• বুধবার, ০৬ জুলাই ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯
  • ||

সুযোগ বুঝে খেজুরের দাম বাড়াচ্ছেন ব্যবসায়ীরা

প্রকাশ:  ০১ এপ্রিল ২০২২, ০০:৩২
নিজস্ব প্রতিবেদক

সারা বছর যে পরিমাণ খেজুর বিক্রি হয়, তার কয়েক গুণ বেশি বিক্রি হয় শুধু রোজার মাসে। বিক্রি বাড়ার কারণে গত ১৫ দিনে খেজুরের দাম মান অনুযায়ী কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

ইফতারির অন্যতম অনুষঙ্গ খেজুর। রোজার মাসে সব শ্রেণির মানুষের চাহিদায় থাকে এটি। বাড়তি চাহিদা এবং বিশ্ববাজারের অজুহাতে এবার বেড়ে গেছে খেজুরের দাম।

কয়েক দিন পরই শুরু হচ্ছে রমজান মাস। রোজা সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা এরই মধ্যে বাড়িয়েছেন খেজুরের মজুত। রাজধানীর ফলের বড় পাইকারি বাজার বাদামতলী এখন খেজুরে ঠাসা। তবে গেল বছরের চেয়ে এবার দাম কিছুটা বেশি। দেখা যায়, চাহিদা বাড়লেই সুযোগ নেয় অসাধু সিন্ডিকেট। অথচ বাজারে কোনো নজরদারি নেই।

কনজ্যুমার ফোরামের সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন মালেক জানান, তেল, চিনি, ডালের সঙ্গে রোজায় প্রয়োজনীয় ফলের দামও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। তদারকি ব্যবস্থা শুধু তেলের বাজারেই দেখা যাচ্ছে। কিন্তু অন্য ক্ষেত্রেও নজরদারি বাড়ানো দরকার।

বাদামতলীতে প্রায় ২৪ জাতের খেজুর বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় মরিয়ম, আম্বার, আজওয়া, শুককারি, ছড়া, ছক্কা, সুগাই, গাওয়া, তিনপল, মাজদুল, মাবরুম, জিদাহি, সায়ের, কালমি, মাসরুক, ফরিদা, বাটি, ম্যাকজুয়েল, মাবরুল, আদম, কিমি, দাবাস, কাউন দাবাস, খালাসসহ বিভিন্ন নামের খেজুর পাওয়া যায়। যদিও ক্রেতারা অল্প কয়েকটির নাম জানেন।

ব্যবসায়ীরা জানান, সারা বছর যে পরিমাণ খেজুর বিক্রি হয়, তার কয়েক গুণ বেশি বিক্রি হয় শুধু রোজার মাসে।

এবারও রোজাকেন্দ্রিক খেজুর বিক্রি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। বিক্রি বাড়ার কারণে গত ১৫ দিনে খেজুরের দাম মান অনুযায়ী কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

বাদামতলীর পাইকারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে ম্যাকজুয়েল খেজুরের দাম সবচেয়ে বেশি চড়া। পাঁচ কেজির এক কার্টন ম্যাকজুয়েল বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৫ হাজার থেকে সাড়ে ৬ হাজার টাকায়। কিছুদিন আগে একই মানের খেজুর বিক্রি হয়েছে ৫ হাজার থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকার মধ্যে।

এরপরেই মাবরুম পাঁচ কেজির এক কার্টন বিক্রি হচ্ছে তিন হাজার ২০০ থেকে তিন হাজার ৩০০ টাকায়।

এক কার্টন নাগাল খেজুর ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মার্চের মাঝামাঝি যা ছিল ১৩৫০ থেকে ১৪০০ টাকার মধ্যে।

আবার ১০ কেজির এক কার্টন খালাস খেজুর বিক্রি হচ্ছে ১২০০ থেকে ১২৫০ টাকায়, যা ১০ দিন আগেও ১১৫০ টাকায় বিক্রি হয়।

একইভাবে কিছুদিন আগে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা বিক্রি হওয়া পাঁচ কেজির কিমি খেজুরের কার্টন এখন বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৫৫০ টাকায়।

দাবাস খেজুরের দাম কেজিতে ১০-১৫ টাকা বেড়েছে। ১০ কেজির দাবাস কার্টন বিক্রি হচ্ছে ২৫০০ টাকায়। আর পাঁচ কেজির কার্টন বিক্রি হচ্ছে ১০৫০ থেকে ১১০০ টাকায়।

মাসরুর ১ হাজার ৯০০ টাকা, কালমি ১ হাজার ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, আজওয়া ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

জিহাদি খেজুর ১০ কেজির কার্টন বিক্রি হচ্ছে ১০৩০ থেকে ১০৫০ টাকা, সায়ের ১০৫০ থেকে ১০৭০, লুলু ১৬৫০ থেকে ১৭০০ ও মাসরুক ১৯০০ থেকে ১৯৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে।

পাঁচ কেজির ফরিদা ৮০০ থেকে ৮৩০ টাকা, কালমি ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০, মাবরুম ১ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৩০০, আদম ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৭৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছে খেজুর। বাহারি নাম এবং মানের খেজুরে ভরে গেছে বাজার। যতই রোজা এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে বিক্রি।

দেশে বছরে প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন খেজুরের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে পবিত্র রমজানেই চাহিদা ২৫ হাজার মেট্রিক টন। ফলে প্রতি বছরই এর প্রভাব পড়ে দামে।

খেজুর আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রোজা সামনে রেখে এবার প্রায় ৫০ হাজার টন খেজুর আমদানি হয়েছে, যেখানে রমজান মাসে চাহিদা রয়েছে ৩৫ হাজার টনের কিছু বেশি।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর অন্তত ৪০টি দেশে খেজুর উৎপাদন হয়। এসব দেশে ২০১৯ সালে ৯২ লাখ টন খেজুর উৎপাদিত হয়েছে।

খেজুর উৎপাদনের শীর্ষে রয়েছে মিসর। এর পরে রয়েছে সৌদি আরব, ইরান, আলজেরিয়া এবং ইরাক।

পাইকারি বাজারের চেয়ে খুচরা বাজারে কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে খেজুরের দাম।

ঢাকার সাধারণ খুচরা বাজারে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকার কেজির মধ্যে সাধারণ খেজুর পাওয়া যায়। মানভেদে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয় বরই, ধাবাস, মদিনা-মনোয়ারা ইত্যাদি জাতের খেজুর।

ব্যবসায়ীরা সরবরাহ ভালো থাকার দাবি করলেও ভালো মানের আজোয়া ও মরিয়ম খেজুরের দাম খুচরা বাজারে চড়া।

পাইকারিতে মরিয়ম খেজুরের দাম ৭০০ টাকা হলেও খুচরা বাজারে এক কেজি খেজুর কিনতে হচ্ছে ৮৫০ থেকে ১৫০০ টাকায়। অন্যদিকে খুচরা বাজারে আজোয়া খেজুর বিক্রি হচ্ছে ১২০০ থেকে ২০০০ টাকা কেজি দরে।

তবে বাজারে গিয়ে কেনার ঝক্কি এড়াতে অনেকে এবার অনলাইনেও এসব পণ্য কিনছেন।

কয়েকটি অনলাইন ই-কমার্স সাইট ঘুরে দেখা যায়, প্যাকেটজাত ধাবাস, বরই ইত্যাদি খেজুর ৪৫০ থেকে ৭৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

এ ছাড়া মরিয়ম খেজুর মানভেদে ১ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ২ হাজার টাকা এবং আজওয়া পাওয়া যাচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা কেজিতে।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে সাধারণ খেজুরের দাম গত বছরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। সাধারণ মানের খেজুর এখন কেজিপ্রতি ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। গত বছর দর ছিল ১২০ থেকে ৩০০ টাকা।

খুচরা বাজারে খেজুরের দাম নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই। ফলে রোজা যতই এগিয়ে আসছে, ততই খেজুরের পেছনে বাড়ছে ভোক্তা ব্যয়। অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের খেজুর ভোক্তাকে চড়া দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে।

তবে নিম্নমানের খেজুর যাতে বাজারে ছড়িয়ে পড়তে না পারে সে জন্য জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর তদারকি করবে বলে জানা গেছে।

ভোক্তা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘খেজুরের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তদারকি করা হবে। আমদানি মূল্য যাচাই এবং পরিবহন খরচসহ যৌক্তিক বিক্রয় মূল্য যাচাই করা হবে। কোনো অনিয়ম পেলেই দেয়া হবে কঠোর শাস্তি। গত বছরের অনেক খেজুর অবিক্রীত ছিল। নিম্নমানের ও মেয়াদোত্তীর্ণ খেজুর যাতে বাজারে ঢুকতে না পারে সে জন্য তদারকি জোরদার করা হবে।’

পূর্ব পশ্চিম/জেআর

খেজুর
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close