• মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
  • ||

গজল আমার আত্মার খোরাক: মেসবাহ আহমেদ

প্রকাশ:  ২৯ এপ্রিল ২০২২, ২১:০২ | আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২২, ২১:৩৬
নন্দী জুয়েল

দুই দশকের বেশি সময় ধরে ধ্রুপদি গান আর গজল গেয়ে শ্রোতাদেরকে মুগ্ধ করে রেখেছেন মেসবাহ আহমেদ। সব শ্রেণির মানুষের কাছে গজলকে জনপ্রিয় করে তুলতে নিরন্তর কাজ করে চলেছেন তিনি। নিজেকে নিয়ে গিয়েছেন অনন্য উচ্চতায়। গজল আর মেসবাহ হয়ে উঠেছে সমার্থক। বাংলাদেশের গজলকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া এ গুণী শিল্পীর সঙ্গে কথা বলেছেন নন্দী জুয়েল।

পূর্বপশ্চিম: বর্তমানে আপনার ব্যস্ততা কি নিয়ে ?

মেসবাহ আহমেদ: রেকর্ডিং এবং মিউজিক ডিরেকশনের কাজ নিয়ে বেশ ব্যস্ত সময় পার করছি। দুইটা অ্যালবামের কাজ করছি। ঈদে আমার লেখা এবং সুর করা একটি গান মুক্তি পাবে, সেটার মিউজিক ভিডিও নিয়েও কাজ করছি। আগে গজলের বাইরে নিজের লেখা-সুরের গানে কণ্ঠ দেয়া ছাড়া খুব বেশি কাজ করা হয়নি। কিছু গুণী মানুষের আগ্রহে ও অনুপ্রেরণায় তাদের সঙ্গে কাজ করছি। অনেকেই বলেন, সঙ্গীত একধরনের যৌথশিল্প; একাধিক সৃজনশীল মানুষের মেধা ও শ্রমে সৃষ্টি আরও সমৃদ্ধ হতে পারে। ভালো যে কোনো কিছুর সঙ্গেই নিজেকে জড়াতে চাই।

পূর্বপশ্চিম: দেশের বাইরে আবার শো করতে যাচ্ছেন কবে ?

মেসবাহ আহমেদ: একাধিক অফার আছে, কিন্তু আপাতত করছি না। কারণ মিউজিকটাই আমার একমাত্র পেশা নয়। অটোমোবাইল এবং ফিলিং স্টেশনের ব্যবসা করি। ব্যবসার দিকেও নজর দিতে হয়। আর ফিজিক্যাল দিকটা বিবেচনা করেও বাইরের প্রোগ্রাম করছি না। আসলে শুধু সুকুমার বৃত্তি নিয়ে চলা মুশকিল। শিল্পচর্চা একমাত্র প্রফেশন হলে যাপিত জীবনের উৎকর্ষ সাধন ব্যাহত হয়। তখন জন্মদিন বা গায়ে হলুদেও গান গাইতে হয়। বেছে কাজ করা যায় না বা না বলতে পারাও কঠিন হয়। যে না বলতে পারে না সে ফেইলর।

পূর্বপশ্চিম: গানকে একক পেশা হিসেবে নিতে চাইলে অসুবিধা কী?

মেসবাহ আহমেদ: সেই পরিস্থিতি এখন আর নেই। একটা সময় হয়তো প্লেব্যাক বা অডিও সেক্টরকে অবলম্বন করে আমাদের অগ্রজরা গানকে জীবিকা হিসেবে নিয়েছিলেন। এখন তো ফিল্ম বা অডিও ইন্ডাষ্ট্রিকে দূরবীন দিয়ে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কেবল স্টেজ শো আর দু’চারটা টিভি অনুষ্ঠানে গান গেয়ে পাওয়া সম্মানীতে জীবন চালানো যায় না। ঘরে অভাব আর পেটে ক্ষুধা নিয়ে ভালো গান অসম্ভব। এই করোনাকালে কতো শিল্পী আর মিউজিশিয়ান যে কি নিদারুণ জীবনযাপন করছেন, কেউ তাদের খবর নেয় না। শিল্পীদের এখন জীবিকার জন্য অন্য কোনো পেশাকে অবলম্বন করতে হবে, গান হতে পারে বড়জোর সাইড প্রফেশন।

পূর্বপশ্চিম: রেডিও, টেলিভিশন, স্টেজ তিনটা মাধ্যমেই গজল পরিবেশন করেন। কোন মাধ্যমে স্বচ্ছন্দবোধ করেন?

