Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • মঙ্গলবার, ২১ মে ২০১৯, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬
  • ||

উগ্রবাদের রক্তবন্যায় ভাসে জায়ানের চাঁদমুখ

প্রকাশ:  ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ০১:০০ | আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ০১:১৬
পীর হাবিবুর রহমান
প্রিন্ট icon

সভ্যতার বিকাশ নাকি আদিম বর্বরতার আবির্ভাব! বিস্ময়ের ঘোর কাটে না অশান্ত পৃথিবীর দিকে তাকালে। উগ্রপন্থিদের হিংস্র আক্রমণে পৃথিবীজুড়ে আজ রক্তবন্যা বইছে। মানবিকতা উন্মত্ত হিংস্র উগ্রবাদীদের আক্রমণে হামেশাই ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। আজ এখানে তো কাল ওখানে। পৃথিবীজুড়ে আজ চরম নিরাপত্তাহীন মানুষ। বন্য জানোয়ারের হিংস্র আক্রমণে নয়, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ বিপথগামী অন্ধ, উন্মাদ মানুষের হাতেই মানুষের নৃশংস মৃত্যু ঘটছে হামেশাই। মানুষই আজ সভ্যতা, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পৃথিবীকে অগ্রসর করে এতদূর টেনে আনলেও কিছু মানুষের জিঘাংসার হিংস্র থাবায় পৃথিবী আজ শয়তানের জল্লাদখানায় পরিণত হয়েছে।

পৃথিবীর শান্তির দেশ নিউজিল্যান্ডে জুমার নামাজ পড়তে আসা মুসলমানদের উপাসনালয় মসজিদে হামলার রক্তের দাগ শুকাতে না শুকাতে, বেদনার চিহ্ন মুছে যেতে না যেতেই ৩৫ দিনের মাথায় রবিবারের সুন্দর সকালে মানবতাবিরোধী উগ্রপন্থিরা ইস্টার সানডে সামনে রেখে গৃহযুদ্ধের বিভীষিকাময় থাবা থেকে মুক্ত হয়ে আসা শ্রীলঙ্কার কলম্বোয় খ্রিস্টানদের ধর্মীয় উপাসনালয় তিনটি গির্জা ও চারটি অভিজাত হোটেলে ২০ মিনিটের মধ্যে ভয়াবহ সিরিজ বোমা হামলা চালিয়েছে।

বোমার আঘাতে কলম্বোই কেঁপে ওঠেনি, ভারত মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। রক্তে ভেসে যায় কলম্বো। শোকস্তব্ধ হয়ে যায় লঙ্কাই নয়, উপমহাদেশই নয়, তামাম দুনিয়া। এমন ভয়াবহ নিখুঁত ও পরিকল্পিত বোমা হামলায় ইতিমধ্যে তিন শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পাঁচ শতাধিক আহত হয়েছেন। প্রথমে কারফিউ, দুই দিনের শোক ও ছুটি ঘোষণা করে শ্রীলঙ্কা বসে থাকেনি, জরুরি অবস্থাও জারি করেছে। দেশটির মন্ত্রিপরিষদ ঘটনার জন্য ইসলামপন্থি ন্যাশনাল তাওহিদ জামাতের নাম প্রকাশ করেছে।

শ্রীলঙ্কার পুলিশপ্রধান ১১ এপ্রিল দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে একটি সতর্কবার্তা পাঠিয়েছিলেন। বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে তিনি বলেছিলেন, জঙ্গি দল ন্যাশনাল তাওহিদ জামাত কলোম্বয় ভারতীয় হাইকমিশন ও শ্রীলঙ্কার প্রধান গির্জাগুলোয় আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনা করছে।

রবিবার হামলার সঙ্গে জড়িত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ককে খুঁজে বের করতে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক সহায়তা চাওয়ার পরপরই সরকারের মুখপাত্র রাজিতা সেনাত্রে ওই হামলার জন্য ইসলামপন্থি ন্যাশনাল তাওহিদ জামাতের নাম প্রকাশ করেন। তিনি বলেছেন, এ হত্যাকান্ডের পেছনে এই সংগঠন আছে বলে তারা মনে করছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, এ হামলাগুলো শুধু দেশের ভিতরে সীমাবদ্ধ একই গোষ্ঠী চালায়নি, একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ছাড়া এসব হামলা সফল হতে পারত না। পুলিশ ইতিমধ্যে ২৪ জনকে গ্রেফতার করেছে।

এদিকে শ্রীলঙ্কায় আত্মঘাতী বোমা হামলায় এবং বিপুল প্রাণহানির নির্মমতায় মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট বা আইএস উল্লাস প্রকাশ করেছে। বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, আইএস কলম্বোর আত্মঘাতী বোমা হামলার মধ্য দিয়ে বিলাসবহুল হোটেল ও উপাসনালয় নিরপরাধ মানুষের রক্তে ভাসানোর ঘটনাকে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে দেখছে।

অনলাইনে জঙ্গি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণকারী মার্কিন সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ বলছে, ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে গোলাগুলির প্রতিশোধ হিসেবে শ্রীলঙ্কার সন্ত্রাসী হামলার প্রশংসা করেছে আইএস সমর্থকরা। সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের পরিচালক বলেছেন, কলম্বোর ভয়াবহ হামলা ও নৃশংস হত্যাকান্ডে আইএস সমর্থকরা প্রশংসা করে বন্য উল্লাস করছে। সেখানে তারা বোমা হামলাকারীদের যেন আল্লাহ কবুল করেন, সেই প্রার্থনাও করেছে। তিনি আরও বলেছেন, আইএসের বিভিন্ন পদে শ্রীলঙ্কার যোদ্ধাদের নাম উল্লেখ রয়েছে। যে কারণে দেশটিতে আইএসের সমর্থকরা অবাধে প্রবেশ করতে পারে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলেছে, শ্রীলঙ্কার উচ্চশিক্ষিত এবং এলিট পরিবারের বেশকিছু সদস্য সিরিয়ার জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসে যোগ দিয়েছে। রক্তাক্ত কলম্বোর শোকস্তব্ধ চিত্রপট বিশ্ববাসীকে উদ্বিগ্ন ও বেদনার্তই করেনি, দুনিয়াজুড়ে এই বর্বরতার বিরুদ্ধে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। এ হত্যাকান্ড বাংলাদেশের মানুষকেও রবিবার সকাল থেকে বিষাদগ্রস্ত করে তুলেছিল। সেই বিষাদ ও বেদনা আরও ভারী হয়ে ওঠে শবেবরাত নামতে না নামতে যখন খবর ছড়িয়ে পড়ে আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান শেখ ফজলুল করিম সেলিমের নাতি জায়ানের করুণ মৃত্যুসংবাদ।

সানবিম স্কুলের ছাত্র আট বছরের শিশু জায়ানের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হতে না হতেই আর্তনাদ করে ওঠে মানুষ। যে শিশুটি সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছিল, বাবা-মায়ের সঙ্গে শ্রীলঙ্কা বেড়াতে গিয়ে মানবসভ্যতাবিরোধী অভিশপ্তদের বোমা হামলায় অকালেই ঝরে গেল। শেখ সেলিমের জামাতা মশিউল হক চৌধুরী প্রিন্স সন্তান হারিয়ে আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সন্তানহারা মা শেখ সেলিমের কন্যা শেখ আমেনা সুলতানা সোনিয়া এখন মাতম করছেন। এমন ফুটফুটে আদরের শিশুটির জন্য শুধু তার মা-ই নন, বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় কাঁদছে।

মশিউল হক চৌধুরী প্রিন্সের পৈতৃক বাসভবনও বনানীতে। জায়ানের দাদা এম এইচ চৌধুরী সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান। আজ বেলা ১১টায় জায়ানের মরদেহ ঢাকায় এসে নামলে বাদ আসর জানাজা শেষে তাকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হবে।

