• বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০, ৭ কার্তিক ১৪২৭
  • ||

‘স্বাস্থ্য ডিজি হতে চাই না, ডিজির ড্রাইভার হয়ে মরতে চাই’

প্রকাশ:  ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৮:২৬ | আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৮:৩১
নিজস্ব প্রতিবেদক

অবৈধ অস্ত্র, জাল নোট ব্যবসা ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়ি চালক মালেকের বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন অনেকেই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, গাড়ি চালক আব্দুল মালেক দীর্ঘদিন ধরে অধিদপ্তরের বিভিন্ন বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। বিশেষ করে অধিদপ্তরের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য তার প্রধান কাজ। কোনো কর্মকর্তা যদি আবদুল মালেকের সুপারিশ না শোনেন তাহলে তাকে ঢাকার বাইরে বদলি করাসহ শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটিয়েছেন একাধিকবার।

গাড়ি চালকের প্রভাবের কাছে অসহায় অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের আক্ষেপ ‘পরজন্মে চালক’ হবেন। আবার কেউ কেউ চেষ্টা করছেন সাফাই দেয়ারও। তবে তার এই প্রবল ক্ষমতার উৎস কী- এই প্রশ্নের মুখে কুলুপ তাদের।

একজন চিকিৎসক বলেন, আমি স্বাস্থ্য ডিজি হতে চাই না, আমার জীবনের শেষ ইচ্ছা ডিজির ড্রাইভার হয়ে মরতে চাই, রিটায়ার্ড হতে চাই। আমি ডিজি হতে চাই না।

তিনি আরো বলেন, মালেক ড্রাইভারের কারণে আমরা অফিসে আসতে পারতাম না। তার দলবল নিয়ে হয়রানি করতো। বলতে গেলে ডিজি অফিসটা মালেকের বাবার অফিস।

এদিকে মালেকের কয়েকজন সহকর্মীর দাবি, কেউ বিপদে পড়লে হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা আর চাকরি দিয়ে সাহায্য করতেন মালেক।

তবে তার সেই ক্ষমতা বা টাকার উৎস কী ছিলো? এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর দেন নি তারা।

জানা গেছে, আব্দুল মালেকের মেয়ে ও ভাই অধিদপ্তরের অফিস সহকারী পদে, ভাতিজা ও এক নিকটাত্মীয় অফিস সহায়ক পদে, ভাগ্নে ও ভায়রা ড্রাইভার বড় মেয়ের জামাতা ক্যান্টিন পরিচালনা করছেন।

অভিযোগ উঠেছে, মালেকের মেয়ের জামাই অধিদপ্তরের ক্যান্টিন লিজ নিলেও এখনো তা পরিচালনা করা হয় সরকারি বেতনভুক্ত কর্মচারী দিয়ে।

একজন বলেন, যদি কোনো অধস্তন কর্মকর্তার এত প্রতিপত্তি হয়, তাহলে বুঝতে হবে সেই কার্যালয়ের যে সর্বোচ্চ অবস্থানে আছেন তার আশ্রয় ও প্রশ্রয়ে থাকে।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক আব্দুল মালেক ওরফে বাদলের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অস্ত্র ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় ১৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) তাকে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে পুলিশ। এ সময় অবৈধ অস্ত্র ও জাল টাকা উদ্ধারের ঘটনায় তুরাগ থানার করা পৃথক দুই মামলায় তার সাত দিন করে ১৪ দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। অন্যদিকে তার আইনজীবী জি এম মিজানুর রহমান রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিনের আবেদন করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম শহিদুল ইসলাম জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে ১৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

অবৈধ অস্ত্র, জাল নোট ব্যবসা ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) ভোরে রাজধানীর তুরাগ এলাকা থেকে গাড়িচালক আবদুল মালেক ওরফে ড্রাইভার মালেককে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। এ সময় তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগজিন, পাঁচ রাউন্ড গুলি, দেড় লাখ বাংলাদেশি জাল নোট, একটি ল্যাপটপ ও মোবাইলফোন উদ্ধার করা হয়।

জানা গেছে, তার স্ত্রীর নামে দক্ষিণ কামারপাড়ায় দুটি সাততলা বিলাসবহুল ভবন, ১৫ কাঠা জমিতে একটি ডেইরি ফার্ম, ধানমন্ডির হাতিরপুল এলাকায় সাড়ে চার কাঠা জমিতে একটি নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবন রয়েছে।

কর্মকর্তারা লোকলজ্জার ভয়ে এসব বিষয় কখনও প্রকাশ করেননি। নিজে অধিদপ্তরের একজন গাড়ির চালক হয়েও মালেক একটি পাজেরো জিপ ব্যবহার করেন। তার রয়েছে তেল চুরির সিন্ডিকেট, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যত গাড়ির চালক তেল চুরি করে, তার একটি অংশ তাকে দিতে হয়। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি পুরো অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।

র‌্যাব জানায়, গ্রেপ্তারের পর ড্রাইভার মালেকের বিভিন্ন ব্যাংকে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থ গচ্ছিত রয়েছে বলে জানিয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাফী উল্লাহ বুলবুল বলেন, সম্প্রতি র‌্যাবের প্রাথমিক গোয়েন্দা অনুসন্ধানে রাজধানীর তুরাগ এলাকায় আব্দুল মালেক ওরফে ড্রাইভার মালেকের (৬৩) বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা, জাল টাকার ব্যবসা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পাওয়া যায়।

তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, তিনি ওই এলাকায় সাধারণ মানুষকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে শক্তির মহড়া ও দাপট দেখিয়ে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছেন। তার দাপটে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। তার ভয়ে এলাকায় সাধারণ মানুষের মনে সবসময় আতঙ্ক বিরাজ করে।

র‌্যাব জানিয়েছে, অবৈধ অস্ত্র, জালনোটের ব্যবসা ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন মালেক। সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ভিত্তিতেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক বলেন, মালেক পেশায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিবহন পুলের একজন চালক। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি। ১৯৮২ সালে সাভার স্বাস্থ্য প্রকল্পে চালক হিসেবে যোগদান করেন। পরে ১৯৮৬ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিবহন পুলে চালক হিসেবে চাকরি শুরু করেন। বর্তমানে তিনি প্রেষণে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা অধিদপ্তরে কর্মরত। তিনি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা, জালনোট ব্যবসাসহ অস্ত্রের মাধ্যমে ভীতি প্রদর্শনপূর্বক সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন।

পূর্বপশ্চিমবিডি/জেডআই

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর,আব্দুল মালেক
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close