• শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২০, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

এক টুকরো গল্পে ‘মা’

প্রকাশ:  ১০ মে ২০২০, ১১:৫৬
মকবুল হোসাইন

রহিমা (ছদ্মনাম) ঝাড়ুদারনির চাকুরী করতো শহরে অবস্থিত এক গার্মেন্টসে। হঠাৎই তাকে ফোনে ডুকরে ডুকরে করে কাঁদতে দেখা গেলো। এমনটা দেখে নাদিরা এগিয়ে গেলো এবং কান্নার কারন জানতে চাইলে। রহিমা কাঁদতে কাঁদতে শুধু বললো 'আইজকে আমি যুদ্ধ জিতার খবর হুনলাম'। এতক্ষনে তার আশেপাশে আরো অনেকেই জড়ো হয়ে গেছে। সকলের মাঝেই কৌতুহল কিসের যুদ্ধ জয়? কি হয়েছে? ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে রহিমা জানালো তার করুণ সেই যুদ্ধের কাহিনী।

অনেক অনেকদিন আগের কথা, রহিম (ছদ্মনাম) নামের এক লোকের ঘর আলোকিত করে জন্ম রহিমার। পরিবারে সে সহ সদস্য ৬ জন। পরিবারের বড় মেয়ে সে, যার জন্য সকল কাজ সামলাতে হয় তাকে। রহিমার বয়স তখন ১৩ কি ১৪ বছর বয়স। মাত্র ব্রাক স্কুলে যাওয়া আসা করে। যখন তার পুতুল নিয়ে খেলার সময়, ঠিক তখনই আচমকা এক দুঃখের ঝড় বয়ে যায় তার উপর দিয়ে। বিয়ে দিবে বলে দিনক্ষণ ঠিক করা হয় এবং বিয়ে দেওয়া হয়। এই ছোট বয়সে পাড়ি জমায় শুশুর বাড়ি। ধরতে হয় সংসারের হাল। তার স্বামী তখন রিক্সা চালাতো। স্বমীর ছিলোনা তেমন জমিজমা, ছিলোনা নগদ অর্থকড়ি। ছিলো শুধু বাপের ভিটার উপর একটা দোচালা শণের ঘর, আর চাষাবাদ করার মতো এক টুকরো জমি (২০ শতাংশ)। দিন আনে দিন খায়। ইনকামের জন্য ছিলো এক রিক্সা। সংসার জীবনেও পেলো না সুখের দেখা, তবু ভেঙ্গে না পরে দুঃখটাকেই সুখ ভেবে নেওয়ার অভ্যাস করে ফেললো। তার স্বামীও নিতান্ত ভালো মানুষ, কিন্তু কেমন যেনো বেখেয়ালি। সংসার জীবনে দুই বাচ্চার(এক ছেলে ও এক মেয়ে) জননী হলেন। মেয়ে মা হয়েছে জেনে খুশি হয়ে রহিম মিয়া একটি গাই গরু দিলেন, যাতে করে তার নাতিনাতনি দুধের কষ্ট না করেন। দুঃখ কষ্ট মিলিয়ে কোনভাবে চলছিলো তার সংসার জীবন। কিন্তু হঠাৎই দুঃখ নামক কালো মেঘ গ্রাস করে ফেলে তার সংসার। তার শশুর মারা যায়। তার কিছুদিন পর এক্সিডেন্ট করে তার স্বামী। রিক্সার স্ক্রুপ (রিং এর শিক) পায়ের একদিক থেকে অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে না পেড়ে বাবার দেওয়া গরুটি বিক্রি করে দেয় রহিমা। চিকিৎসা শেষে রহিমার স্বামী সুস্থ হওয়ার কিছুদিন পর আবার অসুস্থ হয়ে পরে, পরীক্ষা করে দেখা যায় এবার তার বুকের ফেফসায় পানি জমা হয়েছে। রহিমা চিন্তিত হয়ে পরে টাকা জোগার করবে কিভাবে? রহিমা ছোটে চলে যায় তার দেবর ও ভাসুরের কাছে, সব বলার পরো যেনো তাদের মন গলে না।

