• সোমবার, ২৭ জুন ২০২২, ১৩ আষাঢ় ১৪২৯
  • ||

স্বাধীনতার স্বাদ কতটা পেয়েছি!

প্রকাশ:  ২৭ মার্চ ২০২২, ১১:০০ | আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২২, ১১:০৮
জুবাইর হোসাইন সজল

মহান স্বাধীনতা দিবসের ৫১ বছর হল। বৈষম্যহীন যে সমাজ গঠনে ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছিল তার কতটা পূরণ হয়েছে? এনিয়ে কি ভাবছেন নতুন প্রজন্ম ? জাতীয় দিবসে সেই প্রশ্ন ও উত্তর দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

সানজিদা জান্নাত পিংকি, শিক্ষার্থী, গণ বিশ্ববিদ্যালয়

একটি তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে সময়ের পরিক্রমায় আমরাও একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছি।স্বাধীনতার স্বপ্ন ছিল। স্বাধীন হলো বাংলাদেশ। এক এক করে পেরিয়ে গেছে স্বাধীনতার ৫১ বছর। কিন্তু সময়ের সমান্তরালে স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা কি পূর্ণতা পেয়েছে?

৭১ এর যুদ্ধ কি শুধু কোনোরকমে বেঁচে থাকার জন্য ছিল? না। এটা শুধু কোনোরকমে বেঁচে থাকার সংগ্রাম ছিল না।ভালোভাবে বেঁচে থাকার যুদ্ধ ছিল। আমরা স্বাধীনতা চেয়েছিলাম, চেয়েছিলাম মুক্তি, মর্যাদা, সাম্য,ন্যায়বিচার।সেই যুদ্ধে আমরা বিজয় পেয়েছি। সেই বিজয়ের বয়সও ৫১ বছর! অর্ধ শতাব্দীর স্বাধীন হওয়া একটি দেশ হিসেবে আমাদের অর্জন কতটুকু সেই প্রশ্ন ঘুরেফিরেই তো আসে। ১৯৭১ নিয়ে আমাদের গৌরব আছে,গল্প আছে, কিন্তু ৭১ পরবর্তী গল্পগুলো খুব বেশি এগুতে পারছে না। আমাদের দেশের নাম, পতাকা, শাসক ও শাসন পদ্ধতি বদলেছে। আমারা নিজেদের স্বাধীন দেশের নাগরিক বলতে পারছি কিন্তু যে পরিমাণ ত্যাগ, ক্ষত আর রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, সেই আনুপাতিক হারে আমাদের অর্জন হয়নি।

বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ যে এগিয়ে যাওয়াকে আমরা বলছি ‘উন্নয়ন’। উন্নয়নের সংজ্ঞা অনেক ব্যাপক। অবকাঠামোগত উন্নয়ন সেই ‘উন্নয়নের’ ই একটি অংশ। একটা বনের স্বাধীন পাখিকে খাঁচায় বন্দি করে রেখে যতই আদর আপ্যায়ন করা হোক না কেন এই অবকাঠামোগত উন্নয়ন আর জামাই আদর পাখির কাছে পছন্দ হবেনা। মুক্ত-স্বাধীন পাখিটি চায় খোলা আকাশে উড়ার স্বাধীনতা। আমরা অবকাঠামোগত দিক দিয়ে উন্নত হচ্ছি ঠিকই, কিন্তু সেই সাথে বিসর্জন দিতে হচ্ছে ঐ পাখিটির মতো খোলা আকাশে উড়ার স্বাধীনতা!

একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা কতটুকু স্বাধীন ও নিরাপদ সেই প্রশ্নে আমি বলবো- আজ আপনি যত বেশি চুপ থাকবেন, তত বেশি ‘নিরাপদ’! কোনো ব্যাপারে যে গঠনতান্ত্রিক সমালোচনা করবেন সেই সুযোগটাও নেই।

সুদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বাঙ্গালিরা যদি ‘বোবা’ হয়ে যায় তখন ডাক্তারেরা কারণ অনুসন্ধান করে বের করবেন.. ‘আজকের চুপ হয়ে থাকা’! এমন একটা বাংলাদেশে আমরা বসবাস করতে চাই যে দেশে থেকে আমি ন্যূনতম কথা বলতে পারব। নির্ভয়ে বলতে পারবো এটা ঠিক, এটা ভুল। যেমনটা কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন,‘বিদ্রোহী মানে কাউকে না মানা নয়। যা বুঝি না তা মাথা উঁচু করে ‘‘বুঝি না’’ বলা।’

রেদোয়ান আহমেদ, শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে দৃশ্যমান ছোট্ট একটি দেশ। যে দেশ এক সময় শাসনে, শোষণে জরাজীর্ণ ছিল। ইংরেজ থেকে শুরু করে পাকিস্তানি কারও হাত থেকে রেহাই পাইনি এ ছোট্ট দেশটি। উর্বর মাটি ও সহজ-সরল মানুষই ছিল শোষকদের মূল লক্ষ্য। অবশেষে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেল বাঙালিদের। সব ধরনের শাসন-শোষণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে ১৯৭১ সালে বাংলার সাহসী ও দামাল ছেলেরা অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের লক্ষ্য ছিল স্বাধীন একটি দেশের। যেখানে থাকবে না কোনো পরাধীনতার শিকল। সবুজের ওপর নিশ্চিতভাবে হেঁটে বেড়াবে প্রতিটি মানুষ। এমনটাই স্বপ্ন দেখত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতায় নেতৃত্বদানকারী নেতারা।

একাত্তরে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে যে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, তার আকাঙ্ক্ষা ছিল নারী-পুরুষ, শিশু-বয়স্ক নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের স্বাধীনতা। মুক্তিযোদ্ধারা স্বপ্ন দেখেছিল শোষণ ও বৈষম্যহীন একটি মানবিক সমাজের। তাদের দেখা সেই স্বপ্নের সমাজে স্থান পায়নি অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক বৈষম্য, ধর্মীয় বৈষম্য, এমনকি লিঙ্গ বৈষম্যও। আমরা আদৌও কি সেই স্বপ্নের দেশে বসবাস করছি?

কেমন স্বাধীনতা চাই, সেক্ষেত্রে বলতে গেলে বলবো আগামীর বাংলাদেশ দেখতে চাই একটি পশ্চিমা সংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে মুক্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে। বাংলাদেশ হবে সোনার বাংলাদেশ এটাই সকলের চাওয়া, যেখানে অপার সম্ভাবনা লুকায়িত রয়েছে। এ দেশের প্রতিটি মানুষ হবে সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক। প্রয়োজনে তারা মাতৃভূমি রক্ষার্থে জীবনকে বিলিয়ে দেবে, যেমনটি বিলিয়ে দিয়েছিল ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেয়ার জন্য। এ দেশে থাকবে না মানুষে-মানুষে হিংসা-বিদ্বেষ, থাকবে না সামাজিক কোন্দল, হত্যা, ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতি, লুটতরাজ ও চাঁদাবাজির মত ঘৃণ্যতম অপরাধ। থাকবে শুধু শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ, যেখানে থাকবে না কোন অবৈধ নিয়োগ-বাণিজ্য।

এমন একটি বাংলাদেশ হোক, যেখানে সবুজের ওপর নিশ্চিন্তভাবে দেশের প্রতিটি মানুষ হেঁটে বেড়াবে। স্বপ্ন দেখি মানুষের নিরাপত্তায় আমাদের বাংলাদেশ প্রথম। সেই বাংলাদেশ হোক যেখানে ক্ষুধিতের কান্না কেউ শুনবে না কখনও। আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে তরুণদের কাঁধে ভর করে এগিয়ে যাবে এ দেশ।

এ দেশের মানুষের একতা , দেশপ্রেম হবে উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার। এমন একটি বাংলাদেশ হোক যেখানে অস্ত্র কি তা কেউ বুঝবে না, শিক্ষাই হবে একমাত্র চালিকাশক্তি। এমন একটি দেশ যেখানে মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না, মানুষের দুঃখ-কষ্ট দূর করাই হবে মানুষ হিসেবে সবার দায়িত্ব। পরিশেষে বলতে চাই, উপরোক্ত চাওয়া বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশভাগ। একটি পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখি।

রূপা দেবনাথ, শিক্ষার্থী, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

স্বাধীনতা। ১৯৭১ সালে ঠিক এই দিনে স্বাধীনতা অর্জন করে। কিন্তু ১৯৭১ সালের প্রাপ্ত স্বাধীনতার ঠিক ততটাই আমরা ধরে রাখতে পেরেছি। আজ আমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক। তবে নিজেরা ঠিক কতটা স্বাধীন? স্বাধীনতার মর্ম আজও কি আমরা জানি?

স্বাধীন এই রাষ্ট্রে মুখ বুজে সব কিছু মেনে নেওয়া, চোখ বুজে অন্যায় কে প্রশ্রয় দেয় এটাই বোধহয় স্বাধীনতা। প্রতিনিয়ত নানা কাজে আমরা দৌড়াচ্ছি। ছুটে চলছি এক যান্ত্রিক গতিতে নিয়ন্ত্রিত কোন এক মাধ্যমে। কাজের ক্ষেত্রগুলোতে নজর দিলে দেখা যাবে যে, আমরা সকলেই একটা নিয়মে আবদ্ধ। এর বাইরে আমরা কথাটিও বলতে পারিনা। অন্যায় হলে তা মেনে নিতে হয় বরং প্রতিবাদ করার জোর টুকু আমাদের কারো মধ্যে নেই। শুধু কর্মক্ষেত্র নয় শিক্ষা ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি আমরা ঠিক ছোটবেলা থেকেই দাসত্বে অভ্যস্ত। আমাদের জীবনের লক্ষ্য কি হবে,কোন বিষয়টি নিয়ে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাব সব কিছু আমাদের ওপর একপ্রকার চাপিয়ে দেন আমাদের পরিবার। তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী আমাদের এগিয়ে যেতে হয়। সামান্য নিজের অগ্রগতি সম্বন্ধে যেখানে নিজের সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার আমাদের নেই সেখান থেকে আমরা কতটা স্বাধীনতা পেলাম?

বীর মুক্তিযোদ্ধারা এত কষ্ট করে দেশটাকে স্বাধীন করেছেন কিন্তু তাদের এই স্বাধীনতার মর্ম তা আমরা আজও বুঝে উঠতে পারিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল নারী-পুরুষ, শিশু-বয়স্ক নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের স্বাধীনতা। তাদের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে অন্যতম একটি ছিলো ধর্মীয় বৈষম্য বিহীন মানবিক একটি সমাজ। কিন্তু স্বাধীনতার বছরেও এদেশের ধর্মীয় কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ হয়নি।এসবের ফলে সৃষ্ট অনৈক্য দেশের অস্থিতিশীলতার অন্যতম বড় কারণ। তাই নিজের মাতৃভূমিকে ভালোবাসে এমন মানুষগুলোর মধ্যে ঐক্য দরকার।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের চলাচল ও পথঘাট হওয়ার কথা ছিল স্বচ্ছ। কিন্তু প্রতিনিয়ত চলাচলের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে যানজট। ঢাকাসহ অন্যান্য শহরাঞ্চলগুলোতে যানজট হল একটি বড় সমস্যা। যানজটের ফলে আমাদের অনেক মূল্যবান সময় হারিয়ে যাচ্ছে। যার ফলে আমরা সময়ের মূল্যায়ন ঠিকমতো করতে পারছিনা।

সুতরাং আমাকে যদি প্রশ্ন করা হয় স্বাধীনতার এত বছর এ এসে আমি ঠিক নিজের দেশটিকে কেমন হিসেবে দেখতে চাই? তাহলে আমার উত্তর হবে, আমি একটি যানজটমুক্ত বাংলাদেশ চাই। যার ফলে আমাদের মূল্যবান সময়টুকু নষ্ট হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাবে। একটি দেশের উন্নয়ন বৃদ্ধিতে সময়ের সঠিক ব্যবহার অপরিহার্য। শুধু সময় নয় এক্ষেত্রে দেশের জনগণকে অনেকটা সচেতন হতে হবে। অন্যায় দেখলে সাথে সাথে এর প্রতিবাদ করতে হবে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে ঠিক স্বাধীনভাবেই বেঁচে থাকতে হবে দমে থেকে নয়।

কাজী ফয়সাল মাহমুদ, শিক্ষার্থী, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

১৯৭১ থেকে ২০২২ সাল, এক কথায় ৫১ বছর হয়ে গেল বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার। স্বাধীনতার ৫১ বছরে সবুজের রঙে আলোকিত প্রিয় বাংলাদেশের অর্জন কম নয়।সুন্দর আর স্বপ্নের যে বাংলাদেশের স্বপ্ন শহীদেরা দেখেছেন সম্ভবত তার ধারে কাছেও আমরা যেতে পারিনি।

বিজয়ের ৫১ বছরেও বিভিন্ন প্রতিকূলতায় সেই স্বপ্ন অপূর্ণই রয়ে গেছে। এখন আমরা সেই অপূর্ণতা পূরণ করতে চাই। দেখতে চাই বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত স্বচ্ছ সিস্টেমের দ্বারা পরিচালিত হতে। দেখতে চাই ঢাকা শহরকে বসবাসযোগ্য শহরের তালিকার ওপরের দিকে, কিন্তু আজও ঢাকা শহর বসবাস অযোগ্য শহরের তালিকার ৪র্থ অর্থাৎ শীর্ষে বলা যায়। দেখতে চাই বাংলাদেশের শিক্ষার মানের উন্নতি। আমাদের স্বাক্ষরতার হার বেড়েছে, কিন্তু শিক্ষার গুণগত মানের উন্নতি হয়নি। দেশের সার্বিক উন্নয়ন আর অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হলো বেকারত্ব। দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো শিক্ষিত যুবকদের বেকারত্ব। কর্মমুখী আর যুগোপযোগী শিক্ষার অভাবে দেশে দিনের পর দিন শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলছে। অনুন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা, তথ্য প্রযুক্তি শিক্ষার অভাব, দুর্বল ইংরেজি জ্ঞান যা সৃষ্টি করছে নানা রকম সামাজিক সমস্যা।আমাদের দেশের মানবসম্পদকে কর্মদক্ষ করে বিভিন্ন কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হচ্ছে কিন্তু সহজলভ্য ও বাধ্যতামূলক করতে পারেনি।

পরিশেষে বলতে চাই, উপরোক্ত চাওয়া বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশভাগ। একটি পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখি।

এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে বেকারত্বের মতো অভিশাপকে মুছে ফেলা হবে। বেকারত্ব একটি দেশের বিষফোঁড়া। দেশের প্রতিটি বেকার প্রাণের কর্মসংস্থান সুনিশ্চিত করলেই কেবল প্রকৃত মুক্তি সম্ভব। প্রাণ ভরে শ্বাস নেবার ক্ষমতা থাকবে কেবল একটি দেশেরই। আর ঐ বাংলাদেশই চাই আমি,চাই আমরা সবাই।

পূর্বপশ্চিমবিডি/জেএস

স্বাধীনতা
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close