• সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ৪ ফাল্গুন ১৪২৬
  • ||

গরীবের ডাক্তার লিটু (৪র্থ ও ৫ম পর্ব)

প্রকাশ:  ১৭ জানুয়ারি ২০২০, ০১:২৭
ডা. মাহবুবর রহমান

সেন্ট্রাল রোডের লাল ইটের দালানে শিল্পী উত্তমদার আল্পনায় আঁকা টোনাটুনির নতুন সংসার। সেই সংসারে সর্বদা স্বপ্নের বসবাস। মাঝে মধ্যে সঞ্জীব, নির্মল, স্বপনদা, অভিলাষ, জোটন এবং আমি সহ অনেকে সেখানে যখন তখন হামলা করি। জজ গলির রফিক মিয়ার দুধ চায়ের অভাব শিমুর হাতে মিটে গেছে। উত্তমের একতারায় বেজে ওঠে বাউলের সুর। আর লিটুর স্বভাবসুলভ কন্ঠে লালনগীতি পায় নতুন প্রাণ-

“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি, মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি।

এই মানুষে মানুষ গাঁথা

গাছে যেমন আলকলতা।

জেনে শুনে মুড়াও মাথা

জাতে ত্বরবি।

দ্বিদলে মৃণালে

সোনার মানুষ উজলে।

মানুষ গুরুর কৃপা হলে জানতে পাবি।

এই মানুষ ছাড়া মন আমার

পড়বি রে তুই শূন্যকার।

লালন বলে মানুষ আকার

ভজলে তারে পাবি।

লালনের পূন্যস্মৃতি বৃহত্তর কুষ্টিয়ার আলো বাতাসে বড় হওয়া লিটুর রক্তে মানুষের প্রতি আজন্ম দায়বদ্ধতা ।এই মানুষই লিটুর সকল কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য।

আরজ আলী চুয়াডাঙ্গার একটি অজপাড়াগাঁয়ের দরিদ্র কৃষক। ডা লিটুর একই গ্রামে তার বাড়ি। চাষাবাদের পাশাপাশি গ্রামের জুম্মা মসজিদে পাঁচ বেলা আজান দেয়। মুয়াজ্জিন। কৃষকের শরীর বেঁচেই বাঁচতে হয়। কিন্তু কিছুদিন ধরে কোন পরিশ্রমের কাজ করতে পারে না। পাঁচ দশ মিনিট কাজ করলেই হাফ লেগে যায়। ধার কর্জ করে বাস ভাড়া জোগাড় করে ঢাকায় ডা লিটুর চেম্বারে উপস্থিত হল। তার আশা লিটু ডাক্তার কিছু একটা উপায় বের করে দিবে। লিটু প্রভাব খাটিয়ে বিনে পয়সায় সব পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দিল। হাসপাতালের ওয়েটিং রুমে থাকার ব্যবস্থা করে খাবার টাকাও দিল। কিন্তু আরজ আলীর দুর্ভাগ্য। তার হার্টের দু’টো প্রধান ভাল্ভই নষ্ট হয়ে গেছে। ভাল্ভ বদল করতে না পারলে মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু এত টাকার সংস্থান কীভাবে হবে?

উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজের হৃদরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা লিটু। তার হাসপাতালের পিয়ন সেতারা বেগম। তার কুড়ি বছরের যুবক ছেলের দু’টি কিডনীই নষ্ট হয়ে গেছে। নিয়মিত ডায়ালাইসিস ছাড়া তার বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু এই ব্যয়বহুল চিকিৎসার ভার সেতারা বেগম কী করে বহন করবে?

এরকম সারা দেশ থেকে কত শত রোগী আসে তার কাছে। কেউ আসে হৃদরোগ নিয়ে, কেউ আসে অন্য রোগ নিয়ে। যে রোগই হোক লিটুর কাছে এলে একটা উপায়, একটা পথ পেয়েই যায় তারা। একটা ভরসার জায়গা লিটু। কিন্তু দরিদ্র রোগীদের সব সমস্যার সমাধান সে একা কীভাবে করবে?

নিজের গৃহ, স্ত্রী-সন্তান, নিজের দায়িত্বশীল পেশা সবকিছু ছাপিয়ে লিটুর হৃদয় কেবল এইসব নিঃস্ব মানুষদের জন্য কিছু করবার জন্য ছটফট করে। তার হৃদয় “দেবার ব্যথায় “ আক্রান্ত হয়। সে নিজের দিকে না তাকিয়ে চারিদিকের মুখের মাংস ঝুলে পড়া অসহায় মানুষগুলোর পান্ডুর দৃষ্টির দিকে তাকায়।

সে সমাজের নানান স্তরের চিন্তাশীল দার্শনিক মানুষের সংস্পর্শে যেতে থাকে। তাঁদের কাছে নিজের বেদনার কথা, আকাঙ্খার কথা ব্যক্ত করে। কী করে সমাজের এইসব প্রান্তিক মানুষগুলোকে একটা সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনা যায়, নিদেনপক্ষে একটি সহজপ্রাপ্য স্বাস্থ্যবীমা চালু করা যায় - এসব চিন্তা সর্বদা তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।

সে সমাজের অন্ধগলিতে পথ খুঁজে বেড়ায়। প্রাণহীন বিবেকের রুদ্ধদ্বারে করাঘাত হানে।

মানুষের কাছে পথনির্দেশ চায়। অবশেষে সে নিজেই একটি আলোকরেখার সন্ধান খুঁজে বের করে।

সে সমাজের বিভিন্ন স্তরে একটি সংলাপের সূচনা করে। সভায়, সেমিনারে, টেলিভিশনের টকশো-তে সর্বত্র সে বিষয়টি নিয়ে আলোকপাত করতে থাকে। সে

“রোগী কল্যান তহবিল “ বা পেশেন্ট ওয়েলফেযার ফাউন্ডেশন নামে একটি ব্যানার সৃষ্টি করে। অধ্যাপক কাজী শহীদুল আলম, অধ্যাপক সোহরাব আলী, সুলতানা কামাল, এডভোকেট এলিনা খান, টিআইবি’র সচিব ইফতেখারুজ্জামান, জানেসার ওসমান, সাইফুজ্জামান বাদশাহ ,নাইমুল আহসান জুয়েল, আকরামুল হক , দেলোয়ার হোসেন, স্বপন রায়, আজম খান, সঞ্জীব পুরোহিত, শ্যামল দত্ত, স্বদেশ রায়, পীর হাবিবুর রহমান, নঈম নিজাম, শিশির মোড়ল, মূকাভিনেতা পার্থপ্রতিম মজুমদার , স্বদেশ সাহা, অভিলাষ দাস, উত্তম ঘোষ সহ আরো অসংখ্য গুনগ্রাহী কর্মবীর মানুষদের নিয়ে দফায় দফায় মিটিং করে কর্মকৌশল ঠিক করে। তারপর জাতীয় গ্রন্থাগারে কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে , পরে জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়নে মত বিনিময় সভা করে রোগী কল্যান তহবিলের মূলভিত্তি রচনা করে।

সর্পিলাকার দীর্ঘ রেলগাড়ীকে যেমন একটিমাত্র ছোট ইঞ্জিন টেনে হিচড়ে ঠেলে তার গন্তব্যে নিয়ে যায় তেমনি লিটু একাই ইঞ্জিনের মত রোগী কল্যান তহবিলকে সামনে এগিয়ে নিয়ে চলল। তার ইচ্ছেশক্তির দৃঢ়তায় , একনিষ্ঠ একাগ্রতায় এবং সর্বোপরি সততার স্বচ্ছতায় বিবেকবান মানুষের অভূতপূর্ব সাড়া পড়ে গেল।

৫ম পর্ব

সিসিইউ বেড ১৬। সকাল সাতটা থেকে এখানে আছে লিটু। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। তার বিছানা ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে রাজা বাদশা সম্রাট। তার তিনটি অবুঝ সন্তান।

-আঙ্কেল, বাবার কী হয়েছে? শ্বাসকষ্ট হচ্ছে কেন?

-তেমন কিছু হয়নি বাবা। সব ঠিক হয়ে যাবে।

সবচেয়ে ছোট পাঁচ বছরের সম্রাট। তার ঘন পল্লবিত চোখের ভেতরে একরাশ ভীতি ও বিস্ময়। বাবা তো ডাক্তার। সে তো অন্য রোগীর শ্বাসকষ্ট ভাল করে দেয়। তবে তার কষ্ট হচ্ছে কেন?

আমি তাকে আদর করে বললাম, ‘চল বাবা, মায়ের কাছে চল। বাবা একটু ঘুমাক। ঘুমালে শ্বাসকষ্ট কমে যাবে।

অক্সিজেন মাস্কের ভেতর দিয়ে লিটু বলল, “বড়দা , এখন ভাল লাগছে। আমাকে এখন ওষুধেই রাখেন। সমস্যা হল আগামীকাল শুক্রবার আমাদের অনুষ্ঠান । পেশেন্ট ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন এর বিশেষ কর্মশালা ও সদস্য সংগ্রহ কর্মসূচী। সবাইকে দাওয়াত দেয়া হয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে আছে। “

এই হল সমস্যা। দেবার ব্যথা। নিজে হৃদরোগে আক্রান্ত। কিন্তু মানুষের জন্য তার হৃদয় ব্যাকুল হয়ে আছে। নিজের জীবনে কোন শৃংখলা নেই। বিশ্রাম নেই। চেক আপ নেই। চিকিৎসা নেই। সারাদিন খাঁটুনির পরে রাত তিনটা চারটা পর্যন্ত রোগী দেখে এ্যানজিওগ্রাম, এ্যানজিওপ্লাস্টি করে ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে বাড়ি ফেরা। তার বহু আগে রাজা বাদশা সম্রাট গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। শুধু একজন শিমু কান খাড়া করে অতন্দ্র বসে আছে কলিং বেলের অপেক্ষায় । (ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

লেখক: সিনিয়র কার্ডিওলজিস্ট, ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল

পূর্বপশ্চিমবিডি/জিএম

গরীবের ডাক্তার লিটু,ডা. মাহবুবর রহমান,ফেসবুক স্ট্যাটাস
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close