• মঙ্গলবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২০, ১৪ মাঘ ১৪২৬
  • ||

বিষণ্ণ শহরের মানুষেরা

প্রকাশ:  ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৮:৪৯ | আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:৪৩
কাজী নুসরাত শরমীন
কাজী নুসরাত শরমীন

ঢাকা শহরে বাড়ি বদলের হ্যাপা অনেক। তার মধ্যে ভালো ভালো বাসাগুলো মাসের সাত-আট তারিখের মধ্যেই ভাড়া হয়ে যায়। মিতিল গত কয়েকদিন ধরে ঘণ্টা হিসেবে রিকশা ভাড়া করে ঘুরে ঘুরে বাসা খুঁজছে। সিঙ্গেল মাদারদের বাসা পেতে অনেক ঝক্কি। বাড়িওয়ালার নানা রকম উদ্ভট প্রশ্ন, ধৈর্য নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে।

মিতিল গত আট বছর ধরে যে বাড়িতে ভাড়া থাকে, বাড়িওয়ালা খালু মারা যাওয়ার পর তার ছেলেমেয়েরা বাড়িটি ডেভেলপারকে দিয়ে দিয়েছে। তিনি বেঁচে থাকতে বহু ডেভেলপারকে এ বাড়ি থেকে দূর দূর করে তাড়িয়েছেন। এ নিয়ে অবশ্য তার ছেলেমেয়েদের সাথে দূরত্বও তৈরি হয়েছিলো। মারা যাওয়ার এক মাস পরই ছেলেমেয়েরা ডেভেলপার ডেকে চুক্তি করে নিয়েছে। খালু মারা যাওয়ার পর খালাম্মাও খুব চুপচাপ হয়ে গেছেন, কোনো বিষয়েই কথা বলেন না। এ মাসেই বাড়ি ছাড়তে হবে। এই বাড়িওয়ালা ছিলো মিতিলের নিশ্চিন্ত নির্ভরতা। মিতিলের ছেলে ভ্রমরও তাকে নানাভাই বলে ডাকতো। রোজ বিকেলে ভ্রমরের সাথে ফুটবল, ব্যাডমিন্টন খেলতো। হঠাৎ করেই স্ট্রোক হয় তার, তিন দিন ছিলেন আইসিইউতে। আর জ্ঞান ফেরেনি। ভ্রমরের বাবার বিষয়টা তিনি খুব ভালোভাবে জানতেন। মিতিলের একলার যুদ্ধকে সম্মান করতেন। আনিসকে ডিভোর্স দেয়ার সময় মিতিলের মা-বাবা কেউ ওর পক্ষে ছিলো না। তারা বলেছে কম্প্রোমাইজ করতে। কতো মেয়েই তো করছে। তার হঠাৎ বেগম রোকেয়া হওয়ার কী দরকার? এমন নানা রকম বিচ্ছিরি কথার তলে তারা মিতিলের আত্মসম্মানকে ধূলায় মিশিয়ে দিচ্ছিলেন। তবে বাড়িওয়ালা খালু মিতিলের পক্ষে ছিলো। তিনি সাহস দিয়েছেন। মিতিলও ভেবেছে জীবন মানে সহ্য করা না, বেঁচে থাকা। আনন্দ আর আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচা। আনিস জীবনের সমস্ত ব্যর্থতা মিতিলের ঘাড়ে চাপিয়ে, মিতিলকে যার তার সামনে কারণে অকারণে নোংরা কথা শোনাতো। নিজের খামতিগুলো এভাবে ঢাকতে চাইতো। বারবার অপরাধ করতো আর বারবার পায়ে ধরে ক্ষমা চাইতো। ১৮ বছর আনিসের এই অসুস্থতা সহ্য করেছে। রোজ ভেবেছে, কাল সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। ঠিক হয়নি কিছুই। বাড়ির লোক থেকে শুরু করে রাস্তার রিকশাওয়ালা পর্যন্ত যার তার সামনে অপমানিত হতে হতে একসময় মিতিলের মনে আনিসের জন্য ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই টেকেনি। একটা অসুস্থ সম্পর্ক টানাহ্যাঁচড়ার চেয়ে ডিভোর্সই যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে মিতিলের।