অবশেষে সিদ্ধান্ত নেয় চাষাবাদের যে জমিটুকু আছে তা বন্ধক রাখবে, এবং বন্ধক রেখে চার হাজার পাঁচশো (৪৫০০) টাকা নেয় একজনের কাছ থেকে। চিকিৎসা করে সুস্থ হওয়ার কিছুদিন পর এবার রহিমা অসুস্থ হয়ে পরে। তার পেটের ভিতর নারে ঘাঁ হয়। দিসেহারা হারা রহিমা চিকিৎসা কিভাবে হবে, ছোট বাচ্চাদেরকেই বা কে দেখবে।এসব ভাবতে ভাবতে তার চোখে বেয়ে পানি পড়তে থাকে। এসময় রহিমার স্বামী তার সেই রিক্সাটা বিক্রি করে দেয়। তবুও চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সব টাকা জোগার করতে না পেরে শশুর বাড়ি যায় এবং রহিমার বাবার সাথে কথা বলে। এবং রহিমার বাবা মেয়েকে তার বাড়ি নিয়ে গিয়ে মেয়ের চিকিৎসা শুরু করে। আহ্ কি কষ্ট রহিমার- না পারে ভাত খেতে না পারে পানি! খেলেই পেটে যন্ত্রনা বাড়ে শুধু জাও ভাত খেতে দেয়। আর দৈনিক সকাল থেকে সন্ধা দুই হাতে ছয় (৬) টা করে ইঞ্জেকশন দিতে হয়। রহিমার চিকিৎসাধীন অবস্থায় আবার তার স্বামী অসুস্থ হয়ে পরে। এ যেন মরার উপর খরার ঘাঁ। রহিমা সুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত রহিমার স্বামী গ্রামের ফার্মেসী থেকে চিকিৎসা নিতে থাকেন। প্রায় দীর্ঘ ৩ মাস পর রহিমা সুস্থ হলেও সুস্থ হননি তার স্বামী। এবার পরীক্ষা করার পর জানতে পারে তার কিডনিতে সমস্যা। এ কথা শোনার পর রহিমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পরলো, কেন এমন হয়! সৃষ্টিকর্তার নিকট হাজারো প্রশ্ন রাখে রহিমা, কেন তার পরিবরেই এমন হচ্ছে। চিকিৎসার জন্য হন্ন হয়ে টাকার ব্যবস্থা করতে চেষ্টা করে রহিমা। কিন্তু কোথায় পাবে এ টাকা, কে দিবে? রহিমা তার স্বামীর ভাইদের কাছে সাহায্য চেয়েও টাকা পাইনি। শেষমেস সে রহিমা তার বন্ধক কৃত জমির উপর আরো কিছু টাকা বাড়িয়ে চায় এবং যে বন্ধক নিয়েছে সে আরো সাত হাজার (৭০০০) টাকা দেয়। এ দিয়ে চিকিৎসা চলতে থাকে। ডাক্তার বলে দিছে তার স্বামী ভারি কোন কাজ করতে পারবেনা। রহিমার বোন ও তার ননদের ব্যবহৃত পুরাতন কাপড় গায়ে দেয়, ছেলে মেয়েও আর নতুন কাপরের দেখা পায়না। শীত মৌসুমে নানার ছেড়া লুঙ্গী পীঠে বেধে রহিমার ছেলে তাকে বলে মা আমারে একটা জাম্পার (সুয়েটার) কিনে দিবা। রহুমা কোন উত্তর দিতে পারেনি শুধু কান্না করেছে। যখন রহিমার স্বামী মোটামুটি সুস্থ হয় তখন রহিমার এক খালা শহর থেকে গ্রামে বেড়াতে যায়। ভাগ্নির এবস্থা দেখে পরামর্শ দেয় শহরে চলে আসার জন্য। এখানে আসলে কোন না কোন ব্যবস্থা হবেই। তার খালার পরামর্শে রহিমা গ্রাম থেকে চলে আসে শহরে।

সাল ২০০২, গ্রাম ছেড়ে শহরে আসে রহিমা। তার সেই খালার মারফতে কাজ নেয় এক বাসা বাড়িতে আর তার স্বামী মাটি কাটার কাজে নিযুক্ত হয়। বাসা বাড়ি কাজ করে তেমন সুবিধা না করতে পেরে সে ও মাটি কাটার কাজ শুরু করেন। দিন হাজিরা তখন পুরুষ ৯০ টাকা আর মহিলা ৬০ টাকা। চিকিৎসা মিটিয়ে ভরণপোষণের টাকা জোগার করতে ব্যার্থ হয়ে সন্তানদ্বয়কে গ্রামে রেখে আসেন। মেয়েকে তার মায়ের কাছে রেখে আসেন এবং ছেলেকে তার দাদার বাসায়। বেশ কিছুদিন যাওয়ার পর মোটামুটি অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। ঈদ চলে আসাতে গ্রামে যায় বেড়াতে। গিয়ে দেখেন ছেলের মাথায় ঝাকরা চুল, কেউ কেটে দেইনি। ছেলে মাকে দেখে দৌড়াইয়ে কাছে গিয়েই বলে "মা ২ডা টেহা দিবা চুল কাডমো, কাইলেকে ভাইরে (ভাসুরের ছেলে) জেডো চুলি কাইডি দিছে আমারে দেই নাই"।এ কথা শুনে রহিমার চোখ বেয়ে অনবরত পানি পড়তে থাকে। এ অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত নেয় যে এবার যখন শহরে যাবে তখন সন্তানদের ও নিয়ে যাবে।

ঈদের পর আবারো চলে আসলো সদ্য পরিচিত সেই শহর। জানুয়ারি মাস আসতেই ছেলেকে একটি আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে দেয় এবং মেয়েকে দেয় স্কুলে। এবং রহিমা যে বাসায ভাড়া থাকতো সে বাসার এক পরিচিত মহিলার সাহায্যে ঝাড়ুদারনী পদেচাকুরী নেয় এক গার্মেন্টসে। এবং তার স্বামী মাছ ধরার কাজ শুরু করেন। ভালোভাবেই কাটতে থাকে রহিমার সংসার। ছেলে মেয়েও ভালো রেজাল্ট করতে থাকে।

কিন্তু প্রকৃতির নিমর্ম পরিহাস, দুঃখ যেন ছাড়তেই চাইনা তাকে, মেয়েটা যখন ক্লাস ফোরে পরে, সাল ২০০৫ তখন রহিমার এক দূর্ঘটনা ঘটে। গার্মেন্টসের শিপমেন্টের জন্য প্রস্তুত করা মালের কার্টুন তার উপর ভেঙ্গে পরে কোমরে আঘাত পায়, প্রায় দীর্ঘ ১ বছর আর কোন কাজ করতে পারেনা। পরিবারে আবারো সংকট দেখা দেয়। এমন সংকটময় সময়ে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেয়। এবং ছেলের পড়া অব্যাহত রাখে। বছরখানেক পর আবারো গার্মেন্টসে চাকুরী নেয় রহিমা এবং দুঃখ কষ্টের ভিতরেই জীবনযাপন করতে থাকে।

সাল ২০১৩। ছেলে দাখিল পাশ করে এবং পলিটেকনিকে ভর্তি পরীক্ষায় টিকে যায়। এইতো কিছুদিন আগেই অফিসের সবাইকে মিষ্টি খাওয়ালো রহিমা। মেয়ের সংসার ও ভালোই চলছে, এক ছেলেও হয়েছে। রহিমার মেয়ে নিয়ে আর চিন্তা নেই, শুধু ছেলেকে নিয়ে ভাবনা, কীভাবে ছেলের লেখা পরা শেষ করানো যায় এ ভাবনা যেনো তাকে ঘুমাতেই দেইনা।দেখতে দেখতে চার বছর শেষ হলো।

ছেলেও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে ডিপ্লোমা শেষ করে ফার্স্ট ডিবিশন রেজাল্ট নিয়ে। এবং পাশ করার পর থেকেই চাকুরী খুঁজতে বেরিয়ে পরে ছেলে। কয়েকমাস যাবৎ চেষ্টা করতেছিলো। এবং কিছুক্ষণ আগেই রহিমাকে তার ছেলে কল দিয়ে জানায় সে চাকুরী পেয়েছে। ছেলে তাকে বলছে " মা তোমার আর চিন্তা নাই এহন আর তোমারে চাকরি করন লাগবো না, আমি অহনথনে চাকরি করমু আর সংসার চালামু" আর এ খবর শুনেই রহিমা কাঁদতে ছিলো। এ যেন সুখের বৃষ্টি দেখা দিয়েছে রহিমা কষ্টেভরা অন্ধকারময় আকাশে।

একজন মা কতটা আত্মত্যাগী হতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এই ছেলেকে বড় করতে গিয়ে যখন বাধাগ্রস্থ হয়েছিল তখন কত মানুষ বলে ছিলো যে ছেলেকে চায়ের দোকানে, খাবার হোটেলে কাজ করতে দিবার জন্য। আর রহিমা তাদের একটা উত্তরই দিয়েছিলো' প্রয়োজনে ভিক্ষা করবো, রক্ত বিক্রি করবো কিন্তু ছেলেকে লেখা-পড়া করাবো'। আজ তার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার, তার কষ্টটা আজ সুখে পরিণত হবার দিন। যে চোখ বেয়ে কষ্টের অশ্রু ঝরেছিল আজ সে চোখে সুখের কান্না।

রহিমা যেন এক নাম না জানা যুদ্ধ জয় করেছে। এবার হয়তো পাবে সুখের দেখা!!!

বেচে থাকুক পৃথিবীর সকল মায়েরা, বেচে থাকুক মায়েদের ভালোবাসা।

মকবুল হোসাইন

শিক্ষার্থী, সিভিল ডিপার্টমেন্ট

ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

মা
  • আরও পড়তে ক্লিক করুন:
  • মা
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close