• শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২০, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
  • ||

পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু চলছেই. সচেতনতায় বাঁচে জীবন

প্রকাশ:  ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২২:৩৯ | আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৩:৫৪
সারোয়ার আলম

পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর খবর প্রায় প্রতিদিনই জাতীয় দৈনিকের পাতায় জায়গা করে নিচ্ছে। ব্যতিক্রম হলো না আজও। প্রথম আলো থেকে জানা যায়, ১৩ সেপ্টেম্বর ফরিদপুরের ভাংগা উপজেলার হামিরদী গ্রামের সামিউল নামে চার বছরের এক শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে। সামিউল গ্রামের ওহিদুল মাতুব্বরের ছেলে। ঘটনার দিন তাদের বাড়িতে বিয়ের আয়োজন চলছিলো। যদিও পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর এখবরগুলো ভিতরের পাতায় ছাপা হয় ছোটো বক্স নিউজ আকারে, তবে এতটা ছোটো নয় যে সহসাই পাঠকের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। যেমন চোখে পড়েছিলো ৪ সেপ্টেম্বরের একদিনে ৮ শিশুর পানিতে ডুবে মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর বাংলাদেশ প্রতিদিন ৯ পাতায়।

এরকম একটি দুটি নয়, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৩০টি শিশু পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ব্লুমবার্গ ফিলানফ্রোপিক এর সহযোগিতায় পরিচালিত ২০১৯ এর এক গবেষনা প্রতিবেদন বলছে, বছরব্যাপি হিসাব আমলে নিলে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা দাড়ায় প্রায় দশ হাজার। জনসংখ্যা বিবেচনায় যা বিশ্কে সর্ব্বোচ্চ। এ দেশে নিউমোনিয়ার পরে পানিতে ডুবেই সবচেয়ে বেশী শিশু মৃত্যু হয়ে থাকে। যদি শুধুমাত্র এক থেকে চার বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর কথা ধরা হয়, সেক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে বাংলাদেশে পানিতে ডুবেই সবচেয়ে বেশি শিশু মারা যায় এবং মৃত্যুর এই হার পৃথিবীতে সর্ব্বোচ্চ। মোট শিশু মৃত্যুর ৪৩ শতাংশই ঘটে থাকে পনিতে ডুবে।

যদিও বছর জুড়েই পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেই চলে তবে বর্ষা মৌসুমে ও বড় উৎসব, পার্বণ পারিবারিক আয়োজনে কিংবা জাতীয় ছুটিকালিন সময়ে দূর্ঘটনার সং খ্যা বেড়ে যায়। যেমনটা উল্লেখ করেছেন বিশিষ্ট গবেষক ও দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গহর নঈম ওয়ারা।

গত ঈদে ছুটির ১০ দিনের (২৯ জুলাই- ৯ আগস্ট) গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টে বিশ্লেষন করে তিনি বলেছেন, এসময়ে মোট ৬৮টি শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে, যাদের মধ্যে ৩৮ জনই ৫ বছরের কম বয়সি শিশু। ডিজাষ্টার ফোরাম ২৭ জুন ২০ থেকে ২৯ জুলাই ২০২০ পর্যন্ত সময়ে ৪৬ জনের পানিতে ডুবে মৃত্যুর তথ্য উল্ল্যেখ করেছে। এই ৪৬ জনের মধ্যে ৩৬ জনই শিশু এবং আবার তাদের মধ্যে ১ থেকে ৪ বছর বয়সি শিশু ১৪ জন আর ৫-১০ বছর বয়সি শিশু ১১ জন। কষ্ট তখনই বেড়ে যায় যখন জানা, যখন জানা যায়, পানিতে ডুবে শিশুদের এই মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য।

শিশুদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও শিশুদের সুরক্ষা সরকারের সহায়ক নীতিমালা, আইন ও বিধি বিধান রয়েছে। শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা, শিশু নিপীড়ন ও শিশু মৃর্তূরোধে দেশে সরকারি, বেসরকারি ও এনজিওদের উদ্যোগে উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে। পরিকল্পিত সেসব উন্নয়ন কার্যক্রমে ব্যাপক বিনিয়োগের প্রত্যক্ষ ফলাফল হিসাবে শিশু উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ ভালো। আমরা শিশু মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যবাবে কমাতে পেরেছি। গর্ভবতী ও শিশু স্বাস্থ্য সেবা বাড়ির দোরগড়ায় নিয়ে যাওয়ায় ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা বিস্তৃত করার ফলে প্রসবকালিন মা ও শিশু মৃর্তূ কমানো গেছে। গুটিবসন্ত, হাম, পোলিও বিদায় করা গেছে টিকাদান কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে। সরকার প্রসংসিত হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী পুরষ্কার প্রহন করেছেন। কিন্তু আমাদের প্রিয় শিশুরা প্রতিদিন পানিতে ডুবে মরছে। কেউ মরছে নির্যাতনের স্বীকার হয়ে , কেউ মরছে ধর্ষিত হয়ে, কেউবা রাস্তায় গাড়ি চাপা পড়ে। শিশুদের জীবন কী এতটাই সস্তা। পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর এ দায় কার ?

কেনো ও কোন শিশুরা পানিতে ডুবছে ?

পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধে বাংলাদেশে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে খুব বেশি কাজ হয়নি। প্রতিষ্ঠিত এনজিওরা অজানা কারনে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু নিয়ে কাজ করতে তেমন একটা আগ্রহী নয় বলেই মনে হচ্ছে। কেননা প্রতিষ্ঠিত কোনো এনজিও’র এ সম্পর্কীত কোনো কার্যক্রম কোথাও দৃশ্যমান নয়। তবে আশার কথা হলো, অন্যসব আরো অনেক অবহেলিত, উপেক্ষিত বিষয়ের মতো পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধেও এগিয়ে এসেছে কেউ কেউ- অবশ্য তাদের তেমন কোনো পরিচিতি নেই এনজিও খাতে। তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান সিআরপিআরবি, যাদের পরিচিতিতে হয়তো তেমন জোড়ালো নয় তবে এমন তারা এমন কাজ করছে যা অন্য হাই প্রোফাইলরা এনজিওরা করছেন না । তারা আন্তর্জাতিক সংস্থা ব্লুমবার্গ ফিলানফ্রোপিক ও রয়েল লাইফবোট-ইউকে এর সহযোগিতায় দীর্ঘদিন ধরে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধে কার্যকরি স্থানীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবণে কাজ করে আসছেন ২০০৫ থেকে। সিআরপিআরবি’ তার অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক মতামতের ভিত্তিতে বলেছে, দারিদ্র, অসচেতনতা ও প্রতিষ্ঠানিক উদ্যোগহীনতার কারনেই পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেই চলেছে। বাংলাদেশে শিশুরা পানিতে ডুবছে তার বাড়ির ২০ গজের মধ্যে এবং মৃত্যুর এঘটনাগুলো ঘটছে মূলতঃ সকাল ০৯ থেকে বেলা ১টার মধ্যে- যেসময়ে মা-বাবা, বড় ভাইবোন ও কেয়ার গিভাররা অন্য বাস্তুগত কাজে ব্যস্ত থাকেন। এছাড়াও উদ্যেগের বিষয় হলো আমাদেও বাড়ির পাশের ডোবা, নালা, পুকুর, খাল, বিল সব কিছু অরক্ষিত- কোনো প্রতিরক্ষা দেয়াল নেই এবং যার সহজ শিকার হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা । তারমানে, ০৯ থেকে বেলা ১টা সময়কালে বাস্তবতার আলোকে বলা যায় গ্রামাঞ্চলে বসবাস করা আমাদের শিশুরা অরক্ষিত থাকেন।

করনীয় কী ?

পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধে করনীয় সম্পর্কে নির্দেশনা দিয়েছে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৭ সালে Preventing drowning: an implementation guide এর মাধ্যমে। সেখানে কম্যূনিটির সম্পৃক্ততার মাধ্যমে শিশুদের পানির উৎসে যাতায়াতে প্রতিবন্ধকতা তৈরিসহ নীতি পর্যালোচনার বিষয়কে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক সংস্থা ব্লুমবার্গ ফিলানফ্রোপিক ও রয়েল লাইফবোট-ইউকে এর সহযোগিতায় সিআরপিআরবি এর আচল ও ভাসা মডেল কে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে, এই মডেলের সাফল্য প্রমানিত।

পূর্বপশ্চিমবিডি/জেআর

পানিতে ডুবে,শিশু
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close