• বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২০, ২৫ চৈত্র ১৪২৬
  • ||

করোনা আতঙ্কের মধ্যেই দোলে মাতলেন তারা

প্রকাশ:  ০৯ মার্চ ২০২০, ২২:০৮ | আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২০, ২২:১২
বিনোদন ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত

গোটা বিশ্বের কাছে এখন এক প্রাণঘাতী আতঙ্কের নাম করোনাভাইরাস। প্রতি মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে যেমন বিস্তৃত হচ্ছে এর সংক্রমণ তেমনি প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে মৃত্যুর আতঙ্ক। বাদ যায়নি ভারতেও, ইতোমধ্যেই করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৪৩ ছুঁয়েছে। মনে করা হচ্ছিল, এসবের প্রভাব পশ্চিমবঙ্গের দোল উৎসবেও পড়বে।

কিন্তু, দোলের দিন সকাল থেকেই দেখা গেল অন্যচিত্র। রাজনীতিবিদ থেকে সেলিব্রিটি, নেতা থেকে অভিনেতা, নায়ক থেকে গায়ক— সকলেই রং মাখলেন, মাখালেন। তবে, আতঙ্কে চিনা রং-কে দূরে সরিয়ে আবিরেই মেতে উঠলেন সকলে রঙের উৎসবে।

শাসক থেকে বিরোধী প্রত্যেক দলেরই নেতানেত্রীকে সোমবার (৯ মার্চ) দেখা গিয়েছে রং খেলতে। এমনিতেই রঙের উৎসবের মাধ্যমে চিরকালই রাজনীতিবিদরা তাদের জনসংযোগের কাজটা করেন। রাজনৈতিক বিশেষ়জ্ঞরা বলছেন, সামনেই পৌরভোট। ফলে, করোনা আতঙ্ককে দূরে সরানো ছাড়া তেমন কোনও রাস্তাও ছিল না রাজনীতিবিদদের কাছে।

যেমন সকাল থেকেই রঙে জমজমাট দক্ষিণ কলকাতার জনক রোড। সেখানকার দলীয় কার্যালয়ের সামনে প্রতি বছরের মতো এবারও হাজির তৃণমূল নেতা তথা রাজ্যের বিদ্যুৎমন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। শোভনের অনুগামীরা যখন বলছেন, দাদা দোল খেলতে ভালবাসে, তখন তার ছেলে সায়নদেব বলছেন, ভালবাসে শুধু নয়, বাবার কাছে দোল আসলে একটা প্যাশন।

রাজ্যের দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু যেমন লেকটাউনে তার ক্লাবে দোলের শুভেচ্ছা বিনিময় করতে গিয়েছিলেন। দুধ সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি মুহূর্তের মধ্যেই একেবারে রঙিন। আবিরে-আবিরে সুজিত ভরিয়ে দিচ্ছিলেন সকলকে। সঙ্গে জোরকদমে গান-বাজনা। সেখানেও গলা মেলান রঙিন সুজিত। করোনা-আতঙ্কের আবহে রং খেলতে ভয় করছে না? হাসি মুখে সুজিতের জবাব, সতর্কতা, সচেতনতা থাকুক। রঙের উৎসব থেকে আসলে সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করতে চাই।

দলীয় সতীর্থদের মতো রং না খেললেও, এদিন সকালে নিজের এলাকায় প্রভাতফেরি করেন মন্ত্রী ব্রাত্য বসু। করোনা-আতঙ্ককে পরোয়া না করেই তাকে দেখা গেল বড়সড় জমায়েতে। রাজ্যের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ঘোষকেও আবির মেখে শামিল হতে দেখা যায় দোলের উৎসবে। মন্ত্রী তথা মেয়র ফিরহাদ হাকিমও এ দিন রঙের উৎসবে মাতেন।

একই রকম ভাবে রঙের উৎসবে শামিল হয়েছিলেন শাসকদলের অন্যতম বর্ণময় চরিত্র তথা প্রাক্তন মন্ত্রী মদন মিত্র। দিনভর বেলঘরিয়া এলাকায় কাটানোর ফাকে বললেন, আমি দোল খেলিনি। কিন্তু দোল যারা খেলেছেন তাদের সঙ্গে শামিল হয়েছি। করোনা-আতঙ্কের মধ্যে রং? মদনের তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য, ‘‘বিশ্বভারতীতে বসন্তোৎসব বন্ধ করে পাড়ায় পাড়ায় এই রঙের উৎসবকে বন্ধ করা যাবে না।

এদিন রঙের উৎসবে মেতেছিলেন তৃণমূল নেত্রী রত্না চট্টোপাধ্যায়। তিনি এদিন বলেন, রং আমি প্রতি বছরই খেলি। তবে, এ বছর একটু অন্য রকম লাগছে। কারণ পূর্ব বেহালার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আমাকে। ১৩১ নম্বর ওয়ার্ডটাও দেখছি। ওয়ার্ডের সকলে এসেছিলেন রং নিয়ে।

শুধু শাসক দলের নেতানেত্রী নন, বিরোধী শিবিরও ততক্ষণে মেতে উঠেছে রং খেলতে। প্রধানমন্ত্রী রঙের উৎসবে জমায়েত এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু এ রাজ্যের বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ কিন্তু এ দিন রং মেখেছেন। অনেকেই তাকে রং মাখিয়েছেন। দিলীপ যে রং খেলবেন, তা আগেই জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, মোদিজির মতো অত বড় মাপের নেতা নন বলে তাকে ঘিরে অত ভিড় হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

প্রতিবারের মতো তিনি এবারও রং খেলেছেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও যোগ দিয়েছেন। একই রকম ভাবে রং খেলতে দেখা গিয়েছে রাজ্য বিজেপির অন্যতম সাধারণ সম্পাদক সায়ন্ত বসুকেও। হাতে পিচকারি নিয়ে, পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে রং খেলায় তিনি মেতে রইলেন দিনভর।

তবে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অক্ষরে অক্ষরে মেনেছেন বিজেপি নেতা সব্যসাচী দত্ত। তিনি দোল খেলেননি এমন উদাহরণ বড় একটা পাওয়া যায় না। সেই সব্যসাচী কিন্তু এবার রং হোক বা দোলের জমায়েত— সব কিছু থেকে দূরে! তাঁ অনুগামীদের বক্তব্য, মোদিজি দোলের জমায়েত থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। সেটাই মেনে চলছেন দাদা।

নিজের বাড়িতে রং খেলায় ব্যস্ত থাকতে দেখা গেল সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীকেও।

রাজনীতিকদের মতোই রঙে ভাসল গোটা টালিপাড়া। বড়, ছোট— বিভিন্ন মাপের অভিনেতা-অভিনেত্রীকে এদিন দেখা গেল জমিয়ে দোল খেলতে। ব্যক্তিগত কারণে দেব, অঙ্কুশ, পায়েল সরকারের মতো কয়েকজন এবার দোল না খেললেও মিমি, অনির্বাণ, শ্রাবন্তী হোক বা টেলি অভিনেত্রী রুপান্বিতা দাস সকলেই দিনভর মজে রইলেন নিজেদের রঙিন করে তুলতে।

মেদিনীপুরের বাড়িতে গিয়ে নিজের মতো করে রং খেলেছেন অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্য। এদিন তিনি বলেন, বাড়ির লো‌কজনের সঙ্গে নিজের মতো করে দোল খেলছি। একটা ছবির চিত্রনাট্যও পড়লাম। ভালই কাটছে। রঙের উৎসবে মেতে ওঠা প্রিয়ঙ্কা সরকার বললেন, বাঘাযতীন তরুণ সঙ্ঘে সকালবেলা প্রভাতফেরিতে অংশ নিয়েছিলাম। তার পর ছেলে সহজকে নিয়ে রং খেলেছি। সন্ধ্যাবেলা দোলের অনুষ্ঠান রয়েছে।

তবে এই রঙের উৎসবেও বেশ কয়েক জন রাজনীতিক রংহীন থেকেছেন। যেমন রাজ্যের বর্ষীয়ান মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায়। অন্যান্য বছর দোলের দিন তাঁকে দেখা যায় শামিল হতে। কিন্তু রোববার রাতেই সুব্রতর এক ঘনিষ্ঠ অনুগামী বলেন, দাদা এবার দোল খেলবেন না। আমাদেরও খেলতে না বলেছেন খেলতে। চারদিকে সবই তো চিনের জিনিস।

এই কারণে না হলেও, রং-জমায়েত সব থেকেই নিজেকে দূরে রেখেছেন রাজ্যের নারী সমাজকল্যাণ মন্ত্রী শশী পাঁজা। তিনি বলেন, আমি অন্য বছরও দোলের জমায়েতে খূব একটা থাকি না। অনেকেই নিজের নিজের কেন্দ্রে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এই দিনে। আমার দিনে কোনও অনুষ্ঠানে যাওয়ার নেই। সন্ধ্যায় কয়েকটা অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা।

রাজনীতিকদের মতো সেলেবদেরও অনেকে রঙের উৎসবে যোগ দেননি। তবে দেব-পায়েল-অঙ্কুশরা করোনা-আতঙ্কে দোল খেলেননি তেমনটা নয়। অভিনেতা-সাংসদ দেব কয়েকদিন আগেই শুটিং করতে গিয়ে পায়ে চোট পয়েছেন। এবার রং খেলতে পারলেন না বলে মনও খারাপ। তিনি এদিন বলেন, আমার পায়ে ব্যথা। তাই রং খেলতে পারছি না। যারা খেলছেন, তাঁদের অনেক শুভেচ্ছা।

এবার চুটিয়ে রং খেলবেন ভেবেছিলেন পায়েলও। কিন্তু, দু’দিন আগে তার হাত পুড়ে গিয়েছে। এক রাশ মন খারাপ নিয়ে তিনি বললেন, ভেবেছিলাম রং খেলব। বাবা-মাকেও ডেকে নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু দু’দিন আগে হাত গরম কফি পড়ে পুড়ে গিয়েছে। করোনার আতঙ্কে নয়, হাতে ইনফেকশনের ভয়েই এ বার আর খেলিনি।

অঙ্কুশও ভেবেছিলেন রং খেলবেন। তাহলে খেললেন না কেন? করোনা-আতঙ্ক? অঙ্কুশ বলছেন, আরে না না, সবে দার্জিলিং থেকে শুটিং করে ফিরেছি। প্রস্তুতি নেওয়ারই তো সময় পেলাম না। অপরাজিতা আঢ্যও রংহীন হয়েই থাকলেন। তবে করোনার ভয়ে নয়। তার কথায়, যে হিংসা-বিদ্বেষ চারদিকে, যে ভাবে রক্তাক্ত হচ্ছে চার পাশ, তার মধ্যে আনন্দ করতে মন চাইছে না।

দোল উৎসবে মেতেছেন গায়ক নচিকেতাও। দোলের আগের দিন বিকেলে বেলগাছিয়ার মিল্ক কলোনি থেকে পাইকপাড়া— তিন-চার কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে রং-গান-নাচের সঙ্গে তিনি পরিক্রমা করেন। সঙ্গে ছিলেন তার প্রচুর গুণগ্রাহী। করোনা-আবহে এমন পরিক্রমার পরিকল্পনা? নচিকেতা বলেন, আগুনপাখি কবেই বা কিসে ভয় পেয়েছে! উৎসব তো চির কাল মানুষকে মানুষের কাছে এনেছে। তাই পথে আবির নিয়ে নেমেছি।


পূর্বপশ্চিমবিডি/অ-ভি/কেএম

করোনাভাইরাস,দোল উৎসব,পশ্চিমবঙ্গ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close