• সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২০, ১৬ চৈত্র ১৪২৬
  • ||

করোনায় কোন বয়সী মানুষের ঝুঁকি কেমন?

প্রকাশ:  ২৫ মার্চ ২০২০, ০০:০৬
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক
মঙ্গলবার ঢাকা ছাড়তে কমলাপুর রেলস্টেশনে মানুষের ভিড়। ছবি: পূর্বপশ্চিম

করোনাভাইরাস সৃষ্ট কভিড-১৯ সংক্রমণ রোগে বিশ্বজুড়েই তটস্থ অবস্থা। এই রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসা ও পরিচর্যার বিষয়টিকে চার ভাগে ভাগ করা হচ্ছে। প্রথমত, কত শতাংশ এই রোগে আক্রান্ত হলেন। তাদের কত শতাংশকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। তাদের মধ্যে কতজনকে আবার নিবিড় পরিচর্যায় (আইসিইউ) রাখতে হবে। আর কতজন মারা যাচ্ছেন। রোগীর বয়স ভেদে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই তারতম্য দেখা যায়।

যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম ভক্স নিউজ করোনা ভাইরাস উপদ্রুত প্রধান পাঁচটি দেশ, অর্থাৎ চীন, ইতালি, স্পেন, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া উপাত্ত ব্যবহার করে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছে।

প্রথমে আসা যাক ১০ বছরের কম বয়সী শিশুদের ঝুঁকি কতখানি।

শিশু (০-৯ বছর বয়সী)

স্পেনে ২১শে মার্চ নাগাদ করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন ২৮৬০০ জন। এদের মধ্যে ১০ বছরের কমবয়সী আছেন মাত্র ১২৯ জন। আক্রান্তদের মাত্র ৩৪ জন, অর্থাৎ ২৬ শতাংশকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। ১ জনকে (০.৮ শতাংশ) আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দিতে হয়েছে। মারা যাননি একজনও।

ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনে ১০ বছরের কম বয়সী কেউ মারা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রে ২০ বছরের কম বয়সী কাউকে এখন পর্যন্ত আইসিইউতে ভর্তি করতে হয়নি, মারাও যাননি। এই বয়সের মাত্র ১.৬ শতাংশ রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে।

এই বয়স শ্রেণির মধ্যে একেবারে যারা হাঁটতে পারে না, তাদের ঝুঁকি একটু বেশি। সেই তুলনায় যারা হাঁটতে পারে ও স্কুলে ভর্তি হয়েছে, তাদের ঝুঁকি অতটা নেই। এই বয়স শ্রেণির শিশুদের হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে কম।

কিশোর (১০-১৯ বছর বয়সী)

স্পেনে এই বয়স শ্রেণির করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ২২১ জন। এদের মধ্যে ১৫ জনকে (৭ শতাংশ) হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। এদের কেউই আইসিইউতে ভর্তি হননি। মারা গেছেন ১ জন (০.৪ শতাংশ)। ইতালি ও দক্ষিণ কোরিয়ায় এই বয়স শ্রেণির কেউই মারা যায়নি। চীনে এই বয়সীদের ০.২ শতাংশ মৃত্যুবরণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ১০-১৯ বছর বয়সী কাউকেই আইসিইউতে ভর্তি করতে হয়নি। মারাও যায়নি। ১.৬ শতাংশ রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

কিশোর-কিশোরীরা দৃশ্যত শিশুদের চেয়েও বেশি প্রতিরোধক্ষম। স্পেনে শিশুদের চেয়েও অনেক কম হারে কিশোর-কিশোরীদের হাসপাতালে বা আইসিইউতে ভর্তি করতে হয়েছে। তারপরও তাদেরও জটিলতা বা মৃত্যুর ঝুঁকি কিছুটা হলেও আছে।

প্রাপ্তবয়স্ক তরুণ (২০-২৯ বছর বয়সী)

স্পেনে এই বয়স-শ্রেণির রোগীর সংখ্যা ১২৮৫। শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের তুলনায় এই হার অনেক বেশি। আক্রান্তদের মধ্যে ১৮৩ জনকে (১৪ শতাংশ) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ৮ জনকে (০.৬ শতাংশ) আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। ৪ জন (০.৩ শতাংশ) মারা গেছেন। ইতালি ও দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০-২৯ বছর বয়সী কেউ মারা যায়নি। চীনে মারা গেছেন ০.২ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক তরুণ-তরুণী।

যুক্তরাষ্ট্রে ২০-৪৪ বছর বয়সী রোগীদের হিসাব করা হয়েছে। তাদের সংখ্যা বেশ বড়ই হবে। এই বয়স-শ্রেণির ১৪.৩ শতাংশকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ২ শতাংশ আইসিইউতে ভর্তি হন। ০.১ শতাংশ হলো মৃত্যুর হার।

কিশোর-কিশোরী ও সদ্য তরুণদের চেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক তরুণদের হাসপাতালে ও আইসিইউতে ভর্তি হওয়ার হার বেশি। মৃতের হার অবশ্য কমই আছে। তারপরও এই বয়স- শ্রেণির বেশ অনেকেই মারা যান।

প্রাপ্তবয়স্ক ও মধ্যবয়সী (৩০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী)

স্পেনে এই বয়সশ্রেণির মধ্যে ৫১২৭ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে ১০২৮ জনকে (২০ শতাংশ) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ১.১ শতাংশ বা ৫৫ জনকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। মারা গেছেন ৩ জন। অর্থাৎ, মৃতের হার ০.২ শতাংশ। ইতালিতে এই বয়সীদের মৃতের হার ০.৩ শতাংশ, চীনে ০.২ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ০.১ শতাংশ।

আগেই যেমনটা বলা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে ২০-৪৪ বছর বয়সীদের হিসাব করা হয়েছে। এই বয়সীদের হিসাব আগেই দেয়া হয়েছে। ৪৫-৫৪ বছর বয়সীদের আরেক হিসাব আছে যুক্তরাষ্ট্রের। তাদের মধ্যে ২১.২ শতাংশকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, ৫.৪ শতাংশকে আইসিইউতে। মারা যায় ০.৫ শতাংশ।

এই বয়সশ্রেণির মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি ৫ জনের ১ জন। যুক্তরাষ্ট্রের দুই বয়সশ্রেণির হিসাব আছে। ফলে দেখা যাচ্ছে যে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সব বিভাগেই ঝুঁকি বাড়ে। একই ট্রেন্ড দেখা গেছে স্পেনেও। সেখানে ৩০-৩৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ১৭ শতাংশকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। কিন্তু ৪০-৪৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ২৩ শতাংশ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

অবসরকালীন ব্যক্তিরা (৫০-৬৯ বছর বয়সী)

স্পেনে এই বয়সীদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ৬০৪৫ জন। এদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ, অর্থাৎ ২১৬৬ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ৩.৭ শতাংশ বা ২২১ জনকে আইসিইউতে রাখা হয়। মোট ৮৩ জন বা ১.৪ শতাংশ মারা গেছেন। ইতালি, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ায় এই বয়সীদের মৃত্যুর হার ০.৪ শতাংশ থেকে ৩.৬ শতাংশ!

যুক্তরাষ্ট্রে ৪৫-৫৪ বছর বয়সীদের হিসাব আগেই দেয়া হয়েছে। হাসপাতাল ২১.২ শতাংশ, আইসিইউ ৫.৪ শতাংশ, মৃত্যু ০.৫ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে ৫৫-৬৪ বছর বয়সীদের আলাদা হিসাব আছে। তাদের মধ্যে ২০.৫ শতাংশ হাসপাতালে ও ৪.৭ শতাংশ আইসিইউতে ভর্তি হন; মারা গেছেন ১.৪ শতাংশ। অর্থাৎ দুই শ্রেণির মধ্যে বেশি বয়সীদের মধ্যে মারা যাওয়ার হার অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে ৬৫-৭৪ বছর বয়সীদের আলাদা হিসাব করেছে। এদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তির হার ২৮.৬ শতাংশ। আইসিইউতে ভর্তির হার ৮.১ শতাংশ। মৃতের সংখ্যা ২.৭ শতাংশ।

এই বয়সী সবাই উচ্চ ঝুঁকিতে আছেন। প্রচুর মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। প্রতি ১০০ জনে মৃতের হারও বেশি। এই বয়সীদের ঝুঁকি বাড়ে যদি তাদের হৃদরোগ বা ফুসফুসের সমস্যা, ডায়াবেটিস বা ক্যান্সার থাকে।

বৃদ্ধ (৭০ বছর বয়সী ও তদূর্ধ্ব)

স্পেনে এই বয়সীদের মধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন ৬১৫২ জন। এদের ৫৫ শতাংশ বা ৩৩৮৮ জনকেই হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে! ১৯৯ জনকে (৩.২ শতাংশ) আইসিইউতে রাখতে হয়েছে। বৃদ্ধদের মধ্যে ৭০৫ জন বা ১১.৪ শতাংশ মারা গেছেন। ইতালি, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ায় এই বয়সীদের মারা যাওয়ার হার ৬.২ শতাংশ থেকে ২০.২ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের বেলায় ৭৫ বছর বয়সী ও তদূর্ধ্বদের হিসাব আছে। ৭৫-৮৪ বছর বয়সীদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তির হার ৩০.৫ শতাংশ, আইসিইউ ভর্তির হার ১০.৫ শতাংশ। মারা যাওয়ার হার ৪.৩ শতাংশ। এদের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। ৮৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সীদের ঝুঁকি আরো বেশি। ৩১.৩ শতাংশ হাসপাতালে, ৬.৩ শতাংশ আইসিইউতে। ১০.৪ শতাংশ মারা গেছেন।

বৃদ্ধদের মধ্যে আইসিইউ ভর্তির হারের চেয়ে মারা যাওয়ার হার বেশি। এর কারণ হলো, অনেকের মধ্যে এই রোগ এত দ্রুত হারে সংক্রমণ করে যে, আইসিইউতে ভর্তির সুযোগও তাদের হয় না। তারা যে কতটা ঝুঁকিতে আছেন, তা বুঝতে বাকি নেই কিছু। এই বয়স শ্রেণির মানুষের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ও মারা যাওয়ার হার সবচেয়ে বেশি।

প্রসঙ্গত, রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন পর্যন্ত ৩৯ জন কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন চারজন।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

করোনাভাইরাস
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close