• শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
  • ||

জাদুকরের জন্মদিন

প্রকাশ:  ১৩ নভেম্বর ২০২২, ১৩:৫৯
ফিচার ডেস্ক

সমকালীন বাংলা সাহিত্যের জননন্দিত কথাশিল্পী হ‍ুমায়ূন আহমেদের ৭৫তম জন্মদিন আজ। বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের কাছে তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তায় অধিষ্ঠিত এই ব্যক্তিত্ব এক জীবনে গল্প, উপন্যাস, নাটক, শিশুসাহিত্য, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি, চলচ্চিত্র পরিচালনা, সংগীত রচনাসহ নানা মাধ্যমে রেখেছেন তার অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর। ছবি এঁকেছেন। তার সৃষ্ট চরিত্র ‘হিমু’ ও ‘মিসির আলী’ পাঠক-পাঠিকার মনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে একের পর এক মাইলফলক তিনি অতিক্রম করে গেছেন। সেইসঙ্গে নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালনাতেও তার সমদক্ষতা বাঙালি দর্শককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল। সেখানেও তার সৃষ্ট চরিত্রেরা এক সময় মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে। এখনো যার প্রবলতম রেশ রয়ে গেছে। সাধারণ মানুষের জীবনের গল্পগুলো অসাধারণ হয়ে উঠেছে তার কলমে। তিনি আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনের বিচিত্র গল্পগুলোকে উপস্থাপনের চমৎকারিত্বে এবং সহজ-সরল গদ্যে তুলে ধরে পাঠককে করেছেন বিমোহিত। ১৯৭২ সালে প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’র মাধ্যমেই হ‍ুমায়ূন আহমেদ কথাসাহিত্যে পালাবদলের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তারপর একের পর এক উপন্যাসে নন্দিত হয়ে উঠেছেন অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা নিয়ে। আমৃত্যু সেই জনপ্রিয়তার স্রোতে ভাটার টান পড়েনি তার।

মাত্র ৬৪ বছরের জীবনে সৃষ্টিশীলতার অপার মাধুরীতে হ‍ুমায়ূন আহমেদ স্বমহিমায় নির্মাণ করেন বাংলাদেশের আধুনিক কথাসাহিত্যের এক নতুন জগৎ। পেশা, বয়স নির্বিশেষে সমাজের সব স্তরে পৌঁছে গেছেন দুই শতাধিক উপন্যাসের জনক হ‍ুমায়ূন আহমেদ। তিনি হয়ে উঠেছেন আনন্দ-বেদনার এক অকৃত্রিম কথাকার।

সম্পর্কিত খবর

    কার্তিকের চাঁদ ছিল হ‍ুমায়ূন আহমেদের ভীষণ প্রিয়। তার বহু রচনাতে বিষয়টি স্থান পেয়েছে নানাভাবে। জ্যোৎস্নার অনাঘ্রাত সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রায়ই তিনি চলে যেতেন গাজীপুরের হোতাপাড়ায় তার নিজের হাতে গড়া নুহাশপল্লীতে। বসতেন লিচুতলায়। সেখানে বৃক্ষ ছায়ায় আজও ঝরে পড়ছে হেমন্তের শিশিরকণা। যেখানে আজ চিরশায়িত হয়ে কার্তিকের সেই মায়াবী জ্যোৎস্নাধারায় অবগাহন করেন হ‍ুমায়ূন আহমেদ; আমাদের আধুনিক জীবনের আনন্দ-বেদনার কথাকার।

    ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর; কৃষ্ণপক্ষের রাত—নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলায় মাতৃকূলে জন্মগ্রহণ করেন হ‍ুমায়ূন আহমেদ। আদর করে ছেলের নাম রাখা হয় কাজল। দুরন্ত চঞ্চল কাজলের ছেলেবেলার অনেকখানি কেটেছে মোহনগঞ্জেই। তবে পুলিশ কর্মকর্তা বাবার চাকরির সুবাদে হ‍ুমায়ূনের শৈশব কাটে সিলেট, পঞ্চগড়, রাঙামাটি, চট্টগ্রাম, বগুড়া, কুমিল্লা ও পিরোজপুরের বিভিন্ন অঞ্চলে। ১৯৬৫ সালে বগুড়া জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক ও ১৯৬৭ সালে ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন তিনি। ১৯৭০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন বিভাগে স্নাতক ও ১৯৭২ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা ইউনিভার্সিটি থেকে পলিমার কেমিস্ট্রি বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯৮২ সালে। এমএসসি ডিগ্রি অর্জনের পরের বছর ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে শুরু হয় হ‍ুমায়ূন আহমেদের কর্মজীবন। এক বছর পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। লেখক হিসেবে সাহিত্য মহলে ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার কারণে লেখালেখিতে পূর্ণ মনোনিবেশ করতে ১৯৯০ সালে অধ্যাপনা পেশা থেকে অবসর নিয়ে নেন তিনি। এ সময় লেখালেখির পাশাপাশি তিনি নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত হন প্রবলভাবে।

    হ‍ুমায়ূন আহমেদ রচিত উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে নন্দিত নরকে, লীলাবতী, কবি, শঙ্খনীল কারাগার, দূরে কোথায়, সৌরভ, ফেরা, কৃষ্ণপক্ষ, সাজঘর, বাসর, গৌরীপুর জংশন, নৃপতি, অমানুষ, বহুব্রীহি, এইসব দিনরাত্রি, দারুচিনি দ্বীপ, শুভ্র, নক্ষত্রের রাত, কোথাও কেউ নেই, আগুনের পরশমণি, শ্রাবণ মেঘের দিন, বৃষ্টি ও মেঘমালা, মেঘ বলেছে যাবো যাবো, জোছনা ও জননীর গল্প ইত্যাদি।

    ২০১২ সালের ১৯ জুলাই নিউইয়র্কে কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন এই কথাশিল্পী। তার সর্বশেষ উপন্যাস ‘দেয়াল’ প্রকাশিত হয় মৃত্যুর দুই বছর আগে। হ‍ুমায়ূন আহমেদ নাটক রচনা ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেখানেও রেখেছেন অতুলনীয় প্রতিভার স্বাক্ষর। কয়েক দশক ধরে নির্মাণ করেছেন বহু জনপ্রিয় একক ও ধারাবাহিক নাটক। তার সর্বশেষ চলচ্চিত্র ‘ঘেটুপুত্র কমলা’র জন্য তিনি পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

    বাংলাদেশের সৃজনশীল গ্রন্থ প্রকাশনা শিল্পকে বাণিজ্যিক সফলতা দিতে ও এগিয়ে নিতে হ‍ুমায়ূন আহমেদের অবদান অপরিসীম। একক সক্ষমতায় বইয়ের বাজার সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি প্রকাশনা শিল্পে তিনি সৃষ্টি করেন নতুন অর্থপ্রবাহের জোয়ার। হয়ে ওঠেন একুশে গ্রন্থমেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।

    সাহিত্যক্ষেত্রে অবদানের জন্য হ‍ুমায়ূন আহমেদ বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, হ‍ুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার, লেখক শিবির পুরস্কার, মাইকেল মধুসূধন দত্ত পুরস্কার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও বাচসাস পুরস্কার এগুলোর অন্যতম। দেশের বাইরেও সম্মানিত হয়েছেন তিনি। জাপানের এনএইচকে টেলিভিশন তাকে নিয়ে ‘হু ইজ হু ইন এশিয়া’ শিরোনামে ১৫ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র প্রচার করে।

    প্রতি বারের মতো হ‍ুমায়ূন আহমেদের এবারের জন্মদিনটিতেও সারা দেশের অগণিত ভক্ত-পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীর মধ্যে প্রিয় কথাশিল্পীর জন্মদিনকে ঘিরে নানা রকম উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। গত রাত ১২টা ১ মিনিটে প্রয়াত লেখকের বাসায় পারিবারিক আবহে কেক কাটার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এবারের জন্মদিন উদযাপন। হ‍ুমায়ূন আহমেদের সহধর্মিণী মেহের আফরোজ শাওন জানান, আজ সকালে সপরিবারে নুহাশপল্লীতে গিয়ে লেখকের কবর জিয়ারত করবেন তারা। সারাদিন ভক্ত-অনুরাগীদের সমাগমে মুখর থাকবে হ‍ুমায়ূন আহমেদের স্মৃতিবিজড়িত এই প্রাঙ্গণ।

    দিনটি ঘিরে বিভিন্ন গণমাধ্যম নানা আয়োজন করছে। চ্যানেল আই চেতনা চত্বরে প্রতিবছর এ দিনে আয়োজন হয় ‘হিমু মেলা’।

    হ‍ুমায়ূন আহমেদ
    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close