ডিভোর্সের পর আনিস অবশ্য ভেবেছিলো সবসময়ের মতো কয়েকটা দিন গেলেই মিতিল সব ভুলে যাবে। কিন্তু এবার তা হয়নি। জীবনের রোজকার যন্ত্রণা, রোজকার আহত হওয়া মনের ভেতরকার কোমলতা নষ্ট হয়েছে, পরিচর্যা পায়নি। অযত্নে অবহেলায় এককালে মনের মধ্যে যে মায়া ছিলো, এমন ভাবনাটাই যেনো নষ্ট হয়ে গেছে। একটা করুণ কবিতাও পড়তে গেলে যে মিতিলের কান্নার আষাঢ় শ্রাবণ নামতো, সে আজ অনেক দৃঢ়, পাহাড়ের মতো অটল। প্রথমে রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে আনিস। ক’দিন পর আবার ফিরতে চেয়েছে। কিন্ত সখিনা খালাকে স্পষ্ট বলে দেয়া আছে, এই বিষয়টি মীমাংসাযোগ্য নয়। মিতিলের বাবা-মাও বসতে চেয়েছেন বারবার, কিন্তু মিতিল অনড়, যে গ্লানিময় সময় থেকে বেরোতে তার আঠারো বছর সময় লেগেছে, সেই সময়ে সে আর ফিরতে চায় না। মাঝে মাঝে গভীর রাতে আনিস বাসার নিচে এসে চিৎকার করতো। কখনো মিতিলের নাম ধরে, কখনো বা ভ্রমরকে ডাকতো। ভ্রমর নিচে নামলে কতক্ষণ গল্প করে আবার চলে যেতো। ভ্রমরের মরার মনের কথা মিতিল সব জানতো। কবে কোথায় কি হয়েছে, বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ, কে কাকে প্রপোজ করেছে, কার প্রেমের চিঠি স্যারের হাতে ধরা পড়লো, সে কথাও। শুধু ওই এক প্রসঙ্গ ছাড়া, সেটা আনিস। আনিস প্রসঙ্গে দু’জনের মধ্যেই একটা শীতল রকমের নীরবতা ।

ডিভোর্সের পর ভোমরা মায়ের কাছেই থাকতে চেয়েছে। হয়তো বাবার জন্যও প্রাণ পুড়তো, কিন্তু মায়ের রোজকার যন্ত্রণার জীবন দেখে দেখে বড় হয়েছে সে। মা আবার রোজ রাতে বারান্দায় বসে কাঁদুক, এটাও সে মন থেকে চাইতো না। হঠাৎ করেই মিতিলকে এ বাড়ি ছাড়তে হচ্ছে। আপাতত জিগাতলাতেই থাকতে হবে। ভ্রমর ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছে ঢাকা কলেজে। মিতিলের অফিস বনানী হলেও ছেলের জন্য এই মুহূর্তে জিগাতলাই থাকতে হচ্ছে ।

ঘন্টাকাবারি রিকশা চলছে ঢিমে তালে। মিতিল মনে মনে নতুন বাড়িওয়ালার সম্ভব্য প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে। বাস স্ট্যান্ডের আগের গলিতে টু-লেট দেখে রিকশা থামলো। দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলে সে দোতলার কলিং বেল চাপতেই একজন মাঝ বয়সি ভদ্র মহিলা বাজখাই গলায় দোতলার বারান্দা থেকে জিজ্ঞেস করলেন, কে ? দারোয়ান বললো, খালাম্মা, ভাড়াটিয়া। বাসার বিষয়ে কথা বলতে চায়। এরপর লম্বা লাঠির মাথায় পলিথিন বেঁধে চাবি ফেললেন, সঙ্গে একটি চিরকুট।

তাতে লেখা, “চার রুম। দুই বেড+ দুই বাথ (একটিতে হাই কমোড, অন্যটিতে প্যান)+ড্রয়িং+ডাইনিং+মাস্টার বেডের সাথে এক বারান্দা। ভাড়া : ১৭ হাজার, সার্ভিস চার্জ ১৫০০, সব বিল আলাদা। দুই মাসের অ্যাডভান্স। হাজব্যান্ড, ওয়াইফ ও এক বাচ্চা। তবে যাদের বাচ্চা নেই তাদের অগ্রাধিকার। অতিরিক্ত মেহমান আসা যাবে না। বাড়ি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে( প্রতিদিন বিকেলে বাড়ির মালিক বা কেয়ার টেকার তা চেক করবেন)। বাসায় ওঠার আগে সব ঠিকঠাক করে দেয়া হবে, এরপর যা কিছু নষ্ট হবে নিজ খরচে ঠিক করতে হবে। উল্লেখিত বিষয় বাড়ি ভাড়ার চুক্তিপত্রেও থাকবে। রাজি থাকলে দোতলায় আসুন। অন্য কিছু জানার থাকলে টুলেটে দেয়া নাম্বারে ফোন করুন। বিশেষ দ্রষ্টব্য: ভাড়া কমানো হবে না”।

ঢাকা শহরে সব বাড়িঅলাদের ভাড়ার কন্ডিশন প্রায় কাছাকাছি। মিতিল ফ্যামিলি মেম্বার এর বিষয়ে ফোনে কথা বলতে চাইলো। ফোন করতেই বাজখাই গলার মহিলা ধরলেন। সম্ভবত তিনিই বাড়িওয়ালী। কমন প্রশ্ন, ফ্যামেলি মেম্বার কয়জন ? দুই জন, মিতিল উত্তর দিলো। ওহ্, হাজব্যান্ড-ওয়াইফ? তাহলে তো খুবই ভালো। আমরা আসলে এমন ভাড়াটিয়াই খুঁজতেছি। ভদ্রমহিলা হড়বড় করে তার ক্রাইটেরিয়া বলে চলেছেন। এর আগে একটা বদের হাড্ডি ছিলো। বাচ্চাটা তো বিচ্ছু! আমার দেয়ালগুলিতে আঁকায়ে রাখে নাই কিছু। আর বাবা-মা খালি তাকায়ে তাকায়ে দেখছে। জিজ্ঞেস করছি পরে বলে কি! ও তো ছোট, ওকে বকবেন না খালাম্মা, এতে বাচ্চাদের ক্রিয়েটিভিটি নষ্ট হয়ে যায়। ইশ ! বকবো না তো আদর করবো ? এতো সুন্দর রঙ করে দিছি, আর পুরা ওয়াল জুইড়া কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাং আঁইকা রাখছে। উচিত ছিলো থাপরায়ে কান গরম করে দেয়া। বদের বাচ্চা বদ। আপনার বাচ্চার দেয়ালে আঁকাআঁকির অভ্যাস নাই তো ? তা আপনার হাজব্যান্ড কই ? কি করে সে ? মিতিল কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে উত্তর দিলো, আমাদের ডিভোর্স হয়ে গেছে। স্বামী ছাড়া তো বাড়ি ভাড়া দেই না, আপর প্রান্ত থেকে খেঁকিয়ে উঠলেন। মিতিল কিছু একটা বলতে চাইলো, কিন্তু মুখের ওপর ফোন রেখে দিলেন বাড়িওয়ালী। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কয়েক মুহূর্ত ফোনটা কানেই চেপে রাখলো মিতিল। চুপচাপ রিকশায় উঠে হাতের ইশারায় সামনে যেতে বলে রিকশাঅলাকে।

শীত এলেই ইট কাঠের শহরটা আরও খটখটে হয়ে যায়। ধুলো আর ধুলো, চারদিকটা কেমন ফ্যাকাশে লাগছে। তার মধ্যে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি লেগে থাকে সারাটা বছর। একটু সামনে এগিয়ে গলির ভেতর ঢুকতেই বলা নেই, কওয়া নেই, রাস্তা কাটা। ‘উন্নয়ন কাজের জন্য সাময়িক অসুবিধা সৃষ্টি হওয়ার আমরা দুঃখিত’ এই সাইনবোর্ড টানিয়ে কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব সেরেছে। অথচ সাত আট মাস আগেই এই রাস্তাটি খোঁড়া হয়েছে। রিকশা ভাড়া চুকিয়ে প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে কাটা রাস্তার স্তূপ করা কাদামাটি আর ড্রেনের ময়লা পাশ কাটিয়ে হেঁটে সামনে এগোতে থাকে মিতিল। এখানে বেশ কয়েকটা টু-লেট টানানো। খুব চায়ের তেষ্টা পেয়েছে, রাস্তার পাশে টঙ ঘরে চা খেতে বসে।

মামা, একটা লাল চা দেন। লোকটা চা বানায় ঝড়ের গতিতে। সামনে রাখা কৌটায় কোথায় কী সব তার মুখস্থ। অভ্যস্ত হাতে কবিতার মতো দুলে দুলে এক একটা কৌটা থেকে দুধ, চিনি কখনো মাল্টা, বা লেবুর রস নিয়ে অদ্ভুত দ্রুততার সাথে চায়ের কাপে গোলাচ্ছেন। নইলে অবশ্য এতো কাস্টমার সামাল দেয়া সহজ হতো না। বেশির ভাগই বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া। তাদের নিজেদের মধ্যে আলাপে এটুকু বোঝা গেলো। চায়ে চুমুক দিতেই আহা শান্তি! আজ সারাদিন চা খাওয়ার সুযোগ হয়নি। ইশারায় চা-মামাকে রাস্তার উল্টো পাশের টু-লেটটা দেখালো মিতিল। এই বাসাটার ব্যাপারে কিছু জানেন ? ও এইটা ? হুম, কয় রুম, ভাড়া কেমন জানেন ? । জানি তো, তিন রুম। দুইটা বেড আর ড্রয়িং-ডাইনিং। বাড়িঅলা বিদেশে থাকে। কেয়ার টেকার জাহাঙ্গীরই সব। এই এতক্ষণ এই খানে বসে চা খাইতেছিলো ? সেই হইলো গিয়া জাহাঙ্গীর। প্রায় দশ বারো বছর ধইরা সেই এই বাড়ির দেখাশুনা করতেছে। খুবই সরল, বাড়িঅলার নিজের লোক। তার উপরে বাড়িঅলা কোনো কথা কয় না। সে দিন বললে দিন, রাইত বললে রাইত। আপনে বাসা খুঁজতেছেন ? হুম, বারান্দাটা অনেক বড়। ওটা দেখেই পছন্দ হয়ে গেছে। কথা বলতে বলতেই ঝড়ের বেগে চা বানাচ্ছে চা-মামা। মনে হলো কেয়ার টেকার জাহাঙ্গীরের সাথে তার ভালোই ভাব। টু-লেটের নাম্বার থিকা জাহাঙ্গীররে একটা ফোন দেন, আগে বাসা দেখেন। পছন্দ হইলে কথা বলবেন।

কিন্তু মামা, আমি তো বাচ্চা নিয়ে একা থাকি , ভাড়া দিতে রাজি হবে ? কেন হইবো না ? তার বাড়িতে ভাড়া থাকবেন, মাস আইলে ঠিকমতো ভাড়া দিবেন। তাইলে সমস্যা কি ? ফোন দেন তারে, আমি বইলা দিতেছি। মিতিল একটু আশা খুঁজে পেলো। নাম্বারে ফোন করতেই হোঁদল কুতকুত ধরণের একটা লোক এলো। সেই জাহাঙ্গীর। অবশ্য একটু আগেই মিতিলের পাশে বেঞ্চ বসে চা খাচ্ছিলো। বাসা খোঁজার টেনশানে মিতিল তখন খেয়াল করেনি। আফা, আন্নে নি ফোন কইচ্চেন ? বাসা লাইগবো ? হুম, বারান্দাটা খুব সুন্দর। বাসাটা দেখাবেন ? ভাড়া ১৮ হাজার , আর গ্যাস, হানি আর কারেন্টের বিল আলাদা। জাহাঙ্গীরের বাড়ি নোয়াখালি, কথায় তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। তবে মাঝে মাঝে আবার দুয়েকটা শব্দ অন্যরকম করে বলছে। অনেকদিন ধরে ঢাকায় থাকছে বলেই হয়তো নোয়াখালি আর ঢাকা মিলিয়ে ভাষাটাও ভজঘট করে ফেলেছে। মিতিলের বাজেট ছিলো সব মিলিয়ে ১৮ হাজার। প্রতিবার বাসা ছাড়লেই তিন চার হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া বাড়ে। বেতনের বড় অংশই চলে যায় বাড়ি ভাড়ায়। বাবার করে দেয়া এফডিআরটা ছিলো বলে রক্ষা। ওখান থেকে যা আসে, তাতে কোনোমতে ভ্রমরের পড়ার খরচ হয়ে যায়। তবু মাস শেষে টানাটানিতে পড়তই হয়। তার ওপর জিনিসপত্রের যে দাম! পেঁয়াজ আকাশ ছুঁয়েছে, লবণে গুজব, খাবারে ভেজাল...এসব ভাবলে মিতিলের অস্থির লাগে। ডিপ্রেশন চলে আসে।

