• সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২০, ২৩ চৈত্র ১৪২৬
  • ||

১২ রুশ তরুণীই কাল হলো পাপিয়ার

প্রকাশ:  ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১১:৪৯
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর একাধিক পাঁচতারকা হোটেলে রেখে নারীদের অনৈতিক কাজে বাধ্য করা ও বিত্তশালীদের ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইল করে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়ার বিরুদ্ধে। অভিজাত ব্যক্তিদের চাহিদা মেটাতে শামীমা নূর পাপিয়া তার ডেরায় রুশ মডেল-তরুণীদের নিয়ে আসতেন। মাসখানেক আগে ১২ রুশ মডেল তরুণীর দেশে প্রবেশের খোঁজ-খবর করতে গিয়েই পাপিয়ার জগতের সন্ধান মেলে। আর এসব গডফাদার-গডমাদারদের খুঁজছেন গোয়েন্দারা।

পাপিয়া ও স্বামী মতি সুমনসহ গ্রেফতার চারজনের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের যাচাই-বাছাই চলছে। তবে এরই মধ্যে অন্তত ১৫ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে রাখা হয়েছে নজরদারিতে। তারা কোথায় যাতায়াত করেন, কাদের সঙ্গে সময় কাটান এসব বিষয়ের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন গোয়েন্দারা। পরবর্তী সময়ে তাদের প্রত্যেকের আমলনামা পাঠানো হবে শীর্ষ মহলে।

অন্যদিকে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানতে পেরেছেন, পাপিয়ার ইন্দিরা রোডের ফ্ল্যাটে প্রায় রাতেই ককটেল পার্টি বসত। সেখানেও আনাগোনা ছিল বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তির। পরে সেখান থেকে পছন্দ অনুযায়ী সুন্দরী যুবতীদের নিয়ে যেতেন তারা। এ ছাড়া বিমানবন্দর ও শেরেবাংলানগর থানায় করা পৃথক তিনটি মামলার তদন্তভার মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হলেও মামলার তদন্তভার নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে র‌্যাব। গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানা গেছে ।

ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়, মাসখানেক আগে ১২ রুশ তরুণী ঢাকায় আসেন। তবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করলে ইমিগ্রেশনে আটকা পড়েন তারা। শেষ পর্যন্ত পাপিয়া উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের সুপারিশে তাদের ছাড়িয়ে আনেন।

ওই প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, কেন, কোন কারণে, কোন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে তারা ঢাকায় এসেছেন এমন কোনো তথ্য ওই মডেলদের কাছে না থাকায় বিষয়টি গোয়েন্দাদের মাধ্যমে খবর পৌঁছায় সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে। এরপরই তাদের সম্পর্কে খোঁজ-খবর শুরু হয়। ওই সূত্র ধরেই বেরিয়ে আসে পাপিয়ার পাপের জগতের সন্ধান।

একাধিক সূত্র বলছে, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মনোরঞ্জনের জন্য পাপিয়ার কাছে সুন্দরী নারী চাইতেন ক্যাসিনো অভিযানের সময় গ্রেফতার টেন্ডার মাফিয়া জি কে শামীমসহ আরও কয়েকজন টেন্ডারবাজ। তাদের চাহিদা অনুযায়ী সুন্দরীদের পাঠিয়ে দেওয়া হতো সরকারি-বেসরকারি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে। ওই সুন্দরীদের মাধ্যমে টেন্ডারবাজরা হাসিল করে নিতেন বড় বড় টেন্ডার। পাপিয়া ওই সুন্দরীদের টোপ হিসেবে ব্যবহার করতেন। তাদের ব্যবহৃত ভ্যানেটি ব্যাগ কিংবা অন্যান্য সামগ্রীতে পাপিয়া কৌশলে লাগিয়ে দিতেন অত্যাধুনিক ডিভাইস। সেই সব ডিভাইসে ধারণকৃত মনোরঞ্জনের দৃশ্যগুলো পরবর্তী সময়ে কাজে লাগাতেন লেডি মাফিয়া পাপিয়া। এ ছাড়া হাই সোসাইটির খদ্দেরদের চাহিদা অনুযায়ী পাপিয়া তার সংগ্রহে রাখতেন রুশ ও থাই সুন্দরী নারী। চাহিদা ও রেট মিলে গেলে পাপিয়া তাদের বাংলাদেশে নিয়ে আসতেন। সূত্র বলছে, গ্রেফতারের পর পাপিয়া ও তার সহযোগীদের দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদে অপরাধ জগতের বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্যে বেরিয়ে আসছে মদদদাতাদের নাম। এদের মধ্যে যুব মহিলা লীগের তিন নারীনেত্রীর বিষয়ে এরই মধ্যে নিশ্চিত হয়েছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা।

তদন্তভার পেলেও এখনও পাপিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ হয়নি বলে জানিয়েছেন ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মো. আবদুল বাতেন।

তিনি বলেন, র‌্যাবের দায়ের করা তিনটি মামলা ডিবিতে হস্তান্তর হয়েছে। পাপিয়া ১৫ দিনের রিমান্ডে রয়েছে। গতকালই মামলা ডিবিতে আসায় জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ হয়নি। পাপিয়ার সঙ্গে কারা জড়িত, কারা ইন্ধনদাতা, তার অর্থের উৎস কী, তার এত বেপরোয়া আচরণের পেছনে শক্তির উৎস কী— সবই তদন্ত করে দেখা হবে। এমনকি অনৈতিক বিষয় থাকলেও তদন্ত করে দেখা হবে।

গোয়েন্দা পুলিশের (উত্তর) উপকমিশনার মশিউর রহমান বলেন, মামলাগুলোর ডকেট বুঝে পেয়েছি। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছি।

পাপিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক শাফী উল্লাহ বুলবুল। তিনি বলেন, ‘আমরা তাকে গ্রেপ্তার করেছি। কিন্তু আদালতে হাজির করার কারণে অনেক বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ প্রাথমিকভাবে সম্ভব হয়নি। বিস্তারিত তথ্য জানার জন্য আমরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাই।’

গত ২২ ফেব্রুয়ারি দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে জাল টাকা বহন ও টাকা পাচারের অভিযোগে পাপিয়াসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। বাকিরা হলেন, পাপিয়ার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরী ওরফে মতি সুমন (৩৮), সাব্বির খন্দকার (২৯) ও শেখ তায়্যিবা (২২)। এরপর রাজধানীর ফার্মগেটের ইন্দিরা রোডে ও নরসিংদীতে বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়িসহ তাদের নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থের খবর পেয়ে অভিযান পরিচালনা করে র‌্যাব।

অভিযানে ইন্দিরা রোডে পাপিয়ার বাসা থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগজিন, ২০ রাউন্ড গুলি, ৫ বোতল বিদেশি মদ, ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা, ৫টি পাসপোর্ট, ৩টি চেক, বেশ কিছু বিদেশি মুদ্রা ও বিভিন্ন ব্যাংকের ১০টি এটিএম কার্ড উদ্ধার করা হয়।পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি বিমানবন্দর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি এবং ২৪ ফেব্রুয়ারি শেরেবাংলা নগর থানায় অস্ত্র আইনে একটি ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে আরেকটি মামলা করা হয়।।এরপর তাদের রিমান্ডে নেয়া হয়।

পূর্বপশ্চিমবিডি/জিএম

ব্ল্যাকমেইল,যুব মহিলা লীগ,শামীমা নূর পাপিয়া,১২ রুশ মডেল তরুণী
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close