• শুক্রবার, ২০ মে ২০২২, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
  • ||

শাবি উপাচার্য ফরিদ উদ্দিনকে সরানো হচ্ছে

প্রকাশ:  ২৭ জানুয়ারি ২০২২, ০৯:৪৮
নিজস্ব প্রতিবেদক

অবশেষে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দু-চার দিনের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে। এছাড়া শাবিপ্রবি শিক্ষকদের থেকেই নতুন উপচার্য নিয়োগ দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছে সরকার।

বৃহস্পতিবার (২৭ জানুয়ারি) সরকারের সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র থেকে এমন আভাস মিলেছে বলে গণমাধ্যমের খবরে উঠে এসেছে।

সম্পর্কিত খবর

    সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, শাবিপ্রবির আন্দোলন পরিস্থিতি ও সার্বিক বিষয় নিয়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে নানা তথ্য উঠে আসে। এসব প্রতিবেদন নীতিনির্ধারণী দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে।

    প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু শাবিপ্রবি নয়, ভবিষ্যতে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে একই ব্যক্তিকে ভিসি নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি নিরুৎসাহিত করা বাঞ্ছনীয়। এ ছাড়া শাবিপ্রবির ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের কিংবা বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের কোনো উপযুক্ত শিক্ষককে মনোনীত করা যেতে পারে।

    একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, নতুন উপাচার্য হিসেবে বর্তমানে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের যে দু'জন শিক্ষকের নাম জোরেশোরে আলোচনায় রয়েছে তারা হলেন- বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. তুলসী কুমার দাস ও বর্তমান কোষাধ্যক্ষ ড. আনোয়ারুল ইসলাম।

    বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে ওই ক্যাম্পাসের বাইরে, না ভেতর থেকে কোন শিক্ষককে বেছে নেওয়া হলো- এটা বড় বিষয় নয়। সবার আগে দেখতে হবে তিনি যোগ্য কিনা। অবশ্যই উপাচার্য একজন ভালো একডেমিশিয়ান হতে হবে। তার মধ্যে অভিভাবকসুলভ গুণও থাকা জরুরি। এটা একজন উপাচার্যকে মনে রাখতে হবে, তিনি প্রশাসক নন। শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে তাকে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী হতে হবে। শাবিতে বর্তমান আন্দোলন কর্মসূচির সমন্বয়ক মোহাইমিনুল বাশার বলেন, 'আন্দোলনকারীদের মূল দাবি ভিসির অপসারণ। এ ছাড়া অজ্ঞাত মামলা প্রত্যাহার, গ্রেপ্তার সাবেক পাঁচ শিক্ষার্থীর দ্রুত মুক্তি, পুলিশের হামলায় আহত ও অনশনকারীদের চিকিৎসার ব্যয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বহন করতে হবে। ভিসির পদত্যাগসহ সব দাবি সরকার মেনে নিচ্ছে- এমন আশ্বাস ড. জাফর ইকবাল আমাদের জানিয়েছেন। আমরা তার কথায় আস্থা রাখছি। এ কারণে অনশন ভাঙা হয়েছে।'

    শাবিপ্রবির শিক্ষক সমিতির প্রধান অধ্যাপক ড. তুলসী কুমার দাস বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সবাই চায়। ছাত্রছাত্রীদের জন্য শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। শিক্ষার্থীরা অনশন ভেঙেছে, এটা খুব ভালো খবর। তবে উপাচার্য বদলের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তুলসী দাস।

    প্রতিবেদনে উঠে আসে, শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে আন্দোলনে নামলেও শুরু থেকে তা আমলে নেননি উপাচার্য। তিনি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোনো আলোচনায় বসেননি, এমনকি কোনো বিবৃতিও দেননি। বর্তমান ভিসির এমন একরোখা মনোভাব আন্দোলনের গতিকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।

    প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শাবিপ্রবির বর্তমান আন্দোলনে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের ছাত্র অধিকার পরিষদ ও বাম সংগঠনগুলো নানাভাবে উস্কানি-মদদ দিয়ে ভিন্ন খাতে নেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে একে রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার অপতৎপরতা রয়েছে।

    সরকারের কাছে দেওয়া প্রতিবেদনে আগামীতে শিক্ষার্থীদের যে কোনো যৌক্তিক আন্দোলনে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়। এতে বলা হয়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি মনিটরিং সেল গঠন করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের যে কোনো সমস্যার নিয়ে শুরুতেই আলোচনা করে তা সমাধান করা সম্ভব। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসিত হওয়ায় নিজস্ব আইন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। ছাত্র কল্যাণ, শিক্ষকদের সমস্যা, হলের আবাসিক সুযোগ-সুবিধাসহ প্রক্টরিয়াল বডির কার্যক্রম তদারকির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশন বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় তেমন কোনো ভূমিকা পালন করতে পারে না। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোটখাটো সমস্যা সমাধানে তৃতীয় পক্ষের অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকায় সামান্য আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে।

    শাবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সূত্রপাত গত ১৩ জানুয়ারি। ওই দিন রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রাধ্যক্ষ জাফরিন আহমেদের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ তুলে তাঁর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন হলের কয়েক শ ছাত্রী। ছাত্রীদের অভিযোগ, সিরাজুন্নেসা হলের ছাত্রীরা কিছু সমস্যার কথা বলতে প্রাধ্যক্ষ জাফরিন লিজাকে মোবাইল ফোনে কল করেন। এ সময় তিনি ছাত্রীদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন। এর প্রতিবাদে ছাত্রীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে হলের সামনে বিক্ষোভ শুরু করলে ছাত্রলীগ ছাত্রীদের আন্দোলনে হামলা চালায়।

    আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলেছেন, আবাসিক হলের পানি, সিট, ইন্টারনেট, খাবারসহ বেশ কিছু সমস্যা নিয়ে শিক্ষার্থীরা হলের রিডিং রুমে আলোচনা করছিলেন। আলোচনার মাঝে হল প্রভোস্ট অধ্যাপক জাফরিন আহমেদ লিজাকে ফোন দিয়ে অল্প সময়ের জন্য হলে আসার জন্য অনুরোধ করা হয়। প্রথমে তিনি অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে এড়িয়ে যেতে চান। এরপর শিক্ষার্থীরা তাঁর কাছে প্রভোস্ট বডির কাউকে হলে পাঠানোর অনুরোধ জানালে জাফরিন আহমেদ লিজা ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, ‘কেউ তো মরেনি যে তোমাদের দেখতে আসব। আমার এত ঠেকা পড়েনি। ইচ্ছে হলে থাক, নয় তো বেরিয়ে যেতে পারো!’

    প্রভোস্টের এ মন্তব্যে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন শিক্ষার্থীরা। তারা বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করলে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা সেখানে হামলা চালান। আন্দোলনরত ছাত্রীরা জানান, ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা এসে কর্মসূচি গুটিয়ে তাদের চলে যেতে বলেন। এ সময় আন্দোলনকারী ছাত্রীদের সঙ্গে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের বাগ্বিতন্ডা হয়। এরই মধ্যে ছাত্রীদের আন্দোলনে সংহতি জানাতে যাওয়া ১০-১২ জন শিক্ষার্থীকে সেখানে বেধড়ক মারধর করা হয়। হামলাকারীদের হাত থেকে তাদের বাঁচাতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হন আন্দোলনরত কয়েকজন ছাত্রী। ক্যাম্পাসের গোলচত্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক জহির উদ্দিন আহমেদ এবং প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক ড. আলমগীর কবিরের উপস্থিতিতে এ ঘটনা ঘটে।

    এ ঘটনার পর ‘শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে ছাত্রলীগের হামলা কেন, প্রশাসন জবাব চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে ছাত্রীরা হামলার বিচার ও প্রাধ্যক্ষ জাফরিন আহমেদের পদত্যাগ দাবিতে তাদের কর্মসূচি চালিয়ে যেতে থাকেন। আন্দোলনের একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি ভবনে উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করেন। তখন শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা ও তাদের লক্ষ্য করে শটগানের গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে পুলিশ। এতে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। পুলিশ ৩০০ জনকে অজ্ঞাত দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা করে। পরে ১৫ জানুয়ারি রাতে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ও শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেন কর্তৃপক্ষ। এতে আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন শিক্ষার্থীরা। এবার তারা উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। এরই মধ্যে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রাধ্যক্ষ জাফরিন আহমেদ লিজা পদত্যাগ করলেও শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগ দাবিতে ১৯ জানুয়ারি বিকালে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে ২৪ শিক্ষার্থী আমরণ অনশনে বসেন। পরে তাদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে বাড়তে থাকে অনশনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা। পরে অনশনের সাত দিনের মাথায় শিক্ষার্থীদের অনশন ভাঙান বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল ।

    পূর্বপশ্চিম/এসকে

    শাবি উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন
    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close