• রোববার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৩, ১৫ মাঘ ১৪২৯
  • ||

সাক্ষাৎকার

এক লড়াকু নাট্যজন সেলিম রেজা সেন্টু

প্রকাশ:  ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০০:৫৭ | আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ২১:০০
রুদ্র মাহমুদ

নাট্যচর্চায় সম্পৃক্ত সবার চেনামুখ নাট্যজন সেলিম রেজা সেন্টু। কেবল বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনেই নয়, ওপার বাংলার নাটকের লোকদের কাছেও তিনি সুপরিচিত। সেই ১৯৯৭ সাল থেকে তার সম্পাদনায় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে নাট্যপত্রিকা ‘দুই বাংলার থিয়েটার’। ২০০২ সাল থেকে প্রকাশ করছেন শিশু-কিশোরদের নাটক বিষয়ক পত্রিকা ‘নাট্য’ এবং রঙ্গমঞ্চের সংবাদ বিষয়ক মাসিক কাগজ ‘প্রাককথন’।

কেবল প্রকাশনাতেই সীমিত নন সেলিম রেজা সেন্টু। গত দুই যুগ ধরে অব্যাহত রেখেছেন নাট্যচর্চা।‘প্রাকৃতজন’ নামে একটি নাটকের দল গড়ে তুলেছেন। তার নির্দেশনায় মঞ্চে অভিনীত হয়েছে ২০টিরও বেশি নাটক। এর মধ্যে চারটি নাটকের নাট্যকার তিনি। পাশাপাশি প্রায় ২৩ বছর ধরে ‘অ আ ক খ’ শিশু কিশোরদের নাটকের দল নিয়ে কাজ করে চলেছেন।

বগুড়ার ছেলে সেলিম রেজা সেন্টু। নাট্যচর্চার হাতেখড়ি কৈশোরে বগুড়া থিয়েটারে। কৈশোরের দীক্ষাটাকে শিক্ষার বিষয় হিসেবে বেছে নেন তিনি। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক বিভাগ থেকে স্নাতক করেছেন, স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন নাট্যনির্দেশনায়।

সেলিম রেজা সেন্টু পূর্বপশ্চিম অফিসে এসেছিলেন সম্প্রতি। নাট্যচর্চার নানা বিষয়ে তার সঙ্গে কথা হলো। সপ্রতিভ ভঙ্গিতে নানা প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন তিনি।

পূর্বপশ্চিম অফিসে বার্তা প্রধান বিপুল হাসানের সঙ্গে সেলিম রেজা সেন্টু ও তার বন্ধু

পূর্বপশ্চিম: দেশে থিয়েটারে পৃষ্ঠপোষক বড়ই সীমিত। এ পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরে কী করে তিনটি নাটক বিষয়ক প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছেন?

সেলিম রেজা সেন্টু: আপনার কথার সঙ্গে আমি একমত। নাটক বিষয়ক আমার তিনটি প্রকাশনা অন্যধারার নাট্য পত্রিকা ‘দুই বাংলার থিয়েটার’, শিশু কিশোর দের নাটক বিষয়ক কাগজ ‘নাট্য’এবং রঙ্গমঞ্চের সংবার বিষয়ক কাগজ ‘প্রাক্কথন’ প্রকাশে বলতে পারেন আমি প্রায় কোন সহযোগিতা ছাড়াই প্রকাশ করছি। প্রকাশান দেখলে দেখতে পাবেন, প্রায় বিজ্ঞাপন ছাড়া প্রকাশনাগুলো প্রকাশ পায়। মঞ্চ নাটক ও মঞ্চের প্রকাশনা আমার স্বপ্ন, ভালোবাসা। আমার নিজের অনেক ভালোবাসা, কষ্ট, কান্না, ভালোলাগা, না পাওয়া মেশানো এই স্বপ্ন। নিজের ক্ষুদ্র প্রকাশনার ব্যবসা থেকে যে সামান্য আয় হয় সেখান থেকেই এই প্রকাশনা বের হয়। সত্যকথা বলতে কি, কোন নাটকের মানুষের আর্থিক সহযোগিতা আমার প্রকাশনাগুলোতে নেই। আমর মঞ্চ নাটকের প্রকাশনা ও প্রতিটি অনুষ্ঠান নাটকের বাহিরে কিছু মানুষের সহযোগিতা আছে, আছে আমার মায়ের গহনা বিক্রির পয়সা, আছে বাবার জায়গা বিক্রির টাকা, আমার বাবা-মা আমার এই স্বপ্ন কে বাঁচিয়ে রাখতে পাশে থেকেছে । আর এখন আমার জীবিকা থেকে আয়। এই স্বপ্নে এখনও কর্পোরেট বা সরকারী কেনা সহযোগিতার স্পর্শ নেই।

পূর্বপশ্চিম: আপনি পড়াশোনা করেছেন কলকাতায়, তাছাড়া দুই বাংলার থিয়েটার প্রকাশনা সূত্রে ওপার বাংলার নাট্যচর্চার সঙ্গে আপনার যোগাযোগ রয়েছে। দুই বাংলার নাট্যচর্চার মধ্য পার্থক্য কি?

সেলিম রেজা সেন্টু: পড়াশোনা রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই সূত্রে সাত বছর কলকাতায় থাকা। পড়াশোনা নাটক নিয়ে, প্রকাশনা নাটক নিয়ে সেই সূত্রে দুই বাংলার নাটকের প্রধান মানুষদের কাছে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল বা হয়। আমার একান্তই ব্যক্তিগত মতামত পশ্চিমবঙ্গে নাট্যচর্চা বেশি সংগঠনচর্চা নেই (বলতে চাচ্ছি কে সভাপতি সম্পাদক, কবে সম্মেলন, কার কতগুলো ভোট ব্যাংক আছে, উত্তরপত্র ঘষে শিল্পকলায় চাকরি প্রমূখ)। আমরা শিল্পকলাহীন হয়ে পরছি। বলতে পারের ক্রমেই সংগঠনবাজ হয়ে পরছি।

পূর্বপশ্চিম: বাংলাদেশে নাট্যচর্চাকে পেশা হিসেবে নেওয়া পরিস্থিতি কি আছে? আপনি নাটককে কি পেশা হিসেবে নিতে পেরেছেন?

সেলিম রেজা সেন্টু: নাট্যচর্চাকে পেশা হিসেবে নেয়ার পরিস্থিতি নেই। আমি নিজেও চেষ্টা করে পারিনি। তবে সম্ভব ছিলো, এখনও সম্ভব- আমাদের যাঁরা ছায়া দেন তাঁরা চেষ্টা করলে এখনও সম্ভব। আমি চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু আমাদের জাতীয় খেলা হা-ডু-ডু তো তাই আমি একা এগুতে গিয়ে দেখি দশজন আমাকে পিছন থেকে টেনে ধরে আছে! আমাদের দেশে রাজধানী কেন্দ্রীক নাট্যনেতারা যদি ভোট ব্যাংক সৃষ্টিতে আগ্রহী না হয়ে কিংবা তাদের অনুসারী বিভিন্ন অঞ্চলে নাটকের মোড়ল সৃষ্টি করা থেকে ফিরে আসে, তবেই সম্ভব। কারন সকল সম্ভাবনা আছে, দরকার শুধু আমাদের মনের কথা ও মুখের কথা এক হওয়ার।

পূর্বপশ্চিম: জেলা শহর বগুড়া থেকে নাট্যচর্চা অব্যাহত রাখতে গিয়ে কি কি প্রতিবন্ধকতা মুখোমুখি হচ্ছেন?

সেলিম রেজা সেন্টু: নাটকের ‘অ’ মানুষ রয়েছে দু’একজন! যে বা যারা নিজের সভাপতি/সাধারণ সম্পাদক পদ ঠিক রাখতে এলাকাভিত্তিক সংবিধান বানায়। কাউকে নিজের পাশে বা সামনে যেতে না দেয়ার জন্য সবকিছু করতে পারে! বেশিরভাগ জেলায় এই নাটকের মোড়লেরা ‘ময়লাদানী থেকে ফুলদানী’ সব তাদের পকেটে রাখতে চায়। যখন যে সরকার আসে তার পতাকা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি কিংবা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এই দুই একজন নাটকের ‘অ’ মানুষের আর্থিক আবেদন ও প্রাপ্তিতে ফাইল ভরা। একজনের নামে ও বে-নামে চার/পাঁচটা সংগঠন। যেটা ভোট ও অর্থ সংগ্রহে ব্যবহার করে।

নাট্যজন সেলিম রেজা সেন্টু

পূর্বপশ্চিম: বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটকের ওপর পড়াশোনার সুযোগ তৈরি হয়েছে? নাটকের ওপর পড়াশোনা করে শিক্ষার্থীরা পেশা হিসেবে নাট্যচর্চাকে গ্রহণ করতে পারছে?

সেলিম রেজা সেন্টু: নাটকে পেশা হিসেবে নিতে পারছে বললে ভুল হবে। নাটক সংশ্লিষ্ট কিছু পেশাতে বিভিন্নভাবে আছে কেউ কেউ। নাটক বিভাগে বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, সরকারি-বে সরকারি প্রচার মাধ্যমে হাতে গোনা কয়েক জন। আবার কেউ সংবাদপত্র, এনজিওতে। কিন্তু যেটা দুঃখজনক এতোগুলো বিশ^বিদ্যালয় থেকে প্রতি বছরে নাটকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বের হওয়ার পর থিয়েটার গড়ায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এক বা দু’জন ব্যতীত কাউকে। আমাদের দেশে থিয়েটার চর্চায় যে দলগুলো রয়েছে এরমধ্যে কয়টা দলের প্রধান থিয়েটার নিয়ে বিশ^বিদ্যালয়ে পড়া মানুষ। বিভিন্ন তৈরী দলে অতিথি হয়ে কাজ না করে, নিজে দল তৈরী করে নাট্যকর্মী সৃষ্টিতে উৎস্বর্গ করা মানষিকতা সম্পন্ন ক’জন আছে। যেখানে নিজে বিশ^বিদ্যালয়ে নাটকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে একটি থিয়েটার গড়তে পারেনা বা সাহস করে না সেখানে নাটককে পেশা হিসেবে নেয়ার দুঃসাহস কিভাবে হবে!

পূর্বপশ্চিম: বাংলাদেশে গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন কতটুকু সফল?

সেলিম রেজা সেন্টু: একটু পিছন থেকে বলি, কয়েক বছর আগে (২০১৪) আমার “প্রাক্কথন” পত্রিকায় গ্রুপ থিয়েটার চর্চানিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরী করতে গিয়ে দেখি, বাংলাদেশের ১৯ জেলায় কোন গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানভুক্ত দল নেই, ১৪ জেলায় গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনভুক্ত দল রয়েছে একটি করে, ৫ জেলায় গ্রুপ ফেডারেশনভুক্ত দল রয়েছে ২টি করে! তাহলে বুঝতে পারছেন গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন কতটুকু সফল! আর যে কয়টা দল রয়েছে তাদের মধ্যে নিয়মিত থিয়েটার চর্চা করছে কয়টি দল! বর্তমান কি অবস্থা সেটা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও সামাজিক মাধ্যমগুলো লক্ষ করলেই দেখা যাচ্ছে!

পূর্বপশ্চিম: আমাদের দেশে নাট্যচর্চার ভবিষ্যত কি?

সেলিম রেজা সেন্টু: ভবিষ্যত কে ঠিক করবে? আমরা! কেমন করে সম্ভব! এখনতো নাট্যচর্চার আগে নির্ধারণ করা হয় কে কে ভোটার! ভোট আর পদ ঠিক রাখতে গিয়ে ৬৪ জেলায় কমপক্ষে একটি করে দল কে নিয়মিত থিয়েটার চর্চায় নিয়ে আসার কথা আমরা এখন ভাবার সময় পাচ্ছি না! আমারা ব্যস্ত হয়ে পরেছি খাবারের ভাউচার জাল করা বা না জানিয়ে নাট্যকর্মীদের সম্মিলিত অর্থকে গোপনে উত্তোলন নিয়ে! চেয়ারের লোভ আমাদের কে এখন প্রবাদপ্রতিম নাট্যজনদের সম্মান জানানোর কথা ভুলে দিয়েছে! সবকিছু ভুলে আমরা ভবিষ্যত হিসেবে এটুকু ঠিক করতে পাররো কি, ৬৪ জেলায় প্রতি শুক্রবার একটি করে দর্শনীর বিনিময়ে নাটক মঞ্চস্থ করার।

পূর্বপশ্চিম: আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা?

সেলিম রেজা সেন্টু: আমি নগর থেকে দূরে প্রকৃতির স্পর্শে আমার নিজের চেষ্টায় একটি সংস্কৃতিচর্চা কেন্দ্র ‘অ্যামবিশন’ গড়ে তোলার পরিকল্পনায় এগোচ্ছি এখন। যেখানে নিয়মিত শিশু কিশোর, বড়রা থিয়েটারচর্চা করবে। যেকোন সাংস্কৃতিক সংগঠন তাদের কর্মশালা করবে। খোলা আকাশের নীচে থাকবে মঞ্চ, পূর্ণিমার আলোয় নাটক বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে সেখানে। থাকবে সংস্কৃতি গবেষকদের জন্য পড়া-লেখা, থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা। আধুনিক মঞ্চ থাকবে যেখানে নিয়মিত নাট্যচর্চার পাশাপাশি বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। আর থাকবে মঞ্চের বিভিন্ন প্রকাশনার প্রকাশের ব্যবস্থা। প্রাকৃতিক পরিবেশে মাটির ঘর, কাঠের দো’তলা, কংক্রিটের বাসযোগ্য একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশ, আর এর মাঝেই একদিন আমি নিজেকে হারাবো।

পূর্বপশ্চিম- এনই

নাট্যচর্চা,থিয়েটার,মঞ্চনাটক
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close