• বৃহস্পতিবার, ১১ আগস্ট ২০২২, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৯
  • ||

ঢাবি ‘ক’ ও ‘খ’ ইউনিটে প্রথম শিক্ষার্থীদের নিয়ে কোচিং সেন্টারের টানাহেঁচড়া

প্রকাশ:  ০৩ নভেম্বর ২০২১, ২১:২৩
নিজস্ব প্রতিবেদক
মেফতাউল আলম সিয়াম ও মো. জাকারিয়া

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ক’ ও ‘খ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার পর বিরূপ পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন মেফতাউল আলম সিয়াম ও মো. জাকারিয়া।

বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত ‘ক’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেছেন বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজের শিক্ষার্থী মেফতাউল আলম সিয়াম। স্বাভাবিকভাবেই অভিনন্দনে ভাসছেন বগুড়ার এই শিক্ষার্থী। তবে গোলমাল লেগেছে অন্যখানে। উদ্ভাস এবং ইউসিসি— বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার শীর্ষস্থানীয় দুই কোচিং সেন্টারই মেফতাউলকে নিজেদের শিক্ষার্থী বলে দাবি করছে!

বুধবার (৩ নভেম্বর) ঢাবি ‘ক’ ইউনিট ভর্তি পরীক্ষার এই ফল প্রকাশিত হয়েছে। সিয়াম। ১০০ নম্বরের ভর্তি পরীক্ষায় পেয়েছেন ৯৭ দশমিক ৭৫ নম্বর। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের নম্বরসহ মোট ১২০ নম্বরের ভর্তি পরীক্ষায় তার প্রাপ্ত নম্বর ১১৭ দশমিক ৭৫।

ফলপ্রকাশের পরপরই উদ্ভাসের ফেসবুক পেজ থেকে লাইভে সংযুক্ত হন মেফতাউল ইসলাম সিয়াম। এসময় তিনি জানান, ফলপ্রকাশের সময় তিনি সেলুনে ছিলেন এবং উদ্ভাসের পক্ষ থেকেই তাকে ফোন করে তার ফল সম্পর্কে জানানো হয়।

সিয়াম বলেন, উদ্ভাসের সঙ্গে উচ্চ মাধ্যমিকের ফাইনাল মডেল টেস্ট থেকে ছিলাম। ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেডিকেল— দু’টিতেই এনরোল করেছিলাম।

এদিকে ফলপ্রকাশের পর আরেক কোচিং সেন্টার ইউসিসি-ও তাদের ফেসবুক পেজে সিয়ামের সঙ্গে তাদের বগুড়া শাখার পরিচালকের একটি ছবি সংযুক্ত করে পোস্ট করে। তাতে লেখা হয়, ‘আলহামদুলিল্লাহ। UCC মানে-ই অবিস্মরণীয় সাফল্য! ঢাবি ‘ক’ ইউনিটে (বিজ্ঞানে) এবার প্রথম।’ ইউসিসির দেওয়া সেই ফেসবুক পোস্টে সিয়ামের ভর্তি সংক্রান্ত একটি ফরমের ছবিও সংযুক্ত ছিল।

এ প্রসঙ্গে জানতে ইউসিসির কেন্দ্রীয় অফিসে যোগাযোগ করা হলে কোচিংটির ফার্মগেট শাখার পরিচালক কামাল উদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, সে বিজ্ঞানের ছাত্র। বিজ্ঞানের ছাত্ররা একাধিক জায়গায় কোচিং করতেই পারে। আমাদের বগুড়া শাখায় সে কোচিং করেছে। তবে আমি একবারও বলছি না যে সে উদ্ভাসে কোচিং করেনি। বরং আমি শুনেছি, সে মেডিকোতেও কোচিং করেছে।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উদ্ভাসের ব্যবস্থাপনা পর্ষদের এক সদস্য বলেন, সিয়াম লাইভে এসে যা বলার বলেছে। সে আমাদের ছাত্র এবং ক্লাস এইট থেকেই উদ্ভাসের সঙ্গে ছিল। যে কোচিং সেন্টারটি তাকে তাদের শিক্ষার্থী দাবি করছে, সেখানে সিয়াম কেবল একটি মডেল টেস্ট দিয়েছিল। সিয়ামই সেটি আমাদের জানিয়েছে।

জানা গেছে, সিয়ামের বাড়ি বগুড়া শিবগঞ্জের ময়দানহাটা ইউনিয়নের দাড়িদহ গ্রামে। খোরশেদ আলম ও মঞ্জিলা আরম দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে সিয়াম বড়। ছোট দুই জমজ ভাই বগুড়া জেলা স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী।

মেফতাউল আলম সিয়াম উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন বগুড়াতেই। বগুড়া বিয়াম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি ও আজিজুল হক সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। দুই পরীক্ষাতেই তার ফল জিপিএ-৫।

স্কুল-কলেজের এই সাফল্যের ধারাবাহিকতা ভর্তি পরীক্ষাতেও অব্যাহত রেখেছেন সিয়াম। ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে (আইইউটি) ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে প্রথম হয়েছেন তিনি। শুধু তাই নয়, মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষাতেও তার অবস্থান ৫৯তম। অর্থাৎ চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজেই পড়ার সুযোগ পাবেন তিনি। আগামী শনিবার (৬ নভেম্বর) তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ভর্তি পরীক্ষাতেও অংশ নেবেন।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদভুক্ত ‘খ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল মঙ্গলবার (২ নভেম্বর) দুপুরে প্রকাশ করা হয়। এতে ১২০ নম্বরের মধ্যে ১০০ দশমিক ৫ নম্বর পেয়ে প্রথম স্থান পান ঢাকার ডেমরার দারুন্নাজাত সিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে উত্তীর্ণ মো. জাকারিয়া। তিনি বলেছেন, একটি কোচিং সেন্টার তাকে তাদের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে জোর করে নিতে চেয়েছিল, রাজি না হওয়ায় শারীরিক আঘাতও করে।

অভিযোগের মুখে থাকা কোচিং সেন্টারের কর্ণধার শারীরিক নির্যাতনের এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে জাকারিয়াকে নিজেদের কোচিংয়ের শিক্ষার্থী দাবি করার বিষয়টি ভুলক্রমে হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।

এক ফেসবুক পোস্টে মো. জাকারিয়া লেখেন, তিনি যে কোচিং সেন্টারে কোচিং করেছিলেন, সেখানে গেলে অন্য একটি কোচিং সেন্টারের লোকজন তার ওপর হামলে পড়ে।

জাকারিয়া বলেন, তিনি ফোকাস কোচিং সেন্টারের উত্তরা শাখায় কোচিং করেছিলেন। তিনিসহ উত্তীর্ণদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছিল কোচিং সেন্টারটির ফার্মগেট শাখায়। সেখানেই অন্য একটি কোচিং সেন্টারের লোকজন ঢুকে তাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, আমারেও বাইরে নেওয়ার চেষ্টা করলো কিন্তু যাইনি। এক পর্যায়ে টানাটানি। তাতেও না নড়ায় এক কালো পান্ডা মাথায় থাপ্পড় দিলো।

ফেসবুক পোস্টে অন্য কোচিং সেন্টারটির নাম না বললেও পরে জাকারিয়া সাংবাদিকদের সঙ্গে কথায় ‘আইকন প্লাস’ নামে একটি কোচিং সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন।

জাকারিয়া বলেন, আমি ফোকাসেই কোচিং করেছিলাম। তাৎক্ষণিক সংবর্ধনা ও লাইভ অনুষ্ঠানে প্রতিক্রিয়া জানাতে আমি বিকেলে ফোকাসের অফিসে আসি। যেই মাত্র লাইভ শুরু করব, তখন কিছু লোক জোর করে রুমে ঢুকে আমাকে বের করে নিয়ে আসার চেষ্টা করে। তারা আমাকে আইকন প্লাসে কোচিং করেছি স্বীকৃতি দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করে। আমি অস্বীকার করলে তারা আমাকে হুমকি-ধমকি ও থাপ্পড় মেরে চলে যায়।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আইকন প্লাস কোচিং সেন্টারের পরিচালক কামাল হোসেন বলেন, ওখানে আমি ছিলাম। বিষয়টা হল ফার্মগেট বিটিআই ভবনের ছয় তলায় আমাদের অফিস, আর দুই তলায় ফোকাসের অফিস। বিকালে আমরা অফিস থেকে নামার সময় দেখি ওখানে অনেক মানুষের ভিড়। পরে ওখানে গিয়ে দেখি তারা ভেতরে মিটিং করছে, আর স্থানীয় কিছু পোলাপান হৈ-হুল্লোড় করতেছে। পরে আমি সেখান থেকে চলে আসি।

থাপ্পড়ের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এধরনের অভিযোগ করতেই পারে। এর সত্যতা আমার জানা নেই।

এদিকে ‘খ’ ইউনিটের ফল প্রকাশের পর আইকন প্লাস যাত্রাবাড়ী শাখার পরিচালক মোহাম্মদ লিমন এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে দাবি করেন, প্রথম স্থান অর্জন করা শিক্ষার্থী তাদের ওখানে কোচিং করেছে।

পরে জাকারিয়া তার ফেসবুকে বিষয়টি শেয়ার করে লেখেন, হুদাই। আমি একটা ফ্রি ক্লাস করছিলাম। তখন ওরা পরীক্ষা নিছিল। ওখানে ফার্স্ট হইছিলাম। ফ্রি ক্লাস করলেই কোচিং এর ছাত্র হয় এটা জানতাম না।

এ বিষয়ে আইকন প্লাসের কামাল বলেন, ওটা আসলে খুবই দুঃখজনক এবং দুর্ভাগ্যজনক, আমাদের একজন পরিচালক এটা দাবি করেছিল। কিন্তু আমরা আইকন প্লাসের মূল পেজ থেকে এটা দাবি করিনি। আমাদের ভর্তি কোচিং শুরুর আগে আমরা একটা সেশন করেছিলাম, সেখানে সে একদিন ফার্স্ট হয়েছিল এবং পুরস্কার পেয়েছিল। শাখা পরিচালকরা এটা শেয়ার করেছিল। আমরা বলেছি, ওই শিক্ষার্থী যদি স্বীকৃতি না দেয়, তাহলে যেন ফেসবুক পোস্ট ডিলিট করে দেওয়া হয়।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close