• মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২১, ৫ মাঘ ১৪২৭
  • ||

আরোপ নয়, উদ্ভাবনেই সাফল্য পেয়েছেন শিবলী রুবাইয়াত

প্রকাশ:  ১২ জানুয়ারি ২০২১, ১৪:৫৯
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক
শিবলী রুবাইয়াত

১৯৯৬ সালের পর ২০১০-এ পুঁজিবাজার ধসের কারণে এ খাতটির স্থিতিশীলতা নিয়ে কপালে ভাঁজ পড়ে নীতিনির্ধারকদের। বাজারের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ২০১১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্সের অধ্যাপক ড. এম খায়রুল হোসেনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুনর্গঠন করা হয়। দীর্ঘ নয় বছরের মেয়াদে খায়রুল কমিশন আইনি কাঠামো তৈরি করলেও অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলোর বাস্তবায়ন করতে পারেনি। বাজার-সংশ্লিষ্টরাও কমিশনের আরোপিত অনেক সিদ্ধান্তই ভালোভাবে নেয়নি। তবে গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন ও ফাইন্যান্সের অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বে বিএসইসির নতুন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে অনেকটাই পাল্টে গেছে পুঁজিবাজারের পরিস্থিতি। খায়রুল কমিশন অনেক চেষ্টা করেও যেসব বিষয় বাস্তবায়ন করতে পারেনি, সেগুলো অনায়াসেই সম্পন্ন করেছে শিবলী কমিশন। এক্ষেত্রে আরোপ নয় বরং উদ্ভাবনী নীতির কারণেই শিবলী কমিশন সাফল্য পেয়েছে বলে মনে করছেন বাজার-সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশের জিডিপি ও মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশনের অনুপাত বিশ্বে অন্যতম সর্বনিম্ন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, এক দশক ধরেই পুঁজিবাজার একপ্রকার মন্দাবস্থার মধ্যে ছিল। বিনিয়োগকারীরাও হয়ে পড়েছিলেন বাজারবিমুখ। নতুন নেতৃত্বে নতুন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। যার কারণে পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। কমিশনের নতুন নেতৃত্ব শুধু বাজারবান্ধবই নন, শক্তভাবে বাজারে শৃঙ্খলা আনতেও বদ্ধপরিকর। অতীতে পুঁজিবাজারকে জুয়ার ক্যাসিনো হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়েছে। মানুষ এখন আগের চেয়ে শিক্ষিত। মানুষ এখন সঠিক শেয়ার বেছে নিচ্ছে। যখনই কোনো সন্দেহ দেখা যাচ্ছে, তখনই নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ সময়মতো পদক্ষেপ নিচ্ছে। এছাড়া যেসব ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে চায়, কমিশন থেকে দ্রুতই সিদ্ধান্ত দেয়া হচ্ছে। দীর্ঘসূত্রতার পুরনো দিন এখন আর নেই। করোনা মহামারীর মধ্যেও সম্প্রতি আমাদের পুঁজিবাজারের লেনদেন ১৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বহুজাতিক কোম্পানি বাজারে এসেছে। এছাড়া সুকুক বন্ডের মাধ্যমে বন্ডের বাজারও তৈরি হয়েছে। আর এসব পদক্ষেপের ফল এ বছর দেখা যাবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস পুঁজিবাজার আয়তন ও কলেবরে আরো বড় হবে।

দেশের পুঁজিবাজারে ২০১০ সালের ধসের পর নানা উত্থান-পতন হলেও সার্বিকভাবে প্রাণচাঞ্চল্য ছিল না। এর মধ্যে ২০১৮ সাল থেকে পুঁজিবাজারে সার্বিক নিম্নমুখিতা দেখা যায়। এ সময় থেকে বাজার ছাড়তে থাকে বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও। দরপতন চরমে উঠলে রাস্তায় নেমে আসেন বিনিয়োগকারীরা। এর মধ্যেই গত বছরের মার্চে দেশে শুরু হয় নভেল করোনা সংক্রমণ। পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা এবং করোনা আতঙ্কে আবারো ধসের শঙ্কা দেখা দেয় পুঁজিবাজারে। সূচক নেমে যায় ৩ হাজার ৬০০ পয়েন্টে। সূচকের দরপতন ঠেকাতে বিএসইসি সব শেয়ারের সর্বনিম্ন দর বেঁধে দেয়। এতে দরপতন ঠেকানো সম্ভব হলেও প্রাণ ফিরে আসেনি। গত বছরের ২৫ মার্চ থেকে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির কারণে বন্ধ হয়ে যায় পুঁজিবাজারের লেনদেন। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা না থাকায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে ডিজিটাল মাধ্যমে পুঁজিবাজার চালু রাখা সম্ভব হয়নি। বাজারের এ অবস্থার মধ্যেই বিদায় নেয় খায়রুল কমিশন। শিবলী কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পরেই প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল বন্ধ থাকা পুঁজিবাজারে আবার লেনদেন চালু করা। দীর্ঘ ৬৬ দিন বন্ধ থাকার পর গত বছরের ৩১ মে থেকে চালু হয় দেশের পুঁজিবাজার। তবে পুঁজিবাজার চালু হলেও দৈনিক লেনদেন নেমে যায় ৪০ কোটির ঘরে। বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ছিল সামান্যই।

এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বেশকিছু উদ্ভাবনী উদ্যোগ নেয় শিবলী কমিশন। প্রথমেই দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা আইপিও আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হয়। যেসব কোম্পানির আইপিও অনুমোদনযোগ্য সেগুলোকে দ্রুত অনুমোদন দেয়া হয়। আর যেগুলোকে অনুমোদন দেয়া সম্ভব নয় সেগুলো বাতিল করে দেয়া হয়। বন্ডকে জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নেয়া হয়। বাজারে অনিয়ম ও কারসাজির কারণে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয় কমিশন। স্টক এক্সচেঞ্জের কার্যক্রমকে পূর্ণাঙ্গ অটোমেটেড করার উদ্যোগ নেয়া হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) সক্ষমতা বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয় কমিশন। সূচকের সঙ্গে সমন্বয় করে মার্জিন ঋণ প্রদানের মতো উদ্ভাবনী সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসইসি। দুর্বল ভিত্তির জেড ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলোর আর্থিক ও ব্যবসায়িক অবস্থা পর্যালোচনা করে কোম্পানিগুলোর অবস্থা উন্নয়নে পদক্ষেপ নেয় কমিশন। একইভাবে ওটিসিতে থাকা কোম্পানিগুলোর বিষয়টিও বর্তমানে পর্যালোচনা পর্যায়ে রয়েছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর উদ্যোক্তা পরিচালকদের এককভাবে ২ শতাংশ ও সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা পরিপালন করানোর ক্ষেত্রেও সফল হয়েছে শিবলী কমিশন। এতে বাজারে শেয়ার কেনার চাপ তৈরি হয়েছে, যা পরোক্ষভাবে বাজারের উত্থানে ভূমিকা রেখেছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, নতুন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই পুঁজিবাজারের উন্নয়নে চেষ্টা করে যাচ্ছে। তারা রবি ও ওয়ালটনের মতো বেশকিছু ভালো কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দিয়েছে। বাজারে মনিটরিং জোরদার করেছে। পাশাপাশি অনিয়মের কারণে বিভিন্ন কোম্পানি বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তার ওপর বর্তমানে ব্যাংকঋণের সুদের হার কম এবং সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ কারণে মানুষ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে।

পুঁজিবাজারে তহবিল সরবরাহ যাতে মসৃণ থাকে সে উদ্যোগও নিয়েছে কমিশন। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল চাওয়া হয়েছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর অপরিশোধিত বা অদাবীকৃত ২১ হাজার কোটি টাকার লভ্যাংশ পুঁজিবাজারের উন্নয়নে ব্যবহারের বিষয়েও নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। এ ধরনের উদ্ভাবনী উদ্যোগ দেশের পুঁজিবাজারে এর আগে কখনো দেখা যায়নি।

তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য উদ্যোগ নিয়েছে বিএসইসি। সম্পৃক্ত পক্ষের লেনদেনের স্বচ্ছতা আনার জন্য এরই মধ্যে অনেক কোম্পানিকে নোটিস দেয়া হয়েছে। অনেক কোম্পানির বিভিন্ন ধরনের আর্থিক অনিয়ম তদন্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এমনকি অনিয়মে জড়িত কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে পুলিশের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে কমিশন। কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষার দায়িত্বে থাকা নিরীক্ষকদের ক্ষেত্রে ব্যত্যয় দেখা গেলে ব্যবস্থা নিচ্ছে কমিশন। সব মিলিয়ে পুঁজিবাজারের সবদিকেই নিজেদের উদ্ভাবনী ধ্যানধারণা কাজে লাগাচ্ছে শিবলী কমিশন।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) প্রেসিডেন্ট মো. ছায়েদুর রহমান বলেন, উদ্ভাবনী ধ্যানধারণার সঙ্গে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কারণে দেশের পুঁজিবাজারে গতিশীলতা দেখা যাচ্ছে। বর্তমান কমিশন পুঁজিবাজারের সবক্ষেত্রেই তাদের হাত প্রসারিত করেছে। অপরিশোধিত লভ্যাংশ পুঁজিবাজারের উন্নয়নে ব্যবহার, বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল চাওয়া, ২ শতাংশ ও ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ বাস্তবায়নের মতো বিষয়গুলো বাজারের গতিশীলতার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করেছে। তাছাড়া কমিশন অনিয়মের বিরুদ্ধে বেশ কঠোর। সব মিলিয়ে আমরা আশাবাদী কমিশনের নেতৃত্বে পুঁজিবাজার সামনের দিনগুলোতে আরো এগিয়ে যাবে।

বিএসইসি, স্টক এক্সচেঞ্জ, তালিকাভুক্ত কোম্পানি সবাইকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ও অটোমেটেড সিস্টেমের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে শিবলী কমিশন। যদিও এটি বেশ সময়সাপেক্ষ ও জটিল প্রক্রিয়া। তবে এরই মধ্যে এজন্য কমিশনের পক্ষ থেকে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য পরামর্শক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি একটি ফিনটেক বোর্ড, অনলাইন ট্রেডিং প্লাটফর্ম এবং এ-সংক্রান্ত পরামর্শক নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে কমিশন।

জানতে চাইলে বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বলেন, স্টক এক্সচেঞ্জ ও বিএসইসির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। সবকিছু পূর্ণাঙ্গ অটোমেশনের আওতায় চলে এলে ভবিষ্যতে আমাদের পুঁজিবাজার অনেকদূর যাবে। সূত্র: বণিক বার্তা


পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএম

শিবলী রুবাইয়াত,শেয়ারবাজার
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close