• রোববার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৭
  • ||

যে কারণে এফডিসিতে জানাজা হয়নি এটিএম শামসুজ্জামানের

প্রকাশ:  ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:৪৭
বিনোদন ডেস্ক

ষাটের দশক থেকে এফডিসিতে চলাফেরা ছিল সদ্য প্রয়াত অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামানের। কিন্তু শেষ বয়সে এসে তিনি একেবারেই সেখানে যেতেন না। কিছু অভিমান, কিছু কষ্ট এবং কিছু বিরক্তি পুষে রেখেছিলেন মনের মধ্যে। ফিল্মপাড়ার প্রতি তার এতটাই বিরক্তি ধরে গিয়েছিল যে, সন্তানদের তিনি বলেই রেখেছিলেন, ‘মারা গেলে আমার মরদেহ যেন এফডিসিতে না নেয়া হয়।’ এ কারণে মৃত্যুর পর এ বরেণ্যে অভিনেতার জানাজা এফডিসিতে হয়নি।

এসব কথা জানান, প্রয়াত অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামানের মেয়ে কোয়েল আহমেদ। শনিবার সকাল ৯টার দিকে রাজধানীর সূত্রাপুরে নিজ বাসায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বহু প্রতিভাধর ও খ্যাতিমান এই অভিনেতা। শনিবারই যোহরের নামাজের পর জানাজা শেষে তাকে জুরাইন কবরস্থানে বড় ছেলে কামরুজ্জামান কবীরের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়। তার আগে মরদেহ নেয়া হয়নি এফডিসিতে।

এটিএম শামসুজ্জামানের মেয়ে কোয়েল জানান, ‘এফডিসিতে একবার রাজ্জাক আংকেলের (নায়ক রাজ্জাক) সন্তানদের সঙ্গে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছিল। ওই ঘটনায় বাবা খুবই মর্মাহত হন। এছাড়া এফডিসির নানা কর্মকাণ্ডেও কষ্ট পেয়েছিলেন। সেখানে প্রকৃত শিল্পীদের মূল্যায়ন হতো না। এফডিসির পরিবেশটাও বাবার পছন্দ হচ্ছিল না। তাই তিনি বলেছিলেন, তার মরদেহ যেন এফডিসিতে না নেয়া হয়। আমরা বাবার ইচ্ছাটাই পূরণ করেছি।

প্রসঙ্গত, গত বুধবার তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে পুরান ঢাকার আজগর আলী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৮০ বছর বয়সী অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান। দুদিন চিকিৎসার পর কিছুটা সুস্থ বোধ করায় শুক্রবার বিকালে তাকে সূত্রাপুরের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ওই দিনের রাত পেরিয়ে শনিবারের সকাল আসতেই তিনি চলে যান না ফেরার দেশে। চিকিৎসকদের মতে, এটিএম শামসুজ্জামানের অক্সিজেনের লেভেল একেবারেই কমে গিয়েছিল।

২০১৯ সালেও আজগর আলী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এই অভিনেতা। সেবার চিকিৎসা চলেছিল এক মাসেরও বেশি সময় ধরে। হজমের সমস্যা নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে, অপারেশন পর্যন্ত করাতে হয়েছিল। এরপর তাকে লাইফ সাপোর্ট দিয়েও রাখা হয়। পরবর্তীতে তাকে নেয়া হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে কিছুদিন চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ হয়ে বাসায় ফেরেন। আর এবার ফিরেও চলে গেলেন।

১৯৬১ সালে এটিএম শামসুজ্জামানের চলচ্চিত্র জীবনের শুরু হয়েছিল সহকারী পরিচালক হিসেবে উদয়ন চৌধুরী পরিচালিত ‘বিষকন্যা’ ছবির মাধ্যমে। সত্তারের দশক থেকে শুরু করেন অভিনয়। প্রথমে কৌতুক অভিনেতা এবং পরবর্তীতে খল চরিত্রে নিজেকে মেলে ধরেন। তার অভিনীত ছবিগুলোর মধ্যে জলছবি, যাদুর বাঁশি, রামের সুমতি, ম্যাডাম ফুলি, চুড়িওয়ালা, মন বসে না পড়ার টেবিলে, অশিক্ষিত, গোলাপী এখন ট্রেনে, পদ্মা মেঘনা যমুনা, স্বপ্নের নায়ক, অনন্ত প্রেম, দোলনা, অচেনা, মোল্লা বাড়ির বউ, হাজার বছর ধরে, চোরাবালি উল্লেখযোগ্য।

অভিনয়ের বাইরে শতাধিক চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য ও কাহিনি লিখেছেন এটিএম শামসুজ্জামান। এছাড়া ২০০৯ সালে রিয়াজ ও শাবনূর জুটিকে নিয়ে ‘এবাদত’ নামে একটি ছবি তিনি পরিচালনাও করেছেন। এত এত ভালো কাজের পুরস্কারও পেয়েছেন অভিনেতা। এটিএম শামসুজ্জামান তাঁর ক্যারিয়ারে ছয় বার জিতেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। প্রথম পুরস্কার পান ১৯৮৭ সালে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে। কাজী হায়াৎ পরিচালিত ‘কে দায়ী?’ ছবিটির জন্য পুরস্কারটি জিতেছিলেন তিনি। এরপর দ্বিতীয় জাতীয় পুরস্কারটি পান ১৯৯৯ সালে শহিদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত ‘ম্যাডাম ফুলি’ ছবির জন্য। এই পুরস্কারটি তিনি জিতেছিলেন শ্রেষ্ঠ কৌতুক অভিনেতা বিভাগে।

একই ক্যাটাগরিতে ২০০৩ ও ২০১০ সালে আরও দুটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জেতেন এটিএম শামসুজ্জামান। চলচ্চিত্রটি দুটি ছিল যথাক্রমে ‘চুড়িওয়ালা’ ও ‘মন বসে না পড়ার টেবিলে’। ২০১৩ সালে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে ‘চোরাবালি’ ছবিটির পান পাঁচ নম্বর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে দেয় দ্বিতীয় রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক। একই বছর ঢাকা মডেল এজেন্সি অ্যাওয়ার্ড থেকে পান আজীবন সম্মাননা।

২০১৯ সালে আরও একটি আজীবন সম্মাননা পান এটিএম শামসুজ্জামান। তাঁর হাতে এই পুরস্কারটি তুলে দেওয়া হয় ৪২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আসরে। অর্থাৎ, অভিনেতার ক্যারিয়ারের ছয় নম্বর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এটি। একই বছর এটিএমের হাতে ওঠে প্রয়াত অভিনেতা বুলবুল আহমেদ স্মৃতি সম্মাননা পদক। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পেয়েছেন আরও বহু ছোট-বড় পুরস্কার।

তবে শুধু চলচ্চিত্রে নয়, এটিএম শামসুজ্জামান তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন ছোট পর্দায়ও। বহু দর্শকপ্রিয় নাটকে তিনি অভিনয় করেছেন। নাটকে তাকে হাস্যরসাত্মক চরিত্রেই বেশি দেখা গেছে। মানুষ হাসানোর এক জীবন্ত মেশিন হিসেবে মনে করা হতো এই অভিনেতাকে। তার সংলাপ বলার ধরণ, শারীরিক অঙ্গভঙ্গি- সবই দর্শকের হাসির খোরাক যোগাতো।

এমন একজন গুণী মানুষকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ দেশের গোটা অভিনয় জগত। সোশ্যাল মিডিয়ায় শনিবার সকাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত শোক জানিয়েছেন ছোট ও বড় পর্দার বহু তারকা। এটিএম শামসুজ্জামানের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদও। পাশাপাশি সকলে তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাতও কামনা করেছেন।

পূর্বপশ্চিমবিডি/ এনএন

এটিএম শামসুজ্জামান,এফডিসি
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close