দীর্ঘ ২৬ বছরের শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের অবসান হয়েছিল ২০০৯ সালে। তার আগেই গৃহযুদ্ধ চলাবস্থায়ই ১৯৯৫ সালে আরেক ভয়ঙ্কর বোমা হামলায় দেশটিতে ১৪৭ জন খ্রিস্টানকে হত্যা করা হয়েছিল। শ্রীলঙ্কার খ্রিস্টানরা দেশটিতে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কোনো অংশ নয়, একটি গুরুত্বহীন অংশ। জনসংখ্যার মাত্র ৬/৭ শতাংশ হলো খ্রিস্টান। খ্রিস্টানের মধ্যে তামিল ও সিংহলি উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছে। যেখানে তামিলদের সংখ্যাই বেশি। তামিলপ্রধান উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে এবং কলম্বোতেই বেশি খ্রিস্টানরা থাকে। রবিবারের ভয়াবহ হামলাটি হয়েছে কলম্বোর পূর্বাঞ্চলের বার্তি কালোয়ায়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ হামলার পেছনে হিন্দু তামিল ও বৌদ্ধ সিংহলিদের সংশ্লিষ্টতার বড় ঐতিহাসিক কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। তামিলদের সঙ্গে সিংহলিদের রাষ্ট্রনৈতিক যে বিরোধ আছে, সেখানে খ্রিস্টানকেন্দ্রিক কোনো উপাদান নেই। হিন্দু তামিল ও খ্রিস্টান তামিলদের মধ্যে বড় ধরনের কোনো সংঘাত নেই। অতীতে মুসলমান তামিলদের সঙ্গে এলটিটিইর সম্পর্ক খারাপ থাকলেও তার নেতৃত্ব কাঠামোয় ছিল নিম্নবর্ণের হিন্দু, খ্রিস্টান নয়।

সম্প্রতি মুসলমানদের বিরুদ্ধে শ্রীলঙ্কাজুড়ে যেসব আক্রমণ হয়েছে, তাও ঘটেছে মূলত বৌদ্ধ সিংহলি দ্বারা। খ্রিস্টান সিংহলিদের তাতে উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা ছিল না। আবার বৌদ্ধধর্মীয় কিছু সংগঠন চার্চগুলোয় প্রার্থনার সময় হামলা করে থাকে। যদিও সেটি এমন ভয়াবহ কোনো হামলার ইঙ্গিত দেয় না।

লঙ্কানরা গৃহযুদ্ধের সময় থেকে আত্মঘাতী বোমা হামলার সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত। তামিল টাইগার নারীর আত্মঘাতী বোমা হামলায় ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীকেও নির্বাচনী প্রচারণাকালে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। সেই তিন দশকের গৃহযুদ্ধের চিত্রপট দুনিয়ার সামনে খোলা বইয়ের মতো। সেই গৃহযুদ্ধের দিনগুলোয় লাখো মানুষের মৃত্যু ঘটেছে।

লঙ্কায় জনসংখ্যার হিসাবে মুসলমানদের অবস্থান তৃতীয় স্থানে থাকলেও রাজনৈতিকভাবে তারা খুবই দুর্বল জনগোষ্ঠী। তাদের সংগঠনগুলো এ মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তামিল সংগঠনগুলোও একই সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে। ফলে উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর মধ্যে মুসলমানবিরোধী কিছু মনোভাব রয়েছে। এ ছাড়া দেশটিতে আর কারও সঙ্গে মুসলমানদের সংঘাতপূর্ণ কিছু ছিল না। গৃহযুদ্ধ থেকে ঘুরে দাঁড়ানো শ্রীলঙ্কার নিরাপত্তা গোয়েন্দা কাঠামো অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক কঠোর ও সুগঠিত। কিন্তু সব নিরাপত্তা বলয় ভেঙে দিয়ে, পুলিশপ্রধানের সতর্কবার্তা উড়িয়ে দিয়ে, যে ভয়াবহ সিরিজ বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে, যে রক্তনদী বইয়ে দেওয়া হয়েছে তাতে সেখানকার বিরোধী রাজনৈতিক দল সরকারের বিরুদ্ধে দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থার অভিযোগ আনতে পারে।

রাজনীতিতে যেটিই হোক না কেন এ কথা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই যে, গৃহযুদ্ধ থেকে মুক্ত লঙ্কায় এই প্রথম এত ভয়ঙ্কর ভয়াবহ সন্ত্রাসী আঘাত। এ ঘটনা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের সম্পৃক্ততাকে বড় করে সামনে নিয়ে এসেছে। এমন নিখুঁত পরিকল্পিত আত্মঘাতী সিরিজ বোমা হামলার ভয়াবহতা লঙ্কানদেরই নয়, দুনিয়ার সামনে সাক্ষ্য দিচ্ছে যে এর নেপথ্যে সুদক্ষ পরিকল্পনা ও বড় শক্তি কাজ করেছে; যা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী হামলারই আরেকটি নমুনামাত্র। এ হামলা শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে ব্যাপক অবিশ্বাসের জন্মই দেবে না, ধর্মভিত্তিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলবে না, গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় রাষ্ট্রসমূহের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে উদ্বিগ্ন করে তুলবে। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে বলেছে, শ্রীলঙ্কায় আরও হামলা হতে পারে।

গৃহযুদ্ধ অবসানের পর গণতান্ত্রিক সমাজে যে উদার সহনশীলতার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল, তা অশান্ত বিশ্বরাজনীতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রচন্ড রকমে হোঁচট খেয়েছে আজ। প্রায় ৩৫ জন বিদেশিকে পাঁচ তারকা বিলাসবহুল হোটেলে হামলা চালিয়ে সন্ত্রাসবাদীরা হত্যা করেছে। শুধু উপাসনালয়গুলোকেই রক্তাক্ত করেনি, পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় দ্বীপরাষ্ট্রে হামলা চালিয়ে গোটা পৃথিবীকে তারা জানিয়ে দিয়েছে তারা কতটা হিংস্র আর কতটা শক্তিশালী। এ ঘটনার তদন্ত ও সন্ত্রাসবাদের প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক মহলকে যুক্ত হয়ে ভাবতে হবে।

শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধরা হচ্ছেন আদি নাগরিক। পরে মধ্যযুগে আরব বাণিজ্যের হাত ধরে যুক্ত হয়েছে মুসলমানরা। আর ষোড়শ শতকে ইউরোপীয় উপনিবেশের পথ ধরে যুক্ত হয়েছে খ্রিস্টানরা। নানা ধর্মের মিলনস্থল হলেও দেশটি যে সবসময় ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রেখেছে জোর দিয়ে এমনটি বলা যাবে ন। কিন্তু সন্ত্রাসবাদের, ধর্মীয় উগ্রবাদের এমন ভয়াবহ আঘাত লঙ্কানরা আর কখনো দেখেনি। অনেক দিন ধরেই সংখ্যালঘু মুসলিম সংগঠনগুলোর কার্যকলাপ নিরাপত্তা বাহিনীর নজরবন্দি ছিল। ক্ষুদ্র জঙ্গি সংগঠনগুলো সিরিয়ার আইএসের মনোভাবকে লালন করে সেটিও উচ্চারিত হচ্ছিল। এমনকি খ্রিস্টানদের ধর্মশালায় হামলা হতে পারে বলে যে আশঙ্কা ছিল, তা বিশ্বরাজনীতিতে গভীর রক্তক্ষরণের মধ্য দিয়ে সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হলো। সেখানকার বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা খ্রিস্টান ও মুসলমানদের উপাসনালয়ের স্থানগুলো বন্ধ করে দেওয়ার জন্য চাপ দিয়ে আসছে বলে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের বক্তব্যও ছিল। মুসলমানদের হামলার মুখেও পড়তে হয়েছিল। এমনকি মুসলিমবিরোধী দাঙ্গার কারণে শ্রীলঙ্কা সরকারকে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হয়েছিল। কট্টরপন্থি বৌদ্ধ সংগঠনগুলোর অভিযোগ ছিল, মুসলমানরা ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করছে এবং বৌদ্ধ তীর্থস্থানগুলো ধ্বংস করছে।