জাহাঙ্গীর বাসা খুলে দেখালো। ভ্রমরের রুমটা একটু বেশিই ছোট । ওর ছবি আঁকার জিনিস পত্র রাখতেই তো একটা ঘর লাগে। তবু কি আর করা। জাহাঙ্গীর ভাই, আমি আর আমার ছেলে থাকবো। ভাই কি করে আফা ? ডিভোর্স হয়ে গেছে। ও আইচ্ছা। জাহাঙ্গীর খুবই নির্লিপ্ত। ওর কাছে এই হাজব্যান্ড না থাকাটা তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে হলো না হয়তো। ভাড়াটা একটু কমানো যায় না ? না আফা। গত হাঁচ বচ্ছরে ভাড়া বাড়াই ন। বাড়িঅলা বালা মানুষ। অতো টাকার খিদা নাই। আমরা বচ্ছর বচ্ছর ভাড়া বাড়াই না। মিতিল এতক্ষণে একটা বিষয় খেয়াল করছিলো, জাহাঙ্গীর না হেসে কোনো কথাই বলতে পারে না। ক্যাবলা টাইপ একটা হাসি হয়ত সবসময় তার মুখে লেগে থাকে। চেহারার আলস্য আর মাত্রাতিরিক্ত স্বাস্থ্য বলে দিচ্ছে, সে একটা অকর্মার ঢেঁকি। তার ওপর মাথায় চুল নেই, ফেলে দিয়েছে বোধহয়। শরীরের তুলনায় আকারে ছোট শার্ট পরায় মনে হচ্ছে শার্টের বোতাম ছিঁড়ে এক্ষুণি তার ভুড়িটা বের হয়ে আসবে। মাথায় কালো রঙের ক্যাপ আর পরনে কটকটে রঙের জিন্সের প্যান্ট। হাসি, পোশাক, কথা বলার ভঙ্গি সব মিলিয়ে জাহাঙ্গীর একটা হোঁদল কুতকুতের প্যাকেজ। তবে সে খুব সরল। বাড়িঅলা এ জন্যই হয়তো এতো বিশ্বাস করে তাকে। বাসাটা কনফার্ম করে ফেললো। আজ মাসের ১৮ তারিখ, সামনে আর খুব একটা সময় নেই। অল্প অল্প করে প্যাকিং শুরু করতে হবে।

এক তারিখ বাসা শিফ্ট হলো। মিতিল আজ অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে। প্যাকিং বেশির ভাগটা সখিনা বুয়া আর ভ্রমরই করলো। ভ্রমর খুব গুছানো আর পরিপাটি থাকতে পছন্দ করে। এ নিয়ে বুয়ার সঙ্গে রোজ মৃদু তর্ক হয়, অবশ্য ঠাট্টার ছলে। সখিনা বুয়া সেই ছোট্টবেলা থেকে ভ্রমরকে কোলেপিঠে করে বড় করেছে। সে না থাকলে মিতিলের আর এত আয়েশে চাকরিও করা হতো না। তবে রেগে গেলে সখিনা বুয়া একদম পাজির নানী। কথায় কথায় ব্যাগ গুছিয়ে বাড়ি চলে যাওয়ার হুমকি দেয়। মিতিল আর ভ্রমর তখন পালা করে তাকে তোয়াজ করতে থাকে। বয়সের তুলনায় ভ্রমরের খুব বাবা বাবা চালচলন। মাকে এমনতর শাসনে রাখে যে, কে ছেলে আর কে মা বোঝাই যায় না। মিতিল সবসময় ওষুধ খেতে ভুলে যায়, ভ্রমর মনে রাখে। দুপুরের মধ্যে সব জিনিসপত্র নতুন বাসায় চলে এলো। জিনিস পত্র প্যাক কারার সময় খুঁজে খুঁজে পুরোনো সবকিছু ফেলে দেয়া হয়েছে। ড্রয়ারের জরুরি কাগজপত্র গোছাতে গিয়ে ডিভোর্স পেপারটা হতে পড়লো। মিতিল কিছুক্ষণের জন্য স্থির হয়ে বসে রইলো। আনিসের সাথে ডিভোর্সের কত দুঃসহ স্মৃতি ওই বাড়িটাতে ফেলে এসেছে। শেষদিকে ওর সাথে কথাই বলা যেতো না। কারণে অকারণে সারাক্ষণ চিৎকার করতো। জীবনের সব ব্যর্থতার জন্য মিতিলকেই দায়ী করতো। পান থেকে চুন খসলেই মিতিলের বাবা-মা তুলে গালি দিতো। সব কিছু তার ইচ্ছামতো হওয়া চাই। মিতিল কাকে কি বলবে, হাসবে নাকি গম্ভীর হয়ে থাকবে, সব বিষয় হতে হবে তার মর্জিমতো।

রাতে ঘরে ফিরে টিভির রিমোট মিতিলের হাতে দেখলেই ভাবতো, সারা সন্ধ্যা সে টিভি দেখেই কাটিয়েছে। তখন বেড রুমে ঢুকে নিজের প্রয়োজনীয় কিছু একটা খুঁজে না পাওয়ার ছুঁতোয় চিৎকার শুরু করতো। টেবিলে এই প্লেট কোথা থেকে এলো ? নুনের বাটিতে নুন নেই কেনো ? গামছাটা ভাঁজ করা হলো না কেনো ? লোকজন দেখলে সে চিৎকারের মাত্রা আরও বেড়ে যেতো। সখিনা বুয়া মিতিলের বাবার বাড়ির পুরোনো কাজের লোক। ভ্রমর হওয়ার পর, আনিসের রান্নাবান্না সব ঠিকঠাক মতো চলার জন্যেই মিতিলের আম্মা সখিনা বুয়াকে পাঠিয়েছেন। সেই সখিনা বুয়ার সামনেই রোজ মিতিলকে বাজে ভাষায় অপমান করতো আনিস। ডিভোর্সের পর প্রথম দিকে ভ্রমরের সাথে যোগাযোগ থাকলেও গত দুবছরে আর কোনো খোঁজ নেয়নি আনিস। ভ্রমরের দাদা বাড়ির সাথেও ডিভোর্সের পর থেকে আর কোনো যোগাযোগ নেই। মিতিলের বাবা-মা ডিভের্সের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি। প্রথম দিকে কথা বন্ধ করে দিলেও এখন খোঁজ খবর রাখেন।

মিতিল যতক্ষণ বাসায় থাকে, ভ্রমরও সারাক্ষণ মায়ের সঙ্গেই লেপ্টে থাকে। কলেজে ভ্রমরের খুব বেশি বন্ধু নেই, হাতে গোনা দুয়েকজন। তার সব গল্প মায়ের সঙ্গে। পড়াশোনায় সে মাঝারি মানের তবে আঁকার হাত অসাধারণ। দারুণ দারুণ সব স্কেচ করে, দেখলে মনে হয় যেনো জীবন্ত! ভ্রমরের নামের সাথে তার স্বভাবের দারুণ মিল। সারাক্ষণ ছোটাছুটি তার একার রাজত্বে। সকালে ধানমন্ডি লেকে হাঁটতে যায় মিতিলের ঘুম ভাঙার আগে। এখানে হাহা হিহি করা একদল বুড়োর সঙ্গে তার তুমুল বন্ধুত্ব। ফিরে এসে মায়ের সাথে নাস্তা করে। মিতিলের দুপুরের খাবারটা সখিনা বুয়া ঠিকমতো প্যাক করলো কিনা রোজ সেটা চেক করে। ওর তদারকিতে সখিনা যার পর নাই বিরক্ত। মিতিল মুখ টিপে হাসে। এরপর মা ছেলে একসাথে বেরিয়ে পড়ে। দুপুরের খাবার একা একা খেতে হয়, তাই অনেক সময় দুপুরে খায় না ভ্রমর। সখিনা বুয়া অবশ্য পেছনে লেগে থাকে। কিন্তু ভ্রমর খুব একরোখা। যা একবার না বলে তা আর হ্যাঁ হয় না। ভ্রমরের এই যতœ, আর সারাক্ষণ পাশে পাশে থাকা মিতিলের একলা জীবনটা ভরিয়ে রেখেছে। দ্বিতীয়বার জীবন নিয়ে ভাববার কথা মনেই হয়নি কখনো। ভ্রমর দারুণ বাঁশি বাজায়। গানের স্কুল সুর বিহারে সে সবার প্রিয় ছাত্র ছিলো। দুপুরে কলেজ থেকে ফিরে মাঝে মাঝেই বাঁশিটা নিয়ে ধানমন্ডি লেকের ধারে চলে যায়। ছুটির দিনে মিতিলও সঙ্গে যায়। কোথা থেকে অদ্ভুত এক বিষন্নতা টেনে নিয়ে আসে বাঁশির সুরে। মিতিল আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। ভ্রমর আর মিতিলের যৌথ জীবনে এইসব টুকরো টুকরো উৎসব আলো হয়ে ঠিকরে পড়তো খুশির বারান্দায়।

মিতিল গত ছয় বছর ধরে এই ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করছে। ৫টা বাজতে ২০ মিনিট বাকি। ডেস্কে বসে আছে। এই সময়টাতে তেমন ক্লায়েন্টের চাপ থাকে না। সকাল থেকে বেশ কিছু টিকেট ইস্যু হয়েছে। । হঠাৎ বাসা থেকে সখিনা বুয়ার ফোন, খুব উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলছে, বাবু দরজা খুলতেছে না ! কলেজ থেকেও তাড়াতাড়ি আয়া পড়ছে। খায় নাই কিছু। সেই কহন থেইকা দরজা পিটাইতেছি, ঘরের মধ্যে কোনো রা নাই। মিতিল মুহূর্তেই ফোনটা কেটে দিলো। তারপর ঝড়ের বেগে কেমন করে বাড়ি পর্যন্ত এসেছে, মনে নেই। জাহাঙ্গীর দরজা ভেঙে ওর নিথর দেহটা নিচে নামিয়েছে। মাকে সারাক্ষণ হাসি আনন্দে মাতিয়ে রাখা ভোমরার প্রাণহীন মুখটা কি বিষন্ন! মিতিলের সারা জীবনের একমাত্র আশ্রয় আজ কোন এক অজানা কারণে ফ্যানের সঙ্গে ফাঁস দিয়েছে। বাড়ি ভর্তি উৎসুক জনতা, জানতে চায় একলা মায়ের খামতি আর কোথায় কি ত্রুটি হয়েছে। সখিনা বুয়া বিলাপ করছে। আনিস দেশেল বাইরে, বন্ধুদের সাথে ট্যুরে গেছে। তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

হাসপাতালে মর্গের সামনে হাত পা ছড়িয়ে বসে আছে মিতিল। খবর পেয়ে কাছের দূরের অনেকেই জড়ো হয়েছে এখানে। আজিমপুর গোরস্থানে লাশ দাফনের ব্যবস্থা হচ্ছে। মিতিলের প্রাণ ভোমরা অকারণ অভিমানে পাড়ি দিয়েছে আজ বিষণ্ণ কুয়াশার দেশে।

পূর্বপশ্চিমবিডি/ এআর

কাজী নুসরাত শরমীন
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত