• মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০, ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
  • ||

যে ১০ লক্ষণে বুঝবেন আপনি ডায়াবেটিস আক্রান্ত

প্রকাশ:  ২১ নভেম্বর ২০২০, ১৬:৩০
লাইফস্টাইল ডেস্ক

ডায়াবেটিস আক্রান্ত হওয়ার পর দেরিতে বোঝার কারণে অনেক রোগী বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন। এ কারণে কিছু লক্ষণ টের পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডায়াবেটিস টেস্ট করানো জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ডায়াবেটিস অশনাক্ত থাকলে বা চিকিৎসা না হলে কিডনি, লিভার, চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই সঙ্গে ত্বক নষ্ট হয়ে যায় ও চুল পড়ে যায়।

বাংলাদেশের ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক একে আজাদ খান বলেছেন, ডায়াবেটিস আছে এমন রোগীর অন্তত ৫০ শতাংশ জানেন না যে, তার ডায়াবেটিস আছে। এ কারণে ডায়াবেটিস সম্পর্কে সবার সচেতনতা বৃদ্ধি খুব জরুরি।

ডায়াবেটিস কী?

ডায়াবেটিস শব্দটি আমাদের সবার কাছেই বেশ পরিচিত। এমন কোনো পরিবার খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে কোনো ডায়াবেটিসের রোগী নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ডায়াবেটিস এখন একটি মহামারি রোগ। এই রোগের অত্যধিক বিস্তারের কারণেই সম্প্রতি এমন ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

প্রশ্ন আসতেই পারে, ডায়াবেটিস কী? আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন বলছে, ডায়াবেটিস এমনই একটি রোগ, যা কখনো সারে না। কিন্তু এই রোগকে সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

কেন হয়?

আইরিশ ইনডিপেনডেন্টের খবরে বলা হয়েছে, যখন আমরা কার্বোহাইড্রেট বা সাধারণ শর্করাজাতীয় খাবার খাই, তখন তা ভেঙে গ্লুকোজে পরিণত হয়। ইনসুলিন হচ্ছে একধরনের হরমোন। এর কাজ হলো এই গ্লুকোজকে মানুষের দেহের কোষগুলোয় পৌঁছে দেওয়া। এরপর সেই গ্লুকোজ ব্যবহার করে শরীরের কোষগুলো শক্তি উৎপাদন করে। সেই শক্তি দিয়েই রোজকারের কাজকর্ম করে মানুষ। সুতরাং যখন এই গ্লুকোজ শরীরের কোষে পৌঁছাবে না, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হবে।

যখন কারও ডায়াবেটিস হয়, তখন ওই মানুষের শরীরে ইনসুলিন হরমোনের নিঃসরণ কমে যায়। ফলে দেহের কোষে গ্লুকোজ পৌঁছাতে পারে না। এতে করে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যায়। সাধারণত প্রস্রাবের মাধ্যমে অতিরিক্ত গ্লুকোজ শরীর থেকে বের হয়ে যায়। এই কারণে ডায়াবেটিস রোগীর ঘন ঘন প্রস্রাব হয়। যখন প্রস্রাব বেশি হয়, তখন ডায়াবেটিসে ভোগা রোগী তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েন।

ডায়াবেটিসের যেসব লক্ষণ দেখলে সতর্ক হবেন-

১. ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া ও পিপাসা লাগা।

২. 'দুর্বল লাগা' ঘোর ঘোর ভাব আসা।

৩. ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া।

৪. সময়মতো খাওয়া-দাওয়া না হলে রক্তের শর্করা কমে হাইপো হওয়া।

৫. মিষ্টিজাতীয় জিনিসের প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যাওয়া।

৬. কোনো কারণ ছাড়াই অনেক ওজন কমে যাওয়া।

৭. শরীরে ক্ষত বা কাটাছেঁড়া হলেও দীর্ঘদিনেও সেটি ভালো না হওয়া।

৮. চামড়ায় শুষ্ক, খসখসে ও চুলকানি ভাব।

৯. বিরক্তি ও মেজাজ খিটখিটে হয়ে ওঠা।

১০. ক্লান্তি ও অবসাদগ্রস্ত ভাব

১১. চোখে কম দেখতে শুরু করা।

১২. অসাড়তা

১৩.রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া

১৪. ঘন ঘন ইনফেকশন

ডায়াবেটিসের লক্ষণ বিস্তারিত নিন্মে দেওয়া হলো-

১. ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া এবং পিপাসা লাগা

ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া ডায়াবেটিসের একটি অন্যতম লক্ষণ। রক্তে শর্করার পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে কিডনি প্রস্রাবের মাধ্যমে সেটি বের করে দিতে চায়। এর ফলে ঘন ঘন প্রস্রাব হয়। এ সময় পানির তেষ্টাও বেড়ে যায়। ঘন ঘন প্রস্রাবের ফলে শরীরে পানির চাহিদা বাড়ে, তাই পিপাসাও বেড়ে যায়।

২. 'দুর্বল লাগা' ঘোর ঘোর ভাব আসা।

রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে গেলে চোখে এর প্রভাব পড়তে পারে। যদি চোখের মণি স্ফীত হয় এবং আকারের পরিবর্তন হয় তবে হঠাৎ করে চোখে ঝাঁপসা দেখার সমস্যা হতে পারে।

৩. ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া।

শরীরে যখন ইনসুলিনের মাত্রা কমে যায়, তখন শরীর শর্করা ধরে রাখতে পারে না। শরীরে শর্করা প্রয়োজন হয় শক্তি জোগাতে। যখন শর্করার অভাব হবে তখন শরীরের শক্তি হ্রাস পায়। ফলে ক্যালরির চাহিদা বেড়ে গিয়ে অতিরিক্ত ক্ষুধা লাগে।

৪. সময়মতো খাওয়া-দাওয়া না হলে রক্তের শর্করা কমে হাইপো হওয়া।

৫. মিষ্টিজাতীয় জিনিসের প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যাওয়া।

৬. কোনো কারণ ছাড়াই অনেক ওজন কমে যাওয়া।

ডায়াবেটিসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য লক্ষণ হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত ওজন হ্রাস। এ সময় রক্তে শর্করার আধিক্য ওজন কমার একটি অন্যতম কারণ। দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে প্রায় ১০ থেকে ২০ পাউন্ড ওজন কমে যায়। তাই শরীরে ওজন মাত্রাতিরিক্ত হ্রাস পেলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

৭. শরীরে ক্ষত বা কাটাছেঁড়া হলেও দীর্ঘদিনেও সেটি ভালো না হওয়া।

৮. চামড়ায় শুষ্ক, খসখসে ও চুলকানি ভাব।

আমাদের শরীর ৫০ থেকে ৭৮ ভাগ পানি থাকে। ঘন ঘন প্রস্রাব ও ঘাম হওয়ার ফলে শরীর শুষ্ক হয়ে পড়ে। যার প্রভাব পড়ে ত্বকের ওপর। তাই এ সময় চামড়ায় শুষ্ক, খসখসে এবং চুলকানি ভাব হতে পারে।

৯. বিরক্তি ও মেজাজ খিটখিটে হয়ে ওঠা।

দেহে শক্তি কমে যাওয়া এবং ক্ষুধা বৃদ্ধির ফলে সব সময় খারাপ লাগা এবং বিরক্তিবোধ হতে পারে। যেহেতু শরীর শক্তি পায় না এবং কর্মক্ষম থাকে না তাই এটা আপনার মেজাজকে খিটখিটে করতে পারে।

১০. ক্লান্তি ও অবসাদগ্রস্ত ভাব

ক্ষুধার চাহিদা বাড়ার ফলে শরীর দুর্বল, ক্লান্ত ও অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। যেহেতু এ সময় শরীর শর্করার সামঞ্জস্য বজায় রাখতে পারে না, তাই এই সমস্যাগুলো হয়।

১১. চোখে কম দেখতে শুরু করা।

১২. অসাড়তা

রক্তে অতিরিক্ত শর্করার ফলে স্নায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে তাই ব্যক্তি অসাড় অনুভব করতে পারে। শুধু তাই নয়, স্নায়ু দুর্বল হলে রক্তচাপ কমে যায়। ফলে মাথা ঘোরাতে পারে, দুর্বল লাগতে পারে।

১৩. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া

ডায়াবেটিসের ফলে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। রক্তে শর্করার পরিমাণ বৃদ্ধির কারণে এই ঘটনা ঘটে। ফলে সহজে কোনো রোগ নিরাময় হতে চায় না।

১৪. ঘন ঘন ইনফেকশন

রক্তে শর্করার অসামঞ্জস্যতার ফলে ঘন ঘন বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ (ইনফেকশন) হতে পারে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার ফলে সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

কী করবেন

বাংলাদেশের ডায়াবেটিক সমিতির মহাসচিব মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন বলেছেন, যাদের ঝুঁকি রয়েছে, তাদের অবশ্যই বছরে একবার ডায়াবেটিস পরীক্ষা করাতে হবে। ডায়াবেটিস শনাক্ত হলে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

ডায়াবেটিস সম্পর্কে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা

মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে ডায়াবেটিস রোগীরা বিভিন্ন সমস্যায় পড়ছেন। করোনায় গৃহবন্দি জীবনে ডায়াবেটিস রোগীরা পড়েছেন বিপাকে। শরীরচর্চার সুযোগ কমেছে, দুশ্চিন্তা বেড়েছে, খাদ্যাভ্যাস নষ্ট হচ্ছে।

ভাইরাসের প্রকোপের কারণে ডায়াবেটিস রোগীদের নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষায় ব্যাঘাত ঘটেছে, ফলে রোগী বাড়ছে ক্রমাগত। তবে অবশ্যই যে কোনো সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

ডায়াবেটিস সম্পর্কে প্রচলিত সেসব ভুল ধারণা-

১. অনেকের ধারণা রয়েছে ডায়াবেটিস শুধু বৃদ্ধ বয়সে হয়। কিন্তু ডায়াবেটিস যে কোনো বয়সের মানুষের হতে পারে।

২. দীর্ঘদিন ডায়াবেটিসের ওষুধ খেলে বৃক্ক নষ্ট হয় বলে অনেকে মনে করেন। রক্ত পরীক্ষার ফলাফল স্বাভাবিক আসলে অসংখ্য ডায়াবেটিস রোগী এই রোগের জন্য দেয়া ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন। এমনটি মোটেও ঠিক নয়।

৩. আমরা মনে করি যারা মিষ্টি বেশি খায়, তাদেরই শুধু ডায়াবেটিস হয়। বর্তমান যুগের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা বিবেচনা করলে আমাদের প্রত্যেকেরই কম বেশি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া ঝুঁকি আছে। আর ডায়াবেটিসের জন্য যে শুধু চিনিই দায়ি তা কখনই নয়।

৪. ডায়াবেটিস হলেই মানতে হবে বিশেষ খাদ্যাভ্যাস এটা ঠিক নয়। বেশিরভাগ ডায়াবেটিস রোগীর কোনো বিশেষ খাদ্যাভ্যাসের প্রয়োজন নেই।

৫. একজন সুস্থ মানুষের সুস্থতা ধরে রাখার জন্য যে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস কিংবা জীবনযাত্রা মেনে চলা উচিত, সাধারণ ডায়াবেটিস রোগীর জন্যও সেটাই যথেষ্ট।

৬. কিছু ডায়াবেটিস রোগীর এই ইঞ্জেকশন নিতে হয় প্রতিদিন। এটি অবশ্যই চিকিৎসক পরামর্শ নিয়ে দিতে হবে।

কী করবেন

ডায়াবেটিস রোগীরা যে কোনো সমস্যায় অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চলবেন।


পূর্বপশ্চিমবিডি/জিএস

লক্ষণ,ডায়াবেটিস,আক্রান্ত
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close