• বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০, ৬ কার্তিক ১৪২৭
  • ||

শিক্ষক যেন এক সুউচ্চ মিনার

প্রকাশ:  ০৫ অক্টোবর ২০২০, ১৪:৫৮ | আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২০, ১৫:০০
ফারুক সুমন

শিক্ষক বেঁচে থাকেন শিক্ষার্থীর কর্মপ্রবাহে, জীবন সাধনায়। শিক্ষক যেন এক সুউচ্চ মিনার। যেখানে সত্য ও সুন্দরের দ্যুতি ঠিকরে পড়ে। যেখানে মিশে আছে শ্রদ্ধা-ভক্তি ও ভালোবাসা। যে শিক্ষকের পাঠদান কেবল পরীক্ষায় ভালো নম্বরপ্রাপ্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। যিনি এর বাইরে শিক্ষার্থীকে দেখাতে পারেন শুভ সূর্যোদয়। তিনিই প্রকৃত শিক্ষকের অবয়ব নিয়ে দীর্ঘদিন স্মরণে থাকেন।

আমাদের জীবনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রতিষ্ঠানের বাইরে এমন শিক্ষক নিশ্চয় আছেন। যিনি প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে ব্যক্তিত্ব ও আদর্শের দ্যুতি ছড়িয়ে জীবনের সঠিক পথে ধাবিত করেন। অনুকরণ ও অনুসরণের আসন নিয়ে তিনি অনুক্ষণ অনুভবে থাকেন। জীবনের নানা পর্বে এমন অসংখ্য শিক্ষকের সান্নিধ্য পেয়েছি। আজ ‘শিক্ষক দিবস’। মূলত এই বিশেষ দিনে তাদের স্মৃতিস্মরণে শ্রদ্ধা জানাতে চেয়েছি। এখানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্বের কয়েকজন শিক্ষকের স্মৃতিসান্নিধ্য নিয়ে লেখার প্রয়াস পাব।

বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে সর্বপ্রথম যে শিক্ষকের নামের সঙ্গে পরিচিত হই তিনি অধ্যাপক ড. পৃত্থীলা নাজনীন। সে সময় আমাদের ভর্তি কমিটির প্রধান এবং বিভাগের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। প্রথম বর্ষে ম্যাডাম আমাদের ‘প্রাচীন যুগের বাংলা সাহিত্যে’র কোর্স পড়াতেন। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ পড়ানোর মধ্য দিয়ে ক্লাস শুরু হলো। তিনি আমাদের পদ মুখস্থ করতে দিলেন। এ নিয়ে একটা টিউটোরিয়াল পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা দিলেন। সম্ভবত এটিই ছিল বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম টিউটোরিয়াল। এই পরীক্ষা নিয়ে আমাদের কী প্রস্তুতি! কী উদ্বেগ! এখনো ভুলিনি চর্যাপদের মুখস্থ করা পদাবলি-

‘কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল।/চঞ্চল চিএ পইঠা কাল।/দৃঢ় করিঅ মহাসুহ পরিমাণ।/লুই ভনই গুরু পুচ্ছিঅ জান।’ (চর্যা নং-১; লুইপা)

কিংবা,

‘টালত মোর ঘর নাহি পড়বেশী।/হাড়ীতে ভাত নাহি নিতি আবেশী॥/বেঙ্গসঁ সাপ চঢ়িল জাই।/

দুহিল দুধু কি বেণ্টে সামাই।’ (চর্যা নং-৩৩; ঢে-নপা)

খালেদ হোসাইন স্যার। একজন স্বনামধন্য কবি। শুরু থেকেই শিশুর সারল্যে তাকে দেখি। তিনি কবিতার ক্লাস নিতেন। প্রথম ক্লাসে এসে জানতে চাইলেন আমাদের প্রিয় কবি কে। দু-একজন ছাড়া প্রায় সবাই কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি জসীমউদদীন, কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য, কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, ছড়াকার সুকুমার রায়, কবি বন্দে আলী মিয়ার নাম বলেছি। স্যার মূলত ত্রিশের দশকে আবির্ভূত কবিদের নামও প্রত্যাশা করেছেন। যেমন কবি জীবনানন্দ দাশ, কবি বুদ্ধদেব বসু, কবি অমিয় চক্রবর্তীর। কিন্তু সদ্য কলেজপড়–য়া আমাদের অধিকাংশের কাছে এরা তখনো প্রিয় হয়ে ওঠেননি। কারণ ওই বয়সে কবিতা বলতে আমরা কেবল অন্ত্যমিল যুক্ত পদ্য বুঝি। আমাদের সবার উত্তর শেষে স্যার বললেন, ‘আধুনিক বাংলা কবিতা বুঝতে হলে তোমাদের ত্রিশের দশকের বাংলা কবিতা পড়তে হবে।’ স্যারের মুখে সেদিন সচেতনভাবে ত্রিশের দশকের পঞ্চপা-ব হিসেবে খ্যাত কবিদের সম্পর্কে সবিস্তারে জানলাম, যা এখনো কবিতাচর্চায় উদ্বুদ্ধ করে।

