• বুধবার, ০৩ জুন ২০২০, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

করোনাকালে জার্মানির রোজনামচা

প্রকাশ:  ২৩ মে ২০২০, ২২:৫৪
নুরুননাহার সাত্তার

গত সপ্তাহ থেকে হোম অফিস, তারপর থেকে বাড়িতেই আছি৷ বলা যায় স্বেচ্ছায় হোম কোয়ারান্টিন৷ তবে আশেপাশের অবস্থা নিজ চোখে দেখার আগ্রহ থাকায়, কিছুক্ষণের জন্য বের হতে হলো৷ জার্মানদের আতঙ্কিত চেহারা দেখে আবারো আমি হোম কোয়ারান্টিনে৷

বহু বছর বিদেশে থাকার কারণেই কিনা জানি না, সারাটা শীতকাল অপেক্ষা করে থাকি বসন্তের ঝলমলে রোদ, সদ্য গজানো গাছের কচি সবুজ পাতা আর রঙিন ফুলের সুবাস উপভোগ করার জন্য, আর সেইসাথে চলতে থাকে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর নানা প্ল্যান৷ হ্যাঁ, এবারো বসন্ত এসেছে এবং গত বছরের বসন্তের চেয়েও সুন্দর আবহাওয়া নিয়ে৷ তবে এবার কিন্তু সে একা আসেনি, মিষ্টি রোদের পাশাপাশি সাথে নিয়ে এসেছে করোনার কঠিন জীবাণুও৷

এই ভয়াবহ ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা জার্মানিতে এখন প্রায় ২৪ হাজার ছাড়িয়ে গেছে আর মৃতের সংখ্যাও কম নয়, ১০০ এর কাছাকাছি৷ নর্থরাইন ওয়েস্টফেলিয়া জার্মানির সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য, যেখানে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় সবচেয়ে বেশি আর এ রাজ্যেই আমার বাস৷ কাজেই ভয় তো কিছুটা আছেই৷

এক নাগাড়ে কদিন বাসায় থাকায় মন খানিকটা বিক্ষিপ্ত, তাকে শান্ত করতেই রাইন নদীর পাড়ে যাওয়ার জন্য গাড়িতে উঠলাম, বাসা থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের পথ৷ সেখানে লোকজন কম থাকবে, ধরেই নিয়েছিলাম, কিন্তু তাই বলে মাত্র তিন চার জন!

অথচ শীত-গ্রীষ্ম সারা বছরই সেখানে ছোট-বড় নবীন-প্রবীণের ভিড় থাকে৷ দূর থেকে অনেকেই গাড়ি করে এসে নদীর ধারে হাঁটেন৷ মাঝেমধ্যে তো সেখানে গাড়ি পার্কিং এর জায়গা পর্যন্ত পাওয়া যায় না৷

করোনা আতঙ্কে অতি পরিচিত রাইনকেও এবার কেমন যেন নিস্তেজ আর অসহায় বলে মনে হচ্ছিলো৷ আমরা হাঁটতে প্রচণ্ড ভালোবাসি কিন্তু মাথায় সার্বক্ষণিক করোনা নিয়ে কি আর হেঁটে মজা পাওয়া যায়?একটু দূরেই তো সুপার মার্কেট, মন টানলো সেদিকে৷ উদ্দেশ্য ক্রেতা-বিক্রেতাদের দেখা৷ এক সপ্তাহ বাইরে বের হইনি, তাই নিজ চোখে বর্তমান অবস্থা দেখা, মানুষের ভাব খানিকটা বোঝা৷ যাই হোক, হ্যান্ড ব্যাগ থেকে ওয়ানটাইম ইউজের গ্লাভস দুটো হাতে পড়ে নিয়ে ঢুকে পড়লাম দোকানে৷ যদিও বাসায় দরকারি সবই আছে, আর বাঙালি বাড়িতে চাল, ডাল, নুন, তেল থাকবারই তো কথা! তাছাড়া জার্মান চ্যান্সেলার ম্যার্কেল বেশ জোর দিয়েই বলেছেন অতিরিক্ত খাবার কিনে বাড়িতে মজুদ করার দরকার নেই৷ বাজারে প্রয়োজনীয় সবকিছুই যথেষ্টই থাকবে৷

হ্যাঁ, আমিও তেমনটাই দেখলাম৷ দোকানের প্রতিটি তাক ভর্তি, কোনো কিছুরই কমতি নেই৷ যদিও বন বা অন্যান্য শহরের দোকানের চেহারা কিছুটা ভিন্ন বলে শুনেছি৷ দোকানের ভেতরে ক্রেতার সংখ্যাও হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন৷আমি দেরি না করে ঝটপট হাতে তুলে নিলাম ভিটামিন সি, এ, সমৃদ্ধ কিছু তাজা ফল৷ করোনার প্রতিষেধক যখন বের হয়নি, করোনাকে প্রতিরোধ করতে তো শরীরে চাই যথেষ্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি৷ যাই হোক সামান্য সদাইটুকু নিয়ে ক্যাশের লাইনে দুই মিটার দূরত্বে দাড়িয়ে গেলাম৷ সবার মাঝে দূরত্বটা ঠিক থাকছে কিনা সেদিকে ক্যাশের মেয়েটি একটু পরপরই নজর রাখছে৷ লাইনে দাড়ানো ক্রেতাদের চেহারায় কেমন এক থমথমে ভাব৷ জার্মানরা এমনিতেই তেমন হাসিখুশি নয়, আর এখন তো চোখেমুখে কেবলই বিরক্তি, যেন একেকজনের ভেতরে চলছে এক ধরনের স্নায়ু যুদ্ধ৷

গ্রোসারি শপ থেকে বেরিয়ে পাশেই ফার্মেসির সামনে বিশাল এক সাইন বোর্ড দেখে থমকে দাড়ালাম৷ যাতে স্পষ্ট করে লেখা, দুজনের বেশি ভেতরে ঢুকবেন না, দূরত্ব রেখে চলুন৷ আর হ্যাঁ, কারো গায়ে জ্বর থাকলে বাসায় চলে যান৷ সেখান থেকে আমাদের ফোন করুন অথবা জ্বর নেই এমন কাউকে আমাদের এখানে পাঠান৷

সাইন বোর্ডের ছবিটি তুলে ফার্মেসির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমার চোখ আটকে গেলো পাশেই মেয়েদের চুলকাটা বা সেলুনের গ্লাসের জানালায়৷ ঠিক দেখছি তো ? হ্যাঁ, সেলুনের ভেতরে তিন সুন্দরী তরুণী খদ্দের, তাদের মধ্যে দুজনের চুল কাটা হচ্ছে আর একজনের সোনালি চুল স্ট্রেট করছে আরেক সোনালী চুলওয়ালী একেবারে গা ঘেঁষে বসে৷ এই দৃশ্য দেখে আমি বিষ্মিত না হয়ে পারিনি৷ সুপার মার্কেট আর ফার্মেসির দৃশ্যের সাথে সেলুনের দৃশ্য ঠিক মেলাতে পারছিলাম না৷ কে জানে, করোনা হয়তো সুন্দরীদের কাছে যেতে ভয় পায়!

তবে আমার কাছে কিন্তু সেলুনের এই ব্যতিক্রম দৃশ্যটি ছাড়া মনে হচ্ছে, করোনা নিয়ে সাধারণ জার্মানরা বেশ সচেতন এবং বিষয়টিকে বেশ গুরুত্ব সহকারেই নিচ্ছে৷ সে কারণেই হয়তো তাদের চোখে মুখে করোনার ছাপ বেশ স্পষ্ট৷ফেরার পথে ব্যাগভর্তি বাজার নিয়ে দুজন বৃদ্ধাকে হাঁটতে দেখে বেশ মায়া লাগলো৷ আহারে, এদের বুঝি সাহায্য করার কেউ নেই৷ তবে কোলনের দক্ষিণে, আমাদের পাড়ার চেহারা কিন্তু এদিক দিয়ে অনেকটাই ভিন্ন৷ কয়েকদিন আগেই লেটার বক্সে একটি খোলা চিঠি পেয়েছি৷ যাতে বেশ বড় বড় করে লেখা, যাদের বাড়িতে কুকুর আছে কিন্তু করোনা সংক্রমণের ভয়ে বাইরে যেতে পারছেন না, তাদের সাহায্য করতে আগ্রহী ১৩, ১৪ বছর বয়সী দুটি মেয়ে৷ অনেক জার্মানই বাড়িতে কুকুর পোষেন এবং বলাই বাহুল্য প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে দিনে কয়েকবার কুকুরকে নিয়ে বাইরে যেতে হয় তাদের৷ কুকুরকে বাইরে নেওয়ার কাজটি এই মেয়ে দুটি করতে চায়, তাছাড়াও টুকটাক বাজার কিংবা ওষুধ কেনায়ও ওরা সাহায্য করতে আগ্রহী বলে লিখেছে খোলা চিঠিতে৷

আমাদের প্রতিবেশী প্রবীণদের ছেলেমেয়েরা অনেকেই মা-বাবার জন্য প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে দিয়ে যাচ্ছে৷ বাড়ির বাইরে এখন প্রতিবেশীদের বলতে গেলে দেখাই যাচ্ছে না৷ প্রবীণদের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, বিশেষজ্ঞরা তো এমনটাই বলছেন৷ তবে প্রতিবেশীদের সাথে আমাদের কাছাকাছি এই মুহূর্তে দেখা না হলেও টেলিফোন আর হোয়াট্স অ্যাপে কুশলাদি বিনিময় হচ্ছে৷

করোনা ভাইরাস সংক্রমণের গতি কমাতে জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল জনগণের প্রতি যেমন কিছু নিয়ম মেনে চলার অনুরোধ করেছেন, তেমনি তিনি পাড়া প্রতিবেশী, যাদের সাহায্যের প্রয়োজন তাদের প্রতি সহমর্মিতার হাতও বাড়িয়ে দিতে বলেছেন৷

সত্যিই জার্মানিতে অনেক বছর কেটে গেলো কিন্তু এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি কখনো হইনি৷ জানিনা আর কতদিন এমন উদ্বেগের মধ্যে কাটাতে হবে, দেখতে হবে পরিচিত-অপরিচিতদের গুরুগম্ভীর আতঙ্কিত মুখ৷ কতদিন চলবে অস্ত্রবিহীন এই যুদ্ধ? যদিও জার্মানিতে করোনা ভাইরাস আসার প্রায় প্রথমদিকেই রবার্ট কখ ইনস্টিটিউট জানিয়ে দিয়েছে, ভাইরাসে প্রায় দুই বছরের মতো ভোগান্তির আশঙ্কার কথা৷সূত্র:ডয়চে ভেলে।

পূর্বপশ্চিমবিডি/জিএম

ভয়াবহ করোনা,ভাইরাস,জার্মানির রোজনামচা,নুরুননাহার সাত্তার
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close