• সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ১১ কার্তিক ১৪২৭
  • ||

সংকটে নেতৃত্বদাতা ও ভবিষ্যদ্দ্রষ্টা শিক্ষক

প্রকাশ:  ০৫ অক্টোবর ২০২০, ১২:০১
অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ

আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস। বাংলাদেশের মহান স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ ও বাঙালির জীবনধারায় সমাজ সংস্কারসহ প্রগতির অন্যতম পুরোধা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মদ্বিশতবার্ষিকী উদ্যাপন ও বিশ্বগ্রাসী মহামারি করোনার মতো অভাবিত দুর্যোগের পটভূমিতে দেশে দেশে শিক্ষকরা আজ দিবসটি পালন করছেন। অবশ্য ভারতসহ কয়েকটি দেশে অন্য দিনে দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে। ভারতে দিনটি পালিত হয় এক মাস আগে রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধা কৃষ্ণের জন্মদিন ৫ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশে জাতীয় বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদ্যাপন কমিটি কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী শিক্ষকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দিনটিতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো ও শিক্ষক প্রতিনিধিদের নিয়ে বিকেলে এক জাতীয় ভার্চুয়াল মতবিনিময়সভার আয়োজন করেছে।

বিশ্ব শিক্ষক দিবস ৫ অক্টোবর কেন?

১৯৯৪ সালে ইউনেসকোর ২৬তম সাধারণ অধিবেশনে তত্কালীন মহাপরিচালক ফেডোরিকো মেয়রের প্রস্তাবক্রমে ১৯৬৬ সালে ইউনেসকোর উদ্যোগে প্যারিসে ৫ অক্টোবর বিভিন্ন রাষ্ট্রের সরকারগুলোর সভায় শিক্ষকদের অধিকার, মর্যাদা ও করণীয় সম্পর্কে গৃহীত ও পরবর্তী সময়ে আইএলও কর্তৃক অনুমোদিত সুপারিশগুলো চিরস্মরণীয় করে রাখার উদ্দেশ্যে ৫ অক্টোবর ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৯৪ সাল থেকেই দিবসটি উদ্যাপন শুরু হয়। তবে ১৯৬৬ সালের ১৪৫ ধারাসংবলিত সুপারিশমালার মধ্যে নার্সারি, কিন্ডারগার্টেন, প্রাথমিক, কারিগরি, বৃত্তিমূলক, চারুকলাসহ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত পাঠদানকারী সব সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকের কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হলেও উচ্চতর শিক্ষাদানে নিয়োজিত শিক্ষকদের কথা সুনির্দিষ্ট উল্লেখ না থাকায় ১৯৯৭ সালের ১৫ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর প্যারিসে ইউনেসকোর এক বিশেষ অধিবেশনে উচ্চতর শিক্ষাদানকারী শিক্ষকদের মর্যাদাসংক্রান্ত সুপারিশ যুক্ত করা হয়। সিদ্ধান্ত হয় যে ১৯৯৬ ও ১৯৯৭ সালে গৃহীত উভয় সুপারিশমালাই ‘শিক্ষকদের মর্যাদা সনদ’ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং বিশ্বব্যাপী সর্বস্তরের শিক্ষকরা ওই সনদের স্মারক দিবস হিসেবে ৫ অক্টোবর প্রতিবছর ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ পালন করবেন। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ছয় কোটি শিক্ষক বর্তমানে দিবসটি পালন করে থাকেন।

ছয়টি উল্লেখযোগ্য বিষয়

উল্লেখ্য, শিক্ষকদের ‘মর্যাদা সনদ’ হিসেবে ইউনেসকো-আইএলও সুপারিশকৃত বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে—১. সামগ্রিক জনস্বার্থে যেহেতু শিক্ষা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সেহেতু শিক্ষাকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে স্বীকার করতে হবে। যেহেতু শিক্ষা অর্থনৈতিক উন্নতির অপরিহার্য উপাদান, সেহেতু শিক্ষা পরিকল্পনা সমগ্র অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ২. কোনো একতরফা সিদ্ধান্ত দ্বারা শিক্ষকদের পেশাজীবন ও অবস্থান যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তার পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পেশাগত অসদাচরণের জন্য কোনো শিক্ষকের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ প্রযোজ্য বলে বিবেচিত হলে অসদাচরণের সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট উল্লেখ নিশ্চিত করতে হবে। ৩. কারো সম্পর্কে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয় স্থিরকৃত হলে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্ধারিত কর্তৃপক্ষকে শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। ৪. পেশাগত দায়িত্ব পালনে শিক্ষকদের পর্যাপ্ত স্বাধীনতা থাকতে হবে। ৫. শিক্ষকরা এবং সংগঠনগুলো যৌথভাবে নতুন শিক্ষাক্রম, পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষা উপকরণের উন্নয়ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করবে। ৬. ‘একজন শিক্ষকের প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে কত ঘণ্টা কাজ করা প্রয়োজন, তা শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে নির্ধারিত হওয়া উচিত। শিক্ষকদের বেতন এমন হওয়া উচিত, যা সমাজে শিক্ষকতা পেশার গুরুত্ব ও মর্যাদাকে তুলে ধরে।

শিক্ষকরা কতটা অধিকার ও করণীয় সচেতন?

১৯৯৪ সালে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অন্যতম কারণ ছিল ১৯৬৬ সালের ইউনেসকো-আইএলও সুপারিশকৃত শিক্ষকদের অধিকার, করণীয় ও মর্যাদা সংক্রান্ত বিষয়গুলোর দিকে শিক্ষক, অভিভাবক, নীতি প্রণেতা, প্রশাসন—সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা। কিন্তু যাঁদের জন্য এসব সুপারিশ, তাঁরা কতজন এ বিষয়ে অবগত? এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল এ নিয়ে বিভিন্ন দেশে একাধিক জরিপ চালিয়েছে। এতে দেখা যায়, ৭৫ শতাংশ শিক্ষক সংগঠনের সদস্যরা জানলেও ১০ শতাংশ শিক্ষকের এগুলো সম্পর্কে ভালো ধারণা নেই। অন্যদিকে ১০ শতাংশ শিক্ষক আদৌ অবহিত নন যে তাঁদের জন্য এ ধরনের নীতিমালা বা গুচ্ছ সুপারিশ রয়েছে।

বাংলাদেশের শিক্ষকদের অবস্থা

কেমন আছেন বাংলাদেশের শিক্ষকরা? প্রাথমিক বাদ দিলে পরবর্তী শিক্ষাস্তরগুলোর ৯০ শতাংশের বেশি বেসরকারি। সেখানে পাঠরত শিক্ষার্থী ও কর্মরত শিক্ষক উভয়ই বৈষম্য-বঞ্চনার শিকার। সরকার আসে, সরকার যায়; কিন্তু অবস্থার মৌলিক পরিবর্তন হয় না। তার পরও এ কথা স্বীকার করতে হবে, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত যেটুকু ইতিবাচক অর্জন তার বেশির ভাগই শেখ হাসিনার হাত দিয়ে হয়েছে। তবে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বিধ্বস্ত বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু স্বাধীন দেশের উপযোগী শিক্ষানীতি (কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট) দিয়েই ক্ষান্ত থাকেননি। তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা-নির্দেশনাও দিয়ে যান। কিন্তু তাঁকে হত্যার পর ক্ষমতাসীন সরকারগুলো শিক্ষায় মৌলিক কোনো পরিবর্তনে হাত দেয়নি। কিছু তাত্ক্ষণিক বা অ্যাডহক সিদ্ধান্ত নিয়ে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতেই তাদের দেখা গেছে। সে জন্য প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারীকরণের পুরোটাই হয়েছে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার হাত দিয়ে। শিক্ষা কারিকুলামে পরিবর্তন, তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার, মূল্যায়ন ব্যবস্থায় পরিবর্তন, সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে সঙ্গে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মূল বেতন বৃদ্ধি তার অন্যতম। তার পরও কথা থাকে। যেহেতু আজ দিনটি শিক্ষকদের জন্য নির্ধারিত একটি আন্তর্জাতিক দিবস, সে জন্য কিছু কথা বলা দরকার। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে বড় পদোন্নতি হলেও বেসরকারি কলেজ শিক্ষকদের পদোন্নতির হাল আগে যে তিমিরে ছিল, এখনো সে তিমিরেই। সহকারী অধ্যাপকের পদই সেখানে শেষ কথা। সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদ সৃষ্টি হয়নি। এমনকি এমপিওভুক্ত বেসরকারি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষরা যথাক্রমে সরকারি কলেজের অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকের মূল বেতন পেলেও তাঁদের অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যথাযথ পদায়ন করা হয়নি। ১৯৯৪ সালে জমির উদ্দিন সরকার শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালে বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের বেতন অন্যায়ভাবে সরকারি প্রধান শিক্ষকদের এক ধাপ নিচে মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়। এ বঞ্চনার এখনো অবসান হয়নি। অথচ প্রাথমিক, পরবর্তী সময়ে বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষকরাই দেশে শিক্ষার ৯০ শতাংশের বেশি দায়িত্ব পালন করে থাকেন। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গবেষণা কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। ৬৬ হাজার কিন্ডারগার্টেনে কর্মরত ১০ লাখের কাছাকাছি শিক্ষক করোনাকালে প্রতিষ্ঠান ও পেশার অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে। পদোন্নতির প্রশ্ন সেখানে বাস্তবেই অপ্রাসঙ্গিক। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় স্থায়ী শিক্ষক জনবল নেই। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সুপারিশ দেওয়ার বিধান আছে। সুপারিশ কার্যকরের ক্ষমতা নেই।

এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের ২০ লাখের কাছাকাছি শিক্ষকের জীবনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২০ কী বার্তা এনেছে? তাঁদের মতামত কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে? তাঁরা কি করোনার মতো সংকটকালে নেতৃত্ব দিতে ও শিক্ষার ভিত্তিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টিতে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারছেন? কিভাবে তাঁরা এই দিনটি পালন করছেন? বঞ্চনা বুকে পুষে না রেখে তা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে, আত্মানুসন্ধানে ভর করে এবং আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংহতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তাঁরা কি সংগঠিত, সুচিন্তিত পদক্ষেপ নিতে পারবেন? ভবিষ্যতের দিনগুলোতে তার সদুত্তর পাওয়া দরকার।

লেখক : বিশ্ব শিক্ষক দিবস জাতীয় উদ্যাপন কমিটির সমন্বয়ক ও জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন কমিটির সদস্য

[email protected]


পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএম

অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ,শিক্ষক
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

ঘটনা পরিক্রমা : শিক্ষক

cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close