• সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ১১ কার্তিক ১৪২৭
  • ||

বিশ্ব শিক্ষক দিবস

শিক্ষকদের যে অঙ্গীকার করতে হবে

প্রকাশ:  ০৫ অক্টোবর ২০২০, ১২:১০
মাছুম বিল্লাহ

১৯৯৪ সাল থেকে ইউনেস্কোর উদ্যোগে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়ে আসছে। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নের মাধ্যমে তাদের যথাযথ সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করা। এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘Teachers: Leading in crisis, reimagining the future’। সংকটকালে বা সংকটের মধ্যে শিক্ষকদেরকেই নেতৃত্ব দিতে হবে, নতুন করে ভাবতে হবে, দিকনির্দেশনা দিতে হবে, নতুন করে কল্পনা করতে হবে কীভাবে শিক্ষাকে এগিয়ে নেয়া যায় সামনের দিনগুলোয়। চমত্কার প্রতিপাদ্য। মূলত শিক্ষকরাই যেকোনোভাবেই হোক সমাজের অভিভাবক। গোটা পৃথিবীতে এ সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই মূলত প্রতি বছর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন করা হয়।

শিক্ষকদের জীবনে অর্থনৈতিক জৌলুস নেই কিন্তু মনে শান্তি আছে। প্রচুর ধন-সম্পত্তি নেই কিন্তু দুনিয়াজোড়া শিক্ষার্থী আছে, রাস্তার দুই ধারে দাঁড়িয়ে পতাকা হাতে নিয়ে তাদের জন্য মেকি সম্মান প্রদর্শনের মহড়া নেই কিন্তু অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে মানুষ হাত উঁচিয়ে সালাম দেয়। আমার বাবা ছিলেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। একবার ছোট বয়সে গ্রামের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম বাবার সঙ্গে। অনেক দূরে দেখলাম এক লোক সাইকেল চালিয়ে আসছেন। দূর থেকেই হঠাৎ সাইকেল থেকে নেমে মাথা নিচু করে বাবাকে সালাম দিয়ে পেছনে অনেক দূর সাইকেল হাতে চালিয়ে নিয়ে তারপর সাইকেলে উঠলেন। আমি বিষয়টি বুঝতে পারিনি। পরে অন্যদের সঙ্গে আলাপ করে জানলাম শিক্ষকের সামনে দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যাওয়া এক ধরনের বেয়াদবি, যা ওই যুগের মানুষ খুব ভালোভাবে মানত। যখন উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে বরিশাল বিএম কলেজে পড়ি তখন আমাদের বায়োলজি স্যারের সঙ্গে আমরা কয়েকজন দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম, তখন এক ছাত্র দ্রুত সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ এক ছাত্র নেতা সাইকেল থামিয়ে বললেন, ‘বেয়াদব, সাইকেল থেকে নাম।’ তিনি নেমে সাইকেল হাতে চালিয়ে অনেক দূর গেলেন। তখন আমার সেই ছোট সময়ের ঘটনাটি মনে পড়ে গেল। স্কুল থেকে কলেজে এসেছি, এর মধ্যেই ওই সম্মানের বিষয়টি অনেকটাই উবে গেছে।

শিক্ষকদের মর্যাদার জায়গাটি কোথায়? কেউ বলেন, এ মর্যাদা রাষ্ট্র থেকে দিতে হবে। আবার কেউ বলেন, এ মর্যাদা নিজেকে অর্জন করে নিতে হবে। আমি শিক্ষক প্রশিক্ষণে গেলে কিছু শিক্ষক আমাকে প্রায়ই প্রশ্ন করতেন, ‘স্যার, সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ বড় নাকি ডিসি বড়?’ এ প্রশ্নের উত্তর আমাকে খুব টেকনিক্যালি দিতে হতো। আমি বলতাম, যদি অধ্যক্ষ স্যারকে কটাক্ষ করে কেউ কিছু বলেন তাহলে দেখবেন যে শত শত এমনকি হাজার হাজার ছাত্র রাস্তায় নেমে গেছে সেই বক্তাকে শাস্তির আওতায় আনার জন্য এবং বক্তব্য তুলে নেয়ার জন্য। ডিসিকে কেউ কিছু বললে শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্ত রাস্তায় নেমে আসে না, তবে তার যে নির্বাহী ক্ষমতা আছে তা প্রয়োগ করে এবং রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় তিনি অনেক পুলিশ রাস্তায় পাঠিয়ে তার বিরুদ্ধে যে বা যারা কিছু বলেছেন, তাদের অ্যারেস্ট করাতে পারেন। কাজেই কে বড়, সেটি ওভাবে বিচার করা মুশকিল। তবে রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদার দিক দিয়েও ডিসি হচ্ছেন ডেপুটি সেক্রেটারি, যা একজন ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষের চেয়ে ওপরে। আবার বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ যদিও একজন প্রফেসর, তার কিন্তু ডিসির মতো এত শান-শওকত নেই, গাড়ি নেই। শিক্ষকের জায়গাটি আলাদা। এটি ওই বস্তুগত বিষয় দিয়ে বিচার করা কঠিন।

পৃথিবীর অনেক দেশই জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগিয়েছে অনেক, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধিশালীও হয়েছে কিন্তু শিক্ষকদের এবং শিক্ষার বিষয়টিকে সেভাবে মূল্যায়ন করতে পারেনি। খুব কমসংখ্যক দেশে শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা হয়। ওইসব দেশে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াও ভিন্ন, যে কেউ ইচ্ছে করলেই শিক্ষক হতে পারেন না। অনেক দেশ ওইসব দেশের মতো শিক্ষকদের মান-মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় সুবিধা দাবি করে কিন্তু গ্যাপটি পূরণ করার কথা বলেন না। শিক্ষকের পদমর্যাদা বাড়ানোর জন্য রাষ্ট্রীয় তরফে শিক্ষকদের সঠিক প্রতিনিধি থাকতে হয় তাহলে কাজ কিছুটা সহজ হয়। রাজনীতিবিদ যারা নির্বাচিত হয়ে দেশের আইনকানুন তৈরি করেন, তারা তো স্বভাবতই নিজেদের সম্মানের জায়গাটি ধরে রাখা এবং পাকাপোক্ত করার জন্য চেষ্টা করবেন, তারা শিক্ষকদের জন্য করতে যাবেন কেন? তাদের ভাবনাটা হচ্ছে, দেশকে তো আমরা পরিচালিত করি, অতএব, সর্বত্র আমাদেরই প্রতিনিধিত্ব ও প্রভুত্ব থাকতে হবে। শিক্ষকরা তো শুধু বই পড়ান, তারা কেন এত ওপরে থাকতে যাবেন? আর শিক্ষকরাও সে ধরনের উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারেননি, অনন্য দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া। আমরা জানি, অনেক দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বিদেশী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করতে পারেন, বৃত্তি প্রদানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি রাষ্ট্রকে সুপারিশ করতে পারেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্র সেটিকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে বিদেশী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেয়। আমাদের দেশে এটি সম্ভব? আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এ সম্মান অর্জন করতে পারেননি। আমি সর্বশেষ একটি উদাহরণ দিতে পারি। আমাদের দেশ থেকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষার্থীকে ফ্রান্সের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উচ্চশিক্ষার জন্য সুপারিশ করেছেন, রাষ্ট্র থেকে তাদের বৃত্তি দেয়া হয়েছে এবং এই কভিড-১৯ অবস্থার মধ্যেই তাদের সবকিছু সম্পন্ন হয়েছে কিন্তু দুটি পরীক্ষা বাকি থাকায় পুরো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদ্বয়কে ফ্রান্সে যেতে সহায়তা করতে পারেনি। তারা অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছে। শিক্ষার্থীদ্বয় শেষ পর্যন্ত সচিব ও মন্ত্রীর দ্বারস্থ হয়েছেন, তাদেরকে বুঝিয়েছেন যে তারা ওই পরীক্ষা দুটো ওখানে গিয়ে অনলাইনে অনায়াসে দিতে পারবেন। মন্ত্রী হস্তক্ষেপ করায় শিক্ষার্থীদ্বয় সেখানে গেছেন এবং ক্লাস শুরু করেছেন। এই হচ্ছে তফাত আমাদের দেশের শিক্ষক ও অন্যান্য দেশের শিক্ষকদের মধ্যে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের কথা বলি, শিক্ষকদের সামর্থ্য থাকলেও তো তারা শুভ কাজে তা প্রয়োগ করতে পারেন না। আর এই উদাহরণই বলে দেয় যে তারা স্বায়ত্তশাসন ভোগ করার উপযুক্ততা অর্জন করেননি। এটি পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার দীনতা।

বাংলাদেশের শিক্ষকদের মুক্তি কিসে? শিক্ষাকে জাতীয়করণ করা হলেই সব শিক্ষক তাদের সম্মানের জায়গায় অধিষ্ঠিত হতে পারবেন? অর্থনৈতিক মুক্তিও অনেকটাই নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে তারা এটি চাইছেন। যেভাবে তথাকথিত প্রতিষ্ঠান কমিটি, সভাপতি শিক্ষকদের ওপর, প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষদের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেন, সেটির বিচারে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সবাই চাইবেন যে এসব কমিটির হাতে যাতে শিক্ষার মতো মহান দায়িত্ব অর্পণ করা না হয়। কিন্তু কায়েমি স্বার্থের তাগিদে সেটিই যেন চলছে।

আমাদের দেশের পুরো শিক্ষাকে জাতীয়করণ করা হলে যে চিন্তাটি মাথায় আসে, সেটি হচ্ছে শিক্ষার মহান দায়িত্ব যাতে শুধু স্বেচ্ছাচারী প্রতিষ্ঠানপ্রধান কিংবা লোভী ও অনৈতিক কিছু শিক্ষক আছেন, যাদের হাতে পড়লে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কী হবে? জোর করে তাদের প্রাইভেট পড়তে হবে, শিক্ষকদের কথা না শুনলে নিরীহ শিক্ষার্থীদের ওপর নেমে আসবে খড়্গহস্ত। অভিভাবক যদি হন নিরীহ ও অসহায় তাহলে তো গোটা জীবনই হবে দুর্বিষহ। এ ধরনের ইতিহাসও তো কম নেই দেশে। তাহলে উপায় কী? একতরফা ক্ষমতা যাদের ওপরই অর্পণ করা হবে তারাই সেটির অপব্যবহার করবেন। রাষ্ট্রীয় তরফ থেকে একটি ভারসাম্যমূলক ব্যবস্থা না থাকলে একতরফা ব্যবস্থা কারোর জন্যই অবিমিশ্র আশীর্বাদ হবে না। অর্থাৎ আমাদের দেশে এখনো যে প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ হন এবং যারা এই পেশায় প্রবেশ করেন, তাদের মধ্যে সবাইকেই আমরা প্রকৃত শিক্ষক হিসেবে পাই না। পেশাগত উন্নয়নের বিষয়টি জীবনব্যাপী। ব্যতিক্রম ছাড়া তো অনেক শিক্ষকের ভেতর এ ধরনের তাড়না দেখাই যায় না। নিজের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য, শিক্ষার্থীদের আনন্দদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য দুনিয়ার অন্যান্য দেশে কী হচ্ছে, আধুনিক শিক্ষা মতবাদ কী কী চালু রয়েছে, আবিষ্কৃত হয়েছে, এগুলো জানার জন্য অনন্য ব্যতিক্রমধর্মী দু-চারজন শিক্ষক ছাড়া বাকিদের কাছে এসব বিষয় নিছক তুচ্ছ কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত। তার মধ্যে কিছু শিক্ষককে দেখেছি অনেক বাধা-বিপত্তি ও প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও উন্নত বিশ্বের অনুকরণে নিজেদের প্রচেষ্টায় এই করোনাকালে শিক্ষার্থীদের জন্য, নিজেদের পেশাগত উন্নয়নের জন্য, দেশের শিক্ষার জন্য ম্যাটেরিয়ালস তৈরি করে ক্লাস করাচ্ছেন, শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছেন। তারাই কিন্তু প্রকৃত শিক্ষক। শিক্ষক নেতাদের মধ্যে একাডেমিক কোনো বিষয়ই গুরুত্ব পায় না। দেশে যে দু-চারটি অনলাইন শিক্ষা পত্রিকা বা পোর্টাল আছে, সেগুলো খুললেই দেখা যায় শিক্ষকদের শুধু আর্থিক লাভের বিষয় ছাড়া শিক্ষক নেতাদের সেখানে আর কিছু লেখেন না, বলেন না। শুধু বেতন বৃদ্ধি, চাকরি জাতীয়করণ আর রাষ্ট্র থেকে শিক্ষকদের সম্মান দিতে হবে ইত্যাদি। শুধু আর্থিক লাভের বিষয় বিভিন্নভাবে সেখানে উপস্থাপিত হয়। সেগুলো আবার শিক্ষাবিদদের কলামে লেখা হয়! তখন আরো অবাক হয়ে যেতে হয় যে শিক্ষকদের অর্থনৈতিক ও বৈষয়িক দাবিদাওয়া আদায়ের কথা ছাড়া কি শিক্ষক নেতাদের আর কোনো কথা থাকে না? দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষায় পাঠদানরত শিক্ষকদের মানের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ রয়েছে বহুবছর ধরেই। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের এক গবেষণায় দেখা যায়, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কোর্স পাস করে বের হওয়া শিক্ষার্থীদের ৯২ শতাংশই তাদের শিক্ষকদের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সাধারণ শিক্ষায় এ নিয়ে কোনো গবেষণার কথা শোনা যায়নি, তবে অবস্থা এর চেয়ে খুব একটা বেশি হেরফের হবে বলে মনে হয় না। বিষয়টি আজকের দিনে আমাদের মনে রাখতে হবে। আমরা যাদের জন্য, যে প্রজন্মকে আমরা শিক্ষিত করব, তাদের সন্তুষ্টির বিষয়টি অধিকতর গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে এবং নিজেদের সেভাবে প্রস্তুত করতে হবে।

মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক

আরো পড়ুন:

শিক্ষকতার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্যের প্রাসঙ্গিকতা

শিক্ষকদের প্রত্যাশা পূরণ করুন

সংকটে নেতৃত্বদাতা ও ভবিষ্যদ্দ্রষ্টা শিক্ষক


পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএম

মাছুম বিল্লাহ,শিক্ষক
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

ঘটনা পরিক্রমা : শিক্ষক

cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close