• বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২০, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

নাতাশা টাকার জন্য মায়ের শেষকৃত্য করতে পারছে না, বর পালিয়েছে!

প্রকাশ:  ১০ এপ্রিল ২০২০, ০৯:৫৭
রওশন হক

অফিসের সবাই আনঅফিসিয়ালি টাকা কালেক্ট করছে। সোশ্যাল ডিসটেনসিং ছয় ফুট দূরত্ব মানতে হবে তাই এক শিফটে তিন জন করে কাজ করছি। যারা এই সময়ে কাজ করছে তার জন্য আলাদা করে পে করছে কোম্পানি। করোনাকালে পুরানো কর্মচারী হিসাবে আমাকে কাজ করতে হচ্ছে।এ কথা কেন বলছি? কারণ প্যনডামিক সময়ে বেশিরভাগ এমপ্লয়ি পালিয়েছে। কেউ নিজে অসুস্থ বলেছে। অনেকের ঘরে ছোট বাচ্চা এবং সিনিয়র সিটিজেন বাবা মা আছে বলে কাজে আসতে পারবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। অনেকে জবই ছেড়ে দিয়েছে। আমি পালাতে পারছি না কারণ আমার ঘরের ছোট বাচ্চা আম্মা ও এ সময়ে দেশে আছেন। এর জন্য আমার সাথে ম্যানেজার সুপারভাইজার ও মাঠে নেমে কাজে হাত লাগিয়েছেন। আমেরিকার মানুষ তাদের ইমিউন সিস্টেম বাড়ানোর জন্য ভাইটামিন সি, জিংক, হলুদসহ যত রকম বেরি এ দেশে পাওয়া যায় সবই ধুমায়ে কেপসুল টেবলেট বা পাউডার হিসাবে খাচ্ছে।

যা বলছিলাম মোবাইল টেক্সটের মাধ্যমে সবাইকে মিনিমাম ১০০ ডলার নির্দিষ্ট খামে রেখে দিতে অনুরোধ করা হয়েছে। যদি ক্যাশ না থাকে তাহলে ব্যাংকের মানি ট্রান্সফার অ্যাপের মাধ্যমে দেওয়ার জন্য বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছে।

কি বিপদের কথা! আমি এত টাকা পাবো কই!? তাছাড়া কেন এই দুঃসময়ে আমাকে এত টাকা দিতে হবে? আজকে এপ্রিল মাসের নয় তারিখ। এখনো ঘর ভাডা দেইনি। সরকার বলেছে তিন মাস বাড়ি ভাড়া না দিলে চলবে। তার মানে এই নয় যে দিতেই হবে না। অবশ্যই দিতে হবে। পরে বরং আরও কষ্ট হবে। প্রতি মাসের ঘর ভাড়ার সাথে এক্সট্রা টাকা গুণতে হবে। ট্রাম্প সরকার প্রণোদনার নামে লোন দিতেছে সেটাও এখনো পাইনি। কবে পাবো তাও পরিস্কার না। দেশে ছোট ভাই ঘরে বসা দুই সপ্তাহ পার হয় গেল। সেও বেতন পাবে কি না সন্দেহ। তার সাথে আম্মা ও রয়েছে। দেশের অবস্থা তো আরও খারাপ। সরকার থেকে নিম্নবিত্তরা কিছু ত্রাণ পেলেও নিম্ন মধ্যবিত্তরা তো হাত ধুয়েই বসে আছে। এই নিম্নবিত্ত আর নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরে বসেই না খেয়ে মারা যাবে। জীবনে ও ত্রাণ নিতে যাবেও না, পাবেও না। যেসব পরিবারে আমার মত কেউ দেশের বাইরে থাকে তাহলে তো আর কথায় নেই, তারা ঘরে না খেয়ে মরে গেলেও কেউ তাদের বিশ্বাস করবে না। কেউ একটাকা ধারও দিবে না। বাড়িওয়ালা তাদেরকে একদিনের জন্যও ছেড়ে কথা বলবে না। সেখানে তো আমরা চার ভাইবোনের তিনজনই আমেরিকা কানাডায় আছি। দেশের মধ্যবিত্তরা সেই কবেই নিম্ন মধ্যবিত্তের তালিকায় নেমে এসেছে সে হিসাব কজনের আছে আমি জানি না। তবে আমার আছে তাই দেশে ও কিছু টাকা পাঠাতে হবে। হুদাই আমি এ দেশের মানুষকে সাহায্য করব কেন। আগে তো ঘরে আলো জালাতে হয় জানি। তারপর মসজিদের কথা ভাবতে হয়। তাহলে কি এমন হয়েছে আগে জানতে চাই। কেন এত টাকা চাইছো? একশ ডলার আমার কাছে শুধু এখনই না সব সময়ই অনেক টাকা। যে জন্য এতসব বলা যেখানটায় যাই।

