• সোমবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
  • ||

পূর্বপশ্চিমের সুহৃদ সৌমিত্র, দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন

প্রকাশ:  ১৫ আগস্ট ২০১৯, ০২:৫৮ | আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০১৯, ০৩:৩৬
বিপুল হাসান

দুই বাংলার জীবন্ত কিংবদন্তী অভিনেতা, কবি ও আবৃত্তিকার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বেশ অসুস্থ। বুধবার সকালে কলকাতার বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে তাঁকে। শ্বাসকষ্ট ও উচ্চরক্তচাপ জনিত সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি।চারজনের একটি চিকিৎসকের দলের পর্যবেক্ষণে রয়েছেন সৌমিত্র। আপাতত আইসিইউতে রাখা হয়েছে অভিনেতাকে। ফুসফুসেও সংক্রমন ছড়িয়েছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে পূর্বপশ্চিমবিডির সম্পর্ক অনেকটা জন্মসূত্রে। এই নিউজপোর্টালটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে এসেছিলেন তিনি। আরও ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বরেণ্য সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। কথা-কবিতা-গান ও আনন্দ-আড্ডায় এই দুই মধ্যমণিকে নিয়ে ২০১৫ সালের ২৪ নভেম্বর রাজধানীর গুলশানের অল কমিউনিটি ক্লাবে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু পূর্বপশ্চিমবিডি.নিউজের লগো উন্মোচন ও উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাখা বক্তব্যে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেন, পূর্বপশ্চিম পোর্টালটির নামের মধ্যেই বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে সম্মান জানানো হয়েছে। আমার মনে হয় এই পোর্টাল আলোর পথ দেখবে বাংলা ভাষাভাষী সব মানুষ। আমার বিশ্বাস, এটি হয়ে ওঠবে দুই বাংলার মানুষ খোঁজখবর রাখার অন্যতম প্রধান মাধ্যম।আমি পূর্বপশ্চিমে আছি এবং থাকবো।

অভিনয় আর আবৃত্তিতে তিনি যেমন বলিষ্ঠ, তেমনি কোনো কথা বললে সেটি পালন করেন। তাই তো ঢাকা থেকে কলকাতায় কেউ গেলে প্রশ্ন করেন, কেমন চলছে পূর্বপশ্চিম?

বর্ষীয়ান অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় খানিকটা অসুস্থ ছিলেন তখন থেকেই। কিন্তু সেটা তিনি বুঝতে দিতেন না আর কোনোকাজে কারও সাহায্যও নিতে পছন্দ করতেন না। পূর্বপশ্চিমকে তিনি তার দীর্ঘ আশি বছরের শিল্পী জীবনের গল্প বলেছেন দুইদিনের দীর্ঘ এক সাক্ষাৎকারে।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আদি বাড়ি বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার শিলাইদহ। তবে পিতামহের আমল থেকেই তাদের পরিবার পশ্চিম বঙ্গের নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরে স্থায়ীভাবে বসতি গড়েন। ওই বাড়িতেই জন্ম তার। শৈশব কাটে তার সেখানেই। কৃষ্ণনগরের সেন্ট জন্স স্কুলে তার পড়াশোনায় হাতেখড়ি। বাবার কর্মস্থল পরিবর্তনের সাথে সাথে বদল হতে থাকে স্কুল। হাওড়া জেলা স্কুলে মাধ্যমিক পড়াশোন শেষ করেন। এরপর কলকাতার সিটি কলেজ থেকে আইএসসি আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বি এ অনার্স সম্পন্ন করেন। পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজ অফ আর্টসেও দু বছর পড়াশোনা করেন তিনি।

শিল্পচর্চায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের হাতেখড়ি শৈশবে বাবা মোহিত কুমার চট্টোপাধ্যায়ের কাছে। পেশায় তিনি উকিল হলেও নাটক, আবৃত্তি আর কাব্যরচনায় তার ঝোঁক ছিল। বাবার কাছ থেকেই যেন উত্তরাধিকার সূত্রে সৃজনশীলতার বীজ ডালপালা মেলে সৌমিত্রের মাঝে। নিজের বর্ণাঢ্য শৈশব প্রসঙ্গে পূর্বপশ্চিমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘…আমার বাবা মোহিত কুমার চট্টোপাধ্যায় পেশা হিসেবে ওকালতি বেছে নিলেও তিনি নিমগ্ন থাকতেন কবিতা নিয়ে। পছন্দের কবিতা তিনি আমাদের আবৃত্তি করে শোনাতেন। বাবাই আমাকে ধরে ধরে আবৃত্তিটা শিখিয়েছেন। আবৃত্তির মতো অভিনয়ে আসাটাও আমার উকিল বাবার হাত ধরেই। আমাদের কৃষ্ণনগরের বাড়িতে আমার পিতামহের আমল থেকেই নাটক হতো। বাবা কলকাতায় ওকালতি করতেন। তিনি কলকাতা থেকে কয়েকদিনের জন্য বাড়ি ফিরতেন, তখন উৎসব লেগে যেত। বাড়ির সব ছেলেমেয়েরা মিলে তখন নাটক করতাম।’

অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে ১৯৫৯ সালে সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর সংসার’ ছবিতে অভিনয়ের পর মানুষ চিনতে শুরু করলেও নাট্যচর্চার সঙ্গে তিনি জড়িত হন অনেক আগেই। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘…কলেজে পড়ার সময়টাতে আমি নাট্যাচার্য শিশির কুমার ভাদুড়ীর সংস্পর্শে আসি। অভিনয়ের ব্যাকরণ শেখা তার কাছ থেকেই। গিরিশ যুগের অবসান আর নবনাট্য আন্দোলনের সেতু বন্ধনকারী শিশির কুমার ভাদুড়ী আমার চেতনাকে কাঁপিয়ে দিলেন। সেই চেতনা থেকেই এখনো থিয়েটার করছি। থিয়েটারের এই ঘোরের মাঝেই দেখা হয়ে গেল সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে। জায়গা হল বিশ্ব সংসারের মতোই ‘অপুর সংসার’ চলচ্চিত্রে। তারপরে আমার জীবনতো শুধু আর আমার রইল না। একজন সাধারণ সৌমিত্র ছড়িয়ে পড়লো, এক আমি হয়ে গেলাম অনেকের।’

সত্যজিৎ রায়ের ৩৪টি চলচ্চিত্রের মধ্যে ১৪টিতেই অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- ‘অপুর সংসার’, ঘরে বাইরে’, ‘অশনি সংকেত’ ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’, ‘চারুলতা’, ‘সোনার কেল্লা’, ‘হীরক রাজার দেশে’ প্রভৃতি। অমর চলচ্চিত্রকারের সংস্পর্শে থাকার দিনগুলি সম্পর্কে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেন, “… এই মহান মানুষটির সঙ্গে যতোক্ষণ কাজ করতাম, একধরনের ঘোরের ভেতর থাকতাম আমি। সময় যেন থমকে যেত। কখন বেলা গড়িয়ে দুপুর পেরিয়ে বিকেল হয়ে যেত টেরই পেতাম না। এখানে একটু বলে রাখি যে, সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে পরিচয়ের সাথে সাথেই কিন্তু আমার চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু হয়নি। ওইসময় তিনি পথের পাঁচালির দ্বিতীয় পর্ব ‘অপরাজিতা’ বানাচ্ছেন। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন তার ‘পরশপাথর’ আর ‘জলসাঘর’ চলচ্চিত্রের অভিনেতা ছবি বিশ্বাস।

“…আমি প্রায়ই ‘অপরাজিতা’ ছবিটির শুটিং দেখতে যেতাম। বড় ভালো লাগত। একদিন সত্যজিৎ রায় বললেন, ক্যামেরার সামনে অভিনেতা-অভিনেত্রীরা কিভাবে অভিনয় করে সেটা মন দিয়ে দেখার জন্য। কেন বলেছিলেন, সেটা ওইসময় বুঝতে পারিনি। ওই ছবির শুটিং শেষ হওয়ার পর শুনলাম তিনি পথের পাঁচালি নিয়ে আরেকটি সিক্যুয়েল ‘অপুর সংসার’ বানানোর পরিকল্পনা করছেন। মনের মধ্যে তার ছবিতে কাজ করার ইচ্ছে আমার আগেই ছিল। কিন্তু অপু’র জন্য তিনি যে আমাকে বেছে নেবেন, এমনটা ভাবিনি। কারণ আমার বয়স তখন ছিল ২৩। অপু’র বয়স থেকে আমার বয়স বছর দুয়েক বেশি। ছবি বিশ্বাসের মুখ থেকে যখন শুনলাম আমাকেই মানিকদা (সত্যজিৎ রায়ের ডাক নাম) বেছে নিয়েছেন, বিশ্বাসই হচ্ছিল না। এরপর একে একে তার চৌদ্দটি ছবিতে কাজ করার সৌভাগ্য হল।”

সত্যজিৎ রায় ছাড়াও মৃণাল সেন, গৌতম ঘোষ, বুদ্ধদেব দাসগুপ্তসহের মতো খ্যতিমান পরিচালকদের অসংথ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। সুচিত্রা সেনের সঙ্গে ‘সাত পাকে বাঁধা’ চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় পুরনো দিনের দর্শকেরা এখনও মনে রেখেছেন। মহানয়িকার সঙ্গে তিনি আরো অভিনয় করেছেন ‘দত্তা’ আর ‘প্রণয় পাশা’ প্রভৃতি ছবিতে। শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ চলচ্চিত্রেও তাকে নাম ভূমিকায় অভিনয় করতে দেখা গেছে। অভিনয় করেছেন অসংখ্য টিভিনাটক ও সিরিয়ালে।

অবশ্য ছোটপর্দার অভিনয় কখনোই সৌমিত্রকে তৃপ্তি দেয়নি। চেনাজানা মানুষদের অনুরোধ রাখতে গিয়ে টিভি সিরিয়ালে তার অভিনয়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘টেলিভিশনে অভিনয় করাটাকে সেভাবে আমি মূল্যায়ন করতে পারি না। ওটা করার জন্যই করা। পেশা হিসেবে যেহেতু অভিনয়টা আমার অবলম্বন তাই টিভি নাটকে অভিনয় করে থাকি। আজকাল কলকাতার চ্যানেলগুলোতে চলছে ডেইলি সোপের জোয়ার। ডেইলি সোপ বা সিরিয়ালে কাহিনীর নির্ধারিত কোনো ফ্রেম, আমি খুঁজে পাই না। অর্থহীন লাগে এসব কাজ করতে। কিন্তু আমার এমন কিছু সুহৃদ এখন টিভি সিরিয়াল নির্মাণ করছে যে, তাদের অনুরোধ উপেক্ষা করলে মুখ থাকে না। অনুরোধের ঢেঁকিটা তাই গিলতে হয়।’

অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম যেখানে, সেই থিয়েটারকে কখনোই তিনি ভুলে থাকেননি। চলচ্চিত্রে তুমুল ব্যস্ত থাকার দিনগুলোতেও তিনি যেমন থিয়েটারে অভিনয় করেছেন, বয়স আশির কোঠা পেরিয়ে গেলেও এখনো থিয়েটারে কাজ করছেন। তার নির্দেশিত হয়েছে বেশ কিছু মঞ্চনাটক। তার নির্দেশিত নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘টিকটিকি’, ‘আত্মকথা’, ‘লিয়ার’, ‘হোমাপাখি’ প্রভৃতি।

থিয়েটার নিয়ে নিরন্তর আশাবাদি এই শিল্পী বলেন, ‘…থিয়েটার আছে এবং থাকবে, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। কারণ আমরা অনেক ত্যাগ স্বীকার করেই এখনো থিয়েটার করে থাকি। এই ত্যাগ কখনো বৃথা যেতে পারে না। অতীতে যায়নি, ভবিষ্যতেও যাবে না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম একদল ত্যাগি আর নিবেদিত শিল্পী থিয়েটারকে বাঁচিয়ে রাখবে বলে বিশ্বাস করি। হয়তো এটা কখনোই পারফর্মিং আর্টের প্রধান মাধ্যম হবে না, তবে নাট্যকর্মীদের প্রাণশক্তিতেই থিয়েটার টিকে থাকবে।’

অভিনেতা হিসেবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের খ্যাতির কাছে কবি সত্ত্বা কিছুটা আড়ালে পড়লেও যারা কবিতার খোঁজ খবর রাখেন তাদের কাছে কবি সৌমিত্র নামটা অবশ্য নতুন নয়। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ব্যক্তিগত নক্ষত্রমালা’ ‘জলপ্রপাতের ধারে দাঁড়াবো বলে’ ‘শব্দরা আমার বাগানে’ ‘যা বাকি রইল’ ‘পড়ে আছে চন্দনের চিতা’ ‘ধারাবাহিক তোমার জলে’ উল্লেখযোগ্য ।

অন্যসব কিছুর মতোই জীবনের প্রথম দিকের দিনগুলোতে সৌমিত্র চটোপাধ্যায়ের কবিতা রচনা হাতেখড়ি। কবিতা রচনায় অভিষেক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘…কবিতা লেখা শুরু নিজের মনের অব্যক্ত বাসনা প্রকাশ করতে না পারার যন্ত্রণা থেকে। এখনকার সময়ের ছেলেরা অনায়াসে নিজের মনের গোপন কথাটি মেয়েদের কাছে প্রকাশ করতে পারে। আমাদের সময় সেটা সম্ভব ছিল না। কিশোর বয়সে নিজের অব্যক্ত প্রেমাকাঙ্খা প্রকাশের তাড়না থেকেই কবিতা লিখতে শুরু করি। পরবর্তীতে আমার কবিতায় ধীরে ধীরে ওঠে আসে প্রকৃতি, সমাজ, দর্শন, উপলব্ধি। তাছাড়া পড়াশোনাটাও আমি করেছি বাংলা সাহিত্য নিয়ে। যার কারণে কবিতা আমাকে ছাড়েনি। এখনও কবিতা লিখি, যতোদিন মস্তিষ্ক সচল থাকবে কবিতা লিখেই যাবো।’

আবৃত্তিকে শিল্পের একটি অনন্য শাখায় নিয়ে যাওয়াতেও রয়েছে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অসামান্য অবদান। আবৃত্তি চর্চায় নিবেদিত হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘…আমার আদর্শ এবং গুরু হলেন বাবা। ছোটবেলায় বাবাকে একান্ত নিমগ্নতায় আবৃত্তি করতে দেখেছি। পছন্দের কবিতা তিনি আমাদের আবৃত্তি করে শোনাতেন। বাবাই আমাকে ধরে ধরে আবৃত্তিটা শিখিয়েছেন। আবৃত্তিটা পরবর্তীতে আমার অভিনয় জীবনে অনেক কাজে লেগেছে।’

বহুমুখি প্রতিভা নিয়েই পৃথিবীতে আসেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। আঁকাআঁকিতে তার হাত বেশ পাকা। গত পাঁচ দশক ধরে তিনি এঁকে চলেছেন ছবি। তাঁর আঁকা স্কেচ এবং পেইন্টিং নিয়ে প্রদর্শনী হয়েছে ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশন্সে’। ছবি আঁকার এই ঝোঁক প্রসঙ্গে সৌমিত্র বলেন, ‘…ছোটবেলায় অনেক ছবি এঁকেছি। ফাইন আর্টসে পড়াশোনাও করেছি দুবছর। পরে কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় আর সেভাবে ছবি আঁকা হয়ে উঠেনি। তবে হাতের কাছে কোনো কাগজ পেলে নকশা আর আলপনা আঁকার একটা অভ্যাস সবসময়ই ছিল। কয়েক বছর আগে মনে হলো, আঁকাআঁকির প্রতি সুবিচার করা হচ্ছে না। ফের রঙতুলি হাতে তুলে নিলাম। খেয়ালি ভাবনা, সৌখিন কাজ। নিজের তৃপ্তির জন্যই ব্যাকরণহীন এইসব আঁকাআকি। কখনো প্রদর্শনীর কথা ভাবিনি। কলকাতায় আমার কিছু অন্ধ ভক্ত আছে, আমার সব কাজেই তাদের তুমুল আগ্রহ। তারাই প্রদর্শনীর আয়োজন করে।’

সৌমিত্র চট্টোপাসৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ধ্যায় ভূষিত হয়েছেন দেশি-বিদেশি অসংখ্য সম্মানে। ফ্রান্স সরকারের কাছ থেকে সে দেশের শিল্পের সর্বোচ্চ সম্মান ‘অর্ডার অফ আর্টস এন্ড লেটার্স’। ইতালি সরকার দিয়েছে ‘লাইফ টাইম অ্যাচিভম্যান্ট’। নিজ দেশ ভারতের কাছ থেকে পেয়েছেন রাষ্ট্রিয় সম্মাননা পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষন। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছ থেকে পেয়েছন বঙ্গবিভূষণ। পেয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মান দাদাসাহেব ফালকে।

চিরসবুজ শিল্পী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বাংলাদেশে এসেছেন অনেকবার।পূর্বপশ্চিমবিডি.কমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ঢাকা সফরকালে তিনি বলেন, রাজনৈকিকভাবে ভারতীয় হলেও মনেপ্রাণে বাংলাদেশকে নিজের দেশই মনে করেন তিনি। এদেশ আসা-যাওয়া করি নিয়মিতই। কয়েকমাস আগে এসেছিলাম, আবার আসলাম। বেঁচে থাকলে জানি, আবারও আসবো। বাংলাদেশে যতোবার এসেছি, এয়ারপোর্টে নেমে প্রতিবার আমার একটাই অনুভূতি হয়েছে। এদেশের মাটিতে পা রেখে, এদেশের মানুষের মধ্যে এসে জলে আমার চোখ ভিজে ওঠেছে। মন বলে ওঠেছে, বাংলাদেশ কেন আমার কাছে বিদেশ হবে? এদেশের মানুষ তো আমাদের মতোই বাংলায় কথা বলছে। আমাদের ভাষা এক, সংস্কৃতি এক, মাটির গন্ধও এক। এটা তো আমার নিজের দেশই। কেন আমাদের আসা-যাওয়ায় পাসপোর্ট-ভিসা এতোসব ঝামেলা করতে হবে! মন যতোই বলুক, বাস্তবতা আমাদের মেনে না নিয়ে উপায় নেই। আজকে বাংলাভাষি মানুষদের রাজনৈতিক কারণে পূর্ব ও পশ্চিমে ভাগ করে দুই দেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের আত্মাকে কী করে ঠেকিয়ে রাখবে? আমরা যে আত্মার সুতোয় বাঁধা। সেই দাবিতে বাংলাদেশকে নিজের দেশই মনে করি। এটাও জানি, বাংলা ভাষাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এই বাংলাদেশই।’

সব্যসাচি এই শিল্পীকে কবি-আবৃত্তিকার-অভিনেতা কিংবা চিত্রশিল্পী- যে কোনো একটা পরিচয় কেবল বেছে নিতে বলেছিল পূর্বপশ্চিম। জবাবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, এই প্রশ্নটা কয়েকবছর আগে করা হলে বলতাম, কোনোটাই হতে চাই না। গতে বাঁধা জীবন আমার অপছন্দ। পূনর্জন্মে নতুন পরিচয়ে পৃথিবীতে ফিরতে চাই। কিন্তু এই ভাবনাটা আমার বদলে গেছে। কেন বদলে গেছে সেটা বোঝানোর জন্য এবার ঢাকায় আসার পর একটা ছোট্ট ঘটনার কথা বলি। পূর্বপশ্চিমবিডি ডটকমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে গাড়িতে ট্র্যাফিক জ্যামের মধ্যে বসে আছি। দেখি রাস্তায় একটা ছোট্ট মেয়ে আর তার মা ভিক্ষা করছে। মা যাচ্ছে একগাড়ির দিকে, মেয়েটা ছুটছে আরেক গাড়ির দিকে। মেয়েটা আমাদের গাড়ির দিকে এগিয়ে এল। জানালায় একবার টোকা দিল। আমাকে একপলক দেখলো। তারপর ছুটে গেল তার মায়ের কাছে। দেখি আমাকে আঙুল দিয়ে মাকে দেখাচ্ছে মেয়েটা। বুঝলাম ওরা আমার অভিনয় দেখেছে। আমার চোখে জল চলে এল। মনে হলো স্বার্থক অভিনয় জীবন। অভিনেতা হিসেবে মানুষের এতো ভালোবাসা আমি পরের জন্মে মিস করতে চাই না। তাই আর কিছু হই আর না হই, অভিনেতা হয়েই আমি জন্ম নিতে চাই।

সাড়ে পাঁচ দশক ধরে অভিনয়ের শাখা-প্রশাখায় বিরামহীন পথচলা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ে সুস্থতা কামনা করে পূর্বপশ্চিম পরিবার।

লেখক: বার্তা প্রধান, পূর্বপশ্চিমবিডি নিউজ

সৌমিত্র,সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত