• মঙ্গলবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
  • ||

৩০ লাখ টাকায় অবৈধ নিয়োগ এমপিও পেয়েছেন দুই শিক্ষক

প্রকাশ:  ২৬ অক্টোবর ২০২১, ২২:২১
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি

শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেননি তারা। এনটিআরসিএ’র সনদেও রয়েছে জালিয়াতি। তবুও নিয়োগ পেয়েছেন তারা। এমনকি নিয়োগ পাওয়ার পাঁচ বছরে একদিনও বিদ্যালয়ে যাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। সবশেষ একটি চক্রকে ম্যানেজ করে আদায় করেছেন এমপিও। শিক্ষক নিয়োগে এমন অনিয়ম ঘটেছে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার খাসকররা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। নিয়োগ পাওয়া দুই শিক্ষকের নাম জান্নাতুল মাওয়া ও সাইফুল ইসলাম।

অভিযোগ রয়েছে, পরীক্ষায় অংশ নেওয়াদের বাদ দিয়ে এ দুজনকে নিয়োগ দিতে ৩০ লাখ টাকা নিয়েছেন বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক গোলাম সিদ্দিক, ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি বিলাল গণি মল্লিক। যার ভাগ পেয়েছেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুল বারীও। এ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বিদ্যালয়টির নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা দুর্নীতির অভিযোগ করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

খাসকররা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক জানান, ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি বিদ্যালয়টির মানবিক বিভাগে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ১৯ জন প্রার্থী আবেদন করলেও পরীক্ষায় অংশ নেন ১০ জন। পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ৩৮ নম্বর পেয়ে মো. আলিপনুর রহমান প্রথম স্থান অধিকার করেন।

দুই মাস পর তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই বছরের মে মাসে তিনি এমপিওভুক্ত হন। অন্যদিকে পরীক্ষায় ৩৬ নম্বর পেয়ে দ্বিতীয় হন জেসমিন খানম। কিন্তু তাকে বাদ দিয়ে জান্নাতুল মাওয়া ও সাইফুল ইসলামকে নিয়োগ দেয় বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, জান্নাতুল মাওয়াকে ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি যোগদান দেখায় স্কুল কর্তৃপক্ষ। অথচ তিনি বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) থেকে যে সনদ দেখিয়েছেন তা ২০১৬ সালের। কিন্তু ২০১৫ সালের ২২ অক্টোবর থেকে বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের কর্তৃত্ব চলে যায় এনটিআরসিএ’র হাতে।

শিক্ষক-অভিভাবকরা বলেছেন, ভুয়া নিয়োগপত্র ও এনটিআরসিএ’র সনদ দেখিয়ে এই শিক্ষক ২০২০ সাল থেকে এমপিও পেয়েছেন। অবৈধ নিয়োগ কৌশলে বৈধ করতে ২০১৫ সালের নিয়োগ দেখানো হয়েছে। কারণ জান্নাতুল মাওয়া গত পাঁচ বছরে এক দিনও স্কুলে যাননি।

অন্যদিকে সাইফুল ইসলামকে ৩১ জানুয়ারি ২০১৫ সালের নিয়োগের পরীক্ষার প্রার্থী দেখিয়ে একই বছরের জুলাই মাসে নিয়োগ দেখানো হয়েছে বাণিজ্য বিভাগে। কিন্তু এ নিয়োগ পরীক্ষাটি ছিল মানবিক বিভাগের শিক্ষকের জন্য। অভিযোগ রয়েছে, জান্নাতুল মাওয়ার মতো সাইফুল ইসলামও মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে চাকরিতে প্রবেশ করেছেন। তিনি চলতি বছর মে মাসে এমপিও সুবিধা পেয়েছেন। জান্নাতুল মাওয়ার মতো তিনিও সাড়ে পাঁচ বছর বিদ্যালয়ে উপস্থিত হননি।

২০১৪ থেকে ’১৬ সাল পর্যন্ত খাসকররা স্কুল কমিটির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন মো. আরজান আলী। তিনি বলেছেন, ‘আমার মেয়াদকালে স্কুলে এ দুই শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তারা কী করে নিয়োগ ও এমপিও পেলেন বিষয়টি আমি বুঝতেই পারিনি। ’

এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক জান্নাতুল মাওয়ার সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রধান শিক্ষক গোলাম সিদ্দিকের সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। আরেক অভিযুক্ত সাইফুল ইসলামের ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।

প্রধান শিক্ষক গোলাম সিদ্দিকের কাছে মোবাইলে জানতে চাওয়া হয় কীভাবে ওই দুই শিক্ষক নিয়োগ পেলেন? প্রথমে তিনি বলেন, ‘আমি কিছু জানি না।’ পরে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে অপারগ। ’ এরপর তিনিও মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে আর ফোন ধরেননি।

বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি বিল্লাল গণি মল্লিক অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার সময় তারা নিয়োগ পায়নি। কীভাবে নিয়োগ হয়েছে আমি তাও জানি না।'

খাসকররা মাধ্যমিক বিদ্যালয় একাধিক শিক্ষক বলেন, আমরা শুনেছি তারা পাঁচ বছর আগে নিয়োগ পেয়েছেন কিন্তু এতদিনে তাদের স্কুলে আসতে দেখিনি। তারা কীভাবে নিয়োগ পেয়েছেন, এমপিও হলেন কীভাবে এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক, সভাপতি ছাড়া কেউ কিছু জানেন না।

বিদ্যালয়টির কয়েক অভিভাবক সদস্য জানিয়েছেন, এ দুই শিক্ষককে এমপিও পেতে ম্যানেজ করতে হয়েছে জেলা ও উপজেলা শিক্ষা অফিস সবশেষে মাউশির খুলনা অঞ্চলকে।

এ বিষয়ে জানতে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুল বারীর মোবাইলে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

অন্যদিকে চুয়াডাঙ্গা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. আতাউর রহমান বলেন, ঘটনার সময় আমি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলাম না। তবে ঘটনাটি আমি শুনেছি। খাসকররা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে আমি অফিসে আসতে বলেছি কিন্তু তিনি যোগাযোগ করছেন না।

আলমডাঙ্গা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার দুর্নীতির বিষয়ে বলেন, এমন অভিযোগ আমি শুনেছি তবে কোনো প্রমাণ পাইনি।

মাউশি খুলনা অঞ্চলের উপপরিচালক এএসএম আবদুল খালেক বলেন, এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, প্রতিষ্ঠান প্রধান জানবে। আমরা যে কাগজ চেয়েছি স্কুল থেকে ওসব কাগজ পাঠানো হয়েছে। এরমধ্য দিয়েই এমপিও দেওয়া হয়েছে। স্কুলের কোনো শিক্ষকও আমাদের এ বিষয়ে কিছু জানায়নি। জানানো হলে এমন ঘটনা ঘটত না। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রধান শিক্ষক ও সভাপতির বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ

দুই শিক্ষক নিয়োগ ছাড়াও খাসকররা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম সিদ্দিক ও সভাপতি বিল্লাল গণি মল্লিকের বিরুদ্ধে আরও অনেক অভিযোগ রয়েছে। জানা যায়, সম্প্রতি বিদ্যালয়টিতে একজন অফিস সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক (পুরুষ) ও একজন নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়। এজন্য উপজেলার জহুরুলনগর গ্রামের কামরুজ্জামান নামে একজনের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা অগ্রিম নেন প্রধান শিক্ষক গোলাম সিদ্দিক। পরে তাকে না জানিয়ে দুই পদে নিয়োগ দেওয়া হয় সভাপতি বিল্লাল গণির ছেলে রাশিদুল ইসলাম ও গোলাম সিদ্দিকের বড় ভাই ইউনুস আলীর পুত্রবধূ নুসরাত জাহানকে। এ ঘটনায় গত ১৯ আগস্ট প্রধান শিক্ষক গোলাম সিদ্দিককে চুয়াডাঙ্গা শহরে ছয় ঘণ্টা আটকে রেখে ৫ লাখ টাকার চেক আদায় করেন কামরুজ্জামান। বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করেছেন সভাপতি বিল্লাল গণি মল্লিক। তিনি বলেন, ওই ঘটনার মিটমাট হওয়ার পর আমার ছেলেকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রসঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, শিক্ষকদের এমপিও এখন ঢাকার শিক্ষা ভবন থেকে দেওয়া হয় না। সব কাজ করে বিভাগীয় আঞ্চলিক অফিস। আমরা খোঁজ পাচ্ছি অঞ্চলগুলোতে দুর্নীতি বেড়েছে। এর জন্য দায়ী উপজেলা অফিস, জেলা শিক্ষা অফিসও। আমাদের কাছে অভিযোগ এলে তদন্ত করে এ দুই শিক্ষকের এমপিও স্থগিত করা হবে।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

চুয়াডাঙ্গা,শিক্ষক
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

ঘটনা পরিক্রমা : শিক্ষক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close