Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৫ আশ্বিন ১৪২৬
  • ||

মিন্নিকে যেন ভুলে না যাই

প্রকাশ:  ৩০ আগস্ট ২০১৯, ১৭:৩৯
রোকসানা ইয়াসমিন
প্রিন্ট icon

কত রকম সমস্যার মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি। একটা শেষ না হতেই আর একটা শুরু হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিনই পরিবর্তিত হচ্ছে আলোচনার গুরুত্ব। তাই একটা বিষয় বেশিদিন আলোচনায় থাকে না। আমরাও তাল সামলাতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলছি।

শরীরে আগুন লাগিয়ে নুসরাত হত্যা, মিন্নির স্বামী রিফাত শরীফকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে খুন, ছেলেধরা সন্দেহে রানুকে পিটিয়ে হত্যা, ডেঙ্গুর মহামারী রূপ এবং একে একে স্বজন-পরিজনকে হারানো নিয়ে আমাদের আতংক এবং রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনে বিভিন্ন শর্তরোপ, সব মিলিয়ে কোথাও কোন ইতিবাচক সংবাদ নেই, অন্তত এই জাতির জন্য। আর সবশেষ জামালপুরের ডিসির সাথে তার অফিস সহকারীর অন্তরঙ্গ ভিডিও নিয়ে নানাজনের মুখরোচক গল্প এখনও অব্যাহত আছে।

আপাতত বরগুনায় রিফাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আলোচিত মিন্নিকে আজ জামিন দেয়ার খবরটি কিছুটা আশাদায়ক।

গত কয়েকদিন ধরে আমার শুধু মিন্নির কথা মনে পড়ছিল, কেমন আছে মেয়েটি? ও কি ক্ষমতাসীনদের সাথে লড়াইয়ে টিকে থাকতে পারবে? সে কি ন্যায় বিচার পাবে? আমরা কিছুই জানতে পারছিলাম না, কী হচ্ছে পর্দার আড়ালে! পত্র-পত্রিকা আর টেলিভিশন চ্যানেলগুলি এখন আর সেভাবে রিফাত হত্যাকাণ্ড নিয়ে চোখে পড়ার মতো নিউজও করছিল না। সবাই কেমন জানি চুপ করে আছে। এই হত্যা মামলা নিয়ে কি জনগণের কোন আগ্রহ নেই? আমার কিন্তু আগ্রহ আছে। একজন নাগরিক হিসাবে আমি কিন্তু জানতে চাই আপডেট।

তো পেলাম এই আপডেট: ‘বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া তাঁর স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকাকে জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট। রায়ে আদালত বলেন, জামিনে থাকা অবস্থায় আয়শা সিদ্দিকা তাঁর বাবার জিম্মায় থাকবেন। আয়শা সিদ্দিকা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না। ব্যত্যয় ঘটলে তাঁর জামিন বাতিল হবে’। একরকম স্বস্তির নি:শ্বাস ফেললাম।

কারণ কয়েকদিন আগেই একটা অনলাইন পোর্টাল নিউজ করেছে যে রিমান্ডে মিন্নির উপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। মিন্নির পরিবার তার সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। তাদের কাছে তার উপর হওয়া অমানুষিক নির্যাতনের কথা বলে কান্নায় ভেঙে পড়ে মেয়েটি সেইদিন।

সাংবাদিকদের কাছে এই কথাগুলি বলতে গিয়ে মিন্নির মা জিনাত জাহানও কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি অভিযোগ করেন, একজন এসআইয়ের নেতৃত্বে মিন্নির উপর এই নির্যাতন চালানো হয়। ওই সময় নাকি তাকে পানিও পান করতে দেয়া হয়নি।

জিনাত জাহান বলেন, “একটা সাদা কাগজে কিছু কথা লিখে দিয়ে তাকে মুখস্ত করতে বলে পুলিশের ওই এসআই।”

“যতক্ষণ না মিন্নি ওই কথাগুলি মুখস্ত বলেছে, ততক্ষণ তারা মিন্নিকে নির্যাতন করেছে,” কেঁদে কেঁদে বলেন মিন্নির মা।

গত ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রিফাত শরীফকে। যেদিন ঘটনাটি ঘটে সারাদিনই বিভিন্ন মিডিয়া বলতে থাকে, একজন নারী শত চেষ্টা করেও তার স্বামীকে বাঁচাতে পারেনি। সবার কী হা-হুতাশ এই দম্পতির জন্য!

কিন্তু পরের দিনই দৃশ্যপট পালটে যায়। সামনে চলে আসে মিন্নির চরিত্র নিয়ে নানান কানাঘুষা। শোকসন্তপ্ত মেয়েটিকে এতোটুকু রেহাই দেয়নি কেউ, না মিডিয়ার লোকজন, না স্থানীয়রা। গণমাধ্যমে মিন্নিকে নিয়ে রীতিমতোন জেহাদ চলে। তাদের কানাঘুষায় ঘি ঢেলে দেয় নয়ন-মিন্নির একান্ত একটি ভিডিও। তবে ওইটা নয়ন এবং মিন্নির ভিডিও নয় বলেই পরে খবর বের হয়েছে, কিন্তু তার আগেই যা হওয়ার হয়ে গেছে। যদি ধরেও নেই যে ওটা মিন্নি আর নয়নেরই ভিডিও, তাতে কি প্রমাণিত হয় যে মিন্নির চরিত্র খারাপ?