জানতে পারলাম নাতাশার মা করোনায় মারা গিয়েছে। আমার মাথার এতক্ষণের সব চিন্তা ভাবনাগুলো এক ধাক্কায় উড়ে গেল। আমি বুঝতেই পারিনি আমার পাশের ডেস্কে কাজ করে মেয়েটির মায়ের জন্য টাকা তোলা হচ্ছে। আমেরিকার ফিউনারেল হোমে জায়গা খালি নেই। কিছু কিছু হাসপাতালে আরও ১৫ /২০ দিন রাখতে পারে। হাসপালেও জায়গা নেই। তারা এখন মাছ মাংসের ডিপ ফ্রিজার গাড়িগুলোতে লাশ রাখছে।

ফিউনারেল হোম নাতাশাকে এপ্রিলের ১৯ তারিখে দু’ঘন্টার জন্য সময় দিবে এরমধ্যে তাদের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান সেরে ফেলতে হবে। এ দেশে ফিউনারেল হোম অন্য সময়ে তিন থেকে পাঁচজনের বেশি মরদেহের জন্য সময় দেয় না এখন করোনা প্যনডামিক সময়ে তারা দশজনের বেশি ধর্মীয় অনুষ্ঠান করতে পারছে না। নাতাশারা ভারতীয় হিন্দু। সে তার মায়ের জন্য জন্য নগরীর লং আইল্যনডের হেমপসটেড এলাকায় হিন্দু ফিউনারেল হোম বুকিং দিয়েছে। তার জন্য খরচ লাগবে আট হাজারের মত। তার আমেরিকান বর নাতাশার মায়ের করোনা পজেটিভ ধরা পরার পর নাতাশাকে একা রেখে পালিয়েছে। তার মায়ের সৎকারের জন্য চাঁদা তোলা হচ্ছে। আমি এতদিন জানতাম নাতাশা আমেরিকান। তার চালচলনে আমার তাই মনে হতো। সব সময় নামীদামি ব্রানডেড জামা জুতা পরে। ওর কাছে আজকে আট হাজার ডলার নেই? হ্যাঁ সত্যিই নেই। এ দেশে কারও হাতেই জমানো টাকা থাকে না।

প্যনডামিক সময়ে হাসপাতালগুলো ফ্রি চিকিৎসা দিচ্ছে। ভালো হয়ে ফিরে আসলে তো ভালোই হলো কিন্ত যারা মারা যাচ্ছেন তাদের পরিবারকে মর্গের ভাড়া ফ্রিজের গাড়ির ভাড়া এবং ফিউনারেল হোমের খরচ বহন করতে মোটামুটি ছয় থেকে আট হাজার ডলার ব্যয় করতে হবে। নাতাশার জন্য টাকা তোলা হয়েছে। এমন অনেকেই আছেন যারা এই মুহুর্তে টাকার জন্য মরদেহের সৎকার করতে পারছেন না।

এই দেশে মানুষের সঞ্চয় বলতে কিছু নেই। টাকা জমানোর ভাবনাটাও এদের কম, সুযোগটা নেই বললেই চলে। যা আয় করে তার থেকে বাড়তি কোনো টাকা আলাদা করে সঞ্চয় করার সুযোগ খুব কম মানুষেরই আছে।

এক সঙ্গে এত মৃত্যুর জন্য কেউ প্রস্তুত ছিলেন না। ভয়াবহ এ বাস্তবতায় বেশ কিছু প্রবাসী বাংলাদেশির মৃত্যু ঘটনা প্রতিদিনই শুনছি। মৃত্যুর তালিকায় জোড়ায় জোড়ায় নতুন নাম যোগ হচ্ছে। তবে বাঙালী ছাড়াও সারা পৃথিবীর মানুষই করোনায় মারা যাচ্ছে। এর মধ্যেই শুধু নগরীতে অর্ধ শতাধিক মৃত্যুর খবর দুদিন আগেই প্রকাশ করা হয়েছে। এসব মৃতদেহের কবর বা শেষকৃত্য নিয়ে খোঁজ করতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে ভয়াবহ কিছু নির্মম বাস্তবতা।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএম

রওশন হক,করোনাভাইরাস
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close