মেসবাহ আহমেদ: সব মাধ্যমেই কমফোর্ট জোন আছে। যদি বলেন বেস্ট কোনটা? আমার কাছে স্টেজ। কারণ স্টেজ শ্রোতামুখি এবং বাণী প্রধান। স্টেজে সরাসরি দর্শকদের সাথে যোগাযোগ হয় বলে গজল সিঙ্গারের জন্য স্টেজ বেস্ট। কারণ সরাসরি তাদের ভালোলাগা জানতে পারি। অভিনেতা আফজাল হোসেনের একুশে পদক প্রাপ্তিতে মাত্রার সেলিব্রেশন অনুষ্ঠানে আমি গান গেয়েছি। সে রাতেও দেখলাম স্টেজে সাথে সাথে ওটার ফিডব্যাক পাওয়া যায়।

পূর্বপশ্চিম: আপনি কি মনে করে করেন গজলের আবেদন বেড়েছে?

মেসবাহ আহমেদ: শ্রোদের কাছে গজলের গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপক। কারণ গজল আগে খুব বেশি ক্লাসিক্যাল ছিল, শাস্ত্রীয় ছিল। এখন এটাকে মডার্ন ফরম্যাটে আনা হয়েছে। যারা বোঝেন তারা এই ঘরানা থেকে বের হতে চান না। গজলের আলাদা একটা আবেদন আছে। যেটা আর অন্য কোনো গানে নাই। ভালোবাসা থেকে শুরু করে কষ্ট, বেদনা, হাসি, কান্না জীবনের এমন কোনো অঙ্গ নেই যেখানে গজলের প্রভাব নেই। বর্তমান যুগের গজলে বাস্তবতার চিত্র ফুটে ওঠে। আমরা যেমন ফোন, কম্পিউটার আপডেট দেই। গজল নিজে নিজেই আপডেট হচ্ছে।

পূর্বপশ্চিম: আপনার শিল্পচর্চার অনুপ্রেরণা কে?

মেসবাহ আহমেদ: ছোটবেলায় মেহেদী হাসানের গান শুনেছিলাম। ওনার সুর আর গায়কি আমাকে টানত। আস্তে আস্তে আমার আগ্রহ জন্মাল, শুনতে শুরু করলাম। দুই যুগের বেশি সময় ধরে গান করছি। তিন সরকারের সময়েই সম্মানসূচক পুরষ্কার পেয়েছি। অনেকে কিন্তু গানটা শিখে তারপর সিদ্ধান্ত নেয় সে রবীন্দ্রসংগীত গাইবে, আধুনিক গাইবে নাহয় অন্য কোনো গান। আমি গজল গাওয়ার জন্যই গান শিখেছি। মেসবাহ আহমেদ মানেই গজল শিল্পী।

পূর্বপশ্চিম: গজলকেই কেন বেছে নিলেন?

মেসবাহ আহমেদ: যার যার পছন্দের বিভিন্ন রকম আছে। প্রত্যেকটা মানুষের জীবন দর্শন, রুচি, পছন্দ, অভ্যাস আলাদা। কেউ সমুদ্র পছন্দ করে, কেউ পাহাড়। আমার যাপিত জীবনের সঙ্গে গজলের মিলটা খুব বেশি পাই আমি। আর গায়কির কথা বলতে গেলে। একজন গায়ক কি খোঁজেন? একটা ভালো লিরিক্স, ভালো সুর, তাল লয়ের খেলা। সবকিছুর কমপ্যাক্ট প্যাকেজ হচ্ছে গজল। এর থেকে পশ জিনিস আর নেই। এটা আদবের সঙ্গে গায়, আদবের সঙ্গে শোনে। গজল আমার আত্মার খোরাক। আত্মাকে বিশুদ্ধ খোরাক দিতে পারাটাই বড় করে দেখি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গজল গেয়ে যেতে চাই।

পূর্বপশ্চিম: নতুন প্রজন্মের গজল শিল্পীদের জন্য আপনার পরামর্শ কি?

মেসবাহ আহমেদ: গজল ততক্ষণ পর্যন্ত গজল হবে না যতক্ষণ না সেটা সঠিক ভাবে উচ্চারণ করা হবে। কারণ এটা প্রেম সংগীত। যেটা লেখা হয় সেটা গজল, যেটা গাওয়া হয় সেটা গজল নয়। আগে গজলের ভাষাটা শিখতে হবে। আপনার গলায় যতই কারুকাজ থাকুক, ভুল উচ্চারণে গাইলে ওটা গ্রহণযোগ্য নয়। সবাই গজল শোনে না, যারা শোনে তারা জানে এবং বোঝে। সবসময় মাথায় রাখতে হবে আমার থেকে আমার দর্শক দামি।

মেসবাহ আহমেদ,ধ্রুপদি,গজল,খোরাক
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close