Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬
  • ||

সিটি ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তাদের চক্রান্তে ব্যবহৃত হচ্ছেন পপি!

প্রকাশ:  ২৮ আগস্ট ২০১৯, ০০:০৬ | আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০১৯, ১৪:২৭
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট icon

দি সিটি ব্যাংক লিমিটেডের চাকরিচ্যুত অ্যাসিসটেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মনিরা সুলতানা পপিকে ব্যবহার করে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছেন ব্যাংকটির সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা। ব্যাংকটির সাবেক এএমডি ও ডিএমডি সেসময় এমডি হতে না পারায় ক্ষোভ থেকে বর্তমানে এই ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছেন বলে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিটি ব্যাংকে মনিরা সুলতানা পপির নিযোগ প্রক্রিয়াটি ছিল অস্বচ্ছ। ব্যাংকে চাকরির কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পপি সিটি ব্যাংকের আগে অন্য কোনো ব্যাংকে চাকরি করেননি। একসময় তিনি রেডিসন হোটেলের স্পা গার্ল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে সিটি ব্যাংকের সাবেক এক কর্মকর্তার মাধ্যমে ব্যাংকটিতে যোগদান করতে সমর্থ্য হন। চাকরিতে যোগদানের পরবর্তী সময়ে ব্যাংকে কর্মরত অবস্থায় তার জীবনযাপন ও চলাফেরায় আগের উগ্রতা প্রকাশ পায়। এরই মধ্যে পপি সিটি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হোসাইনের ব্যক্তিগত সহকারীর দায়িত্ব পেয়ে যান। এই সুবাদে ব্যাংকের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে গোপনে অবৈধভাবে ড্রাইভারদের ওপর নিজস্ব প্রভাব খাটিয়ে মোট ২৫০ দিন মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত গাড়ি ব্যবহার করেন পপি। ব্যাংকের ড্রাইভারদের বক্তব্য অনুযায়ী, মনিরা সুলতানা পপি মধ্যরাতে বিভিন্ন আবাসিক হোটেল, পার্লারসহ অন্যান্য স্থানে যেতেন। মধ্যরাতে ওইসব স্থানে যাওয়ার সময় অপরিচিত লোকজন গাড়িতে উঠে বসতেন। পপি নিয়মিত নেশা করতেন বলেও ড্রাইভারদের বক্তব্যে প্রকাশ পেয়েছে। এসব প্রমাণাদি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করেছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হোসেনের ব্যক্তিগত সহকারী মনিরা সুলতানা পপির বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাবিরোধী নানা অভিযোগ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছিল। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পে-রোল ব্যাংকিং বিভাগে তাকে বদলি করা হয়। বদলির পর থেকে পপি দীর্ঘদিন কর্মস্থলে কোনো ধরনের পূর্বানুমতি ছাড়াই অনুপস্থিত ছিলেন। ব্যাংকের নিয়ম ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাকে তিনবার রেজিস্ট্রি ডাকযোগে নোটিস পাঠায় কর্তৃপক্ষ। তারপরও তিনি কর্মস্থলে যোগদান না করায় এবং অননুমোদিত অনুপস্থিত থাকায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে অব্যাহতি পান।

সূত্র আরও জানায়, প্রভিডেন্ট ফান্ড ঋণ, হাউজ বিল্ডিং ঋণ, ক্রেডিট কার্ড ও গাড়ির ঋণ, ব্যক্তিগত ঋণখাতে মনিরা সুলতানা পপির কাছে তার চাকরিরত থাকাকালে যাবতীয় প্রাপ্ত টাকা সমন্বয় করার পরও ব্যাংকের প্রায় ১ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এসব ঋণের টাকা পরিশোধ করার জন্য তাকে নোটিসও দিয়ে যাচ্ছে। নোটিসের কোনো উত্তর পপি দেননি। উল্টো সিটি ব্যাংক এবং ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুনাম, সম্মানহানি, ব্ল্যাকমেইল করাসহ ব্যক্তিগত ক্ষোভ চরিতার্থ, অন্যায় ও অবৈধভাবে ৫ কোটি টাকা অর্থ আদায়ের চেষ্টা করছেন। গুলশান থানায় শ্লীলতাহানির মামলা করে অপপ্রচার চালাচ্ছেন মনিরা সুলতানা পপি, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আর একাজে তাকে সিটি ব্যাংকের সাবেক দুুজন এএমডি ও ডিএমডি করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

পপির ৫ কোটির টাকা চাঁদা দাবির ৪৫ মিনিটের ভয়েজ রেকর্ডও ব্যাংকের কাছেও রয়েছে বলে সূত্র জানায়। পাশাপাষি ব্যাংকে চাকরির আড়ালে নিজের একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন পপি। লেগেসি মেকওভার (বিউটি পার্লার), লেগেসি ইন্টারন্যাশনাল প্রি স্কুল অ্যান্ড ডে-কেয়ার (স্কুল), লেগেসি গ্লোবাল কনসালটেন্সি (এজেন্ট ব্যাংকিং), এনএমসি এন্টারপ্রাইজ (এজেন্ট ব্যাংকিং) নামে তার চারটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা সিটি ব্যাংকের সঙ্গে তার চাকরির শর্তের খেলাপ হয়েছে। তার এইসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে বলে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। তার চারটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ঠিকানাগুলো- (লেগেসি মেকওভার) এইচ-২৭৭, রোড-১৬, ব্লক- কে, দক্ষিণ বনশ্রী, ঢাকা, (লেগেসি ইন্টারন্যাশনাল প্রি স্কুল অ্যান্ড ডে-কেয়ার) এইচ-৭০, রোড-৬, ব্লক-বি, দক্ষিণ বনশ্রী, ঢাকা, (লেগেসি গ্লোবাল কনসালটেন্সি) বনশ্রী, ঢাকা, (এনএমসি এন্টারপ্রাইজ) এইচ-৭০, রোড-৭, বক্ল-বি, দক্ষিণ বনশ্রী, ঢাকা। এসব ঘটনায় ২০ আগস্ট মনিরা সুলতানা পপির বিরুদ্ধে রাজধানীর গুলশান থানায় একটি মামলা করেছেন সিটি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের লিগ্যাল ডিভিশনের হেড অব কোর্ট অপারেশন একেএম আইয়ুব উল্লাহ।

মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা পপি চাকরিতে পুনর্বহালসহ নগদ ৫ কোটি টাকা ও বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার অযৌক্তিক দাবি করেছেন। এসব দাবি মেনে নেওয়া না হলে এমডিকে চাকরি করতে দেবেন না এবং নানাভাবে হয়রানি করারও হুমকি দেন। এমনকি এমডির সম্মানহানি করার হুমকিও দিয়েছেন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) স ম কাইয়ূম বলেন, সিটি ব্যাংকের অভিযোগ মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। এরই মধ্যে এর তদন্তও শুরু হয়েছে।

সিটি ব্যাংকের এমডি মাশরুর আরেফিন মামলা প্রসঙ্গে নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘আমার বিরুদ্ধে, আমি ও আমার দুই সিনিয়র সহকর্মীসহ তিনজনের বিরুদ্ধে, ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত এক নারী নোংরা হয়রানির অভিযোগ এনেছেন। ইতোমধ্যে মহামান্য উচ্চ আদালত আমাদেরকে জামিন দিয়েছেন। সিটি ব্যাংকও পরে যৌক্তিক কারণে এই নারীর নামে প্রতারণা ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মামলা করেছে। ব্যাপারটি এখন বিচারাধীন।’

তিনি লিখেছেন, ‘আমি সিটি ব্যাংকের এমডি হিসেবে দায়িত্ব নিই ১৭ জানুয়ারি, ২০১৯ তারিখে। এর চারদিন পরই ২১ জানুয়ারি ব্যাংকের বেশকিছু আইন ভঙ্গ ও ভাবমূর্তি পরিপন্থী কাজ করার কারণে ওই নারীকে অন্য চাকরি খোঁজার জন্য বলি। ঘটনা আরও অনেক আগের। তিনি ছিলেন আমাদের প্রাক্তন এমডির পিএস।’

এক এক করে নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে মাশরুর আরেফিন কটি কারণ তুলে ধরে লিখেছেন,

'১. বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের ৩১.১২.২০১৭-এর অডিট রিপোর্টে আমাদেরকে লিখিতভাবে অডিটরদের সঙ্গে তার অসহযোগিতা সংক্রান্ত একটি অভিযোগ জানান।

২. এরপর ল্য মেরিডিয়েন হোটেলের কর্তারা গত সেপ্টেম্বরে সশরীরে ব্যাংকে এসে আমাদেরকে জানান যে, আমাদের এই নারী কর্মী তাদের হোটেলের রেস্টুরেন্ট/বেকারিতে নিজের ব্যক্তিগত লোকজন নিয়ে ব্যাংকের নামে ‘বকেয়া‘ বিল করে চলেছেন এবং ব্যবহারও খারাপ করছেন।

৩. অক্টোবর ২০১৮ নাগাদ ব্যাংকের ড্রাইভাররা তার বিরুদ্ধে হিউম্যান রিসোর্সেস ডিপার্টমেন্টে নানা অভিযোগ জানাতে থাকেন। তখন পর্যন্ত তিনজন ড্রাইভার লিখিত জানান যে, তিনি অফিসের পর সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত এবং কখনো কখনো ভোর অবধি ব্যাংকের পুলের গাড়ি নিয়ে নানা জায়গায় যান এবং তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। ব্যাংকের নিজস্ব তদন্তে পরে বেরিয়ে আসে যে, তিনি মোট ২০০ রাতের বেশি রাত ব্যাংকের পুলের গাড়ি নিয়ে বিভিন্ন স্থানে গিয়েছেন। ১৫ জন ড্রাইভার তাদের লিখিত জবানিতে আমাদেরকে এ বিষয়ে অনেক কিছু জানান। এরই পরিণতিতে পরে (এপ্রিল ২০১৯-এ) পুলকারের দায়িত্বে থাকা ব্যাংকের জেনারেল অ্যাডমিন বিভাগের একজনের চাকরি চলে যায় এবং আরও দুজন অন্য শাস্তিপ্রাপ্ত হন।

৪. ড্রাইভারদের বিবৃতি থেকেই বেরিয়ে আসে যে, তিনি ব্যাংকের চাকরির পাশাপাশি, ব্যাংকের কোনো অনুমতি ও অবগতি ছাড়া, নিজের কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন, যা ব্যাংক চাকরিবিধি নং ২১-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ওই নারীর নিজ নামে ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স এসময় আমাদের হাতে আসে।’

তিনি লিখেন, ‘ওপরের এতগুলো কারণের প্রেক্ষিতে আমি ব্যাংকের প্রশাসন প্রধান হিসেবে তাকে, আগেই যেমন বলেছি, ২১ জানুয়ারি অন্য চাকরি খুঁজতে বলি। এরপর থেকে তিনি অফিসে আসা বন্ধ করে দেন এবং একপর্যায়ে অফিস থেকে ‘আনঅথরাইজড অ্যাবসেন্সের’ কারণে তার চাকরি ২০১৯-এর মে মাসের শুরুতে ‘শূন্য’ হয়ে যায়। তারপর ব্যাংক থেকে চিঠি যায় তার হোম লোন ও অন্যান্য লোন পরিশোধ করার বিষয়াদি নিয়ে।’

তিনি আরও লিখেছেন, ‘এরপরই এই মামলা, যার প্রথম ‘আসামি আমি। অন্যদিকে থানা তার মামলা নেওয়ার আগের দিন তিনি আমাদেরকে বলেন যে, তাকে ৫ কোটি টাকা দেওয়া হলে তিনি এ মামলা করবেন না। তার এই ব্লাকমেইলিং প্রচেষ্টাকে শক্তপোক্ত করতে তিনি তার কথোপকথনে দেশের কজন মানী ও প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম নিয়ে ব্যাংককে ভয়ও দেখান। ব্যাংকের কাছে তার এই পুরো কথোপকথনের স্পষ্ট অডিও রেকর্ডিং আছে যা এখন তদন্তে একটি বড় আলামত হয়ে উঠবে বলে আমার ধারণা।’

এ বিষয়ে জানতে চেয়ে মনিরা সুলতানা পপির সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

মনিরা সুলতানা পপি প্রসঙ্গে গুলশান থানার ওসি কামরুজ্জামান বলেন, পপির ৫ কোটি টাকা চাঁদা দাবির বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তের স্বার্থে এর বেশিকিছু বলতে চাই না।

এদিকে ৫ কোটি টাকা দাবি করে হুমকি দেয়ার অভিযোগে সিটি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের করা মামলায় ব্যাংকটির সাবেক অ্যাসিসটেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মনিরা সুলতানা পপিকে (চাকরিচ্যুত) হাইকোর্ট থেকে ৮ সপ্তাহের আগাম জামিন নিয়েছেন।

পূর্বপশ্চিমবিডি-এনই

মনিরা সুলতানা পপি
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত