Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯, ৪ শ্রাবণ ১৪২৬
  • ||

দিল্লির সিংহাসন লড়াইয়ে মোদি না কোয়ালিশন

প্রকাশ:  ০৩ মে ২০১৯, ০২:৩৯ | আপডেট : ০৩ মে ২০১৯, ০২:৪৩
পীর হাবিবুর রহমান, দিল্লি থেকে ফিরে
প্রিন্ট icon

দিল্লির সিংহাসনের লড়াই এখন তুঙ্গে। পৃথিবীর বৃহত্তম ভোট উৎসব ভারতের লোকসভার নির্বাচন এখন চলছে। ৯০ কোটি ভোটারের এই গণরায়ে শেষ পর্যন্ত দিল্লির মসনদে আবার ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি জয়ী হয়ে ফিরবে নাকি তার বিরুদ্ধে করুণ বিপর্যয় থেকে উঠে আসা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস ও বিভিন্ন দাপুটে আঞ্চলিক দল ও জোটের নেতারা মোদিকে হটিয়ে কোয়ালিশন সরকার গঠন করবেন? এ প্রশ্ন এখন সবখানে সব পথে সব আলোচনায় ঠাঁই পেয়েছে! ভারতের লোকসভার নির্বাচন চলাকালে কলকাতা ও দিল্লিতে গিয়ে দেখে এলাম কোথাও কোনো পোস্টার নেই। নির্ধারিত স্থানে ডিজিটাল প্রচারণা রয়েছে। গণমাধ্যমে প্রচারণা বিজ্ঞাপন ও বিতর্কের তুফান বইছে।

গণতান্ত্রিকভাবে বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের নির্বাচনের সৌন্দর্যটিই হচ্ছে মানুষের ভোটাধিকারের মাধ্যমে কে ক্ষমতায় থাকবে কে আসবে তা নির্ধারণ। এ মুহূর্তে ভারতে নির্বাচন ঘিরে সবচেয়ে শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান প্রতিষ্ঠানটির নাম হচ্ছে নির্বাচন কমিশন।

বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ৫৪৩ আসনের ২৮২টি বিজেপি এককভাবে এবং জোটগতভাবে ৩৩৬টি আসন লাভ করে। রীতিমতো ব্যালট সুনামি ঘটিয়ে হিন্দুত্ববাদের স্লোগান তুলে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি জোট ক্ষমতায় আসে। আর ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী ও ঐতিহ্যবাহী গান্ধী পরিবারের নেতৃত্বাধীন প্রাচীন রাজনৈতিক দল কংগ্রেস মাত্র ৪৪টি আসন নিয়ে করুণ পরাজয় বরণ করে। জোটগতভাবে ৬০টি আসন পেয়ে চূড়ান্ত ভরাডুবি দেখেছিল। কংগ্রেস বিরোধী দলের মর্যাদা পাওয়ার মতো আসনও সেদিন লাভ করেনি। ইতিহাসে এমন পরাজয় কংগ্রেস আর কখনো দেখেনি। ভারতের ভোট রাজনীতির ইতিহাসে সেদিন বিজেপির এই উত্থানের নেপথ্যে নরেন্দ্র মোদি ছিলেন রাজনীতির জাদুকর। কংগ্রেস জোটের ১০ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়েছিলেন তার ইমেজের ওপর। ২০১৪ সালের ভোটযুদ্ধে ‘আব কি বার মোদিকা সরকার’ স্লোগান তুলে হিন্দুত্ববাদের শক্তির ওপর ভর করে কংগ্রেস শাসকদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে ব্যালট বিপ্লবে জয়ী হয়েছিলেন মোদি।

এবার ‘ফির কি বার মোদিকা সরকার’ স্লোগান তুলে ভারতকে নিরাপদ রাখা এবং সব সমস্যার সমাধানের অঙ্গীকার দিয়ে আবার ক্ষমতায় আসার লড়াইয়ে প্রবল প্রতাপের সঙ্গে লড়ছেন নরেন্দ্র মোদি। তবে অসাম্প্রদায়িক ভারতের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারিত্ব ও চেতনা বহন করা প্রাচীন রাজনৈতিক দল কংগ্রেস কঠিন বিপর্যয় থেকে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়িয়ে মোদিকে হটাতে যেভাবে লড়াই শুরু করেছে তেমনই বিভিন্ন রাজ্যে কোথাও মমতা, কোথাও বা অখিলেশ-মায়াবতীর জোট, কোথাও কেজরিওয়াল, কোথাও বা চন্দ্রগোনাই আবার কোথাও বা জয়ললিতার রেখে যাওয়া জোট একই সুরে নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে জনমত নিজেদের পক্ষে টেনে জয়ী হওয়ার শক্ত লড়াইয়ে অবতীর্ণ।

নরেন্দ্র মোদিবিরোধী এসব শক্তি কংগ্রেসকে নিয়ে এক প্ল্যাটফরমে একজোট হয়ে আসন ভাগাভাগি করে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে পারেননি বলে ভোটের যুদ্ধটা তাদের জন্য কঠিন হয়ে গেছে। আর এই সুযোগে নরেন্দ্র মোদি নির্বাচনী প্রচারণায় এই বলে উপহাস করছেন যে, কেউ কেউ ১০ আসনে মনোনয়ন দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হতে চাচ্ছেন, যা কখনই সম্ভব নয়। মোদিবিরোধী সব অসাম্প্রদায়িক শক্তি ছোট-বড় দলের নেতারা তার পরও মোদিকে হটাতে চলমান ভোটযুদ্ধে অভিন্ন কণ্ঠে নরেন্দ্র মোদি ও তার বিজেপির শাসনকে সমালোচনার তীরে ক্ষতবিক্ষত করে ভোটারের হৃদয় জয় করতে চাচ্ছেন। তারা স্লোগান তুলেছেন, ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’। তারা অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি অর্জনের ব্যর্থতা, নোট বাতিলের মধ্য দিয়ে কালো টাকা উদ্ধারে ব্যর্থতা এবং বেকারত্বের চরম পরিস্থিতি এবং কৃষকের বাম্পার ফলন ঘটিয়েও ন্যায্য পণ্যমূল্য না পাওয়া এবং বিক্রি না হওয়া কৃষিপণ্য রাস্তায় ফেলে দেওয়া চিত্রপট তুলে ধরছেন। বিশেষ করে কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যূনতম মূল্য পাচ্ছেন না। পাঞ্জাবে এত বেশি গম হয়েছে যে, মূল্য না পেয়ে কৃষক রাস্তায় ফেলে গেছে।

অন্যদিকে মোদি ও তার বিজেপি তার হাতেই ভারত নিরাপদ এবং পাকিস্তানকে মুখের ওপর জবাব দেওয়ার সাহসিকতা ও সব সমস্যার সমাধানের কথায় অভিযোগের জবাব দিচ্ছেন। রাহুল গান্ধীর পাশে কংগ্রেসের অন্যতম সাধারণ সম্পাদক হয়ে বোন প্রিয়াংকা নির্বাচনী প্রচারণায় দিনরাত ছুটছেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে মোদির বিরুদ্ধে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েও প্রিয়াংকা ভোটযুদ্ধে আসেননি। এটাকে পর্যবেক্ষকরা নানাভাবে দেখছেন। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মোদির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া রাজনৈতিক শক্তি রীতিমতো ছত্রভঙ্গ। ভারতের লোকসভা নির্বাচনে কে ক্ষমতায় যাবেন তা নির্ভর করে উত্তর প্রদেশের ফলাফলের ওপর। ২০১৪ সালের নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির ডান হাত আজকের বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ এখানে নির্বাচন পরিচালনা করেছিলেন। ৮০টি আসনের মধ্যে ৭৩টি নিয়ে উল্লাসের হাসি হেসেছিল বিজেপি।

মায়াবতী ব্যাপক জনপ্রিয় নেত্রী হলেও সেদিন কোনো আসন পাননি। এবার মায়াবতী-অখিলেশ জোট করে ভোটে নামলেও কংগ্রেসকে সঙ্গে নেয়নি। যদিও অখিলেশের সঙ্গে রাহুলের নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। কিন্তু কংগ্রেসও সেখানে দলীয় প্রার্থী দিয়েছে। এতে অনেকে বলছেন, মোদিবিরোধী ভোট এ কারণে ভাগ হয়ে যেতে পারে। আবার অনেকে বলছেন, কংগ্রেস সেখানে প্রভাব ফেলতে পারবে না। পারিবারিক আসনে জয়লাভ ছাড়া কংগ্রেস ইউপিতে সুবিধা করা কঠিন। অনেকের মতে, রাহুল গান্ধী দুই বছর আগেও সমালোচকদের ‘পাপ্পু’ ডাক থেকে বেরিয়ে যে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে এসেছিলেন সেটি এখন ততটা উজ্জ্বল নয়। সবাইকে নিয়ে জোট করে ভোট করতে পারলে ম্যাজিক দেখাতে পারতেন। কর্ণাটকে বিজেপির বিরুদ্ধে বামপন্থি শক্তিশালী প্রার্থী থাকার পরও কংগ্রেস কৌশলগত ভুল করে নিজেদের প্রার্থী দিয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, ইউপিতে বিজেপির যদি ফলাফল বিপর্যয় ঘটে তাহলে কোয়ালিশন সরকারের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। সমাজবাদী দল ও বহুজন সমাজ পার্টির এককথায় অখিলেশ এবং মায়াবতীর জোটেই বিজয়ের আশা দেখছে মোদিবিরোধীরা। আর যদি সেখানে তাদের অতীত ফলাফল ধরে রাখতে পারে তাহলে নরেন্দ্র মোদির বিজয় রুখে দেওয়া কঠিন। পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল দুর্গ সুরক্ষিত রেখেছে। সেখানে ৪২টি আসন রয়েছে। এখানে তৃণমূলই দখলদারিত্ব রাখবে। বামফ্রন্ট বা কংগ্রেসের কথা কেউ ভাবছেন না। বিজেপি এবার ৮-১০টি আসন নিতে চায়। কিন্তু পর্যবেক্ষকদের মতে, ২টি থেকে বেড়ে ৫টি আসনে যেতে পারে ১০টিতে নয়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও এনডিটিভির কর্ণধার প্রণয় রায়ের মতে, পাঁচ বছর ধরে বদলে দাও বলা হলে পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল। কিন্তু এখন ভোটাররা ভাবছেন, নরেন্দ্র মোদির বিকল্প কই? বিকল্প থাকলে না হয় রাগের মাথায় বদলে দিত।

এদিকে নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে সব অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তির শানিত আক্রমণের মুখে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, এককথায় হিন্দুত্ববাদের আঁতুড়ঘরে যে অভিমান ছিল সব ভুলে তারাও ঐক্যবদ্ধ হয়ে মোদিকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে ভোটের ময়দানে জোরালোভাবে নেমেছে। সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ এনে সব অসাম্প্রদায়িক শক্তি ছত্রভঙ্গভাবে মোদির বিরুদ্ধে যেমন সোচ্চার তেমনি, সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদী শক্তিও মোদির পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। জাতীয়তাবাদ ও উগ্র হিন্দুত্ববাদ নরেন্দ্র মোদির ভোট রাজনীতির শক্তির উৎস যেমন তেমনি রয়েছে তার নিজস্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বের দক্ষতা ও ক্যারিশমা।

উত্তর প্রদেশের পর বেশি আসন রয়েছে তামিলনাড়ুতে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে প্রয়াত জয়ললিতার দল এআইডিএমকে পেয়েছিল ৩৭টি আসন। ২০১৪ সালের নির্বাচন ৭ এপ্রিল থেকে ১২ মে পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৬ মে ফলাফল ঘোষিত হয়েছিল। সেই নির্বাচনে ৮১ কোটি ৪৫ লাখ ভোটার ছিলেন। এবার ১১ এপ্রিল থেকে কয়েক দফায় হওয়া নির্বাচনে ইতিমধ্যে প্রায় অর্ধেকেরও বেশি আসনে ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে। ১৯ মে পর্যন্ত আরও দুই দফা ভোট হবে। ভোট গণনা হবে ২৩ মে। আর ফলাফল তামাম দুনিয়ার সামনে আসতে থাকবে। ৫৪৩টি আসনের মধ্যে সরকার গঠনের জন্য ২৭২টি আসনের প্রয়োজন হয়। নরেন্দ্র মোদির বিজেপি এবার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে এমনটি কেউ বিশ্বাস করছেন না। কারণ তিনি ক্ষমতায় গেলেও বিজেপির আসন কমবে বলে পর্যবেক্ষকদের অভিমত। আর তিনি পরাজিত হলে কোয়ালিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রী কে হবেন- সেই দৌড়ে রাহুল গান্ধী থেকে বাংলার মমতা, ইউপির অখিলেশ-মায়াবতী এমনকি দিল্লির কেজরিওয়ালের নামও উঠে আসবে।সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

ভারত,লোকসভার নির্বাচন
apps
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত