• বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২, ১৬ আষাঢ় ১৪২৯
  • ||

মনের ভয়াল ব্যাধি সিজোফ্রেনিয়া, সঠিক চিকিৎসায় মিলে নিরাময়

প্রকাশ:  ২১ মার্চ ২০২২, ০২:৩৮
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক

সিজোফ্রেনিয়া (সাইকোটিক ডিজঅর্ডার) এক ধরনের জটিল মানসিক রোগ। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির চিন্তা, আবেগ-অনুভূতি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও ব্যক্তিসম্পর্ক মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। রোগী বাস্তবতার বোধ বা উপলব্ধি হারিয়ে ফেলেন। সিজোফ্রেনিয়া জটিল মানসিক রোগ হলেও সঠিক সময়ে এ রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা দেওয়া হলে এটি নিরাময়যোগ্য।

সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত রোগীদের প্রায়ই হেলুসিনেশন হয়। অর্থাৎ বাস্তবে নেই বা ঘটছে না এমন কিছু ঘটতে দেখা বা শোনা। এবং ডিলিউশন হয় অর্থাৎ মনে এমন বিশ্বাস বা মনোবিকার থাকে যে, কেউ বুঝি তাকে গায়েব বা অদৃশ্য থেকে নিয়ন্ত্রণ করছে বা তাকে হত্যা করার চেষ্টা করছে। পরিচিতজনরা তার খাবারে বিষ মিশিয়ে দিচ্ছে– এমন সন্দেহ করে থাকেন এই রোগীরা। এ ছাড়া আরও অমূলক সন্দেহ করে থাকেন তারা। এ ধরনের রোগীদের নিয়ে সাধারণত পরিবারের লোকেরা খুব সমস্যায় পড়ে যান। রোগীর অদ্ভুত আচরণগুলো মানিয়ে নিতে বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।

এছাড়াও সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্তরা অসংলগ্ন কথাবার্তা বলেন, যেমন, হুট করেই একটি বিষয় থেকে এমন আরেকটি বিষয়ে কথা বলা শুরু করেন যার সঙ্গে আগেরটির কোনো সম্পর্ক নেই। সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্তরা প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবন-যাপন থেকেও নিজেদের গুটিয়ে নেন। সিজোফ্রেনিয়াকে বলা হয় একটি জীবন্ত দুঃস্বপ্ন।

বাড়ছে সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্তের সংখ্যা

বর্তমানে সারা বিশ্বে কমপক্ষে দুই কোটি ৬০ লাখ লোক সিজোফ্রেনিয়া রোগে ভুগছেন। বাংলাদেশে এই রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ। মনোবিজ্ঞানীরা নানা সমীক্ষা থেকে বলছেন, আমাদের দেশে দিন দিন সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। তাদের মতে, বাংলাদেশের প্রায় ০.২৪% লোক সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। সেই হিসেবে বাংলাদেশের প্রায় ১৩ লক্ষ লোক সিজোফ্রেনিয়া রোগে আক্রান্ত।চলতি সময়ের অনিশ্চয়তা আর নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে দিচ্ছে এই মনের অসুখের বিস্তার।

সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্তের কারণ

সিজোফ্রেনিয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো হয়নি। তবে বিভিন্ন কারণে সিজোফ্রেনিয়া হতে পারে। একেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে একেক কারণ বেশি কাজ করতে পারে। আবার কতগুলো কারণ একসাথেও কাজ করতে পারে। বংশে কারো থাকলে এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা বেশি। বাবা মা দুজনের মধ্যে একজনের থাকলে সন্তানের এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা ১৭ শতাংশ। যদি উভয়েরই থাকে তবে সন্তানের হওয়ার আশঙ্কা প্রায় ৪৬ শতাংশ। গবেষণায় দেখা যায়, মস্তিষ্কে এক ধরনের রাসায়নিক উপাদানের পরিমাণে ত্রুটি এবং নিউরোকেমিক্যাল উপাদান ভারসাম্যহীন হলে এ রোগ হয়। জন্মকালীন কোনো জটিলতা থাকলেও এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বঞ্চিত পরিবারে সিজোফ্রেনিয়া বেশি দেখা যায়। গর্ভকালীন মা ইনফ্লুয়েঞ্জা বা রুবেলা আক্রান্ত হলে শিশুর পরবর্তী জীবনে এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত অনেকের মধ্যেই আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যায়। অন্যকে শারীরিকভাবে আঘাত করার প্রবণতা তৈরি হয়।

যুক্তরাষ্ট্র্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক জানিয়েছেন, সিজোফ্রেনিয়া রোগটি একক কোনো রোগ নয়। বরং আটটি ভিন্ন ধরনের সমস্যার সমন্বিত রূপ। তাঁদের মতে, এই নতুন ধরনের ব্যাখ্যায় রোগটি ব্যাখ্যার নতুন দুয়ার খুলে গেছে। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ড্রাগান সভ্রাকিক বলেন, জিনগুলো আসলে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। বরং ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করে মস্তিষ্কে বিঘ্ন ঘটায়। ফলে সিজোফ্রেনিয়া হয়।

সিজোফ্রেনিয়া রোগের লক্ষণ

একা একা কথা বলা, চুপচাপ থাকা, কারও কথার জবাব না দেওয়া, কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করলে উত্তর না দেওয়া, কানে অলিক কথা শোনা, অসংলগ্ন কথা বলা, প্রতিদিনের কাজ সঠিকভাবে না করা, ভ্রান্ত বিশ্বাস, অহেতুক সন্দেহপ্রবণতা (ডিল্যুশন), অবাস্তব চিন্তাভাবনা, অসংলগ্ন কথাবার্তা ইত্যাদি সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ। এ ছাড়া এর মধ্যেও আরও কিছু লক্ষণ হচ্ছে- অনাগ্রহ, চিন্তার অক্ষমতা, আবেগহীনতা ও বিচ্ছিন্নতা।

এ ধরনের রোগীরা কতগুলো অবাস্তব দৃশ্য দেখার দাবি করেন। অবাস্তব স্পর্শ অনুভূতির কথা বলেন। তার চামড়ার ভেতরে পোকা হাঁটহাঁটি করছে। কিছু রোগীকে বলতে শোনা যায়, পেটে ও মাথায় পোকা কিলবিল করছে।

সিজোফ্রেনিয়ার চিকিৎসা

সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে অবশ্যই অভিজ্ঞ মানসিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্তদের মধ্যে শতকরা ২৫ ভাগ চিকিৎসার পর সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়, ৫০ ভাগ ওষুধ ব্যবহারের মাধ্যমে সুস্থ জীবনযাপন করতে পারে। বাকি ২৫ ভাগ কখনোই ভালো হয় না। এক্ষেত্রে সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হচ্ছে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শমতো চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া। কারণ নিয়মিত ওষুধ ও কতগুলো মনোবৈজ্ঞানিক কৌশল প্রয়োগ এবং উপদেশ মেনে চললে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

সিজোফ্রেনিয়ায় দুই ধরনের চিকিৎসা রয়েছে, ওষুধ প্রয়োগ ও সাইকোথেরাপি। এক্ষেত্রে ইনডিভিজুয়াল সাইকোথেরাপির মধ্যে রয়েছে হ্যালুসিনেশন নিয়ন্ত্রণ, ফ্যামিলি থেরাপি, যোগাযোগের প্রশিক্ষণ, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের কৌশল ইত্যাদি। অনেক সময় ভালো হয়ে যাওয়ার পর ওষুধ বন্ধ করে দিলে পুনরায় রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। এ জন্য মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।

সিজোফ্রেনিয়া নিরাময় সম্ভব, যদি ঠিকমতো চিকিৎসা করা যায়। এক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখতে হবে, ভালোবাসাপূর্ণ পারিবারিক জীবন এঁদের আরোগ্য লাভকে ত্বরান্বিত করতে পারে।

পূর্বপশ্চিম- এনই

সিজোফ্রেনিয়া,মানসিক রোগ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close