• বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৯ আশ্বিন ১৪২৭
  • ||

এমপিও ও শিক্ষা বিষয়ক নীতিমালা সংশোধনের ক্ষেত্রে কিছু প্রস্তাবনা

প্রকাশ:  ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৬:৪৮
মোহাম্মদ হেদায়েত উল্যাহ
ফাইল ছবি

আর্থ-সামাজিক অন্যান্য ক্ষেত্রের ন্যায় শিক্ষা ক্ষেত্রে যে বাংলাদেশের অর্জন বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে কারো দ্বিমত থাকার কথা না। শিক্ষার হার যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে তেমনি উচ্চ শিক্ষিত মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে ক্রমান্বয়ে। একইভাবে শিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহও বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রথাগত ও ভ্রান্ত ধারণার পরিবর্ততে আধুনিক ও বিজ্ঞান মনস্ক ধ্যানধারণা গড়ে উঠছে। নারী শিক্ষার অগ্রগতি যে কোন দেশের অর্জনকে ছাড়িয়ে গেছে বহু আগে।

তবে শিক্ষা ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান অগ্রগতির মূল চালিকা শক্তি যে শিক্ষক সমাজ তা জোর দিয়ে বলা যায়। শিক্ষকদের বৃহৎ অংশই বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। দেশের নব্বই ভাগেরও বেশি শিক্ষার্থী বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করে। এই বিবেচনায় বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকরা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল চালিকা শক্তি। তাই বেসরকারি শিক্ষকদের যথাযথ উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন ছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।

বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বর্তমান সরকারের অনেক উদ্যোগ সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। এনটিআরসিএ এর মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীয়ভাবে মেধাক্রম অনুসারে নিয়োগ প্রক্রিয়া অবশ্য একটি সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।

সাম্প্রতিক সময়ের সারা দেশের স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে সবার প্রশংসা কুড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ভবিষ্যতে নিবন্ধন পরীক্ষায় লিখিত পরীক্ষার সাথে একাডেমিক ফলাফলের গুরুত্ব দিয়ে মেধাক্রম তৈরির বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে তাতে মেধাক্রম আরো যথার্থ হবে। এন্টি লেভেলে সকল পদে সরকারিভাবে শিক্ষক নিয়োগের কথা থাকলেও নন-এমপিও পদে অনেক প্রতিষ্ঠান নিজেরা নিয়োগ দিচ্ছে ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে যোগ্য প্রাথী তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে যা মোটেও কাম্য নয়।

তবে ভবিষ্যতে জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০১০ এর ঘোষণা মতে শিক্ষক সমাজের দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রত্যাশা অনুযায়ী বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য মেধাভিত্তিক ও উপযুক্ত শিক্ষক নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকারি কর্ম কমিশনের অনুরূপ একটি বেসরকারি শিক্ষক নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে বলে আমাদের আশা। কেননা শিক্ষা মন্ত্রী মহোদয় শিক্ষা নীতি সংশোধনের আভাস দিয়েছেন। এটি বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সরকারের আন্তরিকতারই বহিঃপ্রকাশ।

সরকারিভাবে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। পরিচালনা পরিষদের পরিবর্তে সময় ও বাস্তবতার আলোকে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণ, তদারকি ও পরিচালয়ায় নিয়ে আসা যায় কিনা তাও বিবেচনার বিষয়। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে নেয়া পদক্ষেপগুলো সঠিক ও নির্মোহভাবে বাস্তবায়ন হলে অবশ্যয় বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে নানা ধরনের উদ্যোগ, আইন ও নির্দেশনা প্রণয়ন হচ্ছে। সম্প্রতি মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী ডিগ্রি কলেজের সভাপতির পদেও মাননীয় সংসদ সদস্যদের না থাকার বিষয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বিধি জারি করেছে। একই সাথে দুই বারের বেশি কেউ পরিচালনা পরিষদের সদস্য না থাকার মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনাটিও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

কেননা অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রতিষ্ঠান প্রধানরা তাদের সহায়ক শক্তি হিসেবে বছরের পর বছর একই ব্যক্তিদের সদস্য হিসেবে রাখার প্রচেষ্টা চালায় যারা বন্ধু-বান্ধব বা পরিচিতজনদের মধ্যে হয়ে থাকে। একইভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে, ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে কিংবা নানা কলা-কৌশল অবলম্বন করে নিজের পছন্দমত শিক্ষক প্রতিনিধিও নির্বাচন করে।

এই ধরনের কাঠামোতে প্রতিষ্ঠান প্রধানরা স্বৈরাচারী ও দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে উঠে যা শিক্ষক-শিক্ষার্থী তথা গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য হুমকি। এর মধ্যে থেকে কেউ নিয়মের বিষয়ে বললে তাকে উল্টো হয়রানী হতে হয়। তাই এ ধরনের ব্যবস্থার বাস্তবতা অনুধাবন করে প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালা সংশোধনও সময়ের দাবি।

সরকার শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। ২০১৮ সালে প্রণীত এমপিও নীতিমালা সংশোধনের জন্য দীর্ঘ দিন ধরে কাজ চলছে। সংশোধনের জন্য গঠিত কমিটি নানা বিষয় যাচাই-বাচাই ও আলোচনা-পর্যালোচনা করছে বলে জানা গেছে। এ লক্ষ্যে গত ১ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী মহোদয়ের উপস্থিতিতে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে পত্রিকার মাধ্যমে জানা যায়।

কমিটির বৈঠকে প্রস্তবনাসমূহের মধ্যে অনুপাত প্রথা বালিত করে ১০ বছর পূর্তি হলে প্রভাষকদের একশ নম্বর যোগ্যতা সূচকের ভিত্তিতে সহকারী অধ্যাপক পদে পদন্নোতি দেয়ার প্রস্তাব আসে। একই সাথে অনার্স-মাস্টার্স কলেজে সহযোগী অধ্যাপকের পদ সৃষ্টির বিষয় বিবেচনা করা হচ্ছে। অনুপাত প্রথা বাতিলের বিষয়টি শিক্ষকদের বহু বছরের দাবি। অনুপাত প্রথার জন্য একজন শিক্ষক প্রভাষক পদে যোগদান করলে তিনি বিশ/পঁচিশ বছর চাকরি করলেও সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান না আর সহযোগী অধ্যাপক কিংবা অধ্যাপকের পদতো শুধুই স্বপ্ন যার বাস্তবতা নেই। বছরের পর বছর একই পদে থাকতে থাকতে অনেকে যে আগ্রহ ও উৎসাহ নিয়ে শিক্ষকতা পেশায় আসে তা হারিয়ে ফেলে। অনুপাত প্রথা বাতিল করে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, উচ্চতর ডিগ্রি ও গবেষণাকে গুরুত্ব দিয়ে পদোন্নতির ব্যবস্থা করার বিষয়টি একটি কাঙ্ক্ষিত ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ।

পদোন্নতির ক্ষেত্রে যেসব সূচকের বিষয়ে শুনা যাচ্ছে তার মধ্যে উচ্চতর ডিগ্রি, গবেষণা, প্রশিক্ষণ, প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত হাজিরা, এসিআর অন্যতম। এক্ষেত্রে বিষয়গুলো অবশ্যয় যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত। এখানে শিক্ষকদের একাডেমিক যোগ্যতাকেও সূচকের অন্তর্ভূক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এসিআরের বিষয়টি নিয়ে আরো পর্যালোচনার দাবি রাখে। সঠিক ও যথাযথভাবে এসিআর প্রনয়ন বাস্তবায়ন ও প্রয়োগ করা গেলে শিক্ষকদের পেশাগত জবাবদিহিতা বাড়ার সাথে দক্ষতা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখবে নিঃসন্দেহে।

কিন্তু বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এসিআর তৈরির ক্ষেত্রেও নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে ধারণা করা যায়। কেননা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা পরিষদ অনেক শক্তিশালী। প্রতিষ্ঠান প্রধানরা অনেক ফাওয়ারফুল। এক্ষেত্রে বাস্তবতা বিবেচনায় না এনে এসিআর চালু শিক্ষকদের উপর অযাচিত হস্তক্ষেপ ও হয়রানীর মাত্রাকে আরো বৃদ্ধি করতে পারে বলে আশঙ্কা অমূলক নয়।

একই সাথে সরকারি কলেজে আর বেসরকারি কলেজের চাকরি বিধিই শুধু ভিন্ন নয় বরং ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, প্রথা এবং কাঠামোও ভিন্ন। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, প্রথা-পরিবেশ ও বাস্তবতা বিবেচনায় এসিআর এখানে কতটুকু সঠিক ও নিরপেক্ষভাবে তৈরি হবে বা করা যাবে তা বলা দুষ্কর। এটি ব্যক্তি, অবস্থান ও নীতি-নৈতিকতা ভেদে কোন কোন প্রতিষ্ঠান প্রধানদের আরো স্বৈরতান্ত্রিক ও দুর্নীতিপরায়ণ করে তুলবে কিনা সেটি বিবেচনায় রাখতে হবে।

এসব বিষয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টা, উদ্যোগ, বাস্তব সিদ্ধান্তই আগামী দিনে আরো যোগ্য ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে উঠার পথকে প্রশস্ত করবে। বঙ্গবন্ধুর কাঙ্ক্ষিত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রকে উম্মুক্ত করবে। দেশের চলমান উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাকে আরো গতিশীল করতে বেসরকারি শিক্ষক ও শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আরো বাস্তবসম্মত ও কাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্ত নেয়া সময়ের দাবি। আমাদের বিশ্বাস কমিটি সব কিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে একটি বাস্তবসম্মত প্রস্তাব উপস্থাপন করবে।

কেননা এর সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে আছে দেশের পাঁচ লক্ষ শিক্ষকের দীর্ঘ দিনের প্রত্যাশা ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে রয়েছে লক্ষ লক্ষ শিক্ষকের ভবিষ্যৎ। একই সাথে দেশের গোটা শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা।

লেখকঃ শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, মহিলা কলেজ চট্টগ্রাম।

পূর্বপশ্চিমবিডি/জেডআই

শিক্ষক
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

ঘটনা পরিক্রমা : শিক্ষক

cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close