• মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২০, ৩০ আষাঢ় ১৪২৭
  • ||

‘ইংরেজিতে ৩৩ পেয়ে পাস, পড়ছি বিশ্ববিদ্যালয়ে’

প্রকাশ:  ০২ জুন ২০২০, ১৮:৪৩
মোবারক হোসেন মোহন

এসএসসির ফল প্রকাশিত হয়েছে। এরই মধ্যে ৯ জন সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থী চলে গেছে এ পৃথিবী ছেড়ে। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় যখন প্রশ্ন ফাঁসের খবর প্রকাশিত হচ্ছে, তখন পিতা-মাতার হাজারো স্বপ্নকে চূর্ণ করে জিপিএ-৫ এর ছলনায় তারা আজ পরাজিত। অথচ জিপিএ-৫ না পেয়েও স্বপ্নের পেছনে ছুঁটে চলা হাজারো সৈনিকের গল্প থেকে যায় গোপনে। সেই স্বপ্নচারী সৈনিকদের মধ্যে একজন আমি।

২০১৬ সাল। যেদিন এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দেয়, সেদিন দুপুরে আমি রেজাল্ট দেখার জন্য আমার স্কুলে যাই। ইতোমধ্যে আমার কাছের তিন বন্ধুই তথাকথিত জিপিএ-৫ পেয়েছে। আমি উৎসাহের সাথে রেজাল্ট দেখতেই আমার সবকিছু যেন এলোমেলো হয়ে গেলো। আমার জিপিএ ছিল ৪.৬৭, যা কিছুতেই আমি মেনে নিতে পারছিলাম না।

বাসার উদ্দেশে যখন রওনা দিলাম, তখন একটাই চিন্তা হচ্ছিল ভালো কলেজে চান্স হবে না! বাসায় এসে যখন সবাইকে জানালাম, তখন আমার স্বপ্ন পূরণের সাথী আমার মা বললেন, সৃষ্টিকর্তা যা করেন ভালোর জন্যই করেন। মা যা বলতেন সবসময় মেনে নিতাম। সৃষ্টিকর্তার রহমতে আমার নিজস্ব জেলায় সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়ায় উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হতে পারি। সেই কলেজে আমার আগে থেকেই পড়ার ইচ্ছা ছিল। যেদিন প্রথম কলেজে ক্লাস করতে যাই, সেদিন একটা শপথ করেছিলাম। যা হয়েছে তা নিয়ে আর ভাববো না, এবার উচ্চমাধ্যমিকে একটা আশানুরূপ ফল করবো এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করবো। কথা মতো নিয়মিত পড়াশুনা করতাম। প্রত্যেকটি বিষয়ে প্রচুর সময় দিতাম। কখনই রেজাল্টের জন্য নয়, জানার জন্য পড়তাম। এভাবেই ঘনিয়ে আসে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা। একের পর এক পরীক্ষা শেষে আফসোস থেকেই যেত আশানুরূপ পরীক্ষা না দেওয়ার জন্য। এভাবেই শেষ হয় আমার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা।

এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কোচিং করার পালা। শুরু হলো কঠোর প্রস্তুতি। তত দিনেও উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্ট পাবলিশ হয়নি। এডমিশন প্রিপারেশন নেওয়ার সময় আমি বুজতে পারি ইংরেজিতে আমার অনেক দুর্বলতা রয়েছে। তাই ইংরেজিতে তখন অনেক সময় দিতাম, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। পাবলিশ হয় উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্ট। রেজাল্টের দিন বাসাতেই পড়ছিলাম। আমার বড়ভাই দুপুরে ফোন দিয়ে আমাকে জানায়, আমি নাকি জিপিএ-৪.০০ সহ ইংরেজিতে ৩৩ পেয়ে পাশ করেছি। মুহূর্তেই সবকিছু তছনছ হয়ে যাচ্ছিল যেন। কোনোভাবেই তখন নিজেকে আমি সামলাতে পারছিলাম না। এত কেঁদেছি, তা বোধ হয় বলার মতো না।

তার এক মাস পরেই শুরু হলো বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা। রেজাল্টের পর থেকেই আর পড়াশুনার ওপর তেমন টান ছিল না। উচ্চমাধ্যমিকে ইংরেজিতে ৩৩ পাওয়ার ফলে বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে পছন্দের ইউনিটে ফর্ম তুলতে পারিনি। একের পর এক পরীক্ষা দিচ্ছিলাম কিন্তু চান্স হচ্ছিল না। এভাবে টানা ৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেওয়ার পরেও সবকটিতে ইংরেজিতে ফেইল হওয়াই সেবারের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব হলো না।

অপ্রত্যাশিতভাবে নিজেকে তখন কোনোভাবেই সামলাতে পারছিলাম না। তখন আমার মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, নিজের ভুলগুলো সুধরে আবার নতুন করে প্রস্তুতি নিতে। যখন সমাজের কিছু মানুষ আমাকে ব্যর্থতার চোখে দেখছিল, তখন মা পাশে থাকায় নিজেকে আবার প্রস্তুত করার সাহস করলাম। শুরু হলো আবারো প্রস্তুতি। এরপর টানা ৭ মাস বাসার ভেতরে ছিলাম। ধর্মীয় কাজ আর প্রয়োজনীয় দরকার ছাড়া বাসা থেকে বের হতাম না। যে ইংরেজির জন্য ব্যর্থ হয়েছিলাম, সেই ইংরেজির একদম বেসিক থেকে শুরু করে বিসিএসের প্রশ্ন ব্যাখ্যাসহ বুঝে বুঝে আয়ত্ব করে নিলাম। সেকেন্ড টাইমার হিসেবে যে ৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়েছি, তার মধ্য ১টিতে ওয়েটিংসহ বাকি ৩টিতে চান্স হয়। বর্তমানে পছন্দের সাবজেক্ট নিয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছি।

আমি আমার এই অল্প সময়ের শিক্ষাজীবনে যা শিখতে পেরেছি, তা হলো যদি নিজের ওপর বিশ্বাস থাকে অসম্ভব বলে কিছু নেই। তাই যারা জিপিএ-৫ হাতছাড়া করে ভেঙে পড়েছো, তাদের উদ্দেশে বলবো, নিজের ওপর ভরসা রেখো। ভরসা রেখো সৃষ্টিকর্তার ওপর। কোনো একটি বিষয়ের শেষ পর্যন্ত যাও, দেখবে তা তুমি পাবেই। যেখানে মন থেকে চাইলে সৃষ্টিকর্তাকে পাওয়া যায়, সেখানে দুনিয়ার প্রাপ্তিগুলো পাওয়া নিতান্তই সহজ। তাই এগিয়ে যাও সামনের দিনগুলোতে, দেখবে বিজয় আসবেই।

লেখক: শিক্ষার্থী, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

এসএসসি
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close