আমরা তো শুনেছি যে মিন্নি নয়নকে বিয়ে করেছিল, রিফাত তার দ্বিতীয় স্বামী। কাজেই অন্য বিবাহিতদের মত তাদের মধ্যে ঘনিষ্টতা, শারীরিক সম্পর্ক থাকবে এটাই স্বাভাবিক।

এখানেই শেষ না, এক পর্যায়ে আমরা রিফাতের বাবাকেও বলতে শুনি যে, মিন্নি হত্যাকারীদের একজন এবং এজন্য তিনি মানববন্ধন করে মিন্নির গ্রেফতার দাবি করেন। সেদিন অনেকের মতো আমিও অবাক হয়েছিলাম।

শেষ পর্যন্ত কাকে খুশি করতে বা কাকে বাঁচাতে মিন্নিকে গ্রেফতার করা হলো, তা একেবারেই যে বোধগম্য না, তা বলা যাচ্ছে না। কারণ গণমাধ্যমেরই খবর অনুযায়ী একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে বাঁচাতেই মেয়েটিকে গ্রেফতার করা হয়। মিন্নিকে গ্রেফতারের পর আদালতে হাজির করা হলেও তাকে আইনি সহায়তা দেননি কোনো আইনজীবী প্রথম দিন। মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন অভিযোগ করেন, প্রভাবশালী মহলের চাপে বরগুনার কোনো আইনজীবী তার মেয়ের পক্ষে লড়তে রাজি নন।

বিশিষ্ট আইনজীবীদের মতে, আদালতে মিন্নির পক্ষে কোনো আইনজীবী না দাঁড়ানো সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকারের লঙ্ঘন। এমনকি বরগুনার সংশ্নিষ্ট আইনজীবীরা পেশাগত অসদাচরণ করেছেন বলেও তাদের অভিযোগ।

নাগরিকের আইনগত সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে সংবিধানের ৩৩ (১) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘গ্রেফতারকৃত কোনো ব্যক্তিকে যথাসম্ভব শীঘ্র গ্রেফতারের কারণ না জানিয়ে তাকে প্রহরায় আটক রাখা যাবে না এবং ওই ব্যক্তিকে তার মনোনীত আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শের ও তার দ্বারা আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার হতে বঞ্চিত রাখা যাবে না।’

তবে দেরিতে হলেও এই ঘটনার পর বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা মিন্নির পরিবারের পাশে দাঁড়ায়। মিন্নির জন্য আইনজীবীর ব্যবস্থা হয়। আর তারই ফলস্বরূপ আজ মিন্নির জামিন।

মিন্নির পরিবার এবং স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থানীয় সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর পুত্র সুনাম দেবনাথকে বাঁচানোর জন্যই মিন্নিকে ফাঁসানো হচ্ছে। কারণ বরগুনায় সুনাম গডফাদার হিসেবেই পরিচিত এবং তার সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় নয়নের সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে উঠেছে। তাদের ছত্রছায়ায় নয়ন এবং তার বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে বরগুনায় নির্বিঘ্নে মাদক ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। কাজেই বরগুনা পুলিশ প্রশাসন যে সুনামকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করবে, সেটাই স্বাভাবিক।

কথা হচ্ছে, মিন্নি নাকি হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে। কী অবস্থায় কতটুকু সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে, তা পুলিশই বলতে পারবে। পুলিশ বলছে, আসামিদের সঙ্গে মিন্নির কথোপকথনের প্রমাণ রয়েছে তাদের হাতে। এসব তথ্য হয়তো ঠিক। কিন্তু প্রমাণের ঊর্ধ্বে নয়।

মিন্নির স্বীকারোক্তি, অন্য আসামীদের সাথে তার কথোপকথনের প্রমাণ যথার্থ তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। অতীতে আমরা দেখেছি পুলিশ জোর করে স্বীকারোক্তি নিয়েছি অন্যদের বাঁচানোর জন্য। ২১ শে গ্রেনেড হামলায় জজ মিয়াকে কিভাবে ফাঁসানো হয়েছিল দেশবাসী তা এখন জানে এবং তা আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তা সবার সামনে আসে। যদি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না আসতো, তাহলে হয়তো এই সত্যটা জানা হতো না। কিন্তু মিন্নির কী হবে? সে একজন সাধারণ পরিবারের মেয়ে, তার কোনো প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদ নেই। সে ন্যায়বিচার পাবে তো?

আমি বলছি না যে, মিন্নির কোনো দোষ নেই। মিন্নির ‘চরিত্র’ খারাপ হতে পারে, সে একসাথে দুইজনের সাথে সম্পর্ক রাখতে পারে কিংবা রিফাত হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকতে পারে। আমি কোন কিছুই উড়িয়ে দিচ্ছি না। মিন্নি দোষী হলে অবশ্যই তাকে শাস্তি পেতে হবে।

কিন্তু আমার আশংকার জায়গা হলো মিন্নি কি যথাযথ বিচার পাবে?

এক্ষেত্রে বিরাট একটা ভূমিকা পালন করতে পারে আমাদের দেশের পত্র-পত্রিকা এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলি। তারা প্রতিনিয়ত রিফাত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ এবং প্রচার করতে পারে, যাতে পুরা বিষয়টি জনগণের গোচরে থাকে।

বলা হয়ে থাকে, শত শত দোষী মুক্ত হউক, কিন্তু একজন নিরাপরাধী যেন শাস্তি না পায়। সূত্র: উইমেন চাপ্টার

মিন্নি,রোকসানা ইয়াসমিন
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত