• রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২০, ১০ কার্তিক ১৪২৭
  • ||

‘ভালোবাসার ১০-১২ ব্যাচ’র সীতাকুণ্ড ভ্রমণ

প্রকাশ:  ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২০:১১ | আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২০:৪৩
অভি মন্ডল

বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসে স্থবির গোটা বিশ্ব। সর্বত্রই বিরাজ করছে এক অজানা আতঙ্ক। দীর্ঘ সময় ঘরে বন্দি কোটি কোটি মানুষ। ঘরবন্দি জীবন থেকে বেরিয়ে মুক্ত বাতাসে অক্সিজেন নিতে ঘুরার বাসনা এখন অনেকেরই মনে।

কোলাহলমুক্ত নির্জনতা, চারদিকে সবুজ গাছপালা, মাঝে মাঝে পশু-পাখির ডাক আর শীতল বাতাস। এই রোমাঞ্চকর অনুভূতি আপনাকে দেবে এক পাহাড়সম মানসিক প্রশান্তি। হ্যাঁ, বলছিলাম চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ের কথা। আপনি যদি দুর্গম পাহাড়ি পথে হাঁটতে পছন্দ করেন, তবে চন্দ্রনাথ পাহাড় আপনার জন্যই।

করোনায় নিজেদের একঘেয়েমি জীবনে কিছুটা আনন্দ পাওয়ার জন্য ‘ভালোবাসার ১০-১২ ব্যাচ’র বন্ধু-বান্ধবীদের নিয়ে সীতাকুণ্ড ভ্রমণ ও মিলনমেলার আয়োজন করে ‘অভিযাত্রীক বিডি’ নামের একটি ভ্রমণ প্রিয়াসু সংগঠন। যেখানে অংশ নেয়ার সুযোগ ছিল সারাদেশের ২০১০ সালের এসএসসি ও ২০১২ সালের এইচএসসি ব্যাচের সকল সদস্যের। সময় ও সুযোগ করে ১৬৫ বন্ধু-বান্ধবী এ ভ্রমণে অংশ নেয়।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে ভ্রমণে অংশ নেয়া ব্যাচের সদস্যদের নিয়ে সীতাকুণ্ডের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে ৩টি বাস। মাঝে যাত্রা বিরতি, যাত্রা বিরতি শেষে আবারো আমরা ছুটে চলা। সকাল ৬টার মধ্যে সদস্য সবাই পৌঁছে যায় রূপসী ঝর্ণার কাছে। সৌন্দর্য্যে কোনো অংশেই খৈয়াছড়া, নাপিত্তাচড়া ঝর্ণার চেয়ে কম নয় এটি।

রূপসী ঝর্ণার রয়েছে ৩টি আলাদা আলাদা ধাপ। এরা বড় ‘কমলদহ’, ‘ছাগলকান্দা’ ও ‘পাথর ভাঙ্গা’ ঝর্ণা নামে পরিচিত। এর প্রথম ধাপের ঝর্ণাটি অনেকটা বড় একটি ঝর্ণার মতো। এই ঝর্ণাটা অনেকটা খাড়া পথ বেয়ে নেমে পড়ছে। এটি আসলে রূপসীর বাহিরে রূপ। এই প্রথম ধাপটি বেয়ে উঠলে একটি বড় পাথর রয়েছে। এই পাথরের মাঝ দিয়ে অবিরাম ভাবে বয়ে যাচ্ছে রূপসীর জলধারা।

এই ১০ ফিটের খাড়া পাথরটা বেয়ে উপরে উঠলেই আরো চমৎকার সৌন্দর্য নজর কাড়বে। সম্মুখে রয়েছে বৃক্ষ ফুল লতাপাতা ঘেরাও বিশাল ছড়া। এই পথে দেখা পাবেন বানর ও নারা রকম পাখ-পাখালির। এই ছড়া ধরে এগিয়ে যেতে থাকলে পাওয়া যাবে আরো দু’টি ছড়া। বড় ছড়াটি ধরে এগুলেই দেখতে পাবেন রূপসীর আসল রূপ। অবিরাম ধারায় শো শো শব্দে বয়ে পড়ছে ঝর্ণার শীতল জল। যে জল মুহূর্তেই ভুলিয়ে দিতে সক্ষম ভ্রমণের সমস্ত ক্লান্তি।

৫০ ফিট উপর থেকে বয়ে পরা ঝর্ণার সুমধুর ধ্বনি আর রূপসীর জৌলুশ যে কাউকে মুগ্ধ করবে। পাথর বেয়ে পড়া স্বচ্ছ জলের অমিয় ধারা আপ্লুত করে দেবে আপনাকে। সেখানে ১ ঘণ্টার মতো সময় কাটিয়ে ফের সীতাকুণ্ড বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হলো দলটি।

সীতাকুণ্ড বাজারে পৌঁছে ফ্রেস হয়ে ভোজ হোটেলে সকালের নাস্তা সেরে শুরু চন্দ্রনাথ মন্দির ও চন্দ্রনাথ পাহাড় ভ্রমণ। শহর থেকে মাত্র দুই কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছালাম চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাদদেশে। এ দুই কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে গিয়ে মনে হলো সীতাকুণ্ড যেন মন্দিরের শহর। রাস্তার দুই দিকেই বিভিন্ন ধরনের অনেক মন্দির আপনার নজর কাড়বে।

স্থানীয়দের কাছ থেকে জানতে পারলাম, এই ছোট্ট এলাকায় প্রায় আড়াইশোর বেশি মন্দির আছে এবং আমরা যে পাহাড়ের চূড়ায় চড়তে যাচ্ছি সেখানেও নাকি দু’টি শিব মন্দির আছে। আগ্রহটা আরো বেড়ে গেলো ১২০০ ফুট চন্দ্রনাথের চূড়ায় চড়ার।

প্রথমদিকে তেমন কষ্ট না হলেও তিনশো ফুট থেকে আপনাকে উঠতে হবে খাড়া পাহাড় বেয়ে। কখনো বা চলতে হবে এক পাশে পাহাড়ের গা ঘেঁষে আর অন্য পাশে খাদ নিয়ে। একবার পা ফসকালেই পড়তে হবে ২৫০-৩০০ ফুট নিচে। কোনো কোনো জায়গায় পথটা এতটাই সরু যে, দু’জন মানুষ একসঙ্গে উঠা-নামা করা প্রায় অসম্ভব। মাঝে মাঝে পাবেন প্রাচীনকালের তৈরি সিঁড়ি। কে কতো সালে সে সিঁড়ি কেন বানিয়েছেন সাথে আছে তার নামফলকও। চারদিকে নিরব-নিস্তব্ধ। মাঝে মাঝে শুনতে পাবেন চেনা-অচেনা পাখির ডাক। দেখতে পাবেন ঝরনাও।

প্রায় ঘণ্টা দেড় পর আমরা পৌঁছালাম প্রথম পাহাড়ের চূড়ায়। সেখানে রয়েছে শ্রী শ্রী বিরূপাক্ষ মন্দির। মন্দিরে অবস্থানরতরা জানালেন, এটা তাদের শিব দেবতার বাড়ি। প্রতিবছর এই মন্দিরে শিবরাত্রি তথা শিবর্তুদশী তিথিতে বিশেষ পূজা হয়। এই পূজাকে কেন্দ্র করে সীতাকুণ্ডে বিশাল মেলা হয়। সীতাকুণ্ড চন্দ্রনাথ পাহাড় এলাকায় বসবাসকারী

হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা প্রতি বছর বাংলা ফাল্গুন মাসে (ইংরেজী ফেব্রুয়ারী-মার্চ মাস) বড় ধরনের একটি মেলার আয়োজন করে থাকেন। যেটি শিবর্তুদর্শী মেলা নামে পরিচিত। এই মেলায় বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ডসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে অসংখ্য সাধু এবং নারী-পুরুষ যোগদান করেন। পাহাড়ে এবারের মেলা চলে ১৩ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। আর পাহাড়ের নিচে মেলা চলবে পুরো ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে।

কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে রওনা হলাম চন্দ্রনাথ পাহাড়ের দিকে। সেখানেও নাকি একটা মন্দির আছে নাম, চন্দ্রনাথ মন্দির। বিরূপাক্ষ মন্দির থেকে চন্দ্রনাথ মন্দিরের ১৫০ ফুট রাস্তার প্রায় ১০০ ফুটই আপনাকে উঠতে হবে খাড়া পাহাড় বেয়ে। সেখানে নিজেকে সামলে রাখা অনেকটাই কষ্টকর।

অবশেষে খাড়া পাহাড় বেয়ে মাটি থেকে ১২০০ ফুট উপরে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে উঠলাম আমরা। সীতাকুণ্ডের সর্বোচ্চ উঁচু পাহাড় চন্দ্রনাথে দাঁড়িয়ে আপনি দেখতে পাবেন একদিকে সমুদ্র আর অন্যদিকে পাহাড়ের নির্জনতা। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকবেন উঁচু-নিচু পাহাড়ের সবুজ গাছপালার দিকে। প্রশান্তিতে জুড়িয়ে যাবে চোখ।

পাহাড় থেকে নিচে নামার সময়ও আপনি মুগ্ধ হবে। কারণ, এই পাহাড়ের দু’টি রাস্তা রয়েছে। আপনি যদি আগে বিরূপাক্ষ মন্দির হয়ে উঠেন সেটা হবে আপনার জন্য বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ, চন্দ্রনাথ মন্দির থেকে নামার রাস্তার সিড়ির ধাপগুলো অনেক বড় বড়। এই পথে উঠতে গেলে আপনাকে খুব দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যাবেন। আর নামতে গেলে আপনি পাবেন দুই পাহাড়ের মাঝের সুরঙ্গ রাস্তা। এখানে সব সময়ই বাতাস থাকে। যা আপনার ক্লান্ত দেহকে এক মুহূর্তেই শীতল করে দেবে এবং এই পাহাড় থেকে নিচে নামা একদম সহজ।

পাহাড় থেকে নেমে সোজা সীতাকুণ্ড পৌরসভার পুকুরে ডুব, সাতার কেটে ক্লান্তি দুর করা। তারপর ফ্রেশ হয়ে ভোজ হোটেলে দুপুর খাবার খাওয়া। তারপর কিছুটা সময় বিশ্রাম নিয়ে পরবর্তী যাত্রা শুরু গুলিয়াখালি সী বিচের উদ্দেশ্যে। স্থানীয় মানুষের কাছে এই সৈকত ‘মুরাদপুর বীচ’নামেও সুপরিচিত।

সীতাকুণ্ড বাজার থেকে গুলিয়াখালি সি বীচের দূরত্ব মাত্র ৫ কিলোমিটার। অনিন্দ্য সুন্দর গুলিয়াখালি সী বিচ কে সাজাতে প্রকৃতি কোনো কার্পন্য করেনি। একদিকে দিগন্তজোড়া সাগর জলরাশি আর অন্য দিকে কেওড়া বন এই সাগর সৈকতকে করেছে অনন্য। কেওড়া বনের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালের চারিদিকে কেওড়া গাছের শ্বাসমূল লক্ষ করা যায়, এই বন সমুদ্রের অনেকটা ভেতর পর্যন্ত চলে গেছে। এখানে পাওয়া যাবে সোয়াম্প ফরেস্ট ও ম্যানগ্রোভ বনের মতো পরিবেশ।

গুলিয়াখালি সৈকতকে ভিন্নতা দিয়েছে সবুজ গালিচার বিস্তৃত ঘাস। সাগরের পাশে সবুজ ঘাসের উন্মুক্ত প্রান্তর নিশ্চিতভাবেই আপনার চোখ জুড়াবে। বীচের পাশে সবুজ ঘাসের এই মাঠে প্রাকৃতিক ভাবেই জেগে উঠেছে আঁকা বাঁকা নালা। এইসব নালায় জোয়ারের সময় পানি ভরে উঠে। চারপাশে সবুজ ঘাস আর তারই মধ্যে ছোট ছোট নালায় পানি পূর্ণ এই দৃশ্য যে কাউকে মুগ্ধ করবে।

অল্প পরিচিত এই সৈকতে মানুষজনের আনাগোনা কম বলে আপনি পাবেন নিরবিলি পরিবেশ। সাগরের এতো ঢেউ বা গর্জন না থাকলেও এই নিরবিলি পরিবেশের গুলিয়াখালি সমুদ্র সৈকত আপনার কাছে ধরা দিবে ভিন্ন ভাবেই।

গুলিয়াখালি সি বীচ দর্শন শেষে ব্যাগ গুছিয়ে সোজা রাতে বাসে ঢাকায়। অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়দের জন্য এটাকে একদিনের আদর্শ ট্যুরও বলা যায়।

এ ভ্রমণ সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পরিচালনার মূল দায়িত্বে ছিলেন তাসলিম সিদ্দিকি দ্বীপ। ভ্রমণ আয়োজনের বিষয়ে তিনি জানান, ১০-১২ ব্যাচ’র বন্ধু-বান্ধবীদের নিয়ে সীতাকুণ্ড ভ্রমণ ও মিলনমেলার আয়োজন করে ‘অভিযাত্রীক বিডি’। ব্যাচের দেশের বাইরে থাকা প্রবাসী বন্ধু-বান্ধবীরা ভ্রমণে অংশ নেয়া সকল বন্ধু-বান্ধবীদের জন্য টি-শার্ট স্পন্সর করে। র‌্যাফেল ড্র আর প্রত্যেকের জন্য গিফট করে আমাদের বন্ধু রাশেদ খানের কোম্পানি ফাস্টেক্স।

তিনি আরো জানান, আমরা ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসার পর এখানে (চট্টগ্রাম) থাকা বন্ধু-বান্ধবীরা আমাদের স্বাগত জানায় এবং তাদের পক্ষ থেকে সকলের জন্য নোটপ্যাড উপহার দেয়া হয়।

তাসলিম সিদ্দিকি দ্বীপভ্রমণের বিষয়ে তাসলিম সিদ্দিকি দ্বীপ বলেন, পেশা হিসেবে অনেক ভ্রমণ করার অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু নিজের ব্যাচের সদস্যদের নিয়ে এরকম ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এই প্রথম। ভ্রমণটা আমার জন্য ছিল অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু সবার সহযোগীতায় ভ্রমণটা সুন্দরভাবে শেষ করতে পেরেছি। নিজের সর্বোচ্চ হয়তো দিতে পারি নাই কিন্তু এ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আগামীতে আরো ভালো কিছু উপহার দেবার চেষ্টা করব।

পূর্বপশ্চিমবিডি/অ-ভি

ভ্রমণ,সীতাকুণ্ড,ব্যাচ,ভালোবাসা
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close