার ঘটনায় তিনি বলেন, অনেকে সাবেক কমিটিতে পোস্টেড ছিল। ৩০১ জনের মধ্যে ১৩৩ জন সরাসরি বিগত কমিটিতে কেন্দ্রের পোস্টেড ছিল। আমাদের সাবেক নেতৃবৃন্দ ২০০ জনের তালিকা দিয়েছিল। এর মধ্যে সরাসরি ৯০ জনকে নেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ১৭৪ জন সাবেক নেতাদের পছন্দের। সবাইকে খুশি করা সম্ভব নয়। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি যোগ্যতার মূল্যায়ন করার জন্য। বিগত কোন কমিটিতে এত জনকে নেয়া হয়নি। তারা মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করতে চেয়েছিল। সেখানে জুনিয়ররা ছিল। এক ধরনের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। শ্রাবণী-দিশা আহত হয়েছে। ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলেছি, দিশা ছাড়া কেউ আহত হয়নি। প্রসঙ্গত, সম্মেলনের এক বছর পর সোমবার ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। এর পরপরই পদবঞ্চিত ও কাঙ্ক্ষিত পদ না পাওয়ায় বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভে নারী নেত্রীদের ওপর হামলা হয়।

    পরবর্তীতে সন্ধ্যায় মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন চলমান অবস্থায় আবারও হামলা করে নবগঠিত কমিটিতে পদপ্রাপ্ত একাধিক নেতা। এসময় অন্তত ১৫ জন আহত হয়। শ্রাবণী, দিশা ও ডাকসুর ক্রীড়া সম্পাদক গুরুতর আহত হয়।

    তবে হামলার সাথে জড়িতদের প্রতি হুশিয়ারি দিয়ে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলেন, যারা এই হামলা করেছে, তারা চরম অপরাধ করেছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা হবে।

    পিবিডি/এআইএস

    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close