স্যার যখন ক্লাস নিতেন, তখন তার বক্তব্যে শব্দে শব্দে এক ধরনের সাংগীতিক প্রবাহ তৈরি হতো। কীভাবে কবিতার অনাস্বাদিত স্বাদ অনুভব করা যায়, সে সম্পর্কে থাকত জ্ঞানগর্ভ আলোচনা। একজন মহৎ কবির প্রাতিস্বিকতা সুচিহ্নিত করার কৌশল শেখাতেন। সেই প্রথম বর্ষে স্যার সাহিত্যের বিভিন্ন টার্ম আমাদের মুখস্থ করতে দিলেন। কয়েকটি বই পড়ার পরামর্শ দিলেন। বইগুলো হলো- শঙ্খ ঘোষের লেখা ‘নিঃশব্দের তর্জনী’। সৈয়দ শামসুল হকের লেখা ‘মার্জিনে মন্তব্য’। মোহাম্মদ আবদুল কাইউমের লেখা ‘অভিধান’। হায়াৎ মামুদের লেখা ‘বাংলা লেখার নিয়মকানুন’। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘কবিতার ক্লাস’। অশোক মুখোপাধ্যায়ের ‘সমার্থক শব্দকোষ’। তখন মনে হয়েছিল এগুলো পড়ে কী হবে! পরবর্তী সময়ে যতই সাহিত্য নিয়ে পড়েছি, লিখেছি। এই টার্মগুলো ভীষণ রকম কাজে দিয়েছে। এখনো ব্যক্তিগত লেখালেখির ক্ষেত্রে স্যারের আনুকূল্য এবং উৎসাহে প্রণোদিত হই। যে কোনো সাহিত্য আড্ডায় কিংবা অনুষ্ঠানে একজন মহৎ কবির সরাসরি ছাত্র হিসেবে গর্ববোধ করি।

অনিরুদ্ধ কাহালি স্যার একটু অন্যরকম। রাগী রাগী অভিব্যক্তি, হাসেন খুবই কম। প্রথম দিকে স্যারকে রসকষহীন ভেবে আমরা বন্ধুরা বেশ সমালোচনামুখর ছিলাম। তবে দিন যত গত হতে থাকল, ততই আমাদের অনুমান ভুল প্রমাণিত হলো। আসলে স্যার এমনই। গুরুগম্ভীর প্রচ্ছদের আড়ালে স্যার যেন অবারিত আকাশ। প্রথম বর্ষে অনিরুদ্ধ কাহালি স্যার আমাদের ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’ পড়াতেন। ক্লাসে এসে সাহিত্যের ইতিহাসনির্ভর প্রায় ২০টিরও বেশি গ্রন্থতালিকা দিলেন। আমি তখন সেই গ্রন্থতালিকা নিয়ে বোকার মতো বিরাট কাজ করে ফেললাম। সেদিনই ক্লাস শেষে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকাগামী আড়াইটার বাসে চড়ে বসলাম। ঢাকার কাপ্তানবাজারে মামার হার্ডওয়্যার দোকানে গিয়ে বইকেনার জন্য ২ হাজার টাকা নিলাম। সেখান থেকে সোজা নীলক্ষেত বইয়ের দোকানে হাজির হলাম। বইয়ের দোকানের নাম ‘কল্লোল’ ও ‘সংলাপ’। প্রায় ৮-১০টি সাহিত্যের ইতিহাসনির্ভর বই কিনে হলে ফিরলাম। পরে বুঝলাম, কেনা সবগুলো বই মাত্র একটা কোর্সের জন্য। হায়রে, মাত্র একটা কোর্সের বই কিনেই আমার টাকা শেষ! অবশ্য পুনরায় নীলক্ষেত গিয়ে দোকানের মালিকের কাছে অনুনয়-বিনয় করে সেই বই থেকে কিছু বই ফেরত দিয়ে অন্য কোর্সের বই নিয়েছি। বাংলা কথাসাহিত্য সম্পর্কে স্যারের রয়েছে নিবিড় অভিনিবেশ।

অধ্যাপক এএসএম আবু দায়েন স্যার। দেখা হলেই মুচকি হাসি দিয়ে কুশলাদি জিজ্ঞেস করতেন। ‘ম্যাগনাম ওপাস’ সম্পর্কে প্রথম স্যারের কাছে ধারণা পেয়েছি। স্যারের সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি। কারণ পরবর্তী সময়ে তিনি আমার এমফিল গবেষণার তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে ছিলেন। একদিকে লেখালেখির উদগ্র বাসনা, অন্যদিকে চাকরিজনিত হতাশায় এমফিল গবেষণার হাল প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। কিন্তু স্যার একেবারেই নাছোড়বান্দা। স্বপ্রণোদিত হয়ে একজন অভিভাবকের আন্তরিকতায় আমাকে উদ্বুদ্ধ করলেন। শেষ পর্যন্ত আমি সফল হয়েছি। এখনো লেখালেখি কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে স্যারের সুপরামর্শ এবং আশীর্বাদপুষ্ট হই।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষের দিকে বেশ কয়েকজন নতুন শিক্ষক বিভাগে যোগদান করলেন। তারা হলেন- নাহিদ হক ম্যাডাম, সোহানা ম্যাডাম, শামীমা সুলতানা লাকী ম্যাডাম, ফারহানা ম্যাডাম, সুমন সাজ্জাদ স্যার এবং হিমেল বরকত স্যার। তাদের নিয়েও অনেক স্মৃতি আছে। আগামীতে নিশ্চয় তাদের নিয়েও লিখব। এই লেখা মূলত স্মৃতিপথ ধরে গুরুজনের আশ্রমে বেড়িয়ে আসার বাসনামাত্র। গুরু তোমার চরণধূলি দিও আমার গায়।

লেখক: শিক্ষক, কবি ও প্রাবন্ধিক

পূর্বপশ্চিমবিডি/জেডআই

শিক্ষক
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

ঘটনা পরিক্রমা : শিক্ষক

cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close