সাম্রাজ্যবাদী কর্তৃত্বপরায়ণ আধিপত্যের নামে, মার্কসবাদের নামে, অভিশপ্ত বর্ণবাদের নামে এমনকি জাতিগত বিরোধের নামে রক্তপাত, হত্যা, প্রতিশোধের জিঘাংসায় পৃথিবীকে বার বার অশান্ত করা হয়েছে। যুদ্ধের দামামা বেজেছে। অশান্ত পৃথিবীকে রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সমাজতন্ত্রের পতনের পর পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদের আদর্শিক লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে, গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিতর্ককে পেছনে ফেলে নতুন করে পৃথিবী অশান্ত হয়ে উঠেছে ধীরে ধীরে। সমাজতন্ত্রের পতনের পর উদার গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিপরীতে ইসলামী জিহাদের নামে ধর্মযুদ্ধের ডাক বা ধর্মীয় রাজনীতির উন্মাদনা ছড়িয়েছে পৃথিবীজুড়ে। সামরিক শক্তিবলে যুদ্ধের বিপরীতে উঠে এসেছে উগ্রপন্থি ধর্মীয় জঙ্গিশক্তি। কোথাও তালেবান, লস্কর-ই-তৈয়বা কোথাও বা আইএস কখনো টুইন টাওয়ারে আঘাত করে দাউদাউ আগুনে জ্বালানো হয়েছে উদার গণতান্ত্রিক আমেরিকায়। কখনো বা লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ড বা ইন্দোনেশিয়ার নাইট ক্লাবে চালানো হয়েছে বোমা হামলা।

পৃথিবীর কোথাও আজ কেউ নিরাপদ নয়। ইসরায়েলি হামলায় স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি নারী-শিশু যেমন বারে বারে রক্তাক্ত নিথর হয়, তেমনি জঙ্গিবাদীদের বর্বরতায় নিরপরাধ মানুষ ও শিশুরা প্রাণ হারায়। মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মন্দির ভেঙে চুরমার করা হয়েছে। গির্জা আক্রান্ত হয়েছে। বৌদ্ধ মন্দির ধ্বংসলীলায় শেষ হয়েছে। মানুষের চেয়ে গরুর প্রস্রাবের মূল্য চড়া হয়েছে। রক্তপাত ও আক্রমণ থেকে মানুষ ও মানবতাকে এমনকি ধর্মীয় উপাসনালয়কে রাষ্ট্র নিরাপদ রাখতে পারছে না। উগ্রপন্থিরা হিংস্র জানোয়ার হতে পারেনি, মানুষ হয়তো পেরেছে।

শ্রীলঙ্কায় সন্ত্রাসবাদের ধ্বংসলীলায় সেখানকার বেদনার্ত অসংখ্য মুসলমানকে আজ বিপদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ধর্মের নামে আইএস বা আলকায়েদা বা তলেবানি অনুসারীরা আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে পৃথিবীজুড়ে শান্তির ধর্ম ইসলামকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, মানবিকতাকেই ভূলুণ্ঠিত করছে না, মানবতার কবরই দিচ্ছে না, ধর্মের শান্ত সুললিত বাণীকে কবর দিয়ে পৃথিবীজুড়ে মুসলিমবিদ্বেষী মনোভাব জাগিয়ে তুলছে। এই সন্ত্রাসবাদীরা মানবতার শত্রুই নয়, ধর্মপ্রাণ শান্তিপ্রিয় মুসলমানের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলছে। পৃথিবীজুড়ে অবাধ যাতায়াতের পথ প্রশ্নবিদ্ধ করে দিচ্ছে।

রাজনীতির নামেই হোক, বর্ণবাদের নামেই হোক আর গণতন্ত্রের নামেই হোক উগ্রবাদীদের কর্মকান্ড যেমন সুখ ও শান্তি বয়ে আনেনি, তেমনি ধর্মের নামে উগ্রপন্থা তথা সন্ত্রাসবাদী কর্মকান্ডের ভিত্তিতে মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার মতো অভিশপ্ত পথ কখনো সুখ বয়ে আনতে পারে না। জাতিগত দাঙ্গা, বর্ণবাদী বিদ্বেষ ও ধর্মীয় উগ্রতা আজ পৃথিবীতে মানবতার শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ধর্মের নামে ভারত ভাগের পর ২৪ বছর আমাদের শোষণ করা হয়েছে। ধর্মের নামে সুমহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের ওপর অবর্ণনীয় গণহত্যা চালানো হয়েছে। ধর্মের নামে একাত্তরে আমাদের আড়াই লাখ মা-বোনকে নয় মাস হানাদার বাহিনী গণধর্ষণ করেছে।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মধ্য দিয়ে যে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে আমরা পরাজিত করেছিলাম সেই স্বাধীনতা লাভের অর্ধশতকে এসে দাঁড়িয়ে আমাদের আজ ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক শক্তিকেই মোকাবিলা করতে হচ্ছে না, ধর্মের নামে গঠিত অন্ধকার সন্ত্রাসবাদী শক্তিকেও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। গুলশানের হলি আর্টিজানে সন্ত্রাসবাদ আমাদের রক্তাক্ত করেছে। সন্ত্রাসবাদ আজ শুধু জাতীয়ভাবেই নয়, ধর্মীয় উগ্রতা আজ উপমহাদেশজুড়েই নয়, পশ্চিমা দুনিয়াসহ গোটা পৃথিবীকে অশান্ত করে তুলেছে।

দেশে দেশে আজ জাতিগত সংঘাত, বর্ণবাদ ও কোথাও মুসলিম, কোথাও হিন্দু, কোথাও ইহুদি, কোথাও বা বৌদ্ধ উগ্রপন্থিদের জন্য রাষ্ট্রের চরিত্র পাল্টে যাচ্ছে। এমনকি কলম্বো হামলার সময় সৌদি আরবেও হামলার লক্ষ্য ছিল বলে খবর চাউর হয়েছে। পৃথিবীজুড়ে আজ উগ্রপন্থি ধর্মান্ধ শক্তির আক্রমণে রক্তের প্লাবন ও ধ্বংসলীলা চলছে। চরম অবিশ্বাস জন্ম নিচ্ছে। আর সেই বহমান রক্তনদীতে ভাসছে নিরপরাধ চাঁদমুখ শিশু জায়ানের মুখ।

এই পৃথিবীকে নিরাপদ তথা মানুষের বাসযোগ্য করে তুলতে হলে ধর্মকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখা এবং উদার গণতান্ত্রিক সহনশীল সমাজ প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তামাম দুনিয়ার শান্তিবাদী মানুষের সুসংগঠিত লড়াই ও প্রতিরোধ এখন সময়ের দাবি। পৃথিবীর যেখানেই যে থাকি না কেন নতুন প্রজন্ম ও আগামী দিনের শিশুর জন্য নিরাপদ বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ার লড়াইয়ে এই দানবশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধের কোনো বিকল্প নেই। তেমনি বিশ্বমোড়লদেরও বুঝতে হবে হত্যা ও আক্রমণ আর দখলদারিত্বই সমাধান নয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জাহানারা আরজু রক্তাক্ত কলম্বোর বিভীষিকাময় মৃত্যুপুরী দেখে অনেকের মতো বেদনার্ত হৃদয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন এভাবে, ‘খুব কষ্ট লাগে, কেন আমরা এভাবে খুনের উৎসবে মেতে উঠি? সারা পৃথিবীতে কেন আজ এত উন্মত্ততা? কেন পৃথিবীতে আজ অস্ত্রের ঝনঝনানি?

