• রোববার, ০৭ জুন ২০২০, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

চিকিৎসকদের আবাসিক হোটেল কর্মীদের মধ্যেও ছড়িয়েছে করোনার থাবা

প্রকাশ:  ১০ মে ২০২০, ০০:০০ | আপডেট : ১০ মে ২০২০, ০০:০৫
নিজস্ব প্রতিবেদক

গোটা বিশ্বকে অচল করে দিয়েছে মহামারি করোনাভাইরাস । নতুন আক্রান্ত রোগী ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছেই। করোনার সঙ্গে মানুষের লড়াই জীবন-মৃত্যুর। এ লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সারা বিশ্বের চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা। তারাই করোনাভাইরাসকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে চিকিৎসকরা করোনা আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা করছেন। বাংলাদেশেও কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন চিকিৎসক, সেবিকা ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। দায়িত্ব পালন শেষে তাদের অবস্থান ও দায়িত্ব শেষে কোয়ারেনটাইনে থাকার জন্য বিভিন্ন আবাসিক হোটেল বরাদ্দ করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। সেই আবাসিক হোটেলগুলোর কর্মীদের মধ্যেও ছড়িয়েছে কোভিড-১৯ সংক্রমণ। সম্প্রতি এক আবাসিক হোটেলের দুইজন কর্মীর মধ্যে কোভিড-১৯ সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া যায়। সেই হোটেলের অন্যান্য স্টাফদের কোভিড-১৯ পরীক্ষা করানো হলে তাদের মাঝেও কোভিড-১৯ সংক্রমণ পাওয়া যায়। এ অবস্থায় কর্তৃপক্ষ সেই হোটেলটি জীবাণুমুক্ত করার কাজ করেছে বলে জানিয়েছে। অধিকাংশ হোটেলেই এখনও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। আর তাই নিজেদের উদ্যোগেই স্টাফদের নিরাপত্তা সুরক্ষা নিশ্চিত করছে হোটেল কর্তৃপক্ষ।

স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে এমন অবস্থায় জীবাণুমুক্ত করাই সবচেয়ে ভালো উপায়। তবে আপাতত হোটেলে সংখ্যা বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তা। হোটেলের কর্মীদের মাঝে সংক্রমণ পাওয়া যাওয়ায় সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় যারা সেখানে থাকছিলেন তাদের। এইক্ষেত্রে সংক্রমিত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসার আশঙ্কা থাকায় ঝুঁকির মুখে পড়ে তাদের পরিবার সদস্যরাও।

হোটেল সূত্রে জানা যায়, সীমিত সংখ্যক স্টাফ দিয়ে হোটেলের কাজ চালানো হচ্ছিল। সেই অবস্থায় আসলে কীভাবে কর্মীদের মধ্যে সংক্রমণ দেখা গেছে সেটিই এখন বোঝা যাচ্ছে না। এখানে যে সকল চিকিৎসকরা থাকেন তাদের সঙ্গেও আলাদাভাবে কর্মীদের কোনোভাবেই যোগাযোগ হয় না। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজও এখানে করা হয় নিয়মিতভাবে। যাদের মাঝে সংক্রমণ পাওয়া গেছে তাদের আইসোলেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। তবে হোটেলের কেউ বাইরে যেত কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে কিছু জানা যায়নি। সেই হোটেলের চেয়ারম্যান ও ম্যানেজারকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাদের সঙ্গে কথা বলা যায়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, শুধুমাত্র হাসপাতাল বা ক্লিনিক না। বরং এখন সকল স্থানেই নিতে হবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান বলেন, ‘চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্য কর্মীরা যারা এখন বিভিন্ন হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন কোভিড-১৯ চিকিৎসা দেওয়ার জন্য তারা সবাই কিন্তু এখন ঝুঁকির মুখেই আছেন। আর তাই এক্ষেত্রে আবাসিক হোটেলেও সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা শুধু বাইরেই নয় বরং এই নিয়ম মানতে হবে সবখানেই। আর তাই হোটেলে সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে রুম সার্ভিসের ওপর নির্ভর করা। কারণ দায়িত্ব পালন শেষে হোটেলে এসে কোনোভাবেই কেউ বলতে পারবেন না তিনি সংক্রমণমুক্ত। আর হোটেলগুলিতে যদি জীবাণুমুক্ত রাখার কার্যক্রম নিয়মিত করে যাওয়া প্রয়োজন।’

এদিকে বিভিন্ন হাসপাতালে থাকা চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে দুই ধরনের চিত্র দেখা যায়। একদিকে রাজধানীর একটি হোটেলে দেখা যায়, পবিত্র রমজান মাসের ইফতারি করছে সবাই একসঙ্গে। এক্ষেত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি যেমন বেড়ে যাচ্ছে অনেকভাবেই। আবার অন্য দিকে দেখা যায়, কিছু হোটেলে সবাই এখন যেভাবে আছেন তাতে আসলে হোটেল স্টাফদের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো ব্যবস্থা নেই যার মাধ্যমে সংক্রমণ ঘটতে পারে। সুরক্ষা পোশাক পরে আসা হোটেল স্টাফরা খাওয়া দিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিবেলাতেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি চালানো হচ্ছে।

তবে কিছু আবাসিক হোটেলে খাওয়া বাইরে থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে বলেও জানা গেছে।

বর্তমান কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে আবাসিক হোটেলে কী ধরনের ব্যবস্থাপনা নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে রাজধানীর রিজেন্সী হোটেলের ম্যানেজার ইসরার ইবনে কামাল জানান, মূলত এ হাসপাতালে থাকছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) করোনা ইউনিটের চিকিৎসকরা। সেই হাসপাতালে যে রোস্টার ডিউটি দেওয়া হয়েছে সেটি আমাদেরকেও দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালে নিরাপত্তামূলক যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে আমাদের এখানেও সেই ব্যবস্থা নিয়েছি আমরা। যারা রুম সার্ভিস দিচ্ছেন তাদের জন্য হ্যান্ড গ্লোভস, মাস্ক, চশমাসহ অন্যান্য পিপিই আমরা হোটেল থেকেই দিচ্ছি। এর সঙ্গে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সাবান এগুলো তো দেওয়া হয়েই থাকে। আমাদের যে সকল স্টাফরা আছেন তারা কিন্তু হোটেলে থেকেই দায়িত্ব পালন করছেন। বাইরে যাওয়ার উপায় নেই এখান থেকে। চিকিৎসকরা এখানে যে কয়দিন থাকবেন তারাও এখানে ততদিনই থাকবেন। পরিবারের সঙ্গে দেখা করতেও তাই যাওয়া হচ্ছে না। বলতে পারেন অনেকটা আইসোলেশনের মধ্যে থেকেই এখানে সেবা দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের হোটেলে প্রবেশের মুখেই আছে জীবাণুমুক্ত করার টানেল। এ ছাড়াও সর্বোচ্চ পর্যায়ে যতরকম নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া যায় আমরা সবই করছি। সরকারের পক্ষ থেকে নয় বরং হোটেল ম্যানেজম্যান্টের পক্ষ থেকে এ সব নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা ও সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকার থেকে এখন পর্যন্ত কেউ এসে জিজ্ঞেসও করেনি যে কী অবস্থা বা কেমন আছে এখানে সবাই।’

বিভিন্ন গণমাধ্যমের পক্ষ থেকেই হোটেল স্টাফদের এই নিরাপত্তা বিষয়ে যোগাযোগ করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, `আমরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। কারণ চিকিৎসকরা আমাদের ফ্রন্টলাইন সোলজার এই কোভিড-১৯ যুদ্ধে। তাই কাউকে না কাউকে এগিয়ে আসতে হবে তাদের নিরাপত্তার কথা ভেবেও। আর এই ধরনের মহামারিতে আমাদের মালিকপক্ষের ভাবনা তাদের পাশে দাঁড়ানোর। একইসঙ্গে আমাদের ম্যানেজমেন্ট ও সকল হোটেল স্টাফও এ জন্যে কাজ করে যাচ্ছে সেবা দেওয়ায় উদ্দেশ্য নিয়েই।'

এদিকে চিকিৎসকদের জন্য বরাদ্ধ দেওয়া আরেক হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেনেসাঁ হোটেলের একজন কর্মকর্তা জানায়, সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে হোটেলের পক্ষ থেকে আমরা হ্যান্ড স্যানিটেজার, শরীরের তাপমাত্রা মাপার জন্য হিট মিটার ব্যবহার করছি। এছাড়াও জেনারেল সিকিউরিটি ব্যবস্থা ছাড়াও প্রতিটা রুমেই আমরা হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিচ্ছি। কেউ যখন হোটেলে প্রবেশ করছেন তখন সেখানে জীবাণুমুক্ত করার জন্য স্প্রের ব্যবস্থা করেছে। হোটেলের মেইনটেনেন্সের জন্য অল্প সংখ্যক স্টাফ বর্তমানে হোটেলে আছেন গেস্টদের সার্ভিস দেওয়ার জন্য। হোটেলের বাইরে থেকে কেউ আসছে না আবার কেউ হোটেল থেকে বাইরে যাচ্ছি না।' তবে সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা সুরক্ষা সামগ্রী বা কোনো কিছুই দেওয়া হয়নি বলে জানান এই কর্মকর্তা।

বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের সচিব মহসিন হক হিমেল বলেন, ‘বর্তমানে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা কোন কোন হোটেলে আছেন তা আসলে সঠিক ভাবে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। আবার দেখা যায় এইসব হোটেলের অনেকগুলোই আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য না। এই অ্যাসোসিয়েশনের মেম্বার হিসেবে আছে ৪৭টা হোটেল। স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। পরে যোগাযোগ করার কথাও জানিয়েছিল। এরপরে আমরা জানতে পারি যে স্বাস্থ্য অধিদফতর সরাসরি অনেক হোটেলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। যেহেতু স্বাস্থ্য অধিদফতর আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে কোনো হোটেলে যোগাযোগ করেনি তাই আমরা আসলে নিরাপত্তা বা সুরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে আলাদাভাবে কিছু বলি নি। যদি যোগাযোগ করে তখন আমরা অফিসিয়ালি সবাইকে সুরক্ষামূলক নির্দেশনা ব্যবস্থা দেব সবাইকে।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে যে হোটেলগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্য কর্মীদের জন্য সেখানের সুরক্ষাব্যবস্থা কারা দেখবে?

এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আমিনুল হাসান বলেন, ‘এটি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করতে হবে।’

তবে আপাতত কোনো হোটেল পরিবর্তন করা হবে না বলেও জানান ডা. আমিনুল হাসান।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘যে সব হোটেলের কর্মীরা আক্রান্ত হচ্ছেন সেই সব হোটেলকে জীবাণুমুক্ত রাখার কাজ করা হচ্ছে। আজকে যদি কোনো হাসপাতালের কেউ আক্রান্ত হয় তবে সেই হাসপাতালকে সংক্রমণমুক্ত করার পদ্ধতি আছে। হোটেলেও যদি হয় তবে সেই জায়গাকে সংক্রমণমুক্ত করার পদ্ধতি আছে। সেইগুলো অ্যাপ্লাই করা হচ্ছে।’

যদি প্রয়োজন হয় তবে হোটেলের সংখ্যাও বাড়ানো হবে বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ।

উল্লেখ্য, রাজধানীতে নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) আক্রান্তদের জন্য চিকিৎসাসেবা দানকারী চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের থাকার জন্য ২০টি হোটেল নির্ধারণ করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। ১২ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. মো. আমিনুল হাসান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর এ বিষয়ে চিঠি পাঠান। ১৪ এপ্রিল এই সিদ্ধান্তের কথা জানা গেছে।

চিঠিতে নভেল করোনাভাইরাস আক্রান্তদের জন্য নির্ধারিত ছয়টি হাসপাতালের নাম উল্লেখ করা হয়। এই সব হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স অন্যান্য স্বাস্থ্য সেবাদানকারী সদস্যের জন্য নির্ধারিত ২০টি হোটেলের নামসহ প্রয়োজনীয় কক্ষের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়।

রাজধানীসহ সারাদেশে মোট ৬২৪ জন চিকিৎসক করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত হয়েছেন। শুক্রবার (৮ মে) ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি রাইটস অ্যান্ড রেসপন্সিবিলিটিস (এফডিএসআর) থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।হালনাগাদ তথ্যে জানা যায়, চিকিৎসকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন ঢাকায়-৪৪৫ জন। এছাড়া বরিশালে ৯ জন, চট্টগ্রামে ১৮ জন, সিলেটে ৩৪ জন, খুলনায় ৪৪ জন, রংপুরে ১০ জন, ময়মনসিংহে ৬১ এবং রাজশাহী বিভাগে ৩ জন।গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম শনাক্ত হয় করোনাভাইরাস।

পূর্বপশ্চিমবিডি/জিএম

মহামারি করোনাভাইরাস,চিকিৎসক,নার্স,স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা,আবাসিক হোটেল
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close