• বুধবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
  • ||

মাদ্রাসায় পড়া ‘সফল’ নারীদের কথা

প্রকাশ:  ২২ জানুয়ারি ২০২১, ১৯:০২
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক

বাংলাদেশে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যে শতকরা ২৫ ভাগের মতো মেয়ে। কিন্তু লেখাপড়া শেষে তাদের জন্য কাজের সুযোগ মাদ্রাসায় পড়া ছেলেদের তুলনায় কম। তবে সীমিত সুযোগ কাজে লাগিয়েই কর্মজীবনে সফল হচ্ছেন অনেকে।

নাশিদ কামাল রাইয়ান পল্লী বিদ্যুতের সহাকারী পরিচালক। পড়েছেন যাত্রাবাড়ির জান্নাতুল বানাত মহিলা মাদ্রাসায়। তিনি সেখান থেকে আলিম পাস করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন। এরপর যোগ দেন সরকারি চাকরিতে। মাদ্রাসায় লেখাপড়ার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “শুরুতে যখন মাদ্রাসায় পড়তাম তখন কেউ কেউ মনে করতেন এখানে লেখাপড়া হয় না। এখানে পড়ে কোনো চাকরি পাওয়া যায় না। কিন্তু পরে তাদের ভুল ধারনা কেটে গেছে।” তিনি জানান, মাদ্রাসায় তার মানসিক বিকাশে কোনো সমস্যা হয়নি। তাদের মাদ্রাসায় গিয়ে তারকা শিল্পীরাও অনুষ্ঠান করেছেন। তিনি নিজেও অনেক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। পেয়েছেন সাফল্য। তার কথা, “সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি আমি মাদ্রাসায় পড়ার কারণে ইসলামি শিক্ষাও পেয়েছি। এটা আমার জীবন গঠনে সহায়তা করেছে। আমি তো মনে করি মাদ্রাসায় পড়ার কারণে আমি অনেক বেশি সহনশীল।”

নাশিদ কামাল রাইয়ান যে মাদ্রাসার পড়েছেন সেই জান্নাতুল বানাত মহিলা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মোহসেনা আক্তার। তার পুরো শিক্ষাই মাদ্রাসায়। আলিম পাসের পর তিনি ইংরেজি অনার্সে ভর্তি হলেও শেষ পর্যন্ত তা না পড়ে মাদ্রাসা থেকেই সর্বোচ্চ কামিল ডিগ্রি নিয়েছেন। সেটা মাস্টার্স সমমান হিসেবে স্বীকৃত। তিনি জানান, তার মাদ্রাসার অনেক মেয়ে সরকারি চাকরি পেয়েছেন। এমবিবিএস ডাক্তারও হয়েছেন। মাদ্রাসার সাবেক ছাত্রী আমেনা খাতুন এখন আসগর আলি হাসপাতালের চিকিৎসক বলেও জানালেন তিনি।

মোহসেনা আক্তার বলেন, “আমাদের মাদ্রাসায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)-র বই ও সিলেবাস অনুসরণ করা হয়। বাংলা, ইংরেজি, বিজ্ঞান সবই পড়ানো হয়। ফলে তারা সবই শিখছে। এসবের পাশাপাশি ইসলামি শিক্ষাও নিচ্ছে। তাছাড়া চাকরির ক্ষেত্রেও তাদের সঙ্গে কোনো বৈষম্য করা হয় না”

নরসিংদির লাখপুর মহিলা দাখিল মাদ্রাসায় ছাত্রীদের জন্য নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়ার সুযোগ রয়েছে। নিয়মিত শরীর চর্চাও করানো হয় সেখানে। শরীর চর্চার জন্য নারী শরীর চর্চা শিক্ষকও আছেন বলে জানান মাদ্রাসাটির অধ্যক্ষ মাওলানা নাজমুল হোসাইন। তিনি বলেন, “এখান থেকে ছাত্রীরা পাস করে কেউ সাধারণ উচ্চশিক্ষা নিচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি চাকরি করছে। অধ্যাপক হয়েছেন, শিক্ষক হয়েছেন। অনেকে নার্স হয়েছেন। একজন দেশের বাইরেও চাকরি পেয়েছেন।” আর মাদ্রাসায় চাকরির বড় একটি সুযোগ আছে সবার। এটা বাড়তি। তিনি জানান, তিনি নিজেই মাদ্রাসার সর্বেচ্চ শিক্ষা নিয়ে আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সে ভর্তি হতে পারেননি। পরে সাধারণ শিক্ষা নিয়ে বিএড ও এমএড করেছেন।

এই যে সাফল্য আর বৈষম্যহীনতার কথা, এগুলো সব আলিয়া ধারার এমপিওভুক্ত মাদ্রাসার। এগুলো পরিচালিত হয় বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে।

মাদ্রাসার দুই ধারা

বাংলাদেশে সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাত্র তিনটি। ১. মাদ্রাসা -ই-আলিয়া, লালবাগ, ঢাকা ২. সিলেট সরকারি কামিল মাদ্রাসা এবং ৩. সরকারি মুস্তাফাবিয়া কামিল মাদ্রাসা, বগুড়া।

এছাড়া আলিয়া ধারায় এমপিওভুক্ত মাদ্রাসাও আছে। তার মধ্যে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানোর এবতেদায়ি মাদ্রাসা আছে তিন হাজার ৪৩৩, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানোর দাখিল মাদ্রাসা ছয় হাজার ৪৯৩, একাদশ ও দ্বাদশ শেণি পর্যন্ত পড়ানোর আলিম মাদ্রাসা এক হাজার ৫৫৮ এবং স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পড়ানোর কামিল মাদ্রাসা ২১৮টি। এই মাদ্রাসাগুলো বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে, অর্থাৎ সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন।

এর বাইরে সারাদেশে ২৫ হাজারের মতো কওমি মাদ্রাসা আছে। এই মাদ্রাসাগুলো পুরোপুরি বেসরকারি। বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া (বেফাক)-এর অধীনে পরিচালিত হয়। সিলেবাস ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসার। সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

কওমি মাদ্রাসার ছাত্রীদের চাকরির সুযোগ

হাটহাজারীর জামিয়া ইসলামিয়া ওবায়দিয়া নানুপুরি কওমি মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা সালাহউদ্দিন নানুপুরি জানান, সরকার দাওরা হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান দিলেও সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সেই অনুপাতে সুযোগ নেই। কওমি মাদ্রাসা থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা সাধারণত মসজিদ মাদ্রাসায় চাকরি করে। ইমাম হয়, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক হয়। এছাড়া ইসলামিক ফাউন্ডেশনে কিছু চাকরির সুযোগ আছে। তিনি বলেন, কওমি মহিলা মাদ্রাসা আছে। সেখান থেকে যারা পাস করেন তারা মহিলা মাদ্রাসায় চাকরি পান।

কওমি মাদ্রাসাগুলোতে আরবি ও উর্দু পড়ানো হয়। আর কোরআন, হাদিস ও ফিকাহ শাস্ত্রের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি দেয়া হয়। তবে এখন কেউ কেউ একই সঙ্গে সাধারণ শিক্ষাও নেন। তারা ব্যাংকসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানেও চাকরি পান। তবে তাদের সংখ্যা কম বলে জানান তিানি।

হাটহাজারির মেখল এলাকার আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া হামিসুন্নাহ কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা জাকারিয়া নোমান ফয়েজি বলেন, মাদ্রাসা থেকে যে নারীরা পাস করেন, তারা ইমামের চাকরি বা মসজিদে চাকরি পান না। কিন্তু মহিলা মাদ্রাসায় তাদের প্রচুর চাকরি আছে। অনেক মহিলা মাদ্রাসার প্রিন্সিপালই এখন নারী। তিনি দাবি করেন, “কওমি মাদ্রাসা থেকে যারা পাস করেন, ইনশাল্লাহ তারা তাদের লাইনে চাকরি পান। কেউ বেকার নাই।” মাওলানা জাকারিয়া নোমান ফয়েজি আরো বলেন, “কওমি মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা, ইংরেজি, সমাজ বিজ্ঞান, বিজ্ঞান পড়ানো হয়। আর এরপর আমাদের যে বইগুলো আরবি ও উর্দুতে আছে তার মধ্যেই বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান আছে। কওমি মাদ্রাসার পাঠ্যসূচি ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসার। আর শিক্ষা বোর্ড হলো বেফাক।”

বেফাকের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক বলেন, “কওমি মাদ্রাসায় যা পড়ানো হয় সরকার সেই অনুযায়ী চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করছে। কওমি মাদ্রাসায় সর্বোাচ্চ ডিগ্রি নিয়ে সৌদি আরবসহ কিছু মুসলিম দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুযোগ আছে। অনেকে সেখানে শিক্ষকতা করছেন।”

মাদ্রাসায় সহ-শিক্ষা

কওমি মাদ্রাসায় সহ-শিক্ষা না থাকলেও আলিয়া ধারার কোনো কোনো মাদ্রাসায় সহ-শিক্ষা আছে। এরকম একটি মাদ্রাসা গাজীপুরের ‘শ্রীপুর বাংলাহাটি কামিল মাদ্রাসা’। ১৯৪৯ সালে মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯১ সাল থেকে সহশিক্ষা শুরু হয় সেখানে। সেখানে দুই হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে পাঁচশ’রও বেশি মেয়ে। মাদ্রাসাটির প্রিন্সিপাল মাওলানা সাব্বির আহমেদ মমতাজী বলেন, “ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা ভালো করছে। আর তারা পাস করলেই মাদ্রাসায় চাকরি তাদের কনফার্ম। কারণ, ৩০ ভাগ কোটা পূরণ করতে হয়। কিন্তু তারা সাধারণ ও সরকারি চাকরিও পাচ্ছে। বিসিএস পরীক্ষা দিচ্ছে। সরকারি চাকরি পাচ্ছে।”

তিনি বলেন, “সবচেয়ে বড় কথা হলো, মাদ্রাসায় পড়লে মেয়েদের সহজেই বিয়ে হয়ে যায়। অনেকেই মাদ্রাসা পাস করা পরহেজগার পাত্রী পছন্দ করেন। আমার কাছে অনেকেই আসেন পাত্রীর জন্য।”

মাদ্রাসায় সহ-শিক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, শুরুতে অনেকেই মনে করেছিল কোনো সমস্যা হবে। তাই কমন রুমে ছাত্রীরা থাকতো, শিক্ষকদের সাথে ক্লাসে যেতো এবং তার সাথেই আবার কমন রুমে ফিরে যেতো। এখন তারা কমন রুমে নয়, পর্দা মেনে একই ক্লাসে থাকে। কোনো সমস্যা হয় না। তিনি বলেন, “সিলেটের একটি মাদ্রাসায় একটি ক্লাসে গিয়ে দেখি চার জন ছাত্র, ১৭ জন ছাত্রী। ১৭ জন ছাত্রীকে পর্দা দিয়ে আড়াল করা হয়েছে। আমি তখন বললাম চার জন ছাত্রকে তো পর্দার ভিতরে নেয়া সহজ। তাই করো। আসলে সমস্যা আমাদের মনে।”

কওমির বঞ্চনার কথা

কওমি মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা, ইরেজি পড়ানো হলেও তারা দেওবন্দের সিলেবাসই অনুসরণ করতে চান। তার এই শিক্ষার উচ্চ পর্যায়ে আর কিছু অন্তুর্ভুক্ত করতে চান না। তবে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক কায়সার আহমেদ বলেন, তাদের মূল ধারার সাথে সমন্বয় করতে চাইছে সরকার। আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। আর আলিয়া ধারার মাদ্রাসা শিক্ষার মূল ধারার সাথে সমন্বয় হয়ে গেছে। ফলে তারা এখন সাধারণ শিক্ষার মতোই সব সুবিধা পাচ্ছে। সূত্র: ডয়েচে ভেলে।

পূর্বপশ্চিমবিডি/ এনএন

নারী,মাদ্রাসা
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close