জানি না আমরা কবে মানুষের বাসযোগ্য একটা পৃথিবী পাব! এমন একটা পৃথিবীÑ কাশ্মীর থেকে ফিলিস্তিন, প্যারিস থেকে অরল্যান্ডো, ক্রাইস্টচার্চ থেকে বৈরুত, মুম্বাই থেকে গুজরাট, পেশোয়ার থেকে কাবুল, লন্ডন থেকে বার্সেলোনা, টুইন টাওয়ার থেকে ইরাক, পেসলান থেকে ইস্তাম্বুল, ঢাকা থেকে কলম্বো যেখানে যে মারা যাবে শুধু ভাববে, এই পৃথিবীর আরও একজন মানুষ মারা গেল। এমন মৃত্যু আমরা চাই না। আজকে কলম্বোয় যে লোকগুলো মারা গেল তারাও লাল রক্তের মানুষ। কেন আমরা পরস্পরকে হত্যা করছি? কেন ভাবছি না, এই পৃথিবীর যে প্রান্তে যেই মরুক না কেন সে তো মানুষই। মানুষ হয়ে এভাবে মানুষ হত্যা করে কী আনন্দটা পাচ্ছি আমরা? এখনো সময় আছে মানবজাতি চলুন আমরা এক হই। মানবিক হই। মানবজাতিকে বাঁচাই। ভয়াবহ ধ্বংসের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করি।

রসুল (সা.) বলেন, শেষ জমানায় এমন হবে যে, হত্যাকারী বলতে পারবে না সে কেন হত্যা করেছে, মৃত ব্যক্তি জানবে না কেন তাকে হত্যা করছে।’ শ্রীলঙ্কার ঘটনা আমাদের সেটাই মনে করিয়ে দেয়। ‘যে ব্যক্তি কোনো নিরপরাধীকে হত্যা করল, সে যেন পুরো মানবজাতিকে হত্যা করল আর যে ব্যক্তি কোনো ব্যক্তিকে রক্ষা করল, সে যেন পুরো মানবজাতিকে রক্ষা করল।’ আল কোরআন।

পৃথিবীজুড়ে সন্ত্রাসবাদের কালো থাবায় প্রাণ হারানো সব মানুষের রক্তের রং লাল। কোনো ধর্মই মানুষ হত্যার কথা বলে না। কোনো রাষ্ট্রের আইন-কানুনে মানুষ হত্যার সুযোগ নেই। মানুষ হত্যার চেয়ে বর্বরতা আর কিছু হতে পারে না। মানুষের জন্য নিরাপদ পৃথিবী আজ গোটা মানবজাতির চাওয়া। সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই নয়, পথেঘাটে সবখানে আজ মানুষের একই আকুতি আর বেদনাভরা মূক। সন্ত্রাসবাদ না মানছে সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ, না মানছে রাষ্ট্রের আইন-সংবিধান। এরা অভিশপ্ত উগ্রপন্থি শক্তি- শান্তির শত্রু।

ভয়াবহ ধ্বংসলীলার পর বিশ্বনেতৃবৃন্দের শোক ও সমবেদনা নয়, মানুষের জীবনের নিরাপত্তাবিধান এবং শান্তিময় পৃথিবী তাদের কাছে প্রত্যাশা। ধর্মযাজকদের কাছেও আমাদের সমবেদনা শোনার ধৈর্য নেই। ধর্মীয় বিদ্বেষমুক্ত পৃথিবীই আমাদের চাওয়া। যে পৃথিবী মানুষের জীবনের মূল্যকেই বড় করে দেখবে। মানুষের ভুল ও অপরাধের বিচারের জন্য তার নিজস্ব রাষ্ট্রের আইন রয়েছে। আর মৃত্যুর পর বিচারের দায় তার সৃষ্টিকর্তার, সৃষ্টিকর্তার নামে উগ্র জঙ্গিবাদীদের নয়।